Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯ , ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (32 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৪-১১-২০১৪

ভয়ঙ্কর প্রেমিকা

ভয়ঙ্কর প্রেমিকা

ঢাকা, ১১ এপ্রিল- ‘প্রথমে মিস কল দিতাম। একবার নয় একাধিকবার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই নম্বর থেকে কল ব্যাক করতো। আমি একটু কথা বলে বলতাম ‘রং নাম্বার’। লাইন কেটে দিতাম। ঘণ্টাখানেক পর আবারও মিস কল দিতাম। আবার কল ব্যাক করলে কথা বলতাম। মেয়ের গলা পেয়ে অপর প্রান্তের লোক এমনিতেই কথা বলতো। এভাবেই শুরু হতো ফোনালাপ। তারপর একদিন উনিই (ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি) আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইতো। প্রথমে রাজি হতে চাইতাম না। পরে রাজি হয়ে যেতাম। প্রথমে দেখা করতাম কোন একটি রেস্টুরেন্টে। পরে ফোনের কথোপকথন এডাল্ট বিষয়ে নিয়ে যেতাম আমি নিজেই। এরপর উনিই আমাকে কোন ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে চাইতো। কখনও কক্সবাজার বা অন্য কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইতো। আমি বলতাম, আমার খালার বাসা ফাঁকা। এলে এখানে আসেন। বাসা ফাঁকা শুনে তিনি সহজেই রাজি হয়ে যেতেন। এভাবেই আমার কাজ ছিল ফ্ল্যাট পর্যন্ত এনে দেয়া। বাকি কাজ অন্যরা করতো।’ প্রেমিকা সেজে বিত্তশালী বিভিন্ন লোকজনকে নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে এনে ব্ল্যাকমেইল এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় চক্রের সদস্য দোলা আক্তার বলছিল এসব কথা। মঙ্গলবার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল দোলা ও তার পাঁচ সহযোগীকে মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দোলার আপন খালা সালমা বেগম ও চাচা আবু তালেবও রয়েছে। তালেব-সালমা বিবাহিত দম্পতি। ভাগ্নি দোলাকে দিয়ে তারা এই প্রেম-প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

গ্রেপ্তারের পর দোলা এক প্রতিবেদকের কাছে তার এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং কিভাবে প্রেম-প্রতারণা করতো তা খুলে বলে। দোলা জানায়, তার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের ফকিরহাট থানার রাজপাট এলাকায়। পিতা আবু দাউদ শিকদার ছিলেন গার্মেন্ট কর্মকর্তা। বাবা-মায়ের সঙ্গে মিরপুরে থাকতো সে। কিন্তু বছর চারেক আগে তার বাবা এক মেয়েকে বিয়ে করে তাদের পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যান। এরপরই তাদের পরিবারে নেমে আসে অর্থনৈতিক দুর্যোগ। মা ছোটখাটো একটি চাকরি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু তা দিয়ে চলতে না পেরে শেষে ছোট ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। দোলা জানায়, সে শেওড়াপাড়ায় মামার বাসায় থেকে পড়াশোনা করে। মিরপুরের একটি স্কুল থেকে গত বছর এসএসসি পাস করেছে। বছরখানেক ধরে পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ঘোচাতে নেমে পড়ে অনৈতিক কাজে। জড়িয়ে পড়ে আপন চাচা ও খালার প্রেম-প্রতারণা করে অর্থ আদায় চক্রের সঙ্গে। এক বান্ধবীর মাধ্যমে আজহার নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আজহারের সঙ্গে তার চাচা ও খালারও পরিচয় ছিল। আজহারই তাকে এই পথে নামতে প্রলুব্ধ করে। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ জেনে সে বিপুল টাকার লোভ দেখায়। সেই লোভে পড়েই সে এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।

দোলা বলে, বিভিন্ন ব্যক্তিদের ফোন নাম্বার এনে দিতো তার চাচা আবু তালেব ও আজহার। তার কাজ ছিল শুধু ওইসব ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করা। প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের নিজের ফ্ল্যাটে এনে দিলেই তার কাজ শেষ। মধ্য পাইকপাড়ার ৩৬/২ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয় আজহার। দুই বেডরুম ও ড্রয়িং-ডাইনিংয়ের ওই বাসায় তার খালা, চাচাসহ সে নিজেও মাঝে মধ্যে থাকতো। ওই বাসায় নেয়ার পরই বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করতো তারা। দোলা বলে, একটি লোককে পটিয়ে বাসা পর্যন্ত আনতে তার সময় লাগতো সর্বোচ্চ ১৫ দিন। সর্বশেষ এক রাজনীতিককে পটিয়ে বাসায় আনার কথা স্বীকার করে সে। এর আগে এক প্রকৌশলীকেও একই কায়দায় পটিয়ে বাসায় আনে। পরে তার চাচা আবু তালেব, চক্রের নেতা আজহারসহ অন্যরা তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো। অর্থ আদায়ের পুরো বিষয়টি দেখভাল করতো আজহার। এই দুই ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করলেও তাকে দুই লাখ ও আড়াই লাখ টাকার কথা বলেছে। তার কাজের জন্য দিয়েছিল মাত্র ৪০ হাজার। টাকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রামের বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল বলেও জানায় দোলা। দোলা জানায়, আজহার তাকে বলেছিল কয়েকজন লোককে এভাবে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাসায় এনে দিতে পারলে তাকে এককালীন ১০ লাখ টাকা দেবে। ১০ লাখ টাকার কথা শুনে তার লোভ হয়। মনে মনে চিন্তা করে সে এই টাকা একসঙ্গে মায়ের হাতে তুলে দিলে তাদের আর কোন অভাব থাকবে না। এজন্যই অর্থনৈতিক কষ্ট ও লোভে পড়ে এই প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত হয় সে। দোলা জানায়, পরিবারের ভাঙন তার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে। এই সুযোগ নিয়েছে তার আপন খালা ও চাচা। তবে এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় সে।

এদিকে গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই চক্রটি এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রের পুরুষ ব্যক্তিরা প্রথমে বিত্তশালী লোকজনের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করতো। পরে ওই নাম্বারটি দেয়া হতো দোলাকে। দোলা প্রেমের অভিনয় করে লোক পটিয়ে ওই ব্যক্তিকে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতো। ফ্ল্যাটে ঢোকার পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মাথায় আবু তালেব, আজহার, মোস্তফা ও শামিম শিকদার ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে পরলো। তাদের হাতে থাকতো খেলনা পিস্তল, হ্যান্ডকাফ ও ওয়্যারলেস সেট। শামীম শিকদার নিজেকে ফটোসাংবাদিক ও অন্যরা ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল ও ভয়ভীতি দেখাতো। অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি পরিবারকে জানিয়ে দেয়া ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করতো তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ২৬ই আগস্ট এই চক্র লন্ডন প্রবাসী এক ব্যবসায়ীকে এভাবে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে ২৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। চলতি বছরের ২০শে ফেব্রুয়ারি সরকারি এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে একই কায়দায় ১৭ লাখ টাকা আদায় করে। সর্বশেষ রংপুরের এক রাজনীতিক এই চক্রের প্রেম-প্রতারণার ফাঁদে পড়েন। তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলে তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানান। পরে পুলিশ চক্রটি শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রহমত উল্লাহ চৌধুরী জানান, প্রেম-প্রতারণার ফাঁদে ফেলে চক্রটি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এই ফাঁদে পা দেয়া ব্যক্তিরা সাধারণত সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপও নিতে চায় না। এই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে তারা। এদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অপরাধ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে