Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (149 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-২৮-২০১৪

কাতারে বন্দী ১০ বাংলাদেশি নারীর আকুতি

কাতারে বন্দী ১০ বাংলাদেশি নারীর আকুতি

ঢাকা, ২৮ আগস্ট- "ভাইরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমারে এইখান থেকে নিয়া যাও। ওরা আমাদের একটা অন্ধকার ঘরে আটকাইয়া রাখছে। আধা কেজি চালের ভাত দেয় আমগো ১০ জনরে। ওরা আমাদের বিক্রি কইরা দিব। প্রতিদিন মারধোর করে…"

এটি কাতারের আল ঘারাফা নামক স্থানের একটি বাসায় বন্দী নাজমা নামে বাংলাদেশি এক নারীর আকুতি তার ভাই মিলনের কাছে। নাজমার মতো আরও ১০ জন বাংলাদেশি এবং ৫/৬ জন ভিন্ন দেশি নারী ওই একই ঘরে বন্দী আছেন। তারা সবাই বাংলাদেশি প্রতারক রিক্রুটিং এজেন্সির দ্বারা প্রতারিত হয়ে এখন বন্দী হয়ে আছেন কাতারে। এদেরই কেউ কেউ লুকিয়ে তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন। জানিয়েছেন সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করার আকুতি।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশি এই নারীদের বিভিন্ন কাজের কথা বলে কাতারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর তাদের বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। এই কাজে বাংলাদেশি তিন ব্যক্তি জড়িত। তারা হলেন- ইলিয়াস, মনির হোসেন ও সোহেল। এরা প্রত্যেকেই কাতারে থাকেন।

ভাগ্য সহায় হওয়ায় চলতি মাসের ৫ তারিখে ওই বন্দিদশা থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এক নারী। পল্টনের একটি অফিসে বসে তিনি বললেন তার সেই বন্দী জীবনের দুঃসহ স্মৃতির কথা। সেখানে আরও যারা বন্দি আছেন ফিরে আসার জন্য তাদের আকুলতার কথাও বলেছেন এই নারী।

দেশে ফিরেও দালালদের ভয়ে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন তিনি। গোপন রেখেছেন তার দেশে ফিরে আসার কথা।

যারা বন্দী
বাগেরহাট রেল রোডের আব্দুল মজিদ হাওলাদারের মেয়ে নাজমা। তিনি ফকিরাপুলের আল-হেরাম ট্রাভেলসের আহম্মদ ও আসলামের মাধ্যমে কাতার যান। মুন্সিগঞ্জের খাসকান্দি গ্রামের রিনা কাতার যান মুন্সিগঞ্জের চিতনিয়ার লিটন মাতব্বরের মাধ্যমে। ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জ থানার মাইজবাগের তারাটি গ্রামের সাবিনা কাতারে যান ১২০/১ ফকিরাপুল হারুন মেনসনের আবিদ এয়ার ইন্টারন্যাশনালের মো. আসাদুজ্জামানের মাধ্যমে।

কুমিল্লার মেঘনার মেয়ে আয়শা বাচ্চু মিয়ার মাধ্যমে কাতার যান। নরসিংদির সাটিপাড়ার মেয়ে জাহানারা কাতার যান নরসিংদিরই দালাল রুজির মাধ্যমে। মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের মদনখালীর মো. হারুনের স্ত্রী রেখা ১৩২ নং ডিআইটি এক্সটেনশন রোডের বকশি হোটেলের নিচতলায় অবস্থিত একটি রিক্রুটিং এজেন্সির ফজলুর মাধ্যমে কাতার যান। টাঙ্গাইলের ভোফরপুরের মেয়ে ময়না কাতার যান একই থানার দালাল সেরলির মাধ্যমে। ডসরেটের আছমা যান সিলেটের দালাল ইলিয়াছের মাধ্যমে।

ফকিরাপুলের ১২০/১ হারুন ম্যানসনের (৪র্থ তলা) আবিদ ইন্টারন্যাশনালের মো. আসাদুজ্জামানের মাধ্যমে কাতার যান গাজীপুরের টঙ্গীর মেয়ে লাইলি। ঢাকার কেরাণীগঞ্জের আসান্দিপুরের মেয়ে নাজমা যান দালাল কফিল উদ্দিনের মাধ্যমে।

যেখানে বন্দী
চলতি মাসের ৫ তারিখে বন্দিদশা থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসা নারী যেখানে বন্দী ছিলেন সেখানে তার সঙ্গে বন্দী ছিলেন আরও ১০ বাংলাদেশি নারী। সাহসী ওই নারী পালিয়ে আসার সময় কৌশলে সেখান থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড তুলে নিয়ে আসেন। ভিজিটিং কার্ডে কাতারের যে ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে তা হলো- ফিউচার রিক্রুটমেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট, লোকাল ম্যানপাওয়ার সাপ্লাই, ডমেসটিক হেলপার (হাউজমেড), শেখ ফয়সাল আল থানি বিল্ডিং (২য় তলা), অফিস নম্বর ১০, ডোর নম্বর ২, আল ইতিহাস সড়ক, আল ঘারাফা। টেলিফোন নম্বর- ৪৪৩১৩৭২৭। মোবাইল নম্বর- ৩৩৭৭৫৭৫৮, ৩০০৫১৮৮৩। ফ্যাক্স নম্বর- ৪৪৩১৩৭৪০।

ফিরে আসা সেই নারীর কথা
৫ আগস্ট দেশে ফিরে এলেন সালমা (ছদ্মনাম)। সালমার পরিবারের অনেকে বিদেশ থাকায় তিনি আরবী ভাষায় কিছুটা কথা বলতে পারেন। আর এই ভাষা জ্ঞান আর নিজের সাহসিকতা ও ভাগ্যগুনে বন্দীদশা থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

সালমা জানান, স্থানীয় এক দালাল ও পল্টনের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি কাতার যান। বাংলাদেশ থেকে তার সঙ্গে আরও পাঁচজন মেয়ে সেখানে যান। কাতার এয়ারপোর্টে পৌঁছার পরপরই স্থানীয় দালালরা তাদের একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে তাদের পাসপোর্ট নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নেন দালালরা। ৮/১০ ফুটের একটি কক্ষে তিনিসহ বাংলাদেশী ১১ জন এবং ইন্দানেশিয়ার আরও ছয় নারীকে সেখানে বন্দী করে রাখা হয়। অন্ধকার এ কক্ষে তাদের খুব সামান্য খাবার ও পানি দেয়া হত।

তিনি জানান, আধা কেজি চালের ভাত দেয়া হতো তাদের ১৭ জনকে। পানিও দেয়া হত খুব সামান্য। সেই সঙ্গে বিনা কারণেই চলতো শারীরিক নির্যাতন। সামান্য খাবার আর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে সবাই অসুস্ত হয়ে পড়তে থাকেন। ৫/৬ দিন এভাবে যাওয়ার পর কয়েকজন কাতারের কয়েকজন সেখানে আসেন। কাতারের ওই লোকদের বন্দী নারীদের ছবি দেখানো হয়। সেই ছবি দেখে ওই লোকেরা বন্দীদের পছন্দ করে তাদের সঙ্গে নিয়ে যায়। সালমাকেও নিয়ে যায় এমনই একজন। সেখানে তাকে দিয়ে রাত-দিন বাসার কাজ করানো হয়। তবে ভাষা জানায় সেখানে সালমার উপর শারীরিক কোনো নির্যাতন করা হয়নি। কিন্তু অন্য মেয়েদের মারধোরের কথা জানান তিনি।

সালমা আরও জানান, প্রত্যেক মেয়েকেই বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালরা সেখানে ভালো কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাকেও একটি স্কুলে ২৫ হাজার টাকা বেতনে কাজের কথা বলে নিযে যাওয়া হয়। তবে সেখানে যাওয়ার পর সালমা বাসায় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে কাতারের ফিউচার রিক্রুটমেনেটর এক লোক তাকে জানান, বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহপরিচারিকা আনতে তারা বাংলাদেশি দালালকে (সিলেটের ইলিয়াছ) মাথা পিছু এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন।

উত্তরে সালমা তাকে জানান, তারা এক লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন দালালদের। সালমা ওই লোককে আরও জানান, তাদের গৃহপরিচারিকা নয় বরং ভালো বেতনে স্কুলে কাজের কথা বলে কাতারে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে আসার পর কোনো মেয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মারধর করা হচ্ছে।

সালমা বলেন, তিনি কাতারের নিয়োগকর্তাকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন তার গায়ে যেন হাত না তোলা হয় এবং তাকে যত দ্রুত সম্ভব সেই দেশের পুলিশের কাছে হস্তানন্তর করতে কিংবা দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এরপর সালমাকে জানানো হয় দেশে ফিরে যেতে চাইলে তাকে আরও ৭০ হাজার টাকা দিতে হবে। এ পর্যায়ে সালমা দেশে তার আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে সিলেটের দালাল ইলিয়াসের মাধ্যমে টাকা দিয়ে এক মাস পাঁচ দিন পর দেশে ফিরে আসেন।

পল্টনে যখন এসব কথা বলছিলেন তখন প্রচণ্ড দুর্বল ছিলেন সালমা। তিনি জানান, ফিরে আসার সময় কাতারে বন্দী ১০ বাংলাদেশি নারী তার কাছে তাদের পারিবারের ফোন নম্বর দিয়ে দেন। যেন পরিবারের লোকজন তাদের দ্রুত এই বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেন।

কাতারে বন্দী নাজমার ভাই মিলন বাংলামেইলকে জানান, বোনের সাথে তার একাধিকবার ফোনে কথা হয়েছে। তিনি ফকিরাপুলের আল-হেরামের আসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আসলাম তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু দরিদ্র মিলনের পরিবারের কাছে এতো টাকা না থাকায় সুদূর প্রবাসে বন্দী বোনকে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না তারা।

রিক্রুটিং এজেন্সির ভাষ্য

অভিযোগ প্রসঙ্গে আবিদ ইন্টারন্যাশনালের মো. আসাদুজ্জামান বুধবার বাংলামেইলকে বলেন, সাবিনাকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এক প্রকার বিনা পয়সায় দুই বছরের চুক্তিতে বাসাবাড়ির কাজে কাতারে পাঠানো হয়। কাতার যাওয়ার আগে সাবিনা মিরপুরের ট্রেনিং সেন্টার থেকে ট্রেনিংও নেন। তার সঙ্গে তার খালা শিরিনাও যান। কিন্তু যাওয়ার কয়েকদিন পরেই সাবিনা কাজ করবেন না বলে জানান। এখন তাকে দেশে ফিরতে হলে বিমান ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।

ফকিরাপুলের আল-হেরাম ট্রাভেলসের আসলাম জানান, তারা শুধু নাজমার টিকেট দিয়েছেন। ভিসা দিয়েছেন আহমেদ। কিন্তু আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি না ধরায় তার মন্তব্য জানা যায়নি।

কাতার

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে