Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (104 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১৮-২০১৪

৭ই মার্চের ভাষণের পরবর্তী ভাষণ (একটি শ্রুতি নাটক) 

আকতার হোসেন


৭ই মার্চের ভাষণের পরবর্তী ভাষণ (একটি শ্রুতি নাটক) 

মঞ্চ অন্ধকার থেকে হাল্কা আলোকিত হবে। ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মঞ্চের পেছনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আর সামনের বাঁদিকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটি পোডিয়্যাম (অবিকল ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালের পোডিয়্যামের মত)। ধীর পায়ে এসে বঙ্গবন্ধু পতাকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসবেন 

হে বঙ্গ জননী, 
তুমি বলেছিলে তোমার সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জন্য একটি দিক নির্দেশনা দিতে। 
তুমি বলেছিলে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া
যশোর থেকে চট্টগ্রাম সীমান্ত নিয়ে 
একটি মানচিত্র তৈরি করতে। 
যে আদলে সেদিন আমি সেই মানচিত্র গড়ে ছিলাম তার নাম দিয়েছিলাম - বাংলাদেশ। 
হে বঙ্গ জননী তুমি-ই আমার সেই দেশ, আমার প্রিয় জন্ম ভূমি। 

হাজার হাজার বছর ধরে তোমার সন্তানেরা তোমাকে অমর করে রাখবে। 
তুমি টিকে থাকবে পৃথিবীর বুকে লাল সবুজের দেশ হয়ে। 
সাড়ে সাত কোটি বাঙালি, যারা তোমাকে মুক্ত করতে জীবন প্রাণ দিয়ে লড়াই করেছিল  তুমি তাদের আশীর্বাদ করো। 
তুমি ভুলে যেও না ত্রিশ লক্ষ বাঙালির বলিদানের কথা। 
তুমি মনে রেখো আমার মা বোনের সম্ভ্রম হারানো আত্ম-চিৎকার।
 
হে বঙ্গ জননী, 
আমাকে বার বার তুমি ডাক পাঠাও আমি যেন আর একবার এসে দেখে যাই আমার সাধের বাংলাদেশ। 
হে বঙ্গ জননী, তুমি ৭ই মার্চের মতন আর একটি ভাষণ আমাকে শুনিয়ে যেতে বল। তুমি আমকে আরো একবার গর্জে উঠতে বল বাংলার মাটিতে। 
আমি তোমার ডাক শুনে না এসে পারি না। 
আমার বাংলাদেশের কথা শুনে চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। 
তাই আজ আবারো উঠে এসেছি তোমার আদেশ রক্ষা করতে। 
আমি আসবো বলে (আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্য করে) এই দেখ তোমার সন্তানেরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। 
জানি না ৭ই মার্চের মত আর একটি ভাষণ আমি দিতে পারব কিনা। আর একবার দোলাতে পারবো কিনা টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া। 
তুমি যদি বল, না হয় আর একবার চেষ্টা করে দেখব। 
তুমি যদি হুকুম কর হে বঙ্গ জননী, আমার তর্জনী উঁচু করে আবারো না হয় ডাক দিবো -  ভাইয়েরা আমার। 

(ব্যাকগ্রাউন্ডে গান-
মুজিব বাইয়া যাও রে, নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাও ওরে, মুজিব বাইয়া যাও রে।
গান শেষ হওয়ার আগে হেটে হেটে পোডিয়্যামে এসে দাঁড়াবেন বঙ্গবন্ধু)
 
মহান সৃষ্টিকর্তা জানেন আর আপনারা জানেন, কেন সেদিন জয় বাংলা বলে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ শেষ করেছিলাম। 
সেদিন আমার সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কাছে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের থেকে বড় কোন শক্তি ছিল না। 
সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বেঁধে রাখাতে না পারলে পাহাড় সমান বিপদ থেকে উত্তরণ সম্ভব ছিল না। 
আমার ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন গরিব দুখী, হিন্দু মুসলমান, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এক কাতারে দাঁড়িয়ে, হাতে হাত রেখে, যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পরেছিল। আমি যা যা বলেছিলাম সেই ৭ই মার্চের ভাষণে, আমার বাঙ্গালি ঠিক তাই করে দেখিয়েছে। 
তারা আমার কথা রেখেছিল। 
সেক্রেটারিয়েট, 
জজকোর্ট, 
হাইকোর্ট 
সেমি-গভর্নমেন্ট, 
ওয়াপদা সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছিল। 
আমি বলেছিলাম ‘আমরা পানিতে মারবো, আমরা ভাতে মারবো’ আমার মুক্তি বাহিনী ভাইয়েরা ঠিক তাই করেছিল। 
গর্বে আমার বুক ভরে যায় এই ভেবে যে, একটি পরাধীনতার ভেতর জন্ম নিয়ে - সেই পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে, সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে যে সংগ্রামের ডাক আমি দিয়েছিলাম আমার সেই ডাকে সাড়া দিয়ে নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালিরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল ইতিহাসে তা বিরল। 
যুগে যুগে বাংলার মাটিতে রাজা বাদশাহ জমিদারি সুবেদারিদের বিরুদ্ধে অনেক বিদ্রোহ হয়েছে। 
ক্ষুদিরাম বোমা ছুড়ে মেরেছিল সুদূর ইংল্যান্ড থেকে এসে রাজত্ব করা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সূর্য সেন করেছিল ইংরেজদের হাতিয়ার লুটে নেবার মত সাহসিক কাজ। 
১৯৫২ সালে ভাষার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা রক্ত দিয়েছিল। 
১৯৬৬ অধিকার আদায় করতে গিয়ে রক্ত ঝরিয়েছিল বাংলার শ্রমিক, 
১৯৬৯ ছাত্র জনতার আত্মাহুতি ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলন। 
কিন্তু স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা এলে বাঙালির মুক্তির পথ সুগম হবে তার নেতৃত্ব আমার কাঁধে তুলে দিয়ে তোমার সন্তানেরা আমাকে যে সম্মান দিয়েছিল এবং আমার মধ্যে বঙ্গবন্ধু নামের যে শক্তি সঞ্চালন করেছিলে তা আমি মাথা পেতে নিয়েছিলাম। 

হে বঙ্গ জননী, শুধু দেশ গড়ার ডাক দিয়েই ক্ষান্ত হয়ে বসে থাকি নাই। তার জন্য তিলে তিলে সংগ্রাম করে গেছি। বিশ্ববিধাতা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন বাংলার জন্য জীবন উৎসর্গ করে যেতে, আমি তাই করে গেছি। 
১৯৪৮ সালের মার্চ এবং সেপ্টেম্বর মাসে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল  
১৯৪৯ আবারো আমাকে দেয়া হল কারাবাস। 
১৯৫০ সালে আবারো গ্রেফতার, 
১৯৫৪ সালে তারই পুনরাবৃত্তি। 
১৯৫৮ সালে গ্রেফতার তারপর মুক্তি, আবারো জেল গেট থেকে গ্রেফতার আবারো মুক্তি।
১৯৬২ ফেব্রুয়ারি মাসে আবারো সেই গ্রেফতার। 
১৯৬৪ সালে আরো একবার। 
১৯৬৬ সালে নানান অজুহাতে ৭ থেকে ৮ বার আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। 
১৯৬৯ সালে শুধু গ্রেফতারই নয় ফাঁসির দড়ি পর্যন্ত তৈরি করে রেখেছিল। 
তারপর..
১৯৭১ সালে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে আমাকে মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত করে, জেলের ভেতর কবর খুঁড়েও তারা আমাকে মারতে পারে নাই। 
কেননা - ততদিনে আমার মুক্তি পাগল বাঙালিরা দেশ স্বাধীন করে ফেলেছিল। 
আমি তখন একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি। 
একদেশের রাষ্ট্রপতিকে অন্যদেশে অন্যায় বিচার করে ফাঁসি দিতে পারে না। জীবন ভরে জুলুম অত্যাচার সহ্য করে গেছি। ঘর সংসারের মায়া ত্যাগ করে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি বাংলার গ্রাম গঞ্জে। আমার বড় ছেলে আমাকে না দেখতে দেখতে আমার চেহারা এক সময় ভুলেই গিয়েছিল। জেল থেকে একবার ছাড়া পেয়ে বাড়িতে এলে আমার বড় কন্যা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ছিল তখন কামাল এসে হাসিনাকে জিজ্ঞেস করলো, 
‘হাসু আপু আমি কি তোমার আব্বুকে একটু আব্বু ডাকতে পারি’। 
ভাইয়েরা আমার, 
একটি নতুন পতাকার স্বপ্নই দেখিয়ে বসে থাকি নাই। সেটার বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়ে গেছি। সে নেতৃত্ব এত বেগবান ছিল যে যুদ্ধের দিনগুলোতে আমি বন্দী থাকলেও আমার হাতে গঠিত সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে গেছে। 
আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন সম্ভবত আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা বা প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স বলে কিছু নেই। 
আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতাম।।
তাই কোন কাজ পরিকল্পনার বাইরে রেখে যাই নি। 
সঠিক মুহূর্তে বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বানানো যন্ত্রের সাহায্য নিয়েছিলাম এবং ইপিআর এর মাধ্যমে আমি স্বাধীনতার ডাক ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। 
পরবর্তীতে অনেক সামরিক-অসামরিক ব্যক্তিরা সেই ঘোষণা তাদের মত করে বারবার প্রচার করে গেছে। 
সীমান্ত অতিক্রম করে তাজউদ্দীন ভারতের কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী তুলেছিল তাকে যেন স্বাধীন দেশের প্রতিনিধির মর্যাদায় দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়। 
ভারত সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনী এবং ভারতের জনগণকে আমি জানাই সালাম। ভারত, সোভিয়েত রাশিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য দেশের সাহায্য আমার বাঙালিরা কোন দিন ভুলবে না। সকলের সহযোগিতা পেয়ে আমার লোকেরা ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা মাফিক যার যার জায়গা থেকে যুদ্ধ করেছে। একটি নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাধারণ মানুষের বিজয় এতো কম সময় পৃথিবীতে কেউ এনে দিতে পারে নি। একমাত্র আমার বাঙালিরা সেটা করতে পেরেছে।  
   
দেশ স্বাধীন হবার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বীকৃতি নিয়ে এসেছি দ্রুততার সাথে। এমনকি! খোদ পাকিস্তান পর্যন্ত আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। 
জাতিসংঘে গিয়ে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্ববাসীকে বলেছিলাম বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবার জন্য। আমরা যখন স্বাধীন হয়েছি তখন কেউ সে স্বাধীনতা থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না। 
জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর কাছে বলেছিলাম ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগে শোষক আর অন্য ভাগে শোষিত। আমি শোষিতের দলে’। 
পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি সৈন্য আর রাজাকার বদর বাহিনী মিলে যে ভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে মেধা শূন্য করে গেছে, সেটা কাটিয়ে উঠতে আমাদের অনেক বছর লেগে যাবে। 
সে সময় অর্থনৈতিক ভাবে যে ক্ষয়-ক্ষতি করে গেছে তার জন্য দেশ স্বাধীন হবার পর তৈরি মাল রপ্তানি করতে না পেরে পণ্য বিনিময় দিয়ে দেশের অর্থনীতি গড়তে শুরু করেছিলাম। 
সবুজ বিপ্লবের ডাক দেবার পর গোলাবারুদের গন্ধ ভরা আকাশ বাতাসে যখন ফসলের সবুজ গন্ধ ছড়াতে শুরু করলো তখনই আমকে হত্যা করা হল। 
আজ দেশের মানুষ বুঝতে পেরেছে কাদের খুশি করার জন্য আমাকে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মূল চেতনা, সংস্কৃতি, অর্থনীতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়া আমি জীবিত অবস্থায় ওদের দ্বারা সম্ভব হতো না। তাই পথের কাটা মনে করে আমাকে ওরা হত্যা করেছিল। 
আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন আমার মৃত্যুর পর দেশের মূলনীতি কি ভাবে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছিল। 
দেশের কিছু লোক বিক্রি হয়ে গেল বিদেশিদের হাতে। 
উনসত্তরের গন জোয়ারে যখন দেশ ভেসে যাচ্ছিল তখন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নিয়েছিল অনেক বড় ভূমিকা। তখন ডান বাম রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে এসেছিল বৃহত্তর ছাত্র সমাজ। তাই তারা সঠিক নেতৃত্ব দিতে পেরেছিল। অথচ আমাদের কিছু কিছু লোক এখনো সেই ছাত্র সমাজকে ছলে বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। 
তারা মানতেই চায় না বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠনগুলোর ঐতিহ্যবাহী একটা গৌরব আছে। আমি ছাত্র যুবক সমাজকে বলেছি। তোমারা বায়ান্নর ছাত্র হয়ে যাও। 
তোমারা উনসত্তরের ছাত্র হও। 
তোমারা নব্বইয়ের মত তেজি হয়ে প্রতিবাদী হও। 
তোমারা আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির শিক্ষা নিয়ে দেশবাসীর পাশে এসে দাঁড়াও। 
কবিগুরু বলেছেন – ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। 
মনে রাখ’বা তোমাদের মাথা যেন টাকা পয়সা ধন দৌলতের কাছে নত না হয়। দেশকে তার সঠিক প্রাপ্য দিতে হবে। তোমারা যদি দেশবাসীর পাশে না থাক তবে দেশ এতিম হয়ে যাবে। 
নোবেল পুরস্কার থেকে শুরু করে দেশ বিদেশে তোমারদের কর্ম সাফল্য আর মর্যাদা আমাদের সকলের বুকে আশা জাগিয়েছে। দেশের যুব সমাজ সঠিক পথে থাকলে কেউ আমাদের সাফল্য আটকে রাখতে পারবে না। তোমরা জয় বাংলাকে কণ্ঠে ধারণ করেছ, স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়েছ। রাজপথে ডেকে এনেছ জাগ্রত জনতাকে 
আমি সে জন্য তোমাদের সালাম জানাই। 
আর একটা কথা। 
আমি আওয়ামীলীগ কর্মীদের বলি, আমার নামে দালান কোঠা রাস্তা ঘাটের নামকরণ করা বন্ধ কর। আমিতো চেতনায় আছি নাই বা এলাম চোখে। মনে রাখবা, হৃদয়ের চেয়ে মজবুত দেয়াল আজো কেউ বানাতে পারে নাই। যতো দিন মানুষের হৃদয়ে ঝুলে থাকতে পারব ততদিন আমি সন্তুষ্ট। তার চেয়ে এক বিন্দু বেশি কিছু চাই না। 
এ কথা সত্যি যে তোমরা এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সব চাইতে বড় দল তবে এ’কথাও সত্যি যে তোমাদের অনেকে এখন আর আমার আদর্শ মেনে চল না। আওয়ামী বিরোধী দলের মিটিং এ হাজার হাজার লোক দেখে অনেকে বলেন দেখ দেখ, অমুক দলের কত সমর্থক। আমি বলি, ওরা সকলে সেই দলের সমর্থক না। ওদের বেশির ভাগই আওয়ামীলীগ বিরোধী। 
১৯৭৪-৭৫ সালে হাতে গোনা কিছু লোক ছিল যারা আওয়ামীলীগের রাজনীতি পছন্দ করতো না। আজ এতলোক কি কারণে আওয়ামীলীগের বিরোধী দলের হয়ে গেল? 
তোমরা আত্ম সমালোচনা করতে ভুলে গেছ। 
তোমাদের ভাল কাজে প্রচার তোমরা নিজেরাই করতে পারছ না। 
অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে বলি, আপনারা কোন একটি বিশেষ দলের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেন দেশের বিরোধিতা না করে বসেন। আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে যেন দেশের কোন শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে না বসেন। মনে রাখবেন জনগণের সাথে প্রতারণা করে পার পাবেন না। অনেক আগে বলেছিলাম, আমার দেশের মানুষ বাংলার পলি মাটির মত। একবার নরম, আবার শক্ত হলে পাথরের মত শক্ত। কাজেই বুঝে শুনে দল আর জোট করবেন। 
আমি লক্ষ্য করে দেখেছি দেশের নানান সমস্যার জন্য এক শ্রেণীর লোক এখন মুক্তি সংগ্রামকে, আমাকে এবং স্বাধীনতার যুদ্ধকে দোষারোপ করে। 
তারা বলে, নয় মাসে দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে এতো সব দুর্ভোগ। 
সব বাজে কথা। গড়ে প্রতিদিন ১২ হাজারের মত লোককে হত্যা করা হতো। 
১৬ই ডিসেম্বরে বিজয় না এসে পরের দিন ১৭ই ডিসেম্বরে বিজয় এলে আরো বারো হাজার সন্তান হারাত দেশ।
 
যে সমস্ত লোকেরা নয় মাসের যুদ্ধকে দোষ দেন তারা পৃথিবীর কোন দেশকে মডেল রাষ্ট্র ভেবে এ কথা বলেন কে জানে। 
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে পৃথিবীর এমন কোন মডেল রাষ্ট্র নাই যে রাষ্ট্র বলে দিবে কতদিনে যুদ্ধ শেষ হলে সেটা হবে আদর্শ যুদ্ধ। 
নয় মাস না ছয় মাস, দশ বসর না পনের বসর এমন নজীর কেউ দেখাতে পারবে না। বাংলার ছেলে মেয়েরা যা করেছে সেটাই বরং নজীর বিহীন ঘটনা। তাই তাদের নিয়ে পুরো জাতীর এতো অহংকার। 
বাংলার মুক্তিবাহিনী পৃথিবীতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পৃথিবীর নির্যাতিত ভাই বোনদের বলবো, আপনার আসুন, দেখুন কি ভাবে আমার দেশের মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল আর কি ভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে লড়াই করে গেছি। 
আপনারা আসুন দেখুন এবং আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে মুক্তির লক্ষে ঝাঁপিয়ে পরুন। তারপর দেখবেন জয় আপনাদের নিশ্চিত। আমরা পেরেছি আপনারাও পারবেন। 

মুক্ত বাহিনীর ভাইয়েরা, তোমার আমার সালাম গ্রহণ কর।
বাংলার বীরাঙ্গনা মা বোনেরা, তোমারা আমার সালাম গ্রহণ কর। 
সালাম গ্রহণ কর বাংলার জনসাধারণ, শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী পেশাজীবী, পুলিশ মিলিটারি, জেলে-চাষি, ক্ষেত-মজুর, ব্যবসায়ী।  
সালাম গ্রহণ কর আমার দেশের মেহনতি মানুষ। 
আমি সালাম জানাই দেশের সব জাতি গোষ্ঠী ধর্ম বর্ণ গোত্রের লোকদের। তোমারা সকলে আমার সালাম গ্রহণ কর। 
নেতা হিসাবে নয়, জাতীর পিতা হিসাবে নয় একজন সাধারণ বাঙালি হিসাবে তোমাদের জানাই আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। 
দেশের উন্নয়নের জন্য, একটি সোনার বাংলার জন্য তোমারা প্রতিনিয়ত যে কষ্ট করে যাচ্ছ তার জন্য তোমাদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। 
যে সমস্ত দুঃখ দুর্দশা হতাশা দুর্ভোগ দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে তোমরা দিন অতিবাহিত করছ ইনশাল্লাহ তাঁর সব কিছু দূর হয়ে যাবে। 
তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকল মুক্তিযুদ্ধের বীর-গাথাকে কেউ যেন অসম্মান না করে। তোমরা সেদিকে খেয়াল রাখবা। মনে রাখবা, শক্রর এজেন্টরা এখনো আমাদের মধ্যে ছদ্মবেশে বসে আছে। কোন ভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে দিবে না। যে জাতি তাঁর বীরদের সম্মান করতে পারে না সে জাতিকে কেউ সমীহ করে না। 
কবি বলেছিলেন ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ - আমি বলতে চাই, আমার মুক্তিযোদ্ধাদের মত এমন বীর যোদ্ধা কোথাও খুঁজে পাবে নাকো কেউ। 

ব্যাকগ্রাউন্ডে গান: 
যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা। দে না তোরা দে না সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দে না। 

ভাইয়েরা আমার। একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে যাই।
১৯৫৫ সাল। তারিখ ২৫ আগস্ট। 
করাচীর গন পরিষদ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে আমি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম।
‘জনাব, আপনি দেখবেন ওরা পূর্ব বাংলার বদলে বারবার পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি ব্যবহার করবে। আমরা দাবী করে আসছি আপনারা পূর্ব পাকিস্তান না বলে বলবেন পূর্ব বাংলা। কেননা বাংলা কথাটার সাথে একটা ইতিহাস আছে, আছে একটা ঐতিহ্য। আমদের সাথে কথা না বলে আপনারা সেটা বদলাতে পারেন না’। 
তারপর, 
১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের ডাকা একটি সর্বদলীয় সম্মেলনে আমি ছয়-দফাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চাহিদাগুলো মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাই এবং-
তা প্রত্যাখ্যাত হলে ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় আমি স্পষ্ট করে ঘোষণা দিলাম; 
এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে "বাংলাদেশ" নামে অভিহিত করা হবে:
তারপর। 
তারপরের ইতিহাস আপনারা জানেন। ইলেকশনে মেজরিটি সংখ্যক সিটে জয় লাভ করেও, এমনকি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের মুখে উচ্চারিত আমাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বলার পরও আমারা বাঙালিরা সরকার গঠন করতে পারলাম না। 
এলো ৭ই মার্চ। 
আমি সেই ৭ই মার্চের বক্তৃতায় বললাম; ‘আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই আমাদের বুকের উপর চালিয়েছ গুলি’ ... 
ভাইয়েরা আমার, 
কি বলেছিলাম, লক্ষ্য করে দেখবেন আমি বলেছিলাম ‘আমরা বাঙালিরা’। 
হ্যাঁ আমি বাঙালির পক্ষেই কথা বলেছি। 
কেননা ততদিনে আমি সমস্ত বাঙালিকে একই সুতোয় বেঁধে একই পরিচয়ে গেঁথে দিয়েছিলাম। সেদিন আমরা সবাই বাঙালি হয়ে গিয়েছিলাম যার জন্য পাকিস্তানিরা কাউকে হত্যা করার আগে নিশ্চিত হতো এই বলে, তুমি কি বাঙালি, জয় বাংলা কি তোমার শ্লোগান?
তারপর, সেই ভাষণে বারবার বাংলার অধিকারের কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, 
‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, 
বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, 
বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’ ... আরো বলেছিলাম, 
‘আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বৎসরের করুন ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, 
বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস’। 
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বসবাস করেও সেই ৭ই মার্চের বক্তৃতাতে বলেছিলাম, ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই, 
আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট কাচারি আদালত ফৌজদারি, 
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে’। 
এখানেই শেষ নয়, আরো বলেছিলাম- ‘যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হল’। 
একজন বিবেকবান মানুষ মাত্রই বোঝার কথা ঠিক তখনই দাঁড়িয়ে গেল সরকারের বিরুদ্ধে আর এক সরকার। 
দেশের বিরুদ্ধে আর একটি দেশ। 
আমি ইয়াহিয়া খানকে বলেছিলাম, ‘আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। দেখে যান কি ভাব আমার গরীবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলি করে হয়েছে’। 
তাক সম্বোধন করেছিলাম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আর অন্য দিকে বলেছিলাম আমার বাংলার মানুষের উপর গুলি করা হয়েছে। 
৭ই মার্চের ভাষণেই দুটো আলাদা রাষ্ট্রের ঘোষণা এসেছিল এবং সেই জন্য ভাষণের প্রথমেই বলেছিলাম ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়’। 
আপনাদের মনে থাকার কথা আমি বলেছিলাম, ‘শুধু বাংলা নয়, আমি পাকিস্তানের মেজরিটির পার্টির নেতা’। এখানেও দুটি সত্ত্বাকে ঘোষণা করা হয়েছে। 
বাংলা এবং পাকিস্তান।
বাংলার অস্তিত্ব বজায় রেখেই সেদিন সব কথা বলেছিলাম। শুধু তাই নয় আমি এও বলেছিলাম দরকার হলে- ‘জীবনের তরে রাস্তা ঘাট বন্ধ করে দিতে হবে’। 
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি দেশের বিরুদ্ধে দেশ দাঁড় করিয়েছিলাম। 
দেশের সামরিক বাহিনীর হেড কোয়াটারের পরিকল্পনা আন্দাজ করতে পেরে তাদেরকে শত্রু বলে চিহ্নিত করেছিলাম। 
বলেছিলাম, ‘শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’। 
মানে শত্রুর কাজ শত্রু করবে তবে আর বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেয়া হবে না। 
তাদের সব আগ্রাসন বাংলার মানুষকে মোকাবেলা করতে হবে। 
তাই বলে- আমি বিদ্রোহী ছিলাম না। আমি পদ্ধতিগত সংগ্রামে বিশ্বাসী ছিলাম। ডিসিপ্লিনের বাইরে আমি কখনও যাই নাই। 
তাইতো আমি এও বলেছিলাম ‘কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে, আর সে যদি সংখ্যায় একজনও হয় আমরা তার দাবি মেনে নিব’।
অনেকে বলেন, বলে আমাকে দোষ দেন, ৭ই মার্চেই কেন আমি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করি নাই। দেশের লোকজন নাকি সেদিনই আমার মুখ থেকে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে চেয়েছিল। যারা আমার সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর রাখে না শুধু তারাই ঐ সমস্ত কথা বলতে পারেন। সারা জীবন আমি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর শ্রদ্ধাশীল থেকেছি। আমি পারি না হঠাৎ করে বিদ্রোহী হয়ে যেতে। আমি কোন অপরিচিত নেতা ছিলাম না। বিশ্ব নেতারা তখন আমার প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল। একজন সাধারণ সৈনিকের মত বন্দুক উঠিয়ে আমি বলতে পারি না আমি বিদ্রোহ করে বসলাম। আমি কোন রেজিমেন্টের কিংবা ব্রিগেডের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম না। সাড়ে সাত কোটি মানুষের একটা জাতির পুরো দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে। বিদ্রোহের সময় যে ঘনিয়ে এসেছিল সেটা বুজতে পেরে আমি বলেছিলাম যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে তৈরি থাকতে। 
আর, রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও নিয়ম নীতি মেনে সাথে সাথে পাকিস্তানি মিলিটারিদের শেষ ওয়ার্নিংও দিয়েছিলাম। কি ছিল সেই শেষ ওয়ার্নিং বা আল্টিমেটাম? 
সেই আল্টিমেটাম ছিল– ‘আর যদি একটা গুলি চলে’। বহু গুলি চালিয়েছ আমাদের উপর, আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করবে না। 
একটাও না। 
ভালো হবে না। 
বলেছিলাম আর যদি একটা গুলি চলে সাত কোটি মানুষকে দাবায় রাখতে পারবা না। 
চোরায় না শুনে ধর্মের কাহিনী। শুধু কি একটা গুলি! রাতের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা বাঙালিদের একটা না, দুইটা না মেশিনগান মর্টার কামানের গুলিতে বুক ঝাঁজরা করে দিয়েছিল। 
রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়াটার, ই পি আর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট সৈনিকদের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী সহ নিরীহ জনসাধারণকে মেরে লাশের স্তূপ বানিয়ে ফেলেছিল। 
বলেছিলাম একটাও গুলি না চালাতে। 
খুব বড় ভুল করে বসল তারা। তাদের এই ভুল সিদ্ধান্তের ফলে এবং আমার বেঁধে দেয়া সীমানা অতিক্রম করার জন্য তখন থেকেই পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে- সরকারের বিরুদ্ধে সরকার, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বাস্তবায়ন হয়ে গেল। 
আমি জানতাম না, জালেম হলেও পাকিস্তানি মিলিটারিরা এতো বড় অমানবিক কাণ্ড ঘটাতে পারে। 
রক্তপাত যেন না হয় তার জন্য আমার একটা পরিকল্পন ছিল। আপনার লক্ষ্য করে দেখবেন প্রতিটি আওয়ামীলীগ নেতাকে আমি আত্মগোপন করে যেতে বলেছিলাম। আমার সব এম এন এ, এম পি পি পরিকল্পনা মাফিক নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল। শুধু হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া। আমি ভেবেছিলাম শত্রু মনে করলেও রাজনীতির নিয়মনীতি মেনে চলবে পাকিস্তানী মিলিটারি সরকার। তারা সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করবে না কিংবা জাতিগত লড়াইয়ে জড়াবে না। খুব বেশি হলে আমার ও আমার দলের কিছু লোককে তারা গ্রেফতার করবে, জেলে পুরে রাখবে। হয়তো আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে। তাই আমি আমার দলের লোকদের প্রথমে বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে এবং সেটা ব্যর্থ হলে ভারতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার গঠন করার কথা বলেছিলাম। 
এদিকে আমি প্রস্তুত হয়ে বসেছিলাম যেন আমাকে এসে ওরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। আমার গ্রেফতার হবে আই ওয়াস। এই পরিকল্পনা মতে জীবন হারাতে হলে একমাত্র আমার জীবনই যাবার কথা ছিল। তাই আমি বলেছিলাম, ‘আমি যদি হুকুম দিতে না পারি তোমরা জীবনের তরে রাস্তা ঘাট বন্ধ করে দিবে’। ঘরে ঘরে দুর্গ বানিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। একবার শুরু হয়ে গেলে পৃথিবীর কোন শক্তির পক্ষে দেশের ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ থামানো সম্ভব না। 
কিন্তু অপারেশন সার্চ লাইট নামে ওরা যে তাণ্ডব শুরু করে দিবে তা আমার জানা ছিল না। তাদের চোখে তখন বাঙালি মানেই শেখ মুজিবুর রহমানের লোক হয়ে গিয়েছিল, তাই যখন যাকে যেখানে পেয়েছে তাকেই শেখ মুজিবুরের লোক মনে করে মেরে ফেলেছে। একথা সত্য, বিনা রক্তপাতে পরাধীন দেশ স্বাধীনতা লাভ করতে পারে না। বিশেষ করে কোন জুলুম শাহীর হাত থেকে। তাই বাংলা মায়ের এক গর্বিত সন্তান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একদা বলেছিলেন ‘আমাকে রক্ত দাও আমি স্বাধীনতা এনে দিব’ 
তখন নেতাজীর ডাকে ভারতবাসী সাড়া দিলে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস কি ভাবে লেখা হত কে জানে। তবে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আমার সেই ডাক – ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ’, সেই ডাকে বাংলার মানুষ সাড়া দিয়েছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন। 
(ব্যাকগ্রাউন্ডে গান)
শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ স্বরের ধ্বনি। আকাশে বাতাসে ওঠে রণি। বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।
সেই থেকে মুক্তি মুক্তি করে ছুটছে দেশ। সেই থেকে বাংলার আকাশ বাতাসে কেঁপে উঠছে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। সেই থেকে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মায়েরা বোনেরা - সুতো দিয়ে বুনে যাচ্ছে স্বাধীনতার পতাকা। 

দেশ যতদিন থাকবে ততদিন সরকার আসবে সরকার যাবে। তারাই আস্তে আস্তে দেশ গড়বে। জনগণ তাদের ভাল কাজে সমর্থন দেবে। খারাপ করলে সরকারের বিরুদ্ধে ভোটাধিকার ব্যবহার করবে। 
তিন বছরের মাথায় আমাকে হত্যা করে দেশ পরিচালনার ব্যর্থতার দায় ভার আমার উপর চাপানো ঠিক কি বেঠিক তা দেশের জনগণই বিচার করবে। 
একটা কথা আমি স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, আজ বাংলাদেশে যে বিদ্যুতের অভাব, আজ বাংলাদেশে গ্যাস-পানির অভাব। প্রবাসী বাঙ্গালিদের কষ্ট অর্জিত টাকা চোরেরা নিজেদের ব্যাংক একাউন্টে পুরে রাখছে। সরকারি আমলারা দুর্নীতি করে দেশটাকে বিশ্ব দরবারে হেয় করে দিচ্ছে। কিছু কিছু জিনিষ পত্রের দাম ধরা ছোঁয়ার বাইরে, অনেক ব্যবসায়ী শ্রমিকদের ঠিক মত মজুরি দিচ্ছেন না। দালাল আর ফড়িয়াদের জন্য কৃষক তাঁর ন্যায্য মজুরি থেকে এখনো বঞ্চিত হচ্ছে। সমতা আর সম ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি পরিলক্ষিত হচ্ছে না, তার জন্য স্বাধীনতার কি দোষ! 
আমি লক্ষ্য করেছি আজকাল একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে কোন খাবার টেবিলে, বিয়ের আসরে, চা কিংবা গানের মজলিশে দেশের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি জিনিস নিয়ে আলোচনা শুরু করে ব্যর্থতার সমস্ত দোষ চাপানো হয় আমার ত্রিশ লক্ষ শহিদের উপর। 
যে মা বোনেরা অমানুষিক অত্যাচারের স্বীকার হয়েছিল তাদের উপর। 
সাড়ে সাত কোটি সাধারণ মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করেছিল তার উপর। 
দোষ দেয়া হয় আমকে। আমি নাকি সব নাটের গুরু। 
আমি আবারো পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই। 
এই বাংলায় হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান, বাঙ্গালি নন-বাঙ্গালি সবাই আমার ভাই দেখ, আমাদের যেন বদনাম না হয়। 
আমি আবারো বলি, প্রত্যেক ঘরে ঘরে ৭১এর চেতনাকে জাগ্রত কর। তোমাদের নিজ নিজ অধিকার আদায়ে সংকল্পবদ্ধ হও। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছ, রক্তের বিনিময়ে যখন বাংলাদেশ অর্জন করেছো তখন কেউ তোমাদের দাবাতে পারবে না। 
যে কটা বছর উল্টো রাজনীতির পথে তোমাদের হাটতে হয়েছে সেখান থেকে বেড়িয়ে এসো। তোমাদের জন্য সঠিক পথ হল ধর্ম নিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্র। 
প্রিয় দেশ বাসি, আসুন আর একবার চেষ্টা করে দেখি বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশটার মুক্তি এনে দিতে পারি কি না? 
যে স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক আমি দিয়েছিলাম অনেক প্রাণের বিনিময়ে সেই স্বাধীনতা আমদের অর্জিত হয়েছে। একই সাথে যে মুক্তি সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলাম তার জন্য এখন আর কোন জীবন দিতে হবে না, অস্ত্র হাতে যুদ্ধও করতে হবে না। শুধু আপনাদের সৎ ভাবে চলতে হবে। দেশটা যে কারো একার নয় সে কথা মনে রাখতে হবে। 
ধর্ম - সমাজ - বিদ্যা  - বুদ্ধি আপনাদের যে শিক্ষা দিয়েছে সেই সততার সাথে দেশ পরিচালনার কাজ করে যেতে হবে। 
মনে করতে হবে বাংলাদেশের নাগরিকেরা একটি বৃহৎ পরিবারের সদস্য। সবার জন্য সকলে আমরা সেই নীতি নিয়ে চলতে হবে। দয়া করে কেউ আমার মুক্তিবাহিনীর প্রতি চোখ রাঙাবেন না। মনে রাখবেন শহীদ মিনারের প্রতিটি ইট রক্ত দিয়ে গড়া, কোন ভাবেই তার বেইজ্জতি সহ্য করা হবে না।  

প্রিয় দেশবাসী, আমি আপনাদের সামনে আবারো হাজির হয়ে প্রমাণ করে গেলাম বাংলার মানুষের প্রয়োজনে আমাকে যতবার আসতে হবে আমি ততবার আসবো। আপনারা আমার  ৭ই মার্চের ভাষণ গুরুত্বের সাথে শুনে দেখবেন আর একটা ভাষণের সময় এখনো হয়েছে কিনা। যদি তাই হয়ে থাকে আমাকে খুঁজে পেতে আপনাদের তো কষ্ট হবার কথা না। আমার ঠিকানা সবারই জানা।

ব্যাকগ্রাউন্ডে স্লোগান:
তোমার আমার ঠিকানা। পদ্মা মেঘনা যমুনা (২)। জয় বাংলা, জয় বাংলা। 

যে ভালবাসা আপনারা আমকে দিয়েছেন। আমি জীবন দিয়ে তার ঋণ শোধ করে গেছি। স্বাধীন দেশে আমারই হাতে গড়া বাঙালি সেনাবাহিনীরা আমাকে হত্যা করবে তা কখনো কল্পনা করি নাই। পাকিস্তানীদের আমি বলেছিলাম আমার জন্য তোমরা কবর খুদে ফেলছ। আমি তোমাদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাই না। শুধু অনুরোধ করি আমার লাশটা বাংলার মাটিতে ফিরিয়ে দিও। 
যেদিন দেশের বিরুদ্ধে দেশ, সরকারের বিরুদ্ধে সরকার দাঁড় করিয়ে ছিলাম এবং জাতীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলাম তখনই হয়তো আমার মৃত্যুদণ্ড লেখা হয়ে গিয়েছিল। 
কিন্তু সেই কাজ করতে আমার দেশের কাউকে ভাড়া করতে পারবে তা আমি বিশ্বাস করতাম না। 
শেখ মুজিবের হত্যার ষড়যন্ত্র বুঝতে কাউকে মহা পণ্ডিত হতে হবে না। 
প্রথমে চাল ডালের দাম বেড়ে যাওয়ার ওজুহাতে বছর যেতে না যেতে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বেসামরিক অস্ত্রধারী বাহিনী বানানো হল। 
লাল বাহিনী, গন বাহিনীর নামে দেশের আনাচে-কানাচে সশস্ত্র বাহিনী বানিয়ে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হল। 
পাকিস্তান শাসনের ২৩ বৎসরের ইতিহাসই শুধু বঞ্চনার ইতিহাস ছিলা না। তারও আগে থেকে ইংরেজ, মুঘল, পর্তুগীজ, মগ বর্গিরা এসে গরীবের সম্পদ লুটে পুটে নিয়ে গেছে। যুগে যুগে যদি আমাদের সম্পদ লুটে নেয়া না হবে তবে তো অন্ন চাই বস্ত্র চাই বাঁচার মতো বাঁচতে চাই শ্লোগানের কোন প্রশ্ন উঠত না। কিছু ছিল না বলেই তো আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে গেছি। অথচ আমাকে তিন বৎসর সময়ও দেয়া হল না। হাজার বৎসরের বঞ্চনা পুষিয়ে দিতে আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় দেয়া হলে চেষ্টা করে দেখতাম বাংলার মানুষের ভাগ্য ফেরাতে পারতাম কি না। 

আর একটা কথা, গণতন্ত্র আমি রুদ্ধ করি নাই। আপনারা জানেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল আমেরিকা, চীন, মিডল ইস্টের রাষ্ট্র সমূহ সহ পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশের সরকার। 
সেই সময় আমেরিকার বিরুদ্ধে থেকে, চিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব ছিল না। 
ষড়যন্ত্র কতো গভীর ছিল খেয়াল করে দেখবেন। আমেরিকার কিসিঞ্জার পশ্চিমা দেশগুলোকে বলেছিল পাকিস্তানকে সাহায্য করে যেতে। এই লোকটার কারণেই আমাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল বিশ্বের অনেক দেশের সরকার। যুদ্ধ শেষ হবে হবে করেছে। চারিদিকে যখন মুক্তিবাহিনী এবং ভারতের মিত্র বাহিনী পাকিস্তানীদের নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে তখন এই লোক সেভেন ফ্লিটের মত যুদ্ধ জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে পাকিস্তানিদের শেষ রক্ষা করতে চেয়েছিল। 
১৬ ই ডিসেম্বরে বিজয় এসে যাওয়াতে তার সেভেন ফ্লিট যুদ্ধ জাহাজ বঙ্গোপসাগরে ঠুকতে না পেরে ফিরে গিয়েছিল। 
নয় মাসে দেশ স্বাধীন হওয়াতে তাই কারা খুশি হতে পারে নাই এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। 
কজন লোক এমন করে ভাবেন যে ১৯৭১ সালে বাঙালিরা মাত্র ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলে বসে চিন আমেরিকা মিডল ইস্টের দেশগুলো এবং একই সাথে পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। 
পাকিস্তানের তখন মুরুব্বি দেশ ছিল আমেরিকা আর তারই মোড়ল ছিল হেনরি কিসিঞ্জার। তাই বাঙালিদের কাছে পরাজয়ের কলঙ্ক আমেরিকার কিসিঞ্জারকে পাগল করে দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে হেনরি কিসিঞ্জার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য একবার ঢাকায় এসে একটা ডিপ্লোম্যাটিক বোমা মেরে চলে গেল। 
সে বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিল, আমি তাকে মানা করতে পারি নাই। কেননা স্বাধীনতার পর আমেরিকার সাহায্য আমার জন্য দরকার ছিল। 
অথচ মিঃ কিসিঞ্জার ঢাকায় এসে কোন কাগজ পত্র না দেখে, আমাদের কারো সাথে কোন তথ্য বিনিময় না করে অতিথি ভবনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চলে যাবার সময় এয়ারপোর্টে সাংবাদিকদের বলে গেলেন 
“বাংলাদেশ ইজ এ বটম লেস বাস্কেট” অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি তলা বিহীন ঝুড়ি। 
এই নতুন দেশটাকে যে যা কিছু সাহায্য দিবে সব গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পরে যাবে। 
মানে, কেউ যেন বাংলাদেশকে কোন সাহায্য না দেয় তার ইংগিত তিনি দিয়ে গেলেন। 

লক্ষ্য করে দেখবেন, তিনি কিন্তু বলেন নি শেখ মুজিবের সরকার বটম লেস বাস্কেট। অথবা বলেন নি গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ ইজ এ বটম লেস বাস্কেট। 
তিনি কি বলে গেলেন? 
তিনি বলে গেলেন ‘বাংলাদেশ ইজ এ বটম লেস বাস্কেট’। 
গোটা বাংলাদেশ তাঁর চোখের বিষ হয়ে গিয়েছিল। তাই তাঁর ইশারা মত বন্ধ হয়ে গেল সাহায্য সহযোগিতার সব আশা ভরসা। 
মিস্টার কিসিঞ্জার চীনের সাথে আঁতাত করে, পশ্চিমা দেশগুলোকে নিরপেক্ষ রেখে, মিডল ইস্টের মুসলিম দেশগুলির সাহায্য নিয়ে এবং বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সামরিক শক্তি হয়েও বাংলার মুক্তিবাহিনীর হাতে পরাজয় এড়াতে পারেন নাই। সেই প্রতিশোধ নিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দিয়ে। 
শুধু তাই নয়, মুক্তি সংগ্রামের চেতনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপশক্তির হাত শক্ত করে দিয়েছেন তিনি। নিজেদের পছন্দ মত লোক বসিয়ে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত লুটতে শুরু করেছিল। আজো তাই কিসিঞ্জার ভক্তরা প্রভুর সেই উক্তিকে টেনে এনে বলে বাংলাদেশ এখন আর বটম লেস বাস্কেট না। 
ভাইয়েরা আমার। দেশের শক্র চিনতে ভুল করবেন না। বাংলাদেশ যতোই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাইবে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার শক্তি ততোই দেশকে পেছনের দিকে টেনে রাখবে। 
আজ দেখেন যেই আমেরিকা প্লেন থেকে বোমা মারার জন্য যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছিল সেই আমেরিকা বাংলাদেশের গার্মেন্টসের পিছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 
এক সময় আমার দেশের তরুণ সমাজের স্বপ্ন ছিল সিঙ্গাপুরের তৈরি একটা সার্ট গেঞ্জি পরা। এখন সেই সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি হয়। 
এক সময় দুটি ফসল করার জন্য দেশবাসীকে আমি আহ্বান জানিয়েছিলাম। আজ দেশর কৃষি উন্নয়নে বিদেশিদের হিসাবের মান দণ্ড বদলে গেছে।
আজ শিক্ষার মান ও হার দিনকে দিন উন্নত হচ্ছে। শিশু মৃত্যু হার কমে গেছে, মানুষের আয়ু বেড়েছে। দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। সম্পদের হিসাবে অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।
বাঙালিরা ভাল সৈনিক হতে পারে না, তাদের স্বাস্থ্য ভাল না, তারা লম্বায় খাটো বলে পাকিস্তানি সেনা হেড কোয়াটারের যে মতবাদ ছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণ করে বাঙালিরা আজ জাতিসংঘের অন্যতম সেনা বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়ে বিদেশের মাটিতে শান্তি রক্ষার কাজ করে যাচ্ছে। 
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালিদের সুপ্ত প্রতিভা জাগতে শুরু করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের গন প্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছে বাঙালিরা, তাঁরা পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে। 
দেশের ছেলে মেয়েরা এখন বিশ্ব কাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে।  অপেক্ষা করেন, দেখবেন ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ছুটি দিবস হবে। 
হিমালয়ের চুড়ায় এখন বাংলাদেশের পতাকা। কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না। বাঙালিরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ইনশাল্লাহ। শুধু রোল মডেলই নয় অনেকের ভরসা হয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

আজকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে যে উন্নতি দেখা দিয়েছে এই দিনটি দেখার জন্য আমাকে একের পর এক পদ্ধতি ও পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছিল। 
একবার পার্লামেন্টারি পদ্ধতি, একবার প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি। তাতে কোন লাভ না হওয়াতে শেষে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে দেখলাম। কাতারে কাতার মিলিয়ে সকলে এক সাথে যুদ্ধ না করলে যে দেশ স্বাধীন করা যেত না। সে দেশ কি শুধু আওয়ামীলীগের মন্ত্রী মিনিস্টার দিয়ে গড়া সম্ভব? 
সিদ্ধান্ত নিলাম সকলকে সাথে নিয়ে দেশ গড়ার আর একটা চেষ্টা করে দেখব। নিজ হাতে তিলে তিলে গড়া দল আওয়ামীলীগকে ভেঙ্গে দিলাম। বললাম আমার দল তোমার দল বলে কোন কিছু থাকবে না। সব দল নিয়ে একটা দল হবে। যার নাম দিলাম ‘বাকশাল’। 
সে ছিল আর একটি প্রচেষ্টা। 
আপনার হয়তো জানেন ‘বাকশাল’ কোন রাজনৈতিক দল ছিল না। 
তাকে বলেছিলাম রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। 
সেখানে শিক্ষক ছিল সদস্য, সরকারি আমলারাও সদস্য, এমনকি দেশের সামরিক বাহিনী, যারা কদিন আগে মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে তাদেরকেও শরিক করলাম। আপনারা ভুলে যাবেন না, 
দেশে তখন নেতৃত্বের অভাব ছিল না। কটা দিন সময় পেলে দেশের সকল নেতাদের এক কাতারে নিয়ে আসতে পারতাম। 
কিন্তু সবাই বাঙালি হয়ে থাকুক, সবাই এক প্লাটফর্মে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি করুক সেটা অনেকে চাইলো না। 
দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থায়, দুর্বল প্রশাসন এবং বহু মাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত দেশে বহু দলীয় ব্যবস্থায় এক দলের সাথে অন্য দলের শত্রুতা এবং বিরোধ বাঁধিয়ে দেয়া সহজ কিন্তু সবাই এক দলের সদস্য হয়ে থাকলে বড় কোন বিভেদ বা বিরোধ ঘটানো সম্ভব হত না। বড় জোর ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কিছু শত্রুতা তৈরি করা সম্ভব ছিল -এই সব চিন্তাতে তারা   ‘বাকশাল’ করতে বাঁধা দিল। 
যে পরিকল্পনা আমি নিয়েছিলাম সেটা দেশকে দাঁড়া করাবার পরিকল্পনা। সেটা কোন স্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। সকলে মিলে দেশ স্বাধীন করেছে, সকলে মিলে দেশ গড়বে অর্থাৎ এক দেশ এক জাতি এক রাজনীতি, তারপর দেশের চাকা একবার ঘুরতে শুরু করলে যে ব্যবস্থা ভাল হবে সে ব্যবস্থা নেয়া যেত। 
কিন্তু বাঙালি ঐক্যবদ্ধ থাকলে যাদের ক্ষতি হবে তাঁরাই উঠে পরে লাগলো ভাঙ্গনের জন্য। আমার পদ্ধতিতে গণতন্ত্রকে ভাঙ্গা হয় নি, ভাঙ্গা হয়েছিল বহুদলীয় কোন্দলকে। একটি বৃক্ষ দাঁড়া করাবার আগেই কে গোড়া নিবে কে নিবে আগা সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সকলে মিলে কাজ করবার চিন্তা থেকেই আমি নতুন আহ্বান জানিয়েছিলাম। 
জেনারেল সফিউল্লাহ, জেনারেল জিয়াউর রহমান সবাই এসে সেই বাকশালে যোগদান করল। 
আমি বললাম আসো সবাই মিলে চেষ্টা করে দেখি বাকশালে দেশের কতটা উন্নতি হয়। কার কতোটা সাহায্য সহযোগিতা পাব তার সঠিক হিসাব নিকাশও হাতের কাছে ছিল না। তবে জানতাম বাকশাল ছিল একটি পরীক্ষা মুলুক পদ্ধতি। 
হয়তো বাকশাল দেশের জন্য ভাল কিছু নিয়ে আসতে পারতো। তাই হয়তো বাংলাদেশের শত্রুদের আর সহ্য হল না। 
সম্ভাবনার বাংলাদেশকে বিফল করে দিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে তারা দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিল। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী যে আপনারা দুষ্ট চক্রের উদ্দেশ্য ধরতে পেরে আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। স্বাধীনতার চেতনায় দেশ গড়ে যাচ্ছেন। শুধু আমি নই দেশ এবং দেশের বাইরে যেখানে যেখানে বাঙালি আছে সবাই আজ আশাবাদী। এই সময় আপনাদের সাথে থাকতে পারলে আমার মনটা ভরে যেত।

আপনারাই বলেন আমার স্ত্রীর কি অপরাধ ছিল? সেতো কোন রাজনীতি করতো না। তাকেও গুলি করে মারা হল কেন। সেতো ছিল ওদের মায়ের মতন। মায়ের বুকে কেউ গুলি ছুড়তে পারে সে কথা কল্পনা করতেও বিবেকে বাধে। 
আমার দুই পুত্র কামাল জামাল, নব বিবাহিত দুই পুত্রবধূ সুলতানা ও রোজী, যাদের হাতে তখনো ছিল বিয়ের মেহেদি। তাদেরকেও হত্যা করা হল। 
আমার ছোট ভাই নাসের এসেছিল খুলনা থেকে বেড়াতে তাকেও ওরা মেরে ফেললো। আরো মেরে ফেললো আমার অনুগত পুলিশ ও সেনা অফিসারকে, মারল আমার অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের। শুধু বিদেশে ছিল বলে হাসিনা রেহানা বেঁচে গেল। 
আমার ছোট ছেলে রাসেলের বয়স তখন মাত্র নয় বছর। ওর সামনে আমাদের সকলকে একের পর এক হত্যা করল। হত্যাকারীদের সামনে ভয়ে মাথা নিচু করে না কেঁদে কি আর করতে পারতো অতটুকু নিষ্পাপ শিশু। 
একজন সৈনিক হাতিয়ার উঁচিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল এই, তুমি কাঁদছ কেন, কি চাও তুমি। বলেন তো দেখি একটা নয় বৎসরের শিশু ভয় পেলে সে কি বলতে পারে। হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন, 
আমার শিশু রাসেলও তাই বলেছিল। ‘আমি মায়ের কাছে যাব”।
আপনারা সবই জানেন, 
তখন একজন মেজর ওই সেপাইকে নির্দেশ দেয় রাসকেলকে ওর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে। 
মেজরের ইশারাটা সেপাই বুজতে পারে। 
রাসেলের মা অর্থাৎ আমার প্রিয়তমা পত্নী তখনো তার রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ফ্লোরের উপর নিথর হয়ে পরে আছে। 
হাত ধরে রাসেলকে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে আমার লাশের উপর দিয়ে নিয়ে গেল তার মায়ের লাশের পাশে..., 
আপনারা সবই জানেন ও বুঝেন, 
রাসেলকে ওর মায়ের পাশে দাঁড় করিয়ে বন্দুকে উঁচিয়ে কতক্ষণ ভয় দেখিয়ে... 
আপনার সবই জানেন ও বুঝেন...। 
যে শিশুর পিতার দেহ সিঁড়িতে রক্তাক্ত হয়ে পরে আছে 
যার বড় দুটো ভাই আর বেঁচে নেই। 
যার জন্মদাত্রী মাতা ওভাবে ফ্লোরের উপর, 
না, তবুও ওরা শিশু রাসেলকে প্রাণ ভিক্ষা দিল না। 
মাগো... বলে চিৎকার দিয়েছিল আমার রাসেল। 
যদি শরীরে একটু শক্তি সঞ্চয় করতে পারতাম, যদি একবার হেটে যেতে পারতাম আমার শিশু সন্তানটির কাছে তবে তাকে গিয়ে বলতাম, বাবা তুমি কি একটা ছবি আঁকবে? তোমাকে কিছু কাগজ কলম এনে দেই। সাদা ক্যানভাসে লাল সবুজ পতাকা সে খুব ভাল আঁকতে পারতো। তাই এখনো লাল সবুজের পতাকা দেখলে আমার রাসেলের কথা মনে পড়ে। 
হে বঙ্গ জননী, তুমি সুখে থাক তোমার সন্তানদের নিয়ে। 
তাদের বলে দিও অবিরাম লাল সবুজের উপর হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছবি আঁকার অভ্যাস করতে। 
দেখবে, একদিন এই পতাকা সব চাইতে উজ্জ্বল পতাকা হয়ে উড়বে বিশ্বময়। 
আমি তখন রাসেলের হাত ধরে সকলের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইব আমার সেই ভালোলাগা গান। 
আমি জানি যে গান শুনে, কণ্ঠে কণ্ঠ না মিলিয়ে কেউ চুপচাপ বসে থাকতে পারবেনা। যে গান বুকে ধারণ করতে না পারলে কেউ বাঙালি হতে পারবে না। আসুন, আজ যখন আমরা সমবেত হয়েছি, আমাদের ত্রিশ লক্ষ শহীদদের কথা স্মরণ করে জননী জন্মভূমির জন্য অমর গানটি কণ্ঠে তুলে নেই। জয় বাংলা। 

(মনে হবে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী অদৃশ্য রাসেল এসে চেপে ধরেছে। তাই সে হাতটা রাসেলের অবস্থান বরাবর উঁচু হয়ে সামান্য দুলতে থাকবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান হবে, আশা করা যায় সাথে দর্শকবৃন্দও গাইতে থাকবে)
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।
ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে— ওমা, অঘ্রানে তোর ভরা খেতে, আমি কি দেখেছি মধুর হাসি। 
সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। 

(আমার সোনার বাংলা গাইতে গাইতে মঞ্চ থেকে বের হয়ে যাবার সময়ও মনে হবে হাত টেনে টেনে রাসেল বুঝি মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাচ্ছে।)   

সমাপ্তি

মুক্তিযুদ্ধ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে