Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৯ , ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (32 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৪-১৫-২০১৪

‘সংস্কৃতি মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে’

শুচি সৈয়দ


পৃথিবীর পঁচিশ কোটি বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন উৎসবের দিন। পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় আর আত্ম-অনুসন্ধানের দিন। সারা বছরের অর্থনৈতিক লেনদেন, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, শুভ-অশুভ ও ভালো-মন্দের হিসাব-নিকাশের দিন। মানব জাতির জন্য কল্যাণ কামনার দিন। বাংলার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং মুসলমান- এই দিনে সবাই বাঙালি, শুধুই বাঙালি।

‘সংস্কৃতি মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে’

বাংলাদেশে এই সর্বজনীন উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় গত শতকের ষাটের দশকে, একদল সংস্কৃতি-কর্মীর সাহসী উদ্যোগে। এই সাহসী সংস্কৃতি-কর্মী ও অনুরাগীরা পাকিস্তানি সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু, ভয়-ভীতি, দমন-নিপীড়ন অগ্রাহ্য করে ১৩৬৭ বাংলা, ইংরেজি ১৯৬১ সালে বাংলাদেশে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করে। এজন্য তাদেরকে জেল-জুলুম পোহাতে হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী সাফল্যের সঙ্গে পালনও করেছেন। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর টলিয়ে দিয়েই তারা কেবল থেমে যাননি- তারা গোটা সমাজের সার্বিক অচলায়তনটিকে ভেঙে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেছেন। সেই তাগিদ থেকে নিজেরা সংগঠিত হয়েছেন। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু জাতীয়তাবোধকে পুনর্জীবিত করে রাজনৈতিক লড়াইকে মূর্ত করে তুলেছেন। সেই সংগঠিত সংগঠনের নাম ছায়ানট। ছায়ানট ধ্রপদী রাগ সংগীতের একটি রাগের নাম। কবি কাজী নজরল ইসলামের একটি কবিতার বইয়েরও নাম। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকলেই চিন্তা করলেন এই সাফল্য ধরে রাখতে হবে এবং সেটা একটা সাংগঠনিক তথা প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বে। জয়দেবপুরে এক বনভোজনে গিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন। আর 'ছায়ানট' নামে একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হলো। ছায়ানট-এর নামকরণ করেছিলেন ফরিদা হাসান। কবি সুফিয়া কামালকে সভাপতি এবং ফরিদা হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় ছায়ানটের প্রথম কমিটি। ওই বনভোজনের উদ্যোক্তা ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সংগঠক মোখলেসুর রহমান [সিধু ভাই], উপস্থিত ছিলেন শামসুন্নাহার রোজ, সাংবাদিক আহমেদুর রহমান, মীজানুর রহমান ছানা, ওয়াহিদুল হক, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, সানজীদা খাতুনসহ অনেকে। বাঙালি জাতির কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জংলী শাসকদের হাত থেকে বাঁচাতে সেদিনের সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত সূচনা ঘটাল একটি সাংস্কৃতিক সংগ্রামের।

সূচনালগ্নে ছায়ানট রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনের প্রেরণা থাকলেও ছায়ানট বাঙালি জাতির সমগ্র সংস্কৃতিচর্চার প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে ছায়ানটের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন কামাল লোহানী, জিয়াউদ্দীন, জাহিদুর রহিম, সাইফউদদৌলা, ইফফাত আরা দেওয়ান, খায়রুল আনাম প্রমুখ।

ছায়ানট কেবল ললিতকলার চর্চাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দাঁড়িয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্ত জনপদে, বন্যাপীড়িত গ্রামে, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণে। ছায়ানটের শিল্পীরা ছিল জীবনের লড়াইয়ে, মাতৃভূমির মুক্তির লড়াইয়ে। বাঙালি জাতির নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের সংশপ্তক ছায়ানট।

সংস্কৃতির সব শাখাকেই ছায়ানট সমান গুরত্বপর্ণ মনে করে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে এই সংগঠনকে। নানা প্রকার অপপ্রচার-অপবাদ ছড়িয়ে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই মহৎ উদ্যোগকে। ছায়ানটের যাত্রাকে বিঘ্নিত করতে নববর্ষের পুণ্য প্রভাতে আসা নারী দর্শকদের লাঞ্ছিতও করা হয়েছে। বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে বটমূলের মঞ্চে। তবু ছায়ানট অশুভের বিরুদ্ধে, অকল্যাণের বিরুদ্ধে তার সংস্কৃতির সংগ্রাম জারি রেখেছে।

বাংলা ১৩৭৪ সালের পহেলা বৈশাখ ছিলো শনিবার, ১৫ এপ্রিল ১৯৬৭। এ দিন রমনার বটমূলে প্রত্যুষে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রভাতকে গানে গানে বরণ করে ছায়ানট। সেই থেকে রমনার বটমূলের বর্ষবরণ উৎসবের শুর। এটি আজ জাতীয় উৎসবও। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা শহর ঘুরে রমনার বটমূলের স্থানটি খুঁজে বের করেন প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী নওয়াজেশ আহমদ। ছায়ানটের সবাই জায়গাটি পছন্দও করেন।রমনার বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানটি একবার মাত্র হয়নি, সেটা ১৯৭১ সালে। ছায়ানটের শিল্পীরা তখন মুক্তিযুদ্ধে- রণাঙ্গনে। গান গাইছেন শরণার্থী শিবিরে। তাছাড়া প্রত্যেক বছরেই অনুষ্ঠানটি হয়েছে, ভয়-ভীতি অপপ্রচার বোমাবাজিকে পরাস্ত করে। ছায়ানটের জন্ম ১৯৬১ সালে।

এ সাক্ষাৎকারে ছায়ানট এবং সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলেছেন বরেণ্য সংস্কৃতি-ব্যক্তিত্ব এবং ছায়ানটের প্রাণ ড. সনজীদা খাতুন।

: বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে ছায়ানট পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। এই গুরুদায়িত্ব পালনে যারা আপনার সঙ্গে অবদান রেখেছেন তাদের কার কার কথা স্মরণ হয় আপনার?

-ছায়ানট অসংখ্য নীরব কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তায় চলে আসছে। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো কার্যকরী সংসদের সদস্য আবার কেউ তা-ও নন। একান্ত অন্তর্তাগিদ থেকেই তারা ছায়ানটের কাজ করেছেন। এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে মরহুম মোখলেসুর রহমান সিধু ভাইয়ের কথা। আমার বন্ধু হুসনে আরা মাক্কী- কিছু দিন আগে মারা গেছেন। সিধু ভাইয়ের স্ত্রী আমাদের রোজ বু, ফরিদা হাসান এমপি, ছায়ানটের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। শামসুন নাহার রহমান, নুরুন্নাহার আবেদীন এমন অনেক নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মী- তাদের দানের মূল্য অপরিশোধ্য।

: একজন সংগীত শিল্পীর কী কী গুণ থাকা অপরিহার্য বলে আপনি মনে করেন?

-প্রথম কথা হচ্ছে, মানসিক ঔদার্য, রুচি এবং সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে- প্রেম। সংকীর্ণ অর্থে নয়- মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা, জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা, পরিবেশের জন্য ভালোবাসা- এগুলো না থাকলে হবে না। শিল্পী যদি কেবল নিজের উন্নতি ভাবে, গান পারুক না পারুক টেলিভিশনে মুখ দেখাতে চায়, মঞ্চে উঠতে চায়- এটা কিন্তু সংস্কৃতিচর্চা নয়। এগুলো আত্মচর্চা। ঔদার্য, প্রেম, নিষ্ঠা এরকম অনেকগুলো জিনিস দরকার। আমি তো এমনও বলি, মোনায়েম খাঁ যে আমাকে রংপুরে বদলি করে দিয়েছিল তা থেকেও আমি অনেক শিক্ষা পেয়েছি। এই যে ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত পথে যেতে আসতে আমি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দেখার সুযোগ পেয়েছি- সেটা আমার জন্য একটা মস্ত বড় শিক্ষা। ঢাকা থাকতে আমি কূপমণ্ডূক ছিলাম। ঢাকা থাকলে আমি এটা বুঝতেই পারতাম না।

: ছায়ানটের বিভিন্ন কার্যক্রমে আপনারা যে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় রেখেছেন সেটা সত্যিই ঈর্ষণীয়- যেমন ছায়ানটের শিল্পীরা বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান কবি শামসুর রাহমান এবং কবি শঙ্খ ঘোষের নির্বাচিত রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে শ্রোতার আসর বসিয়েছে- এটা একটা অভিনব এবং ঈর্ষণীয় উদ্ভাবন। এই অনুষ্ঠান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার কথা বলবেন কি?

-কবি শঙ্খ ঘোষের একটি প্রবন্ধের বই আছে ‌'এ আমির আবরণ'। এই বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটিই ছিলো শ্রোতার আসরের সেদিনকার মুখবন্ধ। শখ ঘোষ যে রবীন্দ্রসংগীতগুলো নির্বাচন করেছিলেন সে গানগুলোর ওপর তাঁর বক্তব্য ওই শ্রোতার আসরে তুলে ধরেন। ওই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন, ধরো অনেকে আছে ধর্মে বিশ্বাস করেন না, অথচ যখন রবীন্দ্রনাথের পূজার গান হয় তখন তারা স্তব্ধ হয়ে শোনেন- এ এক অদ্ভুত ধরনের ব্যাপার আছে মানুষের ভেতরে- একটা ভক্তিমান সত্তা আছে, এই জিনিসটা উনি দেখিয়েছেন খুব সুন্দর করে। সবাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করবে, নামাজ পড়বে বা পূজা করবে তা নয়- প্রত্যেকের ভেতরে যে মূল্যবোধে বিশ্বাসটা থাকে সেটা- ধর্ম কি একটা ছোট জিনিস? ধর্ম কি একটা এমনি এমনি কতগুলো সংস্কার বা আচার? তা তো নয়, ধর্ম অনেক বড় জিনিস। ধর্ম আমাদের ধারণ করে থাকে- এই জিনিসটা শঙ্খ ঘোষ ওই প্রবন্ধে খুব সুন্দর করে ব্যক্ত করেছিলেন। শামসুর রাহমানের যেটা প্রধান বক্তব্য ছিলো, তিনি খুব অল্প বয়েসে রবীন্দ্রনাথের এই গানটি শুনেছিলেন, ‌'আমি কান পেতে রই...' তাঁর অবাক লেগেছিল এই কথাগুলো, 'ভ্রমর যেথায় হয় বিবাগী/নিভৃত নীল পদ্ম লাগি'- এই 'নিভৃত নীল পদ্ম লাগি'- খুব অল্প বয়েসে তাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। কবির প্রাণটাকে যেন স্পন্দিত করে দিয়েছিল। এই জিনিসটা তো একটা মস্ত বড় ব্যাপার।

: ছায়ানট কোনো রাজনীতিতে জড়ায়নি কিন্তু রাজনীতির শিকার হয়েছে ঠিকই- সংস্কৃতির সংগ্রামে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকেও বারবার নষ্ট রাজনীতি দ্বারা আপনারা আক্রান্ত হয়েছেন- এ থেকে আপনার উপলব্ধি কি?

-রাজনীতি বলতে আমি যা বুঝি তা হচ্ছে রা-জ-নী-তি! শ্রে-ষ্ঠ-নী-তি! রাজ বলতে বড় নীতি, অনেক বড় নীতি। আমরা যারা সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে জড়িত- আমাদের নীতিটাকে আমি মনে করি মূল্যবোধের রাজনীতি! এবং সংস্কৃতি মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে, উন্নত করে- জীবন সংস্কৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না। কিন্তু কেউ কেউ এটাকে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে। ধর্ম খুব ভালো জিনিস কিন্তু ধর্ম সম্প্রদায় ভালো না। ভাগের মধ্যে ঢুকলে, সংকীর্ণতার ভেতর আবদ্ধ হয়ে গেলেই মুশকিল।

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে