Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯ , ১ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (122 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-১৩-২০১৪

সর্বনাশা ক্যাসিনো

আশরাফুল আলম


সর্বনাশা ক্যাসিনো

সিঙ্গাপুর, ১৩ এপ্রিল- কর্মসূত্রে আমার বসবাস সিঙ্গাপুরে। কয়েক বছর ধরে এখানে আছি। আসার পর মেরিনা বে স্যান্ডসের ক্যাসিনোর কথা বহুবার শুনেছি। সিঙ্গাপুরের এই ক্যাসিনো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্যাসিনোগুলোর অন্যতম। অবসর সময়ে মাঝেমধ্যে আমি মেরিনা বেতে বেড়াতে যাই। কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় মেরিনা বের নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে, হাওয়া খেতে খেতে এই জগদ্বিখ্যাত ক্যাসিনো দেখার কৌতূহল জাগল।

ক্যাসিনো বললেই সিন সিটি লাস ভেগাসের কথা মনে আসে সবার আগে। কিন্তু টিভি-সিনেমায় দেখা লাস ভেগাসের ক্যাসিনোর তুলনায় সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোগুলো অনেক ভদ্র প্রকৃতির। কয়েকটা ফ্লোর ও কয়েক লাখ বর্গফুটের বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই ক্যাসিনোতে আছে শত শত ভিডিও গেমসদৃশ ক্যাসিনো স্লট, পোকার, ব্ল্যাক জ্যাক, রোলেট, ক্র্যাপ্সসহ নানা রকম বিচিত্র খেলা। খেলার চেয়ে আমার কৌতূহল ছিল খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া দেখা।
চায়নিজদের মধ্যে এসব খেলা খুবই জনপ্রিয়। সে নজির দেখা গেল ক্যাসিনোতে। বালক থেকে বৃদ্ধ, সব বয়সী চায়নিজদের চোখে পড়ল। দেখা মিলল আমাদের দেশি ভাইদেরও। বাংলায় একজনকে বাংলাদেশি কি না জিজ্ঞেস করতেই তিনি শুধু হাসলেন। এবারই প্রথম এসেছেন কি না জিজ্ঞেস করতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বোঝা গেল, এবারই এখানে তাঁর প্রথম আসা নয়।

এখানে খেলতে আসা বাংলাদেশিদের বেশির ভাগ সিঙ্গাপুরেই কর্মসূত্রে থাকেন। সবাই অল্প বেতনে চাকরি করেন। দেশে জায়গা-জমি বিক্রি করে কিংবা ধারদেনা করে সিঙ্গাপুরে এসেছেন ভালো উপার্জনের আশায়। শুনেছি তাঁদের অনেকেই ক্যাসিনো খেলতে এসে লোভে পড়ে সারা মাসের বেতন খুইয়ে গোপনে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফেরেন।

ক্র্যাপ্স নামের গেমের সামনে ভিড় বেশি। বড় একটা টেবিলের ওপর অনেকগুলো ঘর। আগ্রহী ব্যক্তিরা পছন্দমতো ঘরে বাজি ধরেন। তিনটা লুডুর ডাইস টেবিলের ওপর ছুড়ে মারা হয়। যাঁরা বাজি ধরেন, সবাই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকেন। তারপর ডাইসগুলোতে যে যে সংখ্যা ওঠে, সে অনুযায়ী কয়েকটা ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। বাজির টাকার কেউ দ্বিগুণ, কেউ চার গুণ ফিরে পায়। কিন্তু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বেশির ভাগ বাজিগরের।
একজনকে দেখলাম একসঙ্গে দুই টেবিলে খেলছে ক্রমাগত। প্রতিবার দান ফেলার আগে খুব তীক্ষ দৃষ্টিতে গেমের স্কোর বোর্ডের দিকে তাকিয়ে নিচ্ছেন। ছোট দানগুলোতে হেরে যাচ্ছেন। বড় দানগুলোতে হারার পরিমাণ কম। হয় জিতছেন, নয়তো টাই হচ্ছে।
আরেকজনকে দেখলাম, খুবই অস্থিরভাবে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরছেন। অন্যরা যেখানে ১০, ২৫ বা বড়জোর ৫০ ডলারের বাজি ধরছেন, তিনি একেকবারে ৫০০ থেকে হাজার ডলারের বাজি ধরছেন। খুবই অবাক ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ বাজিই জিতে যাচ্ছিলেন। লোকটার এই বারবার জিতে যাওয়ার ব্যাখ্যা বের করার চেষ্টা করলাম। কী হতে পারে? মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য সাজানো নাটক? প্রতিভাবান গণিতবিদ চোরের কারসাজি? নাকি কেবলই ভাগ্য? শেষের অংশটি কেন জানি মানতে পারলাম না। প্রবাবিলিটির থিওরির হিসেবে যেখানে শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই অন্যরা হারছেন, সেখানে একজনের ওপর প্রবাবিলিটি দেবতার এতখানি সুপ্রসন্নতা স্বাভাবিক নয়।

বয়স্ক একজন মহিলাকে দেখলাম, খেলার জন্য কয়েন ফেলে পরের মুহূর্তেই উঠিয়ে ফেলছেন। খেলার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না শেষ পর্যন্ত।

খুবই মলিন পোশাকের এক বৃদ্ধকে দেখা গেল চকচকে পাঁচটা ৫০ ডলারের নোট দিয়ে কয়েন কিনতে। হয়তো বা তাঁর কয়েক সপ্তাহের খাবারের খরচ নিয়ে এসেছেন খেলতে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তাঁর খেলা লক্ষ করলাম। তাঁর উজ্জ্বল মুখ পোশাকের মতোই মলিন হতে পাঁচ মিনিটের কম সময় লেগেছিল।

সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনোর প্রচলন খুব বেশি দিন হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে সিঙ্গাপুরের অন্য সব সামাজিক সমস্যাগুলোকে ছাড়িয়ে ক্যাসিনো-সংক্রান্ত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। লোভের পরিণতিতে হতাশা, বিষণ্নতা, শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো ঘটনা অহরহই হচ্ছে। নিজেদের নাগরিকদের এই নেশা থেকে দূরে রাখার জন্য ক্যাসিনোতে তাঁদের জন্য ১০০ ডলার এন্ট্রি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবু এ থেকে উদ্ভূত নানা সমস্যার কিনারা হচ্ছে না। সিঙ্গাপুরের শত উন্নতির উদ্ভাসের ওপিঠে ক্যাসিনো একটা দগদগে সংযোজন। এর ফাঁদে যে একবার পা দিয়েছে, তার ধ্বংস অনিবার্য!

সিঙ্গাপুর

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে