Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.1/5 (14 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৪-২৬-২০১৪

মিলিবাগ এসেছে পাশের দেশ থেকে

মিলিবাগ এসেছে পাশের দেশ থেকে

ঢাকা, ২৬ এপ্রিল- জায়ান্ট মিলিবাগ। গাছ-গাছালিতে থাকা এক ধরনের পোকা। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকা গাছ-গাছালি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গাছ-গাছালিতে এ পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা বিভিন্ন স্থানের গাছ-গাছালিতে।

জায়ান্ট মিলিবাগ

প্রথম অবস্থায় এ পোকার প্রাদুর্ভাব নিয়ে শিক্ষার্থীরা কিছুটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরে বিশেষজ্ঞরা জানান, জায়ান্ট মিলিবাগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এরপরই পোকাটি নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয় কৌতুহল।

এ পোকার ওপর গবেষণা চালিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোছা. নূর মহল আখতার বানু দিয়েছেন এ ব্যাপারে বিস্তরিত তথ্য। তিনি তার গবেষণা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ্য করে জানান, পোকাটি পার্শ্ববর্তী দেশে অনেক আগেই ছিলো। বাংলাদেশে পোকাটি দেখা যায় ২০০৩ সালের দিকে।

ড. নূর মহল আখতার বানু পরিবর্তনকে বলেন, “জায়ান্ট মিলিবাগ নামক পোকাটি বাংলাদেশে নতুন। পোকাটি একটি কোয়ারেন্টাইন পেস্ট। এর আগে বাংলাদেশে তেমন কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি। আমি গত ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পোকাটি নিয়ে পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করেছি। এরপর গত ২০১৩ সালে এ পোকার ওপর আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি।”

এ পোকা সম্পর্কে তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই ভারত, পাকিস্তান ও চীনে এই পোকার বিস্তার রয়েছে। বাংলাদেশে ১২ জেলায় ২০১১ সালে জরিপ চালিয়ে শুধুমাত্র ঢাকার ক্যান্টনমেন্টে, পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাংগা পামুলীতে, ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা ক্যাম্পাসে ও দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলায় এই পোকার উপস্থিতি দেখা গেছে।”

এ পোকা মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে কিনা জানতে চাইলে ড. নূর মহল আখতার বানু বলেন, “আমি এই পোকা নিয়ে গবেষণা করার সময় বহুবার শত শত পোকা নিজ হাতে ধরেছি। আমার কোনো সমস্যা হয়নি। এমনকি আমার সাথে যারা সহযোগিতা করেছে তারাও পোকাগুলোকে হাতে নিয়ে কাজ করেছে। আমাদের কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি।"

আদৌ কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।”

তিনি বলেন, “বিশেষ কোনো স্কিনের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। যেমন যাদের এলার্জি জনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের কারো কারো ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হতে পারে।”

তিনি জানান, বর্তমানে তার অধীনে দুইজন এমএস-এর ছাত্র এই পোকা নিয়ে গবেষণা করছেন। এ পোকার মরফোলজি, জীবন বৃত্তান্ত, পোষক, বাংলাদেশে বিস্তৃতি, মৌসুম ভিত্তিক প্রার্দুভাব, রাসায়নিক দমন, বোটানিক্যাল দমন এবং সমন্বিত দমন বিষয়ে গবেষণা করছেন।

গবেষণার বিভিন্ন তথ্য থেকে জায়ান্ট মিলিবাগ সম্পর্কে জানা যায়, পোকাটির নাম ম্যাংগো মিলিবাগ বা জায়ান্ট মিলিবাগ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ড্রসিকা ম্যানজিফেরি। যা মনোফ্লেবিডি পরিবারভূক্ত। এর বর্গ হচ্ছে হোমপ্টেরা।

জায়ান্ট মিলিবাগ পোকার বিস্তার সম্পর্কে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পোকা প্রথম দেখা যায়।

পোকাটির বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘পোকাটি দেখতে সাদা। স্ত্রী পোকার নিম্ফ কিছুটা বাদামী এবং পা ও অ্যান্টেনা কালো বর্ণের। ধীরে ধীরে এরা ওয়াকস সিক্রেশন করে বলে সাদা হয়ে যায়। স্ত্রী পোকা ১৯ মিলি মিটার লম্বা এবং ২.০৩ মিলি মিটার চওড়া। স্ত্রী পোকার কোনো পাখা নাই। ফলে স্ত্রী পোকা উড়তে পারে না। পুরুষ পোকা দেখতে স্ত্রী পোকার থেকে আলাদা। পুরুষ পোকা দেখতে মাছির মত এবং কালো পাখা থাকায় উড়তে পারে।’

গবেষণা প্রতিবেদনে পোকাটির জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এ পোকার জীবনচক্রে তিনটি পর্যায় রয়েছে। যেমন-ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পোকা (স্ত্রী পোকার ক্ষেত্রে)। কিন্তু পুরুষ পোকার ক্ষেত্রে চারটি পর্যায় রয়েছে। পর্যায়গুলো হলো- ডিম, নিম্ফ, পিউপা ও পূর্ণাঙ্গ পোকা। বছরে একবার এই পোকা জীবনচক্র সম্পন্ন করে। এপ্রিল থেকে জুন মাসে পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা মাটির নিচে, আবর্জনার নিচে চলে গিয়ে তুলার মত থলি তৈরি করে ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা সাধারণত ২৫১-৫৫৭টি। যা বাংলাদেশে ওই গবেষণায় পাওয়া গেছে। স্ত্রী পোকা ডিম দেবার পর মারা যায়। আবার ডিম ২১০ দিন মাটিতে সুপ্তাবস্থায় থাকার পর ফুটে নিম্ফ বের হয়ে আসে এবং গাছকে আক্রমণ করে।’

পোকাটির স্বভাব সম্পর্কে অধ্যাপক ড. নূর মহল আখতার বানু-এর গবেষণায় ওঠে এসেছে, ডিম ফুটে নিম্ফ বের হবার পর আগাছা এবং ঘাসে খাবারের খোঁজে এদেরকে দেখা যায়। এরপর যখন আমগাছে মুকুল আসে তখন গাছ বেয়ে উপরে উঠে মুকুলকে আক্রমণ করে। পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা গাছ থেকে মাটিতে নেমে এসে ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজতে থাকে এবং লুকায়িত স্থান পছন্দ করে। আশে পাশে ঘরবাড়ি থাকলে সেখানে ঢুকে পড়ে। এ সময় এদেরকে গাছের ফাটলে, গাছের গোড়ায়, মাটির নিচে, শুকনো পাতার নিচে, ড্রেনের চারপাশে দেখা যায়। পুরুষ পোকার ক্ষেত্রে যখন এরা তৃতীয় নিম্ফাল স্টেজে আসে তখন গাছ বেয়ে মাটিতে নেমে আসে এবং লুকায়িত স্থানে পিউপেশন সম্পন্ন করে। এরপর পূর্ণাঙ্গ পাখাযুক্ত লাল রঙয়ের পুরুষ পোকা বের হয়ে আসে এবং উঠতে থাকে।

গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭২ রকমের গাছে এই পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এদের মধ্যে ফলগাছ, শোভাবর্ধণকারী গাছ, শাকসবজী, কাঠের গাছ, হেজ প্লান্ট এবং আগাছা অন্যতম। এটি প্রধানত আম গাছের পোকা। তবে এরা পেপে এবং কাঁঠাল গাছকেও মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে।

জায়ান্ট মিলিবাগ পোকায় ক্ষয়-ক্ষতি সম্পর্কে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পোকার নিম্ফ এবং পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে রস চুষে নেয়। গাছের পাতা, শাখা, পুষ্পমঞ্জুরী, ফল থেকে রস চুষে খাবার ফলে এই অংশগুলো শুকিয়ে যায় এবং পাতা, ফুল ও ফল ঝড়ে পড়ে। খুব বেশী মাত্রায় আক্রমণ হলে গাছে কোনো ফল আসে না এবং পুরো গাছটি মারা যেতে পারে। এছাড়া এই পোকা হ্যানিডিও সিক্রেশন করে এবং সেখানে সুটি মোল্ড ফানগাছ গ্রো করে যার ফলে সালোক সংশ্লেষণের পরিমাণ কমে গিয়ে ফলনের মারাত্মক ক্ষতি করে। গাছে আক্রমণ প্রকট হলে সম্পূর্ণ গাছ পোকায় ছেয়ে যায়।

পোকাটি থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায় :
এপ্রিল মাসে গাছের কাণ্ডের গোড়ায় পলিথিন পেঁচিয়ে উপরের অংশ খুলে রাখলে পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা সেখানে জমা হবে এবং সেখান থেকে সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কিংবা মাটির এক মিটার গভীরে পুঁতে ফেলতে হবে। মে-জুন মাসে গাছের মাটিগুলো সরিয়ে রোদে রাখতে হবে যাতে করে ডিমগুলো নষ্ট হয়ে যায় কিংবা পাখি খেয়ে ফেলে।

নিম্ফ যেন গাছে উঠতে না পারে তার জন্য আঠালো ব্যান্ড, পলিথিন ব্যান্ড ও গ্রিজ ব্যান্ড গাছের কাণ্ডের চারপাশে মাটি হতে এক মিটার উঁচুতে পেঁচিয়ে দিতে হবে। ডিম ফুটে নিম্ফ বের হবার পর যখন মাটির উপরে আসে তখন অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। রিপকর্ড ১০ ইসি ১.০ মিলি/০১ লিটার পানি। মারসাল ২৫ ইসি ৩.০ মিলি/০১ লিটার পানি। কনফিডার ৭০ ডব্লিউজি ০.৪ গ্রাম/০১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সমস্ত গাছ ভিজেয়ে সাতদিন পর পর স্প্রে করতে হবে তিন বার।
পূর্ণাঙ্গ বয়স্ক পোকা যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য গাছের চারদিকে নালা তৈরি করে কেরোসিন মিশ্রিত পানি দিয়ে রাখতে হবে। পূর্ণ বয়স্ক পোকা ঝাড় দিয়ে একত্রিত করে মাটির এক মিটার গভীর গর্তে রেখে কেরোসিন দিয়ে মাটি চাপা দিতে হবে। এছাড়া পূর্ণবয়স্ক পোকা সংগ্রহ করে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।

উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. মোছা. নূর মহল আখতার বানুর ওই  গবেষণার সময় সাথে ছিলেন মেজর প্রফেসর ড. মো. জিন্নাতুল আলম, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সালনা, গাজীপুর। আর সুপারভাইজার ছিলেন প্রফেসর ড. মো. আব্দুল লতিফ, কীটতত্ত্ব বিভাগ শের-ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ঢাকা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে