Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২২ জুলাই, ২০১৯ , ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৭-০৮-২০১৪

নতুন যুগের ইলেকট্রনিকস

মুনির হাসান


নতুন যুগের ইলেকট্রনিকস

ঢাকা, ০৮ জুলাই- কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ ইলেকট্রনিক সামগ্রীর প্রাণভোমরা ছয় দশক আগে উদ্ভাবিত ট্রানজিস্টর। কিন্তু এরই মধ্যে ট্রানজিস্টর তার কর্মদক্ষতার প্রায় সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। বিজ্ঞানী-প্রকৌশলীরা তাই খুঁজছেন এমন কোনো উপায় বা বস্তু, যা সূচনা করবে নতুন যুগের ইলেকট্রনিকসের।

ঠিক এমনই ‘একটা কিছু’ খুঁজে পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও সুইডেনের একদল বিজ্ঞানী। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের অধ্যাপক জাহিদ হাসান। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত নতুন এই বস্তু-দশার (state of the matter) নাম দেওয়া হয়েছে ‘টপলোজিক্যাল ইনসুলেটর’ বা ‘স্থানিক অন্তরক’। বস্তুর ভেতরে ঋণাত্মক বিদ্যুৎবাহী ইলেকট্রন কণার চলাচলের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা বস্তুকে কয়েক ভাগে ভাগ করেন। যার মধ্যে ইলেকট্রন সহজে চলাচল করতে পারে (পরিবাহী, যেমন তামা), যার মধ্যে পারে না (অন্তরক, যেমন কাঠ) এবং এই দুইয়ের মাঝামাঝি (অর্ধ-পরিবাহী, যেমন সিলিকন)। অর্ধপরিবাহীর ভেতরে ঋণাত্মক ইলেকট্রনের পাশাপাশি ধনাত্মক চার্জেরও ছোটাছুটি থাকায় এটি হয়ে উঠেছে ইলেকট্রনিকসের মূল উপকরণ। অর্ধপরিবাহী সিলিকনের কারণে আমেরিকার ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের এলাকাটি সিলিকন উপত্যকা নামে পরিচিত।

জাহিদ হাসান বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ তথা বিসমাথ, থ্যালিয়াম, সালফার ও সেলেনিয়ামের সংমিশ্রণে যে যৌগ তৈরি করেছেন, সেটি এমনিতে অন্তরক। কিন্তু এটির উপরিতলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার জগতে ইলেকট্রন খুবই কম বাধার মধ্যে ছোটাছুটি করতে পারে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে অতি-পরিবাহী। ‘এটি একটি বড় বিষয়।’ টেলিফোনে বলেন জাহিদ হাসান। কারণ, দেখা যাচ্ছে আগের বিসমাথ-নির্ভর বস্তুর তুলনায় নতুন এই বস্তুতে ইলেকট্রন প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি গতিতে চলাচল করতে পারছে।

১৯৯৭ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী ফিলিপ এন্ডারসনের মতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কেবল তত্ত্বের কারণে নয়, বরং এর কারিগরি দিকটিও তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে অনেক দিন ধরে তত্ত্বীয় পর্যায়ে থাকা কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা যাবে।

জাহিদ হাসান আরও বলেন, কেবল কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের নতুন জোয়ার নয়, এর ফলে বস্তুজগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে যেখানে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কাজ করে, সেটির অধ্যয়নও আলাদা গতি পাবে। যেহেতু কার্যকর তাপমাত্রায় এটি বানানো যাবে। শুরু হবে এক নতুন ইলেকট্রনিকস যুগের। যার কেন্দ্রে থাকবে এই স্থানিক অন্তরক। হয়তো তখন সিলিকন ভ্যালির নাম পাল্টে হবে টপোলজিক্যাল ভ্যালি।

অ্যাডভোকেট রহমত আলী ও গৃহিণী নাদিরা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে জাহিদ সবার বড়। ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় ও ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন জাহিদ।

ছোটবেলায় উপহার পাওয়া একটি কম্পাস জাহিদকে প্রথম জগতের রহস্য অনুসন্ধানে আগ্রহী করে তোলে। কম্পাসের কাঁটা ভেঙে যাওয়ার পরও কেন এক ‘অদৃশ্য শক্তি’র প্রভাবে সেটি উত্তর-দক্ষিণ হয়ে থাকে তা ছিল শিশু জাহিদের পরম বিস্ময়। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান-লেখক আবদুল্লাহ আল মুতীর বিজ্ঞানবিষয়ক বই জাহিদকে বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় জাহিদ নিজেই লিখে ফেলেন বই—এসো ধূমকেতুর রাজ্যে।

বিজ্ঞানের নানান বিষয় পড়তে পড়তে জাহিদের মনে আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। জাহিদ জানালেন—‘আমি আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলাম না।’ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন ভাইনভার্গের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ নিতে জাহিদ ভর্তি হলেন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পদার্থবিজ্ঞান থেকে স্নাতক হয়ে পরে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন। পিএইচডি করার সময় জাহিদ বের করেন কঠিন বস্তুর মধ্যে ইলেকট্রনের চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যা বের করার কৌশল। এই সময় তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর আমন্ত্রণ পান।

‘আমি একটা বক্তৃতা দিতে গিয়েছি প্রিন্সটনে। বক্তৃতা শেষেই তারা আমাকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কোনো জীবনবৃত্তান্তও তৈরি ছিল না। পিএইচডিও শেষ হয়নি।’ আরাধ্য স্বপ্ন ধরা দেওয়ার কথা বলছিলেন জাহিদ। বিজ্ঞানী মহামতি আইনস্টাইন, নিলস বোর, ওপেন হাইমারের স্মৃতিবিজড়িত প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিই ২০০২ সাল থেকে জাহিদের কাজের ক্ষেত্র। এরই মধ্যে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী তাঁর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

তাঁদের মধ্যে একজন হলেন ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড শাই। তিনি বলেন, স্থানিক অন্তরক গবেষণাকাজে আন্তর্জাতিকভাবে দারুণ কাজ করছেন অধ্যাপক জাহিদ। এ ছাড়া একজন শিক্ষক ও পরামর্শদাতা হিসেবেও তিনি দারুণ।

শুরুর দিকে দুনিয়ার জন্ম-মৃত্যুর তত্ত্ব নিয়ে কাজ করলেও বিজ্ঞানী স্টিভেন ভাইনবার্গ জাহিদকে ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী করে তোলেন। সেখানে আইনস্টাইনের আলোর তড়িৎ ক্রিয়ায় ব্যবহৃত পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন এক জগতের সন্ধান পান জাহিদ। ক্রমেই হয়ে ওঠেন এই জগতের একেবারেই সামনের কাতারের বিজ্ঞানী। তাঁর প্রকাশিত শতাধিক বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের দুই- তৃতীয়াংশই ছাপা হয়েছে নেচার, ফিজিক্স টুডে, সায়েন্স, ফিজিক্যাল রিভিউর মতো বনেদি, অভিজাত ও বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীতে।

মাইক্রোসফট করপোরেশনে কর্মরত স্ত্রী প্রকৌশলী সারাহ আহমেদ, ছেলে আরিক ইব্রাহিম ও মেয়ে সারিনা মরিয়মকে নিয়ে জাহিদের সংসার। শিকড়ের টানে যুক্ত আছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ডে । সুযোগ পেলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে জাহিদের।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে