Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ৮ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.4/5 (27 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-২৪-২০১২

হুন্ডির পাচার ২০ হাজার কোটি টাকা

মির্জা মেহেদী তমাল ও মানিক মুনতাসির


হুন্ডির পাচার ২০ হাজার কোটি টাকা
হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। ভারতের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন মাড়োয়ারি হুন্ডি ব্যবসায়ীসহ শক্তিশালী শতাধিক হুন্ডি সিন্ডিকেট বিমান ও স্থলবন্দর দিয়ে প্রতি বছর গড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। আর এ অবৈধ কাজে সহযোগিতা করছেন বেশ কিছু বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, মানি এক্সচেঞ্জ, কুরিয়ার সার্ভিস, বিমান ও স্থলবন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

চিহ্নিত চক্র ছাড়াও একশ্রেণীর ব্যবসায়ী আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা প্রতি বছর হুন্ডি করে পাচার করছে। শুধু টাকা পাচারই নয়, বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসীদেরও টাকা আসছে। ফলে সরকারও হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব।

এমন আশঙ্কাজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা বিভাগসহ অন্য বেশ কয়েকটি সংস্থার তদন্তে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় অর্থনীতিতে হুন্ডি এখন বড় হুমকি। এনবিআরের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীরা ১০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করছেন।

দ্রব্যমূল্যের উত্থান-পতনে বড় একটি হুন্ডি সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলেও জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন মাড়োয়ারি হুন্ডি ব্যবসায়ী এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন।

টাকা পাচার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানি লন্ডারিং-বিষয়ক সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি)। তারা সরকারকে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, যে পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে, তা দেশে বিনিয়োগ হলে জাতীয় উৎপাদন বাড়ত কয়েক শতাংশ। জিডিপিতে অতিরিক্ত তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতো। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাচ্ছে। ওই অর্থ সঠিক পথে এলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ত। তারা বলছেন, প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হলেও সরকার উদাসীন। প্রশাসনের নাকের ডগায় হুন্ডি ব্যবসা চলছে, যা এখন 'ওপেন সিক্রেট' হলেও তাদের যেন কিছুই করার নেই। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, হুন্ডি বৃদ্ধি পাওয়ায় এপিজি আয়কর আইন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরাধী আইন এবং মানি লন্ডারিং আইন সংশোধনের তাগিদ দিয়েছে। সে অনুযায়ী সম্প্রতি সরকার আয়কর আইনের সংশোধনী চূড়ান্ত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'হুন্ডির কারণে সরকার যেমন রাজস্ব হারায় তেমনি জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। মানি লন্ডারিং আইন সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে।' তবে এর জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জড়িত সূত্রগুলো জানিয়েছে, বছরের পুরোটাই হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। তবে ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণকে কেন্দ্র করে মাত্রা বেড়ে যায়। প্রতিটি স্থল ও বিমানবন্দর দিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু ধরা পড়লেও ধারাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় বড় ঘটনাগুলো। এনবিআরের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় বিমানবন্দরে বা সীমান্ত এলাকায় যে পরিমাণ হুন্ডির ঘটনা ধরা পড়ে, তা মোট পাচারের মাত্র পাঁচ শতাংশ। ৯৫ শতাংশই নিরাপদে পাচার হয়ে যায়।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, কারওয়ান বাজার, গুলশান ও বনানীতে এ ধরনের একাধিক চক্র রয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও অনেক চক্র রয়েছে বলে জানা গেছে। তারা বিভিন্ন দেশের পাচারকারী চক্রের সঙ্গে এ অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। কেউ বিদেশে টাকা পাঠাতে চাইলেও হুন্ডি ব্যবসায়ী চক্রের হাতে টাকা তুলে দেন। টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রাপকের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা তুলে দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দেখিয়ে (আন্ডারইনভয়েসিং) শুধু মোবাইল ফোনসেট আমদানির নামেই বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। সেইসঙ্গে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে আমদানি পর্যায়ে সরকারের শত শত কোটি টাকার অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (এটিভি)। শত কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। মাসে কয়েক লাখ মোবাইল ফোনসেট আমদানি হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) ছাড়পত্রের বিপরীতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে শতকরা এক থেকে ১০ ভাগেরও কম দামে।

মাড়োয়ারি হুন্ডি সিন্ডিকেট : ভারতের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন মাড়োয়ারি হুন্ডি ব্যবসায়ী এ সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে হুন্ডির টাকা পাঠানো হয় সেসব দেশে এসব মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী এজেন্ট বসিয়ে টাকা সংগ্রহ করেন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি কিছু ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তারাও এর সঙ্গে জড়িত। প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে ব্যাংকে যে টাকা জমা করেন, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আবার হুন্ডি চ্যানেলের আশ্রয় নিয়ে সেসব টাকা থেকে অবৈধ আয়ের উৎস বের করে নেন।

সূত্র জানায়, হুন্ডি ব্যবসা একসময় বাংলাদেশিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী মাড়োয়ারি সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ চ্যানেলে এ ব্যবসা বেশি লাভজনক হওয়ায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের ঘাঁটিও অত্যন্ত শক্তিশালী। এসব মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী এরই মধ্যে বাড়ি, গাড়ি এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট পর্যন্ত করে রেখেছেন। তারা বাংলা ভাষায়ও পারদর্শী। ফলে বাংলাদেশে এদের ভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করা দুরূহ। সূত্র আরও জানায়, মাড়োয়ারির বড় ঘাঁটি সৌদি আরবে। কেননা ওই অঞ্চলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থান বেশি হওয়ায় রেমিট্যান্স-প্রবাহ বেশি। পরের অবস্থান হলো সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের। কষ্টে অর্জিত পরিশ্রমের টাকা দেশে পাঠাতে হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি বেছে নিচ্ছেন হুন্ডির মাধ্যম। কেননা ব্যাংকিং বা অন্য কোনো বৈধ পথের চেয়ে হুন্ডিতে পাঠালে টাকার দর বেশি পাওয়া যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এভাবে প্রায় দুই হাজারের ওপর হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে প্রতি মাসে তিন-চার হাজার কোটি টাকা ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে। ফলে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা থেকে।

হুন্ডির স্বর্গরাজ্য বিমানবন্দর : সূত্র জানায়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাংক এবং মানি এক্সচেঞ্জ বুথগুলোতে চলছে অবৈধ হুন্ডি ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ব্যবসা। প্রায় প্রতিদিনই এই বিমানবন্দর দিয়ে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২-এর প্রবেশগেট এবং ভিআইপি গেটে মোট ১৬টি লাগেজ স্ক্যানিং মেশিনে অস্ত্র ও গোলাবারুসহ অন্য ধাতবসামগ্রী পরীক্ষা করা সম্ভব হলেও কাগজের নোট শনাক্ত করা যায় না। এ সুযোগে পাচারকারীরা নির্বিঘ্নে মুদ্রা পাচার করলেও কর্তৃপক্ষ তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। গত এক বছরে শুধু এ বিমানবন্দর দিয়েই পাচারকালে আটক হয়েছে প্রায় দেড় শ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি মুদ্রা। তবে পাচারের পথে খুব অল্পই ধরা পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রাসহ আটক ব্যক্তিরা গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, এসব মুদ্রার অন্যতম গন্তব্যস্থল দুবাই। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাচার হচ্ছে।

স্থলবন্দরগুলোয় হুন্ডি : দেশের প্রায় প্রতিটি স্থলবন্দরে হুন্ডি ব্যবসা জমজমাট। নির্বিঘ্নে লোকজনের যাওয়া-আসা এবং হুন্ডির মাধ্যমে চলছে পণ্য আনা। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দর দিয়ে কোনো যাত্রীর ভারতে পা দেওয়ার আগেই তার ব্যয় নির্বাহের টাকা পৌঁছে যায় ওপারের বসিরহাটে। লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর রুটে যাতায়াত ও পণ্য আনায়ও অবাধে চলছে হুন্ডির ব্যবসা। বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে চোরাপথে আসছে গরু, মাদকদ্রব্য, মোটর পার্টস, টায়ার-টিউবসসহ নানা পণ্য। আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে মিথ্যা ঘোষণা ও এলসি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রবেশ করছে অতিরিক্ত পণ্য। এসব পণ্যের দাম পরিশোধ করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে। এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ভারত, নেপাল ও ভুটানে যাতায়াতকারী পাসপোর্টধারী যাত্রীরা অবৈধভাবে যে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে যাচ্ছেন, সেসব পাচারে সহযোগিতা করতে বুড়িমারী চেকপোস্ট এলাকা ও ওপারে ভারতের চেংড়াবান্ধা চেকপোস্ট এলাকায় হুন্ডি এজেন্টরা তৈরি থাকেন। বেনাপোলে ছোট ছোট দোকানের মাধ্যমেই টাকা পাচার হচ্ছে ভারতে। চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন সীমান্ত হুন্ডি পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া ভারত থেকে গরু আনার নামে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে চলে যাচ্ছে। পাচার হওয়া ওই অর্থের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বলে এনবিআর সূত্র জানায়। এ ব্যাপারে এনবিআর চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, 'হুন্ডি জাতীয় অর্থনীতির জন্য সব সময় হুমকি। আইনের ফাঁকফোকর গলে পাচারকারীরা বছরের পর বছর হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার করে। ফলে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে।' এ জন্য আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে