Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ১ পৌষ ১৪২৬

গড় রেটিং: 5.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১৪-২০১২

উপদেষ্টাদের কাজ কী

মির্জা মেহেদী তমাল


উপদেষ্টাদের কাজ কী
প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দান ও মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি আনতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় সাতজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেয় সরকার। কিন্তু কাজে গতি আনা দূরের কথা, জগাখিচুড়ি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে। যে মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা আছেন, সেখানকার অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এসব উপদেষ্টার প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিরূপ মনোভাব আর উভয় পক্ষের অন্তর্দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়টি গোপন থাকছে না। অনির্বাচিত, জনগণের কাছে দায়বদ্ধহীন, জবাবদিহিমুক্ত সাবেক আমলা বা সমগোত্রীয় ব্যক্তি এসব উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মন্ত্রীদের মতবিরোধ গত তিন বছরে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সংবিধানবহিভর্ূত এসব উপদেষ্টার দায়িত্ব ও ক্ষমতার কোনো সীমারেখা না থাকায় তারা মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে চলেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

কাজে গতি আনায় ব্যর্থতা আর সংকট সৃষ্টির কারণে উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংবিধান যেখানে মন্ত্রীকেই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে মন্ত্রণালয়ের কাজে উপদেষ্টার ভূমিকা কী? তাদের নিয়োগ দিয়ে কতটুকু লাভবান হয়েছে সরকার? তাদের অবস্থানটাই বা কোথায়? এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তারা বলছেন, উপদেষ্টাদের কার্যকলাপ সাক্ষ্য দেয় যে তাদের অবস্থান মন্ত্রীদের ওপরে। যদিও তাদের পদের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।

প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ডা. এস এ মালেককে। তবে কোনো মন্ত্রণালয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ বা প্রভাব ফেলার মতো কার্যক্রম সেবার ঘটেনি বলে উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার নিয়োগ দিয়েছেন সাতজন উপদেষ্টা। এরা হলেন জনপ্রশাসন উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম; শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমেদ; আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী; স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী; অর্থ উপদেষ্টা মশিউর রহমান; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তওফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী।

জানা গেছে, সরাসরি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কোনো উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান বাংলাদেশের সংবিধানে না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা ও পরামর্শ দিতে এ সাতজনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। অতীতের সরকারপ্রধানরাও এমন নিয়োগ দিয়েছেন। তবে তাদের কর্মপরিধি ছিল নিজ নিজ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব তাদের ছিল না কিংবা কোনো মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের ওপর হুকুমদারি করার ক্ষমতাও ছিল না । কিন্তু এ ধারায় ব্যত্যয় ঘটায় বর্তমান মহাজোট সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সাত উপদেষ্টার হাতে ন্যস্ত করেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দেখভালের দায়িত্ব। তাদের মধ্যে তিনি বণ্টন করে দেন নির্দিষ্ট কিছু দফতর। এ দায়িত্ব বণ্টনের পরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আর উপদেষ্টারা বিপরীত মেরুর বাসিন্দা বনে যান।

আর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যে প্রকট, তা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যে পরিষ্কার বোঝা যায়। জাতীয় সংসদে সম্প্রতি দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেছেন, 'উপদেষ্টাসহ ৫০ জনের বেশি রয়েছেন কেবিনেটে। উপদেষ্টারাও কেবিনেট বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সেক্রেটারি ছিলাম। কিন্তু কখনো কেবিনেট বৈঠকে অংশ নিতে পারিনি।' আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল করীম সেলিম বলেন, অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের ফটকাবাজ বলেন। উপদেষ্টারাও উল্টোপাল্টা কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সরকারে না থাকলে এদের চেহারা খুঁজেও পাওয়া যাবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারব্যবস্থায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দেশনা ও সমন্বয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, শিক্ষা, জ্বালানি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন রাজনীতিতে একেবারে অনভিজ্ঞ ডা. দীপু মনিকে। দীপু মনির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগে রয়েছে নানা সমালোচনা। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী যাকে তার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা করেছেন, সেই ড. গওহর রিজভীও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে পারেননি। উপরন্তু তারা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঘন ঘন বিদেশ সফর করছেন। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেখভালের দায়িত্ব পাওয়া এই দুজন চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ায় বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে যারা কর্মরত, তাদের পোয়াবারো। অধিকাংশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, প্রেস মিনিস্টারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন। ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি নিয়েও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন এ উপদেষ্টা।

সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী ও উপদেষ্টার মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতার কারণে তাদের কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টার সম্পর্কের অবনতি ঘটে সেই ২০১০ সালে। এ অবস্থার পরিবর্তন এখনো হয়নি। বরং বদলি, পদোন্নতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন-সংক্রান্ত সব কাজই এখন চলছে উপদেষ্টার নেতৃত্বে। এতে মন্ত্রী অনেকটা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রী-উপদেষ্টার সমন্বয়হীনতার সুযোগে বেড়ে গেছে তদবির-বাণিজ্য। উপদেষ্টা নিজে শিক্ষাবিদ হওয়ায় সরকারের রাজনৈতিক আস্থা তার ওপর অনেক বেশি। এ ছাড়া দলীয় নেতা-কর্মীদের তার প্রতি স্বচ্ছন্দ বোধ তার জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় সবার আস্থার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন উপদেষ্টা। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগের শেষ নেই। এর মধ্যে রয়েছে, তিনি তার সাবেক দলের অনুসারীদের পদোন্নতি, পোস্টিং বেশি দিয়ে থাকেন। তাদের প্রতি মন্ত্রীর দুর্বলতা অপরিসীম। নেতা-কর্মীরা এ অভিযোগ তুলছেন শুরু থেকেই। এ ছাড়া মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বামপন্থিদের প্রতি বিশেষ দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রী-উপদেষ্টার টানাপড়েনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে সূত্র মারফত জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরু হয় একজন মন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টা নিয়ে। শুরু থেকেই এ মন্ত্রণালয়ের কাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজমান। পরে একজন প্রতিমন্ত্রীও নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজ নিয়ে উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর মধ্যে নিয়োগ-বদলিসহ নানা বিষয়ে মতবিরোধ আলোচনায় ছিল। মন্ত্রণালয়ের বহু বিষয়ে উপদেষ্টার হস্তক্ষেপের কথা শোনা যায়। ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ওএসডি করা হয়। ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রী ওই কর্মকর্তার বদলি বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পুনর্বহালে অনানুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র দেন সংস্থাপন সচিবকে। আবার একই দিনে প্রতিমন্ত্রী ওই কর্মকর্তাকে ড্যাবের নেতা জাহিদ হোসেনের আশীর্বাদপুষ্ট উল্লেখ করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের আদেশ বহাল রাখতে সচিবকে একই রকম অনানুষ্ঠানিক পত্র দেন। ওই কর্মকর্তা চারদলীয় জোট সরকারের সময় ড্যাবের চাহিদাপত্র নিয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডার থেকে প্রশাসনে এসেছিলেন। ওই কর্মকর্তার কারণেই হতদরিদ্র মানুষের পথ্য কেনার জন্য বিশ্বব্যাংকের দেওয়া ৪৫০ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে বলে প্রতিমন্ত্রীর পত্রে উল্লেখ করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, চিকিৎসক ও নার্সের নিয়োগ-বদলি নিয়ে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) একদিকে আর উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী ও বিএমএ অন্যদিকে অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সাধারণ কর্মকর্তারা বলছেন, নাজুক এক পরিস্থিতিতে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। মন্ত্রী যদি এক কথা বলেন, উল্টো বলেন প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টা।

সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন উপদেষ্টা ও দুজন সচিব। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এখানে নির্বাহী কর্তৃত্ব মূলত উপদেষ্টা ড. তওফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর হাতে। প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের তেমন ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। এ জন্য সবাই তাকিয়ে থাকেন উপদেষ্টা কী নির্দেশ দেন সেদিকে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি উপদেষ্টাকে ঘিরে ভুয়া চিঠির সূত্রে শেভরনের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কিত খবর বের হয়। এ বিষয়ে উপদেষ্টার সন্দেহের তীর এক সচিবের দিকে। সন্দেহ, অবিশ্বাস আর খবরদারির মধ্যে মন্ত্রণালয়ের কাজে স্বাভাবিক পরিবেশ নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের কাজে উপদেষ্টাদের নজরদারির যে ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন, একে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষ কোনো কোনো উপদেষ্টার কাজ খবরদারিতে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক মন্ত্রী-সচিব স্বাধীনভাবে তাদের মন্ত্রণালয় পরিচালনা করতে পারছেন না। আবার উপদেষ্টাদের সব উপদেশ মন্ত্রীরা প্রতিপালন না করে অনেকটা উপেক্ষা করছেন, এমন অভিযোগও আছে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে