Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ , ১০ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (31 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৫-০৫-২০১৪

বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাওয়া এত সহজ!

মহিউদ্দিন মাহী


বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাওয়া এত সহজ!

ঢাকা, ০৫ মে- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইম ইউনিভার্সিটির মিরপুরের দারুসসালাম রোড শাখায় ভর্তি হয়েছিলেন মিজানুর রহমান ফোরকান। তিনি একটি বেসরকারি কলেজের প্রভাষক। এলএলবিতে ভর্তি হয়েছিলেন প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে দুই বছরে তিনি এলএলবি পাস করেছেন। এজন্য টাকা দিতে হয়েছে ৫২ হাজার। তাকে ক্লাস করতে হয়নি। তিনি শুধু ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন। আর কোনো পরীক্ষা বা ক্লাস করেননি। তবে দুই বছর পর ঠিকই সনদ পেয়ে গেছেন ফোরকান।

সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে প্রাইম ইউনিভার্সিটির মিরপুরের ২এ/১ এ উত্তর পূর্ব দারুসসালাম রোডে অবস্থিত ক্যাম্পাসে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় ফোরকানের। তিনি সনদ নিতে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘ভাই দুই বছর আগে ভর্তি হয়েছি। ক্লাস করিনি। কিন্তু পাস করেছি। একটা সনদ দরকার ছিল, সেটা পেয়েছি। তবে ভালো, বিনা পরিশ্রমে আইনের সনদ পেলাম।’

শুধু ফোরকান নন, এভাবে অনেকেই টাকার বিনিময় সনদ নিয়ে যাচ্ছে। আর এভাবেই সনদ বিক্রি করে টাকা কামাইয়ের অভিযোগ নতুন নয় প্রাইম ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে। এ নিয়ে তদন্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তাদের তদন্তেও পাওয়া গেছে প্রমাণ, কিন্তু নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

ওয়ালিউল্লাহ নামে আরেক সনদ প্রার্থী অপেক্ষা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্প ডেস্কে। তিনি জানান, ‘আমি ভোলা থেকে এসেছি এলএলবির সনদ নিতে। পাস করেছি।’ এতেই খুশি বলে জানান তিনি। ওয়ালিউল্লাহ বলেন, ‘ভাই একটা সনদ দরকার ছিল। টাকা গেছে সমস্যা নাই। সনদ তো পেয়েছি।’ কি শিখলেন জানতে চাইলে বলেন, ‘শিখব যখন আইন প্রাকটিস করব তখন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর কি শেখাবে যোগ করলেন তিনি।’ এরপর এই প্রতিবেদক এলএলএম-এ ভর্তি হওয়ার জন্য যোগাযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার এ কে এম সাইফুল্লাহর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এক বছর মেয়াদি এলএলএম করতে খরচ হবে ৭০ হাজার টাকা।’ জানতে চাইলাম ক্লাস পরীক্ষায় অংশ না নিলে সমস্যা হবে কি না। তিনি বলেন, ‘ক্লাসে অংশ না নিলেও হবে। তবে ইয়ার ফাইনাল এবং হাফ ইয়ার ফাইনাল পলীক্ষায় অংশ নিতে হবে।’

তবে সনদের এ রকম রমরমা বাণিজ্যের কথা মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের সনদ বাণিজ্য হয় না। এখানে ভর্তি হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন মেনেই ভর্তি হতে হয়। সনদ নিয়ে বাণিজ্য করার মতো সুযোগ প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে নেই।’

মালিকানা দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত প্রাইম
এই ইউনিভার্সিটিতে দুটি মালিকপক্ষ রয়েছে। রয়েছে দুটি ট্রাস্টি বোর্ডও। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় জগতে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হলো এই মালিকানা দ্বন্দ্ব। সনদ বিক্রি, অবৈধ ক্যাম্পাস বা নামমাত্র শিক্ষাদানের মাধ্যমে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন কিছু ব্যক্তি। এ কারণে ট্রাস্টি বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়েই কর্মরতরা যখন সনদ ব্যবসাটা বুঝে ফেলেন, লোভাতুর হয়ে বাকিরা তখনই নেমে পড়েন বাণিজ্যে। এরপর একাধিক ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হয়। শুরু হয় একে অপরকে হটানোর প্রতিযোগিতা আর পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার। একপর্যায়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত থেকে অনেকে স্থিতাদেশ নিয়ে আসে। এরপর থেকেই জোরে চলে বাণিজ্য। মাঝখানে প্রতারিত হয় শিক্ষার্থী-অভিভাবক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র জানিয়েছে,  প্রাইম ইউনিভার্সিটির দুটি ক্যাম্পাস রয়েছে মিরপুর ও উত্তরায়। ক্যাম্পাস দুটির ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুই ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষকেই স্বীকৃতি দিয়েছে বলে দাবি উভয় পক্ষের। মিরপুর কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের ক্যাম্পাসই প্রধান ক্যাম্পাস। উত্তরাটি অবৈধ। এ ইউনিভার্সিটি শাখা ক্যাম্পাস খুলে উত্তরায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করত। ওই শাখা ক্যাম্পাসের দায়িত্বে ছিলেন আবুল হাসান নামে একজন পরিচালক।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ প্রাইম ইউনিভার্সিটির উত্তরা ক্যাম্পাসকে অবৈধ বলে নির্দেশ দেয়। এর আগে আরো দুই দফায় প্রাইম ইউনিভার্সিটির উত্তরা ক্যাম্পাসকে ইউজিসি অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। এরপরও বিজ্ঞাপন দিয়ে এখানে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। যারা এখানে ভর্তি হচ্ছেন তারা জানেন না কি হবে তাদের ভবিষ্যৎ।

২০০২ সালের অক্টোবরে ৯ শিক্ষার্থী নিয়ে মিরপুরের দারুসসালাম রোডে প্রাইম ইউনিভার্সিটির যাত্রা শুরু হয়। এ ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিমধ্যে ৬ হাজার শিক্ষার্থী পাস করে বের হয়েছে। আরো প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বর্তমানে মিরপুর মাজার রোডে প্রায় ২ বিঘা জমির ওপর প্রাইম ইউনিভার্সিটির নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে।

পরবর্তী সময়ে প্রাইম ইউনিভার্সিটি উত্তরায় একটি আউটার ক্যাম্পাস খোলে। এ ক্যাম্পাসের যিনি পরিচালক ছিলেন পরবর্তী সময়ে তিনি ইউনিভার্সিটির মালিকানা দাবি করে ক্যাম্পাস পরিচালনা করতে শুরু করেন। এ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে আদালত উত্তরা ক্যাম্পাসকে অবৈধ বলে সব কার্যক্রম রহিত করার আদেশ দিয়েছেন গত ২৯ সেপ্টেম্বর। এরপরও দীর্ঘদিন থেকে অবৈধভাবে উত্তরা বিএনএস সেক্টরে ভাড়া ভবনে ছাত্রছাত্রী ভর্তি চলছে।

ইউজিসি ও প্রাইম ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ বার বার পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে  সতর্ক করলেও তাতে তিনি কর্ণপাত না করে অবৈধভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছেন। প্রাইম ইউনিভার্সিটিও তার বিরুদ্ধে ৭-৮টি মামলা দায়ের করেছে।

মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের কাহিনি
প্রথমে সরকার মিরপুরের ঠিকানায় এ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন দেয়। এরপর তারা উত্তরার বিএনএস সেন্টারে একটি ক্যাম্পাস খোলার চুক্তি করে জনৈক আবুল হোসেনের সঙ্গে। এক পর্যায়ে মিরপুর অংশের কিছু ট্রাস্টিকে নিয়ে উত্তরা গ্রুপ নিজেদের আলাদা শক্তি হিসেবে দাঁড় করায়। এমনকি তারা সর্বশেষ ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ট্রাস্টি বোর্ডও গঠন করে। এভাবে মালিকানার ওপর শক্ত দাবি নিয়ে আবির্ভূত হয় উত্তরা গ্রুপ। তারা ক্যাম্পাস ভাড়া নিয়ে বর্তমানে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়েরই মালিকানার দাবি শক্ত করে ফেলে। উভয় গ্রুপের মামলা পাল্টা মামলার অবস্থা এতই শোচনীয় যে, ইউজিসি শেষ পর্যন্ত তাদের ওয়েবসাইটেও মূল মালিক কোন পক্ষ সে ঠিকানা মুছে দিয়েছে। এই অবস্থার মধ্যেই রাজধানীর বারিধারা-কুড়িল, ফার্মগেট ও মিরপুরে ‘অ্যানেক্স ক্যাম্পাস’ নামে আলাদা ক্যাম্পাস খুলেছে উত্তরা গ্রুপ।

প্রাইম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘উত্তরায় প্রাইম ইউনিভার্সিটির কোনো ক্যাম্পাস নেই। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অবৈধভাবে শিক্ষার নামে ব্যবসা করছেন আবুল  হোসেন। ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে আদালত রায় দিয়েছেন। এছাড়া ইউজিসি কর্তৃপক্ষও প্রাইম ইউনিভার্সিটির নামে উত্তরা ক্যাম্পাসকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

তবে উত্তরা ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, মিরপুর এক নম্বরের ক্যাম্পাসটি অবৈধ। তারা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী তাদের  ট্রাস্টি বোর্ডই আগে সরকারের রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে নিবন্ধিত হয়। এছাড়া মিরপুর ইউনিভার্সিটির গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের ৪ জন ছাড়া বাকি ৯ জনই উত্তরা ক্যাম্পাসের ট্রাস্টি বোর্ডে রয়েছেন।

উত্তরা ক্যাম্পাসের মালিকানার দাবিদার আবুল হোসেন জানান, মিরপুর অংশের দায়ের করা মামলায়ই তারা রায় পেয়েছেন। তাদের পকেটে মোট চারটি মামলার রায় রয়েছে। ইউজিসিও মালিকানার ব্যাপারে তাদের ইতিবাচক পত্র দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অ্যানেক্স ক্যাম্পাস’ আইনের আলোকেই তারা খুলেছেন। ছাত্র সংখ্যা বেশি হলে আলাদা ক্যাম্পাস খোলা যায়।’
 
তিনি বলেন, ‘প্রাইম ইউনিভার্সিটির মিরপুর ক্যাম্পাস স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আদালতের রায় মেনেই। আইন অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ট্রাস্টি বোর্ড ছাড়া হয় না। আদালত দেখেছেন কেবল উত্তরা কর্তৃপক্ষই আইন অনুসারে ট্রাস্টি বোর্ডসহ অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করেছে। তাই বিজ্ঞ আদালত মিরপুর কর্তৃপক্ষের আবেদনটি খারিজ করেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী প্রাইম ইউনিভার্সিটির মূল ক্যাম্পাস হিসেবে উত্তরাই (৪২, রবীন্দ্র সরণী, সেক্টর-৭, উত্তরা, ঢাকা) বহাল থাকছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একটি ইউনিভার্সিটির একাধিক ট্রাস্টি বোর্ড এবং সিন্ডিকেট থাকার কোনো বিধান আইনে নেই। কিন্তু এ ইউনিভার্সিটিতে দুটি ট্রাস্টি বোর্ড রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘শিগগিরই অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে কাজ চলছে।’

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষাবাণিজ্য করছে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আমরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভিন্নভাবে সময় দিয়েছি। মালিকানা দ্বন্দ্ব নিরসন ও অবৈধ ক্যাম্পাস বন্ধে শেষ পর্যন্ত আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করেছি।’

শিক্ষা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে