Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (98 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৩-২০১২

মতিউর রহমান চৌধুরীর ‘কূটনীতির অন্দরমহল’

মতিউর রহমান চৌধুরীর ‘কূটনীতির অন্দরমহল’
আওয়ামী লীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচরদের অন্যতম খোন্দকার মোশ্‌তাক আহ্‌মাদই যে পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক ট্র্যাজেডির সঙ্গে জড়িত সেকথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম শুনেছিলেন প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর কাছে। প্রথমে তিনি তা কোন মতেই বিশ্বাস করতে রাজি ছিলেন না। মতিউর রহমান চৌধুরীর প্রকাশিতব্য ‘কূটনীতির অন্দরমহল’ বইয়ের বর্ণনায়, ‘শেখ হাসিনা বলছিল তা কি করে হয়। আব্বার সঙ্গে মোশতাক চাচা কত ঘনিষ্ঠ। পরিবারের একজন সদস্যের মতো। তিনি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত হতে পারেন না। হাসিনা অবিশ্বাস করলে কি হবে মোশতাকই সে ঘটনার নায়ক। অভ্যুত্থানের সুবাদে প্রেসিডেন্ট।’
উল্লেখ্য, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৭৫ সালে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পারিবারিকভাবে হুমায়ুন পরিবারের সঙ্গে ষাটের দশক থেকেই বঙ্গবন্ধুর হূদ্যতা ছিল। সে কারণে ১৯৭৫ সালের ১৩ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু জার্মানিতে দুই মেয়েকে বেড়াতে পাঠিয়েছিলেন। আর সেসব দিনের স্মৃতিচারণ ফুটে উঠেছে মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে প্রয়াত স্পিকারের একান্ত কথোপকথনে।
সূচীপত্র প্রকাশিত ২২৩ পৃষ্ঠার ওই বইটি বাংলা একাডেমী আয়োজিত একুশের বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর জবানিতে সেদিনের ঘটনাবলী প্রকাশিত হলো এই প্রথম। তার কথায়, ‘জার্মান সরকারকে জানালাম আমার বাসায় শেখ সাহেবের দুই মেয়ে, মেয়ের জামাই ও দুই নাতি নাতনি রয়েছে। জার্মান সরকার সঙ্গে সঙ্গে আমার বাসার সামনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা করল। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্তারিত জানাতে বলল। তারা বলল, একসেলেন্সি আমরা আপনার সাহসী ভূমিকাকে উৎসাহিত করছি। তবু আপনি নিজে কোন ঝামেলায় পড়েন কিনা খেয়াল রাখবেন। আমি বললাম না কোন অসুবিধা হবে না। মানবিক দায়িত্ব পালন করছি। মনে আছে ডেস্ক অফিসার আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন নিশ্চিন্ত না হই অসুবিধা হবে না এ কথা ভেবে। তার ভাষায় আমারও অসুবিধা হতে পারে। সতর্ক থাকবেন। আমাদের জানাবেন সবকিছু। এক পর্যায়ে হাসিনা জানতে চাইল কে এই ঘটনার নায়ক। আমি বললাম রেডিও রিপোর্ট থেকে শুনেছি খোন্দকার মোশ্‌তাকের কথা।’
আমি কেন ঠাঁই দিয়েছি
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বরাতে ‘কূটনীতির অন্দরমহলে’ আরও ছাপা হয়েছে যে, ‘‘সারা দুনিয়া থেকে টেলিফোন আসতে শুরু করল আমার কাছে। সবাই জানতে চায় শেখ পরিবারের দুই সদস্যের কথা। সংবাদপত্র থেকেও ফোনের পর ফোন আসতে থাকল। এক জার্মান ভদ্রমহিলা মিশনে ঢুকে বলল তোমরা কেমন জাতি। তোমরা তোমাদের জাতির পিতাকে হত্যা করতে পার। তোমরা এক অসভ্য জাতি। ভদ্রমহিলা কোন অবস্থাতেই থামতে রাজি নন। তাকে বললাম, শেখ সাহেবের মেয়েদের আমি আশ্রয় দিয়েছি। অপর এক মহিলা ১২ বছরের এক বালককে নিয়ে এলেন দূতাবাসে। তাকে দেখিয়ে বললেন কি করে তোমরা এই বয়সের এক বালককে হত্যা করতে পার। কি জবাব দেব বলুন। আমার কেন যেন মনে হয়েছিল নিজেই আত্মহত্যা করি। রাষ্ট্রদূত হিসেবে পরিচয় দিতে তখন লজ্জা লাগছিল। ঘৃণাবোধ করছিলাম। এই যখন অবস্থা তখন জার্মান প্রবাসী কতিপয় বাংলাদেশী যুবক এসে ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি করল। তারা বলল, আমি কেন শেখ সাহেবের মেয়েদেরকে ঠাঁই দিয়েছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের যেন বাসা থেকে বের করে দেই। না হলে আমাকে দেখিয়ে দেবে। তারা কয়েকটি পাসপোর্ট দিয়ে বলল ইসলামী প্রজাতন্ত্র যেন সিল মেরে দেই। তাদের ধারণা, বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়ে গেছে। তারা বলল, এগুলো না করলে দূতাবাস ত্যাগ করবে না। এদের প্রায় সবাই অবৈধভাবে জার্মানিতে বসবাসকারী। কেউ কেউ ঢাকায় সরকার পরিবর্তনের ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করল। সরকারকে জানাল তারা আওয়ামী লীগ করত। এখন সরকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। ঢাকায় গেলে মারা পড়বে তাই রাজনৈতিক আশ্রয় দরকার।
বিক্ষোভরতদের বললাম, শেখ পরিবারের সদস্যরা আমার বাসায় থাকবে। বিক্ষোভ করে কোন লাভ হবে না। বরং তাদের ক্ষতি হবে। এরপর তারা চলে গেল। ১৬ তারিখ আমার এক ভাগিনা এসে হাজির। বাসায় থাকবে কয়দিন। ড. কামাল তখন লন্ডনের পথে পাড়ি দিয়েছেন। রুম খালি আছে। ভাগিনাকে এই রুম দেয়া হলো। বললাম, যাও বিশ্রাম নাও। সুঠাম দেহের অধিকারী ভাগিনা যখন রুমে যাচ্ছিল তখন শেখ সাহেবের এক মেয়ে তাকে দেখে ফেলে। এই ভয়ে তারা রাতে ঘুমাতে পারেনি। আমি তখন কিছুই জানি না। পরদিন তারা বুঝতে পারল ও আমার ভাগিনা। হত্যা করতে আসেনি। ড. ওয়াজেদ আমাকে জার্মানিস্থ সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অনুরোধ জানালেন। তার ধারণা ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদেরকে আশ্রয় দেবে। আমি বললাম, আশ্রয় নিতে চাইলে সোভিয়েত কেন জার্মানিতে হতে পারে। এটা কোন সমস্যা নয়। তারা ইচ্ছে করলে লন্ডনেও যেতে পারে। আমার ছেলের বাড়িতেও থাকতে পারবে। আমার ছেলে নোমান তখন লন্ডনে একাউন্টেন্সি পড়ছে। এক সময় ভারতীয় হাইকমিশনার আমাকে টেলিফোন করে শেখ পরিবারের সদস্যদের কুশলাদি জানালেন। বললাম তারা এখন ভাল আছে। আমি দেখাশোনা কছি। তিনি বললেন, মিসেস গান্ধী খুব খুশি হয়েছেন আমি আশ্রয় দিয়েছি জেনে। হাসিনাকে বললাম, ভারতীয় হাইকমিশনার জনাব রহমান দেখা করতে চান তার সঙ্গে। সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলাম। সাক্ষাৎ হলো। আমি গরহাজির থাকলাম। এরপরে ড. ওয়াজেদ তাদেরকে নিয়ে গেলেন কার্লশোতে যেখানে শিক্ষা সফরে এসেছিলেন তিনি। কিছুদিন পর ভারতীয় হাইকমিশনার জানালেন শেখ পরিবারের সদস্যগণ নিরাপদে, সুস্থভাবে বসবাস করছেন দিল্লিতে।’’
মোশ্‌তাক আহ্‌মাদ খুবই ক্ষিপ্ত
‘‘২৫শে আগস্ট জেনেভা থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী ফোন করে জানালেন মোশ্‌তাক আহ্‌মাদ খুবই ক্ষিপ্ত। কেন আমি হাসিনা-রেহানাদের আশ্রয় দিয়েছিলাম। আমাকে এক হাত দেখিয়ে দেবেন বললেন। আমাকে ঢাকায় তলব করা হয়েছে। প্লিজ আপনি যাবেন না। গেলে বিপদ হবে। দু’দিন পর ঢাকা থেকে বার্তা পেলাম। বার্তায় বলা হয়েছে আমি চার্জ হস্তান্তর করে ৫ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঢাকায় রিপোর্ট করতে। আমাকে তখন ওএসডি করা হয়েছে। জার্মান বন্ধুরাও নিষেধ করল ঢাকায় যেতে। তারা বলল, জার্মানিতে চাকরি হয়ে যাবে। পররাষ্ট্র দপ্তর বার্তার পর বার্তা পাঠালো। আমি যেন তাড়াতাড়ি ঢাকায় চলে যাই। আমি জবাব পাঠালাম নভেম্বরের আগে আসা সম্ভব নয় এবং নভেম্বরে আমি পররাষ্ট্র সার্ভিস থেকে ইস্তফা দেব। জার্মানিতে চাকরি হয়ে গেছে।
মি. এইচ আর ডিঙ্গেলস জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি এসে বললেন, আমার কোন সাহায্য দরকার কিনা? আমার সঙ্গে তার হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক আগেই প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তিনি বললেন, জার্মানিতে যদি আমি থাকতে চাই। এতে কোনরূপ অসুবিধা হবে না। আমি তখনও স্থির করতে পারিনি কি করব। এর মধ্যে খবর পেলাম ঢাকায় সরকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। খোন্দকার মোশ্‌তাক আর ক্ষমতায় নেই। মোশ্‌তাকের কারণেই আমি দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ মোশ্‌তাক ব্যক্তিগতভাবে আমাকে পছন্দ করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে মোশ্‌তাকের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আমি তাকে পছন্দ করতাম না। মোশ্‌তাক একজন ষড়যন্ত্রকারী। দেশের স্বার্থ বিসর্জনকারী একজন রাজনীতিক হিসেবেই তাকে চিনতাম। মোশ্‌তাকের অন্যতম সহযোগী তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও মাহবুব আলম চাষী বরাবরই আমার বিরুদ্ধে ছিল। সুযোগ পেলেই তারা আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করতো। এই তিনজন পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের ব্যাপারে সক্রিয় ছিল।

সাহিত্য সংবাদ

আরও সাহিত্য সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে