Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (132 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১৯-২০১৪

যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো ...

নাজমুস সাকিব


যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো ...

নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে । তাঁর পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন । তাঁর পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন ।

ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল ছিল শামসুর রহমান । ডাকনাম কাজল । পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে ‌হুমায়ূন আহমেদ রাখেন । হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় , তাঁর পিতা ছেলে-মেয়েদের নাম পরিবর্তন করতে পছন্দ করতেন । ১৯৬২-৬৪ সালে চট্টগ্রামে থাকাকালে হুমায়ুন আহমেদের নাম ছিল বাচ্চু ।

বাবার চাকুরী সূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছেন বিধায় হুমায়ূন আহমেদ দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন । তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন । তিনি পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন । পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন ।

ছাত্র জীবনে একটি অসাধারণ উপন্যাস নন্দিত নরকে রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজীবনের শুরু । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি । ১৯৭২ সালে আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় । প্রখ্যাত বাঙলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এই গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয় । এরপরে হুমায়ূন আহমেদকে আর পেছনে ফেরে তাকাতে হয়নি । বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সে , ১৯৮১ সালে । তখন বাজারে তাঁর মাত্র চারটি বই। পেয়েছেন একুশে পদকও , ১৯৯৪ সালে ।

তাঁর অন্যতম কয়েকটি উপন্যাসের নাম দেয়াল , জোছনা ও জননীর গল্প , গৌরীপুর জাংশান , মেঘ বলেছে যাবো যাবো , মধ্যাহ্ন ১ , ২ , কবি , শুভ্র , নির্বাসন , যদিও বসন্ত , এপিটাফ , ফেরা , ময়ুরাক্ষী , দরজার ওপাশে , আঙ্গুল কাটা জগলু , হলুদ হিমু কালো র‌্যাব , দেবী , নিশিথিনী , নিষাদ , অন্যভুবন , বৃহন্নলা , ভয় , বিপদ , বাদশাহ নামদার , অচিনপুর , অন্যদিন , আমি এবং আমরা , লীলাবতী প্রভৃতি ।

তিনি প্রায় তিন শতাধিক বই রচনা করেছেন । তাঁর রচনার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো 'গল্প-সমৃদ্ধি' । এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতিবাস্তব ঘটনাবলীর অবতারণা করতেন যাকে একরূপ যাদু বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা যায় । তাঁর গল্প ও উপন্যাস ছিল সংলাপপ্রধান । তাঁর বর্ণনা ছিল পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র ফুটিয়ে তুলার অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভার কারনে তিনি ছিলেন বিখ্যাত । তাঁর লেখায় যদিও সমাজসচেতনতার অভাব নেই ।

মধ্যবিত্ত সমাজকে কলমের সূক্ষ্ম আঁচড়ে তিনি দিতেন অনন্য রুপ । সাধারণ ঘটনাগুলো তুলে ধরতেন স্বমহিমায় । তাঁর অনেক রচনার মধ্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি লক্ষ্য করা যায় । তাঁর রসবোধ ছিল কিংবদন্তীতুল্য । বাংলাদেশের প্রথম সায়েন্স ফিকশন 'তোমাদের জন্য ভালোবাসা' তাঁর লেখা । তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী । ছোটগল্প উপন্যাস , নাটক , সিনেমা , গান সবকিছুতেই হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সিদ্ধহস্ত । লেখালেখির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি অনায়সেই ।

সত্তর দশকের (১৯৭০) শেষভাগে থেকে শুরু করে ২০১২ সালে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দী কারিগর । এই কালপর্বে তাঁর গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত । তাঁর প্রধান প্রতিভা অসামান্য কাহিনী সৃষ্টি । তাঁর সৃষ্ট হিমু চরিত্রটি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে । একই সঙ্গে মিসির আলি কেন্দ্রিক রহস্যোপন্যাসগুলি লাভ করে বিশেষ পাঠক অর্ভ্যথনা । তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ ও তাদের বই পড়ায় আগ্রহ তৈরিতে নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক ।

টেলিভিশনের জন্য এইসব দিন রাত্রি , বহুব্রীহি , কোথাও কেউ নেই , নক্ষত্রের রাত , অয়োময় , আজ রবিবার , নিমফুল এর মতো একের পর এক দর্শক-নন্দিত নাটক রচনার পর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন ।

তাঁর পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে । ২০০০ সালে শ্রাবণ মেঘের দিন ও ২০০১ সালে দুই দুয়ারী চলচ্চিত্র দুটি প্রথম শ্রেনীর দর্শকদের কাছে দারুন গ্রহণযোগ্যতা পায় । ২০০৩ সালে নির্মান করেন চন্দ্রকথা নামে একটি চলচ্চিত্র । ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালে নির্মান করেন শ্যামল ছায়া চলচ্চিত্রটি । এটি ২০০৬ সালে "সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র" বিভাগে একাডেমি পুরস্কার এর জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল । এছাড়াও চলচ্চিত্রটি কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় । তাঁর সব চলচ্চিত্রে তিনি নিজে গান রচনা করেছিলেন । ২০০৮- সালে আমার আছে জল চলচ্চিত্রটি তিনি পরিচালনা করেন । ২০১২ সালে তার পরিচালনার সর্বশেষ ছবি ঘেটুপুত্র কমলা । যার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পান ।

এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে ২০০৬ সালে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত দুরত্ব, বেলাল আহমেদ পরিচালিত নন্দিত নরকে এবং আবু সাইদ পরিচালিত নিরন্তর । ২০০৭ সালে শাহ আলম কিরণ পরিচালিত সাজঘর এবং তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র দারুচিনি দ্বীপ ।

জীবনের শেষভাগে ঢাকা শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমন্ডীর ৩/এ রোডে নির্মিত দখিন হাওয়া এ্যাপার্টমেন্টের একটি ফ্লাটে তিনি বসবাস করতেন । খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতেন তিনি । ভোর থেকে সকাল ১০-১১ অবধি লিখতেন । মাটিতে বসে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন । কখনো অবসর পেলে ছবি আঁকতেন । জীবনের শেষ এক যুগ ঢাকার অদূরে গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলে ৯০ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত বাগান বাড়ী 'নুহাশ পল্লীতে' থাকতে ভালোবাসতেন তিনি । গল্প বলতে আর রসিকতা করতে খুব পছন্দ করতেন । নিরবে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করা ছিল তার শখ । তবে সাহিত্যপরিমণ্ডলের সঙ্কীর্ণ রাজনীতি বা দলাদলিতে তিনি কখনো নিজেকে জড়াননি । বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও অন্তরাল জীবন-যাপনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন ।

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ । তাঁদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে । এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে । তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ । অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায় । গুলতেকিনের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয় ২০০৫ সালে । পরে তিনি অভিনেত্রী শাওনকে বিয়ে করেন । এই ঘরে নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন নামে দুটো ছেলে আছে । প্রথম ভূমিষ্ঠ মেয়ে লীলাবতী মারা যায় ।

হুমায়ূন আহমেদের জন্ম পীরবংশে । নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার বিখ্যাত পীর জাঙ্গির মুনশি’র ছেলে মৌলানা আজিমুদ্দিন হুমায়ূন আহমেদের দাদা । তিনি ছিলেন একজন উঁচুদরের আলেম এবং মৌলানা । তিন ভাই দুই বোনের মাঝে তিনি সবার বড় । তাঁর ছোটভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল একজন প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী । শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ৷ তিনিও একজন কথাসাহিত্যিক । সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট এবং রম্য লেখক ৷ দেশের একমাত্র কার্টুন পত্রিকা উন্মাদ’র কার্যনির্বাহী সম্পাদক ।

২০১১-এর সেপ্টেম্বের মাসে সিঙ্গাপুরে ডাক্তারী চিকিৎসার সময় তাঁর কোলন ক্যান্সার ধরা পড়ে । নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে স্থানীয় সময় ১১:২০ মিনিটে নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপুরুষ পরলোকগমন করেন । 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে