Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.4/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৩-২৭-২০১৪

নীরব সাক্ষীদের অস্ফূট ক্রন্দন, বেখেয়াল সরকার

রতন বালো


নীরব সাক্ষীদের অস্ফূট ক্রন্দন, বেখেয়াল সরকার

ঢাকা, ২৭ মার্চ- বৃহস্পতিবার রাজধানীর সূত্রাপুর মালাকারটোলা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের অপারেশন সার্চলাইট নামে ২৬ মার্চের মধ্যরাতে লোহারপুরের মালাকারটোলার হিন্দু মহল্লার ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক সেনারা। এই কালরাতে ১৫ জনকে হত্যা করা হলেও তাদের স্মরণে সরকারিভাবে নেই কোনো উদ্যোগ।
 
২৬ মর্চের এই মধ্যরাতে ১৫ জনের ১৪ জনই ছিল সংখ্যালঘু। এরা হলেন- ড. হরিনাথ দে, ইন্দ্র মোহন পাল, বিল্পব কুমার দে, দুলাল চন্দ্র দে, লাল মোহণ সাহা, মণিলাল সাহা, গোলাপ চাঁন সাহা, ক্ষিতিস চন্দ্র নন্দী, প্রাণ কৃষ্ণ পাল, বিশ্বনাখ দাস (পল্টু), জীবন ঘোষ, দীনেশ চন্দ্র দাস, জীবন কৃষ্ণ দাস, রাম কৃষ্ণ দাস ও হারুণ-অর-রশীদ।
 
স্বাধীনতার ৩৯ বছর (২০১০ সালে) পর  মালাকারটোলা মোড়ে এসব শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতির ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে সূত্রাপুরের মালাকারটোলা লেনের লোহারপুলে যে বীর সন্তানেরা পাক-হানাদার বাহিনীর গুলিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মরণে এই স্মৃতির ম্যুরালটি সরকারি অনুদান ছাড়াই ১৯৭১ শহীদ স্মৃতি সংসদ তৈরি করেছে।
 
এ উপলক্ষে ২৭ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ১৯৭১ শহীদ স্মৃতি সংসদ এর পক্ষ থেকে ম্যুরালে পুস্পস্তবক অর্পণ ও বিকেলে মোমবাতি জ্বালিয়ে শহীদের আত্মার শান্তি কামনা করেন সংসদের সভাপতি বাবুল দে।  
 
এ সম্পর্কে বাবুল দে বলেন, এতো লোক এক সঙ্গে মারা গেলেও সরকারের কোনো খেয়াল নেই। তিনি শহীদ পরিবারের সদস্যদের নাম সরকারি গ্যাজেট আকারে প্রকাশ এবং সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানান।
 
গণহত্যা
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা লোহারপুল এলাকার মালাকারটোলার হিন্দু মহল্লায় আক্রমণ চালায়। এক সঙ্গে ১৫ জনকে ধরে লোহারপুরের উপর নিয়ে যায়। সবাইকে দাঁড় করিয়ে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। ঘটনাস্থলেই ১০ জনের মৃত্যু হয়। বাকি ৫ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফিরে আসেন। মরণযন্ত্রণা ভোগ করে দুই বছর পর তাদের মৃত্যু হয়।
 
গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী
সূত্রাপুরের এই গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বাবুল দে বলেন, ২৬ মার্চ সকালে পাক সেনারা আক্রমণ চালায় এবং মর্টার শেল মারে। পুরো মালাকাটোলা কেঁপে উঠে। তখন মহল্লা ছিল জনশূন্য। কোনো বাড়িতে মানুষ ছিল না। থানায় মাত্র একজন পুলিশ ছিল, তাকেও মেরে ফেলা হয়। ওইদিন বিকেলে সূত্রাপুর থানায় আর্মি ক্যাম্প করা হয়। থানার বিপেরীতে লক্ষ্মী ফার্মেসি ছিল। সেখানে বরিক পাউডার আনতে গিয়ে দেখি আর্মিরা সব ওঁৎপেতে আছে। রাতে পাক বাহিনী চিহ্নিত কিছু বাড়িতে আক্রমণ চালায়। প্রথমে ড. হরিনাথ দের বাড়িতে আক্রমণ করে।
 
পরে হরিনাথ দেসহ আরও তিনটি বাড়ি থেকে মোট ১৩ জনকে ধরে নিয়ে ২০০ গজ দূরে এক মন্দিরের সামনে জড়ো করে।  পাক সেনারা  ড. হরিনাথ দেকে সঙ্গে করে আমাদের বাড়িতে আসে। তারা আমাদের বাড়ির দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলে। তারপর সরাসরি দু’তলায় উঠে আসে। দোতলায় গিয়েই পাক সেনারা দেখতে পায় আমাদের ঠাকুরঘর। তারপর ওদের জিজ্ঞেস করে, ‘তুম হিন্দু হ্যায়?’ ঠাকুর দেখে এরা বুঝে ফেলে এরা হিন্দু।
 
এরা আমার ভাইদের ও বাবাকেসহ মোট ১৩ জনকে ধরে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে ড. হরিনাথ দেকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুম সব হিন্দু হ্যায়?’  ড. হরিনাথ দে বলেন, ‘জি হিন্দু হ্যায়’। তারপর সবাইকে লোহারপুলের সামনে নিয়ে যায়। আমার দু’ভাই বিল্পব কুমার দে খোকন ও দুলাল চন্দ্র দে দুলু ও আমার বাবা কালীপদ দে’কে জিজ্ঞেস করেন তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তখন আমার বাবা বলে ভগবানকে ডাক। তারপর লোহারপুলের সামনে দাঁড় করিয়ে ১৩ জনকে পাখির মতো গুলি করে মারে।
 
পাক সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে আমরা যখন পালানোর চেষ্টা করছিলাম তখন অনেক গুলির শব্দ পাওয়া যায়। ২৭ মার্চ ভোরে জানতে পারলাম আমার বড় দুই ভাই এবং বাবাকে গুলি করা হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় আমার বাবা ১৩ জনের মধ্যে প্রাণে বেঁচে গেলেও দু’ভাই ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে আমরা জানতে পারি, সে গুলিবৃদ্ধ আহত অবস্থায় ডা. আজিজুন নেসার বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। ডা. আজিজুন নেসা তার লোক দিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করায়। তারপর সকাল ৮টার দিকে কারফু দেয়া হয়।
 
বাবুল দে আরও বলেন, আমাদের বাড়িটি ছিল সাবেক ন্যাপের ঘাঁটি। অনেক বড় বড় নেতারা এখানে বৈঠক  করেছে। দু’বছর মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করে আমার বাবা মারা যান।
 
গণহত্যার নীরব সাক্ষী
পাক বাহিনীর গুলি থেকে বেঁচে যাওয়া পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, তার বাম গালের চোয়ালের নিচে গুলি লেগে বাম ঘাড়ের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ২৫ মার্চের পর ঢাকায় কার্ফু ছিল। দিনের বেলায় কিছুক্ষণের জন্য সান্ধ্যআইন শিথিল করা ছিল।
 
তখন আমি পূর্ব পাকিস্থান বিদুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অধীন ডিআইটি ভবনের দোতলায় অফিসে কর্মরত ছিলেন। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে অন্যান্য চাকরিজীবীর মতো ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কার্ফু শিথিল থাকায় অফিসে উপস্থিত হলাম। অবস্থার অবনতি ঘটলে আমি বাড়িতে চলে আসি। ওই দিন বিকেলে পাকিস্তানি সেনারা মালাকাটোলা আক্রমণ করবে এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনতা বেরিকেড দিয়ে সূত্রাপুর থানার পশ্চিমে তিন রাস্তার মোড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ২৭ মার্চ রাত ১০টায় মালাকারটোলার লেনে ঢুকে পড়ে তারা।
 
আগে থেকেই মালাকারটোলায় কিছু অবাঙালি স্থায়ীভাবে বসবাস করতো। সম্ভবত তারাই হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িগুলোকে চিহ্নিত করে রাখে। তাদের সহযোগিতায় পাক সেনারা সশস্ত্র অবস্থায় হিন্দু বাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে অত্যাচার চালায়। এক পর্যায়ে ২০ জন বিশিষ্ট নাগরিককে ধরে এনে বিহারীলাল জিউ বিগ্রহ মন্দিরের সামনে জড়ো করে। অন্যদের সঙ্গে আমি ও আমার ছোট ভাই বিশ্বনাথ দাসকেও ( পল্টু) এখানে নিয়ে আসে। আমাদেরকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। আমরা পাশের বাড়িতে আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয় নেই। সেখান থেকে আমাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সবাইকে এক সঙ্গে করে থানায় ও পরে লোহারপুলের ওপর এক লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখে। পুলের দক্ষিণ দিক থেকে সৈন্যরা আমাদের ওপর ব্রাশ ফায়ার চালায়। সঙ্গে সঙ্গে ৭/৮ জন পুলের উপরে লুটিয়ে পড়ে। পরক্ষণেই দ্বিতীয় দফায় ব্রাশ ফায়ার করে। দ্বিতীয়দফায় ওই আক্রমণে আমি ও আমার ছোট ভাই পুলের ঢালে লুটিয়ে পড়ি। আমার বাম গালের চোয়ালের নিচে গুলি লেগে বাম ঘারের নিচের অংশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
 
২৮ মার্চ সকালে আমাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে কিছু দিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। এপ্রিলে মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে বুড়িগঙ্গা অতিক্রম করে বহু কষ্টে গ্রাম গ্রামান্তর পার হয়ে কুমিল্লা জেলার মধ্যদিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। ১৬ ডিসেম্বের দেশ স্বাধীন হলে পরিবার পরিজনসহ আমি ঢাকায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসি। ঘটনাক্রমে বেঁচে থাকলেও আমার ছোট ভাই বিশ্বনাখ দাস (পল্টু) ২৭ মার্চ পাক সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। কিন্তু অদ্যাবধি সরকারিভাবে কোনো সহায়তা করা হয়নি। কেউ এগিয়েও আসেনি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে।
 
পাকিস্তানি সৈন্যের নির্মম নির্যাতন আর গণহত্যার নীরব সাক্ষী বেদনা রানী সাহা। তিনি জানান, ২৬ মার্চ রাতে খাবার পর আমরা সকলে ঘুমিয়ে পড়ি। রাত ১২টায় ডা. হরিনাথ দে আমার ভাসুরকে (নাম মনিলাল) ডাকে। আমার ভাসুর রেবিয়ে এসে দেখে হরিনাথ দে’র সঙ্গে ৫/৬ জন পাক সেনা। ঘর থেকে ভাসুর বের হওয়ার পর তাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। তারা জানতে চায়, আমার ভাসুররা কয় ভাই। এবং তাদের ডাকতে বললে আমার ভাসুর তার ভাই লাল মোহন সাহা, গোলাপ চাঁন সাহা ও মোহন লাল সাহাকে ডেকে ঘর থেকে বের করে। পাক সেনা তাদেরকেও নিয়ে যায়। এসময় তাদের না নেয়ার জন্য পাক সেনাদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেছি। পাক সেনারা বলে, এদের সঙ্গে আলাপ করে ছেড়ে দিব। তখন আমার কাছে টাকা চায়। কখন কী ঘটে, কোথায় চলে যেতে হয়, তাই একটা ব্যাগে ৫০/৬০ ভরি স্বর্ণ ও ৫ লাখ টাকা রেখে ব্যাগটি আলমারিতে রেখেছিলাম। ভয়ে ভয়ে আলমারির চাবি দিতে দেরি হওয়ায় সৈন্যরা বন্দুকের বাট দিয়ে আলমারির তালা ভেঙে ব্যাগ ও তাদের চার জনকে নিয়ে যায়। ওই সময় আমাদের হোটেল ছিল। সকালে হোটেলের কর্মচারীরা তাদের মৃতদেহগুলো পুলের ঢালে দেখে আমাদের বাসায় খবর দেয়। আমি দ্রুতি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি মোহন লাল সাহা ছাড়া সবাই মারা গেছে। মোহনকে এক মহিলা গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরে লুকিয়ে রেখেছিল। আমি মোহনকে আমার কাপড় দিয়ে জড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ফলে সে প্রাণ বেঁচে যায়। এর পরও ১৫ বছর বেঁচে ছিল।
 
২৬ মার্চের কালোরাত্রির অপর নীরব সাক্ষী রাধাগোবিন্দ পাল। তিনি তার চোখে দেখা পাক সেনাদের হত্যা, হামলা ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন এই প্রতিবেদকের কাছে। তিনি জানান, সেই ৬/৭জন পাক সেনা ডা. হরিনাথকে সঙ্গে নিয়ে হরিণাথের মাধম্যে আমার নাম ধরে ডাকতে থাকেন। দরজা না খুলে ভিতরের দিকে এক ঘরে আমরা আশ্রয় নেই। আমার বাবা ইন্দ্র মোহন পাল, মেঝ ভাই প্রাণকৃষ্ণ পাল এবং আমার এক বোনজামাই ক্ষিতিস চন্দ্র নন্দী আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। ডাকাডাকির শব্দে সাড়া না পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘরের দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে ফাঁকাগুলি করে। এরমধ্যে আমার বাবা, মেঝ ভাই ও ভগ্নিপতি,  আমার শিশু ছেলে রতনসহ পায়খানায় লুকিয়ে ছিলাম। পাক আর্মি টর্চ লাইটের আলোতে তাদের দেখতে পায় এবং তাদের মন্দির গেটের সামনে অন্যদের সঙ্গে একত্রিত করে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ছেলে রতন বাসায় ফিরে আসে। পাক বাহিনী চলে যাওয়ার পর আমরা ছাদ টপকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার সময় আমি ও আমার মা আহত হই। পরে লোক মারফত খবর পাওয়া গেল অন্যদের সঙ্গে আমার বাবা, ভাই ও ভগ্নিপতিকে লোহার পুলের উপর দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তখন আমরা ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে শূন্য হাতে নদীর ওপারে চলে যাই।
 
এই ভয়াবহ ঘটনার পর গত ৩৯ বছরেও সরকারিভাবে শহীদের স্বজনদের কেউ খোঁজ খবর রাখেনি। কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। ১৯৭১ শহীদ স্মৃতি সংসদ মালাকারটোলা মোরে এই প্রথম পাকবাহিনীর গুলিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মরণে একটি স্মৃতি ম্যুরাল তৈরি করা হয়।
 
২০১০ সালের ২৭ মার্চ শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় বিচারপ্রতি মো. গোলাম রাব্বানী আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। শহীদ স্বজনদের দাবি, সরকারিভাবে সাহায্য সহযোগিতা না পেলেও বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি পেলেও শহীদদের আত্মার শান্তি হবে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে