Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (27 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-০২-২০১২

মনের অন্বেষায় মনোবিজ্ঞান

মনের অন্বেষায় মনোবিজ্ঞান
মনোবিজ্ঞান এখন আর মন নিয়ে আলোচনা করে না। মন শব্দটি অনেকার্থক। আত্মা শব্দটির মতো মন শব্দটিকে নিয়েও মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। মন বলতে মানসিক প্রক্রিয়াকে, মানসিক প্রক্রিয়ার মূলীভূত মানসিক ঐক্যকে, মানস সত্তাকে বুঝিয়ে থাকে। মন তার যে অর্থে মানসিক সত্তাকে বুঝিয়ে থাকে, মনোবিজ্ঞান মনের সে অস্তিত্বকে স্বীকার করলেও তা প্রমাণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে না। কেননা মনের মধ্যে যেসব প্রক্রিয়া ঘটে তার কোনোটাই বাইরে থেকে নিরীক্ষণ করা যায় না। তাছাড়া মন আছে কী নেই এ এক বিতর্কমূলক প্রশ্ন। মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করছে দায়িত্ব দার্শনিকদের, মনোবিজ্ঞানীদের নয়। তাই রসিকদের মতো করে বললে বলতে হয় মনোবিজ্ঞানের মন নেই। মনোবিজ্ঞানীদের কাজ মনের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে মনের বিভিন্ন অবস্থা, বিভিন্ন ক্রিয়া। বৃত্তি, মানসিক ঘটনা, মনের বাহ্য প্রকাশ, মানসিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে কতগুলো সাধারণ সূত্র প্রতিষ্ঠা করে তার ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা। মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে নানা অদ্ভুত ও হাস্যকর মন্তব্য প্রায়ই শোনা যায়, এমনকি অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিরাও মনোবিজ্ঞান প্রসঙ্গে সন্ধিগ্ধপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন। যেমন, অনেকের ধারণা মনোবিজ্ঞান পড়লে বশীকরণ বিদ্যা আয়ত্ত করা যায়, মনোবিজ্ঞানীরা অন্যের মনের সব কথা বলে দিতে পারেন। মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞানের অভাবই হলো এ ধরনের মনোভাবের কারণ। আধুনিক মনোবিজ্ঞান এক জটিল ও বিস্তৃত ক্ষেত্র। আজকাল মনোবিজ্ঞানীরা নানা সমস্যার সমাধানে নিয়োজিত। কেউ গবেষণা করছেন প্রচারের মাধ্যমে কীভাবে দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা বাড়ানো যায়, কেউ গবেষণা করছেন সৈনিকদের সুষ্ঠু শিক্ষাদানের মাধ্যমে কীভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, কেউ গবেষণা করছেন অতি সহজে কেমন করে কোনো বিষয় শেখা যায় এবং দীর্ঘদিন মনে রাখা যায়, কেউ গবেষণা করছেন ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে, ব্যক্তিত্বের গুণগত বিকাশে মনোবিজ্ঞানের কোনো অবদান রাখা যায় কিনা, আবার কেউ গবেষণা করছেন মহাশূন্যে ওজনহীনতায় ও প্রচ- গতিশীল অবস্থায় মহাশূন্যে জীবদেহে ওষুধের প্রতিক্রিয়া মহাশূন্যে বসে তৈরি করা ওষুধগুলো পৃথিবীপৃষ্ঠে জীবদেহে কী প্রতিক্রিয়া করে। আবার কেউ গবেষণা করছেন মানুষের বিশ্বাস, মতামত ও জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষের কারণ নিয়ে এবং তার মনোবৈজ্ঞানিক সমাধান উদ্দেশে। তাই দেখা যাচ্ছে মনের সঙ্গে যুক্ত সব বিষয়ই মনোবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই ড. ওয়ার্ড (উৎ. ডধৎফ) বলেন, 'ব্যক্তির চেতনার বিষয়বস্তু হিসেবে স্বর্গের সমগ্র গায়ক দল এবং মর্ত্যের সব সজ্জা মনোবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।' মনোবিজ্ঞান কথাটি আমরা ইংরেজি সাইকোলজি (চংুপযড়ষড়ম) শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। (চংুপযড়ষড়মু) কথাটি গ্রিকশব্দ চংুপযব (সাইকি) এবং খড়মড়ং (লেগোস) হতে উদ্ভূত হয়েছে। সাইকি কথাটির অর্থ আত্মা আর লেগোস কথাটির অর্থ বিজ্ঞান বা শাস্ত্র। অর্থাৎ সাইকোলজি কথাটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো আত্মার শাস্ত্র বা বিজ্ঞান। অতএব স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে মনোবিজ্ঞানের জন্ম দর্শন শাস্ত্রের প্রসব গৃহে। দর্শন শাস্ত্রের দর্শন করা শুধুই মাত্র বাইরে থেকেই বাহ্যিক দর্শনে ক্ষান্ত হয় না। দৃশ্যমান বাহ্যিক আবরণ বহির্ভূত তার মূলগত সত্তাটির অন্তর্দর্শন বুঝিয়ে থাকে। অর্থাৎ দৃশ্যমান জগতের মূল সত্তাটি নির্ণয় করা দর্শন শাস্ত্রের কাজ। তাছাড়া এ দৃশ্যমান জগতের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো মানুষ এবং তাকে জানতে হলে জানতে হবে তার আত্মাকে। ফলে দার্শনিকরা অনুভব করলেন যে আত্মার জন্য একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রের প্রয়োজন ফলেই সৃষ্টি হলো সাইকোলজির বা আত্মার বিজ্ঞানের। কিন্তু আত্মা আজও কল্পিত ব্যাপার এর কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। ইন্দ্রিয়াতীত আত্মা বিভিন্ন প্রকার নিরীক্ষণের, পর্যবেক্ষণের তথা ধরাছোঁয়ার বাইরে, পরীক্ষণের কথা দূরে থাক। তাই 'আত্মার বিজ্ঞান কথাটিই আত্মবিরোধী। অতএব, কল্পিত বিষয় নিয়ে বাস্তব কোনো বিজ্ঞান গড়ে উঠতে পারে না। পরে সুধীজনরা আত্মার পরিবর্তে মনকে সাইকোলজির বিষয়বস্তু করে তুললেন। কোনো কোনো মনোবিজ্ঞানী আবার মনের পরিবর্তে চেতনা কথাটি ব্যবহার করেন। কিন্তু দেহাতিরিক্ত মন বা চেতনা বলে স্বতন্ত্র কোনো পদার্থের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায় না। তাছাড়া, ব্যক্তি কেবলমাত্র তার নিজের চেতনাকেই সোজাসুজি হানতে পারে, অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার বাহ্য আচরণের ভিত্তিতে তার চেতনাকে অনুমান করে নিতে হয়। তাছাড়া মনোবিদ্যা এখন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, বিশাল তার ক্ষেত্র। প্রাণী মনোবিদ্যা, শিশু মনোবিদ্যা ইত্যাদি বহুবিধ তার শাখা। আর এসব ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণী বা শিশুরা তার নিজের চেতনা প্রকাশ করতে অক্ষম। আর তাই চরমবাদী একদল মনোবিজ্ঞানী স্বীয় মনকেই মনোবিজ্ঞানের রাজ্য থেকে দিয়েছেন নির্বাসন। তারা হলেন আচরণ বাদী। তাদের মতে, সব আচরণের মাধ্যমেই দেহাজন্তরের যদিও সর্বাংশে সমর্থিত নয় বিষয়গুলো জানা সম্ভব। প্রায় সব মনোবিজ্ঞানীই সন্দেহাতীতভাবে জীবের আচরণ পর্যবেক্ষণ করাকেই মনোবিজ্ঞানের প্রধান কাজ বলে মেনে নিয়েছেন। এমনি করেই দিনে দিনে সাইকোলজির স্বরূপ গেছে বদলে। প্রথমে সাইকোলজি ছিল আত্মার বিজ্ঞান, পরে হলো মন বা চেতনার বিজ্ঞান, আর এ আধুনিক যুগে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে আচরণের বিজ্ঞান, বারবার এ বদল প্রসঙ্গে উড ওয়ার্থের চমৎকার উক্তিটি হলো: ঋরৎংঃ চংুপড়ষড়মু ষড়ংঃং রঃং ংড়ঁষ ঞযবহ রঃ ষড়ংঃং রঃং সরহফ ঞযবহ রঃ ষড়ংঃং পড়হংপরড়ঁংহবংং, রঃ ংঃরষষ যধং নবযধারড়ঁং ড়ভ ধ শরহফ. অর্থাৎ মনোবিজ্ঞান হারাল তার আত্মা, তারপর হারাল তার মন পরে হারাল তার চেতনা, তবে এখনো মনোবিজ্ঞানের অবশিষ্ট আছে এক ধরনের আচরণ। দেহযন্ত্রের ওপর কোনো উদ্দীপকের ক্রিয়ার ফলে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিই তাই হলো আচরণ। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যখন বাহ্যবস্তুর সংযোগ ঘটে তখন স্নায়ুতন্ত্রে যে প্রতিক্রিয়া ঘটে সে প্রতিক্রিয়ার বাহ্য প্রকাশই হলো আচরণ। হাঁচি, কাশি, বই লেখা হলো প্রকাশস্বরূপ আচরণ মাত্র। আচরণবাদীদের আচরণ সম্পর্কে এ ব্যাখ্যা নিছক যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেয়া। কিন্তু জীবমাত্র নিছক যন্ত্র নয়। জীবের আত্রনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে। জীব নিজের উদ্দেশ্যকে সচেতনভাবে অনুকরণ করে। তাই ম্যাকডুগাল বলেছেন, 'মনোবিজ্ঞান হলো উদ্দেশ্যমুখী আচরণের বিজ্ঞান।' এবং এ কারণেই আচরণকে ব্যাখ্যা করতে হলে উদ্দেশ্যের কার্যাকারণের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। আর উদ্দেশ্য হলো মানসিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা এবং ঐক্যের সমন্বিত ফল। যা মানব সত্তার অস্তিত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। জেমস চেতনাকে বলেছেন, 'বহুমাত্র স্রোতস্বীনি অর্থাৎ চেতনার স্রোত।' তিনি মনকে 'কর্মগতিময় ও জীবন্ত বলে স্বীকার করেছেন।' আর তাই তো মন বলতে বোঝায় যা চিন্তা করে, যার অনুভূতি আছে, যা ইচ্ছা করে। মনোবিজ্ঞানী ওয়ার্ডও আচরণ বলিতে একজন জীবন্ত ইচ্ছা সম্পন্ন সক্রিয় ব্যক্তির আচরণকে বুঝিয়েছেন। জীবের চিন্তা, অনুভূতি উদ্দেশ্য' -এর মতো উপাদান আছে বলেই জীব মনবিবর্জিত নয়। উডওয়ার্সের মতে, 'মনোবিজ্ঞান হলো পারিপাশ্বর্িকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তির ক্রিয়াকলাপ, সম্পর্কযুক্ত থাকার জন্য আচরণকে বুঝতে হলে পরিবেশকে বুঝতে হবে। আর এ কারণেই সামাজিক বা প্রাকৃতিক পরিবেশও মনোবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। ক্রিয়াকলাপ কথাটিকে তিনি ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করেছেন। যেমন:- জ্ঞান বা বোধের বিভিন্ন ক্রিয়া যথা হাসা, কাঁদা, সুখী হওয়া, দুঃখিত হওয়া ইত্যাদি। গতির বিভিন্ন ক্রিয়া যথা: হাঁটা, কথাবার্তা ইত্যাদিকে বুঝিয়েছেন। ব্যক্তি বলতে দেহ ও মনের সমন্বয়ে যে ব্যক্তি সেই সমগ্র ব্যক্তিকে বুঝিয়েছেন। তাই আবার সেই একই কথা মনোবিজ্ঞান মনবিবর্জিত নয়। তবে মনোবিজ্ঞান মন নিয়ে আলোচনা করে বটে তাই বলে ইন্দ্রিয়াতীত মনেরস্বরূপ তার আলোচ্য বিষয় নয়। মনের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়ে যেসব উপায়ে মনের প্রকাশ ঘটে সেসব ক্রিয়া, মানসিক অবসথা অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করাই মনোবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ মনকে জানি তার ক্রিয়ার মাধ্যমে। আর মনের তিনটি প্রধান ক্রিয়ার সঙ্গে আমরা পরিচিত। তা হলো চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে