Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৯ , ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (47 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৩-২০১১

অন্তর্যাত্রা

মীজান রহমান


অন্তর্যাত্রা
এক
আজকে ছুটির দিন সারা প্রদেশ জুড়ে। রাস্তাঘাট খালি। দোকানপাট বন্ধ। চারদিকে স্তব্ধতার মৃদু গুঞ্জন। এমনকি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে পাখিদের অভ্যস্ত কলকাকলিও শুনতে পেলাম না। ওরাও বুঝি ছুটিতে বেড়াতে গেছে কোথাও, কোথাও কোন অজানা অরণ্যে।
আজকে আমি একা। ছুটির দিনে আমি সবসময়ই একা হই। গোটা পৃথিবীটাই তখন আমার গৃহেতে প্রবেশ করে। অন্তরীক্ষের বিপুল শূন্যতা এসে আমার পাশে বসে। আমরা পরস্পরকে সঙ্গ দিই। মাটিতে ঘাসের শয্যায় প্রতিটি তৃণদল তখন বাঙ্গময় হয়ে ওঠে। রুশ লেখক ভ্লাডিমির নাবুকফ তাঁর নিঃসঙ্গতাকে দুর্বাদের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর সুরের সঙ্গে আমার নিজের সুরটি আশ্চর্যভাবে মি্লে যায়। লোকে বলে, আমি একা একা জীবন কাটাই, আহারে, কতনা কষ্ট! না, আমার একাকিত্ব নিঃসঙ্গতার একাকিত্ব নয়, স্থূল বস্তুর আধারে ভরা একাকিত্ব নয়। আমার একাকিত্ব মৃত্তিকানির্মিত কোনও পাংশু, কাতর কষ্ট জাগায় না। আমার কষ্ট আকাশে আকাশে একাকি পাখির মত ভ্রমণ করে। এ-কষ্ট বৃষ্টিভরা দিগন্তে বর্ণালী রোদ সৃষ্টি করে । আমার কষ্ট সৃষ্টির উল্লাসে চিরচঞ্চল।
গত সপ্তাহের পুরোটাই কাটল পথের ওপর---প্রাণের-অতি-কাছেতে-থাকা তিনটি মানুষের সঙ্গে। তাদের উড়ুক্কু মনের সঙ্গে আমিও উড়াল দিলাম কি জানি কোন্ অজানা দ্বীপের খোঁজে। পথকে আমি ভালোবাসি সেটা কারো অজানা নয়। যেখানে যাই সেখানেই পথের প্রতিটি ধূলিকনা আমাকে হাত বাড়িয়ে দেয়---তাদের প্রাণেতে আসন পেতে দেয়। পৃথিবী আমার সাহচর্য পেয়ে ধন্য হয়---এমনই এক অপূর্ব অর্বাচীন ভ্রান্তির সুখে আমি তন্ময় হই। বৃক্ষবন জল পর্বত আমার সঙ্গ নেবার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে।

                                  দুই

  ফেরদৌস, মুনির আর মুকুল। তিনটি আশ্চর্য সুন্দর মানুষ। ফেরদৌস নাহার কবিতা লেখে, দেশ-বিদেশে তার প্রচুর সুনাম, ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসঙ্গতার অনুপম নৈঃশব্দকে সে জীবনসঙ্গী হিসেবে বাছাই করে নিয়েছে যৌবনের গোড়াতেই। অল্প বয়সে এতখানি দূরদৃষ্টি কেমন করে পেয়েছিল মেয়েটি জানিনা। বেশির ভাগ মানুষ ভুল করে শেখে। ও শিখেছে ভুল করার আগেই। আমাকে সে মামা বলে ডাকে। সাধারণত লোকে ভাই চাচা বা কাকা বলেই সম্বোধন করে আমাকে। আমার দুর্বলতা কিন্তু মামার প্রতি---এর একটা কোমল ধ্বনি আছে। ভাই-চাচা-কাকা তিনটেতেই প্রথম অক্ষরটি কেমন কর্কশ শোনায় আমার কানে। শুধু মামাতেই মা আছে, যাতে অন্তহীন কোমলতা।
  মুনির ফেরদৌসের ভাই---সহোদর নয় যদিও। বুদ্ধি ও চিন্তায় তারা বন্ধু, পরমাত্মীয়। মুকুল ওদের দুজনেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রিয় সহচর। কবিতা লেখে সেও। রাশিয়াতে ছিল কুড়ি বছর, রুশ ভাষা ও সাহিত্যে তার অবাধ গতিবিধি, বিস্তর পড়াশুনা বাইরের। তিনজনই দারুণরকম মুক্তমনা। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার নিরাপস সাধক। বৈবাহিক জীবনের স্বাদ এবং বিস্বাদ, দুয়েরই অভিজ্ঞতা হয়েছে মুনির আর মুকুলের। এখন তারা দুজনই বাধাবন্ধনহীন মুক্ত বিহঙ্গ। অশ্ব ছুটিয়ে, ধুলো উড়িয়ে, মুহূর্তের আহ্বানে যেখানে ইচ্ছা সেখানেই চলে যেতে পারে যখন খুশি তখন। তিনটি মুক্ত মানুষের মুক্ত ডাকের ঘূর্ণিতে কেমন করে যেন আমিও জড়িয়ে গেলাম। আমার জীবনও তো ওদেরই মত আইন আর নিয়মের শাসন থেকে মুক্ত। বয়স আমার ভারি হয়েছে জানি, কিন্তু সে-ভার বহন করে শূন্যবিহারী হবার মনটি তো হারাইনি এখনো। আমার মতে বয়স চলবে তার স্বভাবে, আমি চলব আমার স্বভাবে। আমার পথ অনেক আগেই বেঁকে গেছে গতানুগতিকতার সড়ক থেকে।
  পথে বেরুবার পর আমি গন্তব্যের কথা ভুলে যাই। না, ঠিক ভুলি না, তবে অবান্তর হয়ে যায় সেটা। তখন পথই আমার গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আমি চলছি--এবং এই চলাটাই আমার লক্ষ্য। জানি, বাস্তবতার দাবিঃ গন্তব্য চাই। সেই গন্তব্যের বাজারে প্রযুক্তির বণিকেরা কত প্রকারের পণ্য সরবরাহ করেছেন তার সীমা নেই। নবতম পণ্যের নামঃ জিপিএস---বানান করে বললে দাঁড়ায়ঃ গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম। আধুনিক শকটবিহারীদের পরম বন্ধু---যার উপকারিতা অপরিমেয়। আমি যান্ত্রিক জগতের আধুনিক পর্যটক নই। আমার গাড়িতে যন্ত্রযুগের এই অত্যাশ্চর্য উদ্ভাবনটিকে এখনও স্থাপন করা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ। য়ামি এখনও সেই পুরনো যন্ত্রতে আস্থাবান, যে-যন্ত্র কারখানায় তৈরি হয়না, হয় মাতৃগর্ভে। মরচে-ধরা আমার এই প্রাচীন যন্ত্রটি এখনও পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েনি। জানি, আধুনিক জিপিএস-এর সঙ্গে পাল্লা দেবার ক্ষমতা নেই আমার ক্ষয়িষ্ণু মস্তিষ্কটির, তবুও কোন সফরে বেরুবার কালে আমি এখনও পুরনো দিনের মত ডজনখানেক মানচিত্র সাথে নিই। তাতেই কাজ চলে যায়। কিন্তু বর্তমান যুগের প্রযুক্তিমনা ছেলেমেয়েদের জন্যে জিপিএস চাই। তাই হল এবারের সফরে। গাড়িটা মুনিরের, যন্ত্রটিও ওর, মুকুল তার দক্ষ দিকদিশারী, আমি আর ফেরদৌস, দুটি যন্ত্রভীরু মানুষ, পেছনের সিটে বসে বাইরের চলমান পৃথিবী দেখছি।

                                 তিন

  আমাদের প্রথম লক্ষ্য মন্ট্রিয়ল। সেখানে দুরাত কাটানো। আমার ভ্রমণসঙ্গীদের ইচ্ছে, পুরনো মন্ট্রিয়ল দেখা, যেখানে আধুনিক ভাস্করদের আকাশচুম্বী প্রস্তরপ্রাসাদ আর তীব্র আলোর ঝলসানিতে রুগ্ন, আর্ত হয়ে ওঠেনি সভ্যতার প্রাচীন ভিত্তিসমূহ। অতীতের নীরব আভিজাত্যের ছাপ এখনো সুস্পষ্টভাবে বিরাজ করে মন্ট্রিয়লের ফরাসীপ্রধান উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বিস্তৃত এলাকা জুড়ে---যেখানে নটারডেমের গীর্জাধ্বনি তিনশ বছর ধরে বেজে চলেছে প্রতিদিন প্রতিঘণ্টায়। সেখানে অত্যাধুনিক যান্ত্রিকতার উপদ্রব পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি এখনো। সেখানে এখনো ঘোড়ার গাড়িতে করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে পারে দূরের আগন্তুক। পুরনো দিনের আধো-আলো-আধো-আঁধার-ভরা ঘরোয়া কফির দোকানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারবেন আপনি জ্যাঁ কার্টিয়ে আর স্যামুয়েল দ্য শ্যামপ্লেনের গল্প করে করে। সুভেনিয়ের শপে গিয়ে দেখতে পাবেন ফরাসীদের বিগত গৌরবের অস্তমিত সূর্যগাঁথা---দেখতে পাবেন কেমন করে সাম্রাজ্যের কুশীলবেরা ক্ষমতার হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন পুরাকালে, এবং যা অব্যাহত রয়েছে অদ্যাবধি। এই পুরনো মন্ট্রিয়লে আপনি অলিম্পিক বিল্ডিঙ্গের উত্কট আস্ফালন দেখতে পাবেন না, দেখতে পাবেন পুরনো ইউরোপের পদচিহ্ন, শুনতে পাবেন এক পরাজিত জাতির চাপা ক্রন্দনের শব্দ। নটারডেমের প্রতিটি ঘন্টাধ্বনি যেন সেই ব্যথিত অশ্রুবারির ইতিহাসকে বারবার জাগ্রত করে তোলে।
  দুটি রাত কাটলো মন্ট্রিয়লে---প্রধানত মনিকা আর রাজার বাড়িতে। রাজার আসল নাম হারুন-অর-রশিদ। শুধু রাজা হলেও ক্ষতি ছিল না, সুন্দর মানিয়ে যেত। রাজার মতই ব্যক্তিত্ব তার। মিতভাষী, মিতাচারি, প্রচারবিমুখ---প্রকৃত সজ্জন বলতে যা বোঝায় সে তার জীবন্ত ছবি। উপরন্তু, সযত্নে-গোপন-করে-রাখা তার প্রখর ধীশক্তি---সাধারণ বাঙালি চরিত্রের ঠিক বিপরীত একটি বিনয়নম্র মানুষ। মনিকা তার স্ত্রী। মনিকার কথা শোনেননি বুঝি? ওর গানও শোনা হয়নি? তাহলে আপনার জীবনে একটা অপূর্ণতা থেকে গেল। ও যখন গায় তখন পুরো আকাশটাই নেমে আসে নিচে। পাখিরা চুপ হয়ে যায়---নিসর্গ নিথর হয়। কি এক আশ্চর্য জাদু আছে তার গলায়, তার গানে প্রাণে সুরে, যা মানুষকে অবশ করে ফেলে, তাকে অক্ষম অসহায় অবস্থায় তুলে নিয়ে যায় অন্য কোনও পৃথিবীতে। মনিকা রশিদ প্রকৃতির এক আশ্চর্য কারুকার্য। পাঁচ বছরের আদরিনী কন্যা ঋত্বিকা আর ওরা দুটিতে মিলে এক অনবদ্য নিলয় সৃষ্টি করে রেখেছে মন্ট্রিয়লের শহরতলীতে অবস্থিত পয়েন্ট ক্লেয়ার অঞ্চলে।
  সোমবার সকালবেলা রাজা চলে গেল কাজে, ঋত্বিকা গেল তার স্কুলে। মনিকা আর আমরা চারজন মিলে বেরিয়ে গেলাম পুরনো মন্ট্রিয়লের দিকে। মুনিরের জিপিএস এর যান্ত্রিক রমনীটির কর্কশ কন্ঠের রুক্ষ পরিচালনাতে আমরা নটারডেম বেসিলিকার চত্বরে গিয়ে পৌঁছুলাম বেলা দশটা নাগাদ। গাড়ি পার্ক করা হল কাছাকাছি এক পার্কিং লটে। তারপর পায়ে হাঁটা। সেখানকার রাস্তাঘাট মন্ট্রিয়লের ডাউনটাউনের যানবহুল, জনবহুল, নিত্য বিপদসংকুল রাজপথ নয়---রেনে লেভেক সড়ক থেকে আর্বান স্ট্রীটে ঢোকার সাথে সাথে প্রাচীনতার মুখোমুখি হই আমরা। গীর্জার উঁচু উঁচু গম্বুজ দেখা যায় সেখান থেকেই। আর্বান গিয়ে মেশে এভেনিউ ভিগেরের সাথে। অদূরেই সরুপথ স্যাঁ জ্যাক। সেখান থেকে ডানদিকে মোড় নিলেই রুয়ে নটারডেম। ওখানে প্রকাণ্ড উঠানের মত চত্বর---গাড়িঘোড়ার উপদ্রব নেই, সেখানে পদচারিদের স্বর্গ। অগণিত পর্যটক সেখানে---দেশবিদেশ থেকে আসা নানা জাতের নানা বর্ণের নানা ধর্মের মানুষ। তাদের সবার হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা---ক্যামেরাহীন মানুষ সেখানে বোধ হয় একজনই ছিল। মানুষটিকে আপনারা চেনেন---তার বেশি কি বলার প্রয়োজন আছে? ও হ্যাঁ, মনিকাও ক্যামেরা নিয়ে যায়নি। ফলে আমরা দুজন প্রায় প্রতিটি ছবিতেই উপস্থিত ছিলাম। ছবিতে নিজের চেহারাটির একটা অবাস্তব রূপ দেখলাম। ডিজিটালের দারুণ শক্তি।
   কাছেই অনেকগুলো ছোট ছোট দোকান। ওই পাড়াতে সবাই ছোট ব্যবসায়ী---পারিবারিক ব্যবসাই বেশির ভাগ। সেখানে ওয়ালমার্ট নেই, সিয়ার্স, কস্টকো, বে বা লব্লো নেই। সেখানকার কোনও দোকানে ঢুকলে স্বয়ং মালিকের সঙ্গেই হয়ত দেখা হয়ে যাবে আপনার, নতুবা তাঁর পরিবারেরই কেউ-না-কেউ। এমনি এক দোকানে ঢুকল ফেরদৌস আর মনিকা। ফেরদৌসের চোখ ছোট ছোট সুভেনিয়ারের প্রতি যা মন্ট্রিয়লের স্মৃতি ধারণ করে রাখবে। বিশেষ করে চুম্বক যা ফ্রিজের গায়ে এঁটে রাখা যায়। চুম্বক ওকে চুম্বকেরই মত টানে। মনিকার দৃষ্টি কোথায় ছিল জানিনা, হয়ত কোথাও না, আবার সবখানে। ওর নিত্যচপল চোখদুটি কোথায় কখন কিসের টানে নাচতে শুরু করে ঠিক নেই---একটা দুর্ভেদ্য রহস্যের কুয়াষা যেন সারাক্ষণই ঘিরে থাকে মেয়েটিকে। আমরা শুধু দেখতে পেলাম সে দোকানে ঢুকেছে এক পোশাকে, যখন বেরিয়ে এল তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পোশাক।
  গীর্জাপাড়ায় যা দেখবার দেখা শেষ করে আমরা রওয়ানা হলাম অদূরবর্তী নদীর ধারে। বড় রাস্তা পার হয়ে চোখে পড়ল একটা পুরনো রেলসড়ক----যেখানে রেলগাড়ি চলে না এখন, চলে প্রেমিকপ্রেমিকারা একে অন্যের হাত ধরে, চলে সেন্ট লরেন্সের আর্দ্র শীতল হাওয়া অতীতের স্মৃতি বহন করে। মরচেধরা এই প্রাচীন রেলসড়কের দৃশ্য আমার যাত্রাসঙ্গীদের মনে রঙ ছড়িয়ে দিল। বিশেষ করে ফেরদৌস আর মনিকা। কবিমন ওদের দুজনেরই। ওরা গুণ গুণ করে গাইল, মনে মনে হয়ত দুচারছত্র কবিতাও রচনা করে ফেলল---কে জানবে কবির মনের কথা। হ্যাঁ, মনিকাও কবিতা লেখে, কবিতার বই বেরিয়েছে রীতিমত। অকবি শুধু আমিই ছিলাম ওখানে। আমার মন তখন বোবা----মেয়েদুটির উচ্ছলতা দেখেই বাকহারা, মুগ্ধ।
  এবার সেন্ট লরেন্সের জলের কাছে। জল কেন এমন করে টানে মানুষকে জানিনা। হয়ত নারীর মতই তার রূপ বলে---দূর থেকে তার গভীরতা বুঝবার কোনও উপায় নেই, ওপরের শান্ত শরীর দেখে জানবার উপায় নেই কত অশান্ত স্রোতের ধারাতে বিধৃত তার অন্তর। শুধু তার রূপ, তার চটুল তরলতা মানুষকে ব্যাকুল করে বারবার, তাকে কাজের জগত থেকে তুলে এনে ভাবের জগতে প্রবিষ্ট করে। সেন্ট লরেন্সের তীরে রেলিঙ্গে দাঁড়িয়ে আমরা নৌকাবিহারীদের সখের প্রমোদাগার দেখলাম, দেখলাম পালতোলা সাধের বজরা পরম আলস্যে ভেসে চলেছে নদীর ঢেউএর ওপর। অদূরে বিশাল জাহাজের মত দেখতে কি যেন কি দাঁড়িয়ে আছে কূলের মাটিকে আঁকড়ে ধরে----যেন প্রস্তরযুগের বিপুলাকার কোনও প্রেমিকপ্রেমিকা। ভাল করে তাকালে বোঝা যায় ওটা জাহাজ নয়, জাহাজের আকারে তৈরি দালান---মানুষের কল্পনায গড়া একটি ইঁটপাত্থরের জলজ রচনা। সেখানে দোকানিদের দোকান আছে সারি সারি, আছে খাবারওয়ালাদের খাবারের পসরা, এমনকি একটা গাড়িপার্কও। নদীর ওপারে দিগন্তের কাছে দারুণ স্পর্ধায় দাঁড়িয়ে আছে মন্ট্রিয়লের অলিম্পিক ভিলেজের সেই বিশাল গোলকটি। আজ থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে এক্সপো সিক্সটিসেভেনে আমি সেই গোলকের ভেতরে-স্থাপিত এক প্রমোদশকটে চড়ে আকাশে আকাশে বিচরণ করেছি। যতবার সেই গোলকটি দেখি ততবারই ভাবি ওই সময় আমার বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়। ত্রিশের কোঠায়! ভাবতেই অবাক লাগে। আজকে যাদের বয়স ত্রিশ তারাও একদিন আমার আঙ্গিনায় এসে পৌঁছুবে। তখন কি তারা একই মানুষ থাকবে? না থাকবে না। এই নদীর মতই সেই জল কোন্ সুদূর সাগরের নীল জলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাবে।
  দিনের আলো আস্তে আস্তে তামাটে হয়ে আসছিল---নদীর বাতাসে ঠাণ্ডা আমেজ। ওরা তড়িঘড়ি করে আরো অনেক ছবি তুলল----আমার ছবি, মনিকার ছবি, ওদের নিজেদের ছবি, পরস্পরের ক্যামেরাতে, পরস্পরের শৈল্পিক খেয়ালখুশিতে। ধন্য তুমি ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভাবলাম মনে মনে। তুমি আছ বলে কাউকে ভাবতে হয়না ফিল্ম শেষ হয়ে যাবে কিনা। ফিল্মের বালাই চুকে দিয়েছে এই আশ্চর্য যন্ত্রটি। এই যন্ত্রের জনক সেই বিশাল প্রতিভাধর মানুষটি কে কেউ কি মনে রেখেছে? ভদ্রলোকের নাম স্টিভেন স্যাশন, আমেরিকান প্রকৌশলী, ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানিতে নিযুক্ত থাকাকালে এই অসাধারণ যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন ১৯৭৫ সালে, যখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ। আজকে যখন পৃথিবীর কোনায কোনায় কোটি কোটি মানুষ কোটি কোটিবার বোতাম টিপে সখের ছবি তুলে যাচ্ছে মনের আনন্দে তারা কি কখনও জানতে চেয়েছে লোকটার নাম? না চায়নি। সৃষ্টি যখন পণ্যতে পরিণত হয় স্রষ্টার নামটি তখন কারুর মনে থাকে না। মনে রাখার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করে না কেউ।
  আমার বৃদ্ধ শরীরে ক্লান্তির ছায়া পড়ছিল একটু একটু করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা কেবল পায়ে পায়ে থাকা---আমার বয়সে তেমন সয় না। বারবার বেঞ্চিতে বসে দম নিচ্ছিলাম। ওদের সবারই তরুণ বয়স। আমি যদি সঙ্গে না থাকতাম তাহলে ওরা হয়ত আরো অনেক সময় নিয়ে ঘুরে বেড়াতো সেখানে। আসন্ন সন্ধ্যার মিষ্টি সজল বাতাস আমার সমস্ত শরীরে মনে অলস তন্দ্রা মেখে দিচ্ছিল, আর ওদের প্রাণে হয়ত বাজিয়ে তুলছিল সাঁঝের বেলার শঙ্খধ্বনি। তবুও বলতে হল, চল যাই। ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। ক্ষিদেও মন্দ পায়নি।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে