Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২০ , ১৯ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২২-২০১২

লঙ্ঘিতে হবে অনাস্থার দুর্গম গিরি

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান


লঙ্ঘিতে হবে অনাস্থার দুর্গম গিরি
আড়াই হাজার বছর আগেপঞ্চতন্ত্রে বলা হয়, গো-দান নয়, ভূ-দান নয়, আত্মদানও নয়, পৃথিবীতে সকল দানের মধ্যে নিরাপত্তা দান শ্রেষ্ঠ দান হিসেবে স্বীকৃত।
গত দেড় হাজার বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় ৬৩টি বিশিষ্ট রাজশক্তির উত্থান ঘটে। এর মধ্যে মাত্র নয়টি নিখিল ভারতীয় রাষ্ট্রের মর্যাদা পেয়েছিল। সর্বশেষ রাষ্ট্রটি ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য। আধিপত্যবাদী, ক্ষমতাধর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন—‘যে দুর্বল, সবলের পক্ষে সে তেমনই ভয়ঙ্কর, হাতির পক্ষে যেমন চোরাবালি। এই বালি বাধা দিতে পারে না বলেই সম্মুখের দিকে অগ্রসর করে না, কেবলই নীচের দিকে টেনে নেয়। শক্তির আয়তন যত প্রকাণ্ড, তার ভার যতই বেশী, তার প্রতি অশক্তির নীচের দিকে টান ততই ভয়ঙ্কর। যে বাধা দেয় না, তাকে পদাঘাত যত জোরেই করবে, পদের পক্ষে তা ততই বিপদ ঘটাবে।’
সামরিক ইতিহাসের ছাত্র নীরদ সি. চৌধুরীর কাছে দক্ষিণ এশিয়া একটি ‘কনটিনেন্ট অব সার্সি’— কুহকিনী সার্সির মহাদেশ। আবার জন জে গলব্রেথের দৃষ্টিতে এটি একটি ‘ফাংশনাল অ্যানার্কি’—কার্যকর নৈরাজ্য।
ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিকীকরণের তৎপরতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, ১৯৪৭-এর পর আজ পর্যন্ত আমরা আন্তরাষ্ট্রীয় বিরোধের খুব কমই মীমাংসা করতে পেরেছি। ইতিমধ্যে অসংখ্য নতুন বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
কথায় আছে, তুমি প্রতিবেশী নির্বাচন করতে পার না। আমরা ভারত বিভাগের সময় প্রতিবেশী চিনে নিয়েছি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় প্রতিবেশীরাই বাংলাদেশের জনগণকে আশ্রয় দিয়েছে এবং স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। এ এমন এক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত যে, ত্রিপুরায় সে দেশের নাগরিকদের চেয়ে শরণার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে গিয়েছিল। এমন হূদ্যতা আমরা হেলায় হারাতে যাব কার জিদে, কার স্বার্থে, কার ছলে, কার কর্মে। সবার সঙ্গে সমঝোতা একান্ত প্রয়োজনীয়। সভ্যতার কোন স্তরে আমরা পৌঁছেছি তার একটা মাপকাঠি হলো আসামি, অপরাধী, দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত, ব্রাত্য বা ভ্রষ্টদের সঙ্গে সমাজ কেমন ব্যবহার করে তার ওপর। দেখামাত্র ‘অনুপ্রবেশকারী’দের গুলি করার নির্দেশ, সে তো এক মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুর আচরণ। রাবার গুলি ব্যবহারের কথাটা কোন নিষ্ঠুর নিশ্চয়তার জন্য প্রস্তাবকেরা আর জোর দিচ্ছেন না।
ভারত উপমহাদেশ হিসেবে পরিচিত। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষ চলাচল করে আসছে জাভা মানবের যুগ থেকে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আজও এ ভূখণ্ডের বিভিন্ন দেশবাসী যেসব স্থলপথে যাতায়াত করে তার ইতিহাস অতি পুরোনো ও পথ পরিচিত। এই পথ ধরে রাজেন্দ্র চোল বঙ্গাল দেশে আসেন। এই পথ ধরে কালাপাহাড় জাজনগর ও নেপাল আক্রমণ করেন। এই পথে বর্গি ও তুর্কিরা চলাচল করে। এই অতিপরিচিত ও অতিব্যবহূত পথ ভিসা-পাসপোর্টের দেয়াল তুলে বন্ধ করা যায় না। এখানে সীমান্ত আইন মহানুভবতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।
গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের দক্ষিণ এশিয়ায় আজ যে অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে, তার অবসান হওয়া একান্ত প্রয়োজন। ভারত-পাকিস্তানের দেনা-পাওনা চুকিয়ে ফেলার জন্য গান্ধী অনশন করেছিলেন। তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পদযাত্রা ও অনশনব্রত পালন করেন। অতীব দুঃখের কথা, সেই সাম্প্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে তাঁকে বলি হতে হয়। যে রবীন্দ্রনাথ বলতেন মানুষকে অবিশ্বাস করা মহাপাপ, সেই মানুষ অবিশ্বাস করে কঠোর থেকে কঠোরতর আইন পাস করছে। যে নজরুল ব্যক্তিগত জীবন থেকে তাঁর সাহিত্যিক জীবনে অসাম্প্রদায়িকতার নিদর্শন রেখে গিয়েছিলেন এবং যিনি হাঁক দিয়েছেন:
‘অসহায় জাতি ডুবিছে মরিয়া, জানে না সন্তরণ—
কান্ডারী, আজ দেখিব তোমার মাতৃ-মুক্তি-পণ।
হিন্দু না ওরা মুসলিম—ওই জিজ্ঞাসে কোন জন,
কান্ডারী, বল ডুবিছে সন্তান মোর মা’র’
সেখানে আজ ভেদাভেদ। যে দক্ষিণ এশিয়ায় এসব ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানে আজ রাষ্ট্রীয় অবিশ্বাস এতই বিদ্বিষ্ট হয়ে উঠেছে যে সার্ক সংঘটি আজ পৃথিবীতে আঞ্চলিক সৌহার্দ্যের সবচেয়ে দুর্বল ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। তাঁদের দেশ আজ অবিশ্বাসে আত্মপ্রত্যয়হীন ও বড়ই সন্দেহকাতর।
আমি অন্যত্র বলেছি, ‘ঐতিহাসিক বৈরিতা, হূতরাজ্য পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, অচিহ্নিত সীমান্ত, একই ভাষা ও ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আন্তসীমান্ত, জ্ঞাতিসম্পর্কানুরাগ, অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিরোধ, অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের অংশীদারিত্ব এবং সর্বোপরি সংঘাতময় জাতিগঠন-প্রক্রিয়ার দরুন দক্ষিণ এশিয়া পৌনঃপুনিক বিরোধ ও আঞ্চলিক সংকটের অঞ্চল হয়ে রয়েছে।’
দেশ ক্ষুদ্র হোক বা বৃহৎ হোক তার হূদয় থাকার কথা নয়, তবে দেশনায়কের হূদয় থাকার কথা। বড় রাষ্ট্রের দেশনায়ককে হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের কর্তাব্যক্তির মতো মহানুভব ও বৃহৎ হূদয়সম্পন্ন হতে হবে। বাড়ির কাছের আরশিনগর আজ সবচেয়ে অজানা-অচেনা। এপার বাংলা-ওপার বাংলা কেবলই কথার কথা। সন্দেহমোচনের জন্য ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির ক্ষেত্র আজ বড়ই খেলো।
সূচ্যগ্র মেদিনী না দেওয়ার অহংকারে কুরু-পাণ্ডবদের আত্মঘাতী মহাযুদ্ধের সূচনা হয়। অনুরূপভাবে এক ঘটি জল দেব না বলে যে আস্ফাালন করা হয় তা আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর এবং প্রতিবেশী-বিধ্বংসী কথা। সীমান্ত চুক্তি পালনে অপদখলীয় ভূমি ও আটকেপড়া এলাকার সুরাহা হলো না। কোচবিহারের রাজা এবং রংপুরের ফৌজদারদের দূতক্রীড়ার দুষ্ফলে এখনো আমরা তার দুর্ভোগ পোহাচ্ছি।
সব নাগরিকের জন্য ন্যূনতম মানের খাদ্য-বস্ত্র-আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করতে পারায় ‘ভোখের’ তাড়নায় কখনো কখনো লোকে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। প্রতিবেশীরা যদি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন-রীতি মেনে তাদের স্বীয় ভূমিকে কাঁটাতারের বেড়া বা ‘মাজিনো’ লাইন দিয়ে ঘিরে ফেলতে চায়, আমরা সেখানে ‘না’ বলার কে! তবে দেশের সীমান্তে বা অভ্যন্তরে আইনের নামে গুলি করে যে নরহত্যা ঘটে, তা অতীব দুঃখজনক। এরূপ ঘটনা শুধু দুঃখবহ নয়, লজ্জাকরও বটে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে।
গত দু-তিন দশকে মানবসমাজের চেহারা-খাসলত পাল্টে গেছে। মৌলবাদী ছাড়া ধর্ম বা আদর্শে মানুষের তেমন অনুরাগ, আনুগত্য বা একাত্মবোধ নেই। সব আশা-আকাঙ্ক্ষার আদল এখন উপভোগবাদের নিরিখে। আজ আমাদের দেশে নারী-শিশু পাচারকারী, মাদক চোরাকারবারী, কালোটাকা পাচারকারী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও মৌলবাদীদের কখনো ক্যারাভান-সরাই, কখনো অভয়াশ্রম। এসব শত্রুকে শায়েস্তা করা দূরের কথা, চোখে চোখে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। জলকষ্টে নিপীড়িত অসহায় মানুষ কলতলায় গিয়ে যে কলহ সৃষ্টি করে, আমরা প্রতিবেশীরা কি সেই পথ অনুসরণ করব?
একাত্তর সালের পারস্পরিক সহানুভূতি ও মৈত্রীর কথা চিন্তা করলে আমাদের নিরাশ হওয়ার কথা নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মানবদরদি, সাহিত্যানুরাগী, শিল্পী, চারুশিল্পী, সংগীতজ্ঞ এবং নান্দনিক জগতের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি যদি নীরব না থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি সৃষ্টির জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে আমার মনে হয় না আমরা এক অনতিক্রম্য বাধার সম্মুখীন। সে হবে এক বড় অতিক্রম। আমরা ‘দুর্গম গিরি দুস্তর পারাবার লঙ্ঘিতে’ পারব।

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে