Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (74 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৫-২৫-২০১৪

আইলা বিধ্বস্ত মানুষের লড়াইয়ের গল্প

আইলা বিধ্বস্ত মানুষের লড়াইয়ের গল্প

সাতক্ষীরা, ২৫ মে- মুন্সীগঞ্জ থেকে নীলডুমুর ঘাট যেতে বড় জোর তিরিশ মিনিট। এরপরই উত্তাল খোলপেটুয়া নদীর প্রচণ্ড ঢেউ পেরিয়ে ওপার নামলেই ঘটনা-দুর্ঘটনায় বিখ্যাত গাবুরা ইউনিয়ন। নৌকা থেকে নামতে হয় এই ইউনিয়নের লাইফ লাইন খ্যাত বাঁধের ওপর।

ওপার থেকে এপার এলেই চোখে ঝাঁঝাঁ অনুভূতি। সবুজের আচ্ছাদন থেকে যেন হঠাৎই মরুতে এসে পড়া। কনক্রিটের বাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে ছোট বাজার পেরিয়ে যে গ্রামে প্রথমে পা পড়ে, তার নাম চকবারা। এই চকবারা গ্রামটি ২০০৯ সালে আঘাত হানা আইলার জন্য দেশ-বিদেশে বহুল পরিচিত।

খালের পাড় ধরে কিছু দূর এগুলেই চোখে পড়ে একটি পরিত্যক্ত ধানের ক্ষেত। স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের কথায়, চার বছর পর এবারই এই ক্ষেতে প্রথম লবণ সহিষ্ণু জাতের ধান রোপা হয়েছিল। কিন্তু শীষ হওয়ার আগেই লবণে শুকিয়ে যায় ধান গাছ। ক্ষেতের ওপরও লবণের আস্তর।

খালের পানির রেখা বরাবর কয়েক ফুট সাদা রংয়ের আস্তরন। মনে হয় কারো করা আল্পনা। কাছে গিয়ে সাদা রং জিভে দিতেই গা গোলানো তিতকুটে লবণের ঝাঁঝ। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ায় জ্যৈষ্ঠের তীব্র খরায় পানি শুকিয়ে লবণে পরিণত হয়ে এই সাদা রংয়ের প্রলেপ পড়েছে খালের পাড়ে।

সংসারের যাবতীয় কাজ এই বিষাক্ত লবণ পানিতেই সারছেন গ্রামের গৃহিনীরা। বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি কাজেই লাগছে লবণ পানি।

পুরো গাবুরাতে সবুজের আকাল। লবণের আগ্রাসনে সবুজ হারিয়ে গেছে নিমিষে। পথের ধারে ভাঙ্গা কুঁড়ে সারাতে ব্যাস্ত রাশিদা। স্বামীহারা রাশিদা আইলাতে হারিয়েছিলেন সব। চার বছরেও তার ভিটে মজবুত হয়নি। থাকেন ভাইয়ের বাড়ির বারান্দায়।

রাশিদা জানালেন, কেবল সবুজই নয়, গাবুরা থেকে হারিয়ে গেছে ঋতু বৈচিত্রও। এখন কেবল বর্ষা, শীত আর গ্রীষ্মই চোখে পড়ে গাবুরায়।

চার দিকে চারটি বিশাল নদী। পানির উচ্চতাও কখনো কখনো ভূমির উচ্চতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে বেড়িবাঁধকে শাসিয়ে যায়। তবু পানিরই অভাব গাবুরায়। খাবার পানি আর রান্নার পানির জন্য রিতিমতো যুদ্ধের মুখে পড়তে হয় গাবুরাবাসীকে। একমাত্র পুকুরটি মাছ চাষ করে নষ্ট করেছে প্রভাবশালীরা। আইলার পর থেকে নষ্ট হয়ে আছে নলকূপ। যে কয়টি অবশিষ্ট আছে সেগুলোতেও ওঠে লবণ পানি। বেসরকারি সংস্থার করে দেওয়া পানি ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে কবে তার হিসেব নেই কারো কাছেই।

বৃষ্টি না হওয়ায় পানি ধরে রাখার পদ্ধতিও লাগছেনা কাজে। তাই নদী পার হয়ে নীলডুমুর বিজিবি ক্যাম্পের পুকুরই এ অঞ্চলের মানুষের মিষ্টি পানির একমাত্র ভরসা।

রাশিদা জানালেন, এক কলস পানি আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হয় ৫ টাকা, আর এক ড্রাম পানি আনতে ১০ টাকা। টাকা না থাকলে নৌকার মাঝি নদীতে ফেলে দেয় পানির কলস অথবা ড্রাম।

এই গ্রামের প্রায় সবাই বনজীবী। নদীর ওপাড়ের সুন্দরবনই এদের একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন। সফিকুল ইসলাম এখানকারই একজন শ্রমজীবী।

তিনি জানালেন, বাঁদায় কাঁকড়া ধরা, পোনা ধরা, মধু ভাঙ্গা, গাছ কাটাসহ প্রায় সবকাজেই রুটি-রুজি এখানকার মানুষের। নিয়মনীতির মাথা খেয়ে তারা কেবল বেঁচে থাকার তাগিদেই জঙ্গলকে একমাত্র অবলম্বন করেছেন। আর এ কারণেই গত ৩০ বছরে এ গ্রামের ২ শতাধিক মানুষ বাঘের খাবারে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই এ গ্রামকে অনেকেই বাঘ বিধবার গ্রামও বলে থাকেন।

কেবল লবণ পানি আর বনের বাঘই নয়, এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন জলদস্যু-বনদস্যুদের সঙ্গেও। কখনো কখনো গ্রামে এসেই জিম্মি ধরে নিয়ে যায় দস্যুরা। খেটে খাওয়া মানুষের প্রায় সব খুইয়েই মুক্ত হয়ে ফিরতে হয় পরবর্তী যুদ্ধে। এ যুদ্ধ আমৃত্যু। অশেষ জীবনের জন্য।

গ্রামেরই একজন কলেজ পড়ুয়া সেলিনা আক্তার।

তিনি বললেন, আইলার পর সারা দেশের মিডিয়ার সঙ্গে এখানে ভিড় করেছিল নানা কিছিমের মানুষ। এরা মানুষের কথা বলে, পরিবেশের কথা বলে এনেছিল ডজন ডজন এনজিও। এদের প্রায় সবাই নীতি কথা বলে আখের গুছিয়ে কেটে পড়েছে। কিন্তু কে‌উই খাবার পানির নিশ্চয়তা দিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাতে পারেনি গাবুরাবাসীকে।

 

সাতক্ষীরা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে