Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯ , ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.6/5 (21 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৩-১৭-২০১৪

ফের চাঙ্গা জেএমবি, অর্থদাতা এক ডজন ‘সুধী’

ফুয়াদ হাসান


ফের চাঙ্গা জেএমবি, অর্থদাতা এক ডজন ‘সুধী’

ঢাকা, ১৭ মার্চ- নতুনভাবে টাকার যোগান পেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী থেকে রিকশাওয়ালা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জেএমবির অর্থদাতা রয়েছে। তাদের ভাষায়, এ অর্থদাতাদের বলা হয় ‘সুধী’।

শীর্ষ নেতাদের জেল-ফাঁসি হওয়ার পর ভঙ্গুর জেএমবিকে আবারও চাঙ্গা করতে পরিকল্পনা শুরু হয় ২০১২ সাল থেকে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার যোগান দিতে শুরু করেন ‘ডেডিকেটেড’ সুধীরা। পর্যাপ্ত অর্থের যোগান পাওয়ার কারণেই জেএমবির জঙ্গিদের পুনরুত্থানের প্রথম মিশন ত্রিশাল অপারেশন সফল হয়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে তিন জঙ্গিকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

অর্থের যোগান দিয়ে জেএমবিকে জাগিয়ে তোলা ব্যবসায়ীদের মধ্যে দুইজন এখন পুলিশের কব্জায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আজমীর ও রাহাত নামে এ দুই গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ত্রিশালের ঘটনায় প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করেছে। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন উপায়ে জেএমবির জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়া হতো। এমন আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানকে সনাক্ত করেছেন গোয়েন্দারা, যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে জেএমবি সুবিধা পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও জেএমবির সুধী। অভিযোগ সুনির্দষ্টভাবে প্রমাণিত হলেই অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আজমীর পাঁচ কোটি ৮০ লাখ টাকা দিয়ে বাড্ডার সাতারকুলে একটি গার্মেন্ট কিনেছেন। কল্যাণপুরে রাহাতের ‘রাহাত ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি পোশাক কারখানা রয়েছে। জঙ্গিদের পুনর্বাসন ও অর্থ জোগান দেয়ার জন্য এই গার্মেন্টস দুটি পরিচালনা করা হতো বলে তথ্য পাওয়া গেছে।’

মনিরুল ইসলাম আরও জানান, জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়ার কাজে মূলত নেতৃত্ব দিয়েছে গ্রেপ্তারকৃত জাকারিয়া এবং পলাতক ফারুক। এরা জেএমবির মূল ধারার একটি অংশে নেতৃত্ব দেয়। এদের নেতা ছিলেন রাকিব হাসান (‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত)।

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, ত্রিশালে জঙ্গি ছিনতাইয়ের কাজে ১৫ জন সরাসরি অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন এবং সহায়তাকারী সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া আজমিরের বাড়ি নোয়াখালী এবং রাহাতের ঝালকাঠি জেলায়। এ দুই ব্যবসায়ী গার্মেন্ট ব্যবসার আড়ালে জেএমবিকে সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছিলেন। গত এক বছরে জাকারিয়ার মাধ্যমে জেএমবির যে অর্থ সংগ্রহ হয়েছে, তার বেশিরভাগই দিয়েছেন এক ডজন সুধী। এদের মধ্যে রাহাত ও আজমীর অন্যতম। এছাড়া এখন অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানান মনিরুল ইসলাম।

গত ২৩ ফেব্রয়ারি ত্রিশালে পুলিশ হত্যা করে তিন জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর সখীপুর থেকে অস্ত্র ও মাইক্রোবাসসহ ধরা পড়েন জেএমবি সদস্য জাকারিয়া। একই দিন গ্রেপ্তার হন রায়হান ওরফে রাসেল। এরপর টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জাকারিয়ার স্ত্রী স্বপ্না বেগম ও তার ভাই মো. ইউসুফকে। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয় সহযোগী রাজু আহমেদ রাজু ও সোহরাব হোসেন। এ ছয়জনকে জ্ঞিাসাবাদে জেএমবির নতুন অর্থসংস্থানের নেটওয়ার্ক বেরিয়ে এসেছে।
গত বৃহস্পতি ও শনিবার দুই অর্থদাতা গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আজমির ওরফে অমিত ও গোলাম সরোয়ার রাহাত, জেএমবির সক্রিয় সদস্য আল-আমীন, জিয়াউল ইসলাম জিতু এবং রুহুল আমীন ওরফে রাজুকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এ ১১ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি জেএমবির অর্থদাতার সূত্রসহ সংগঠিত হওয়ার অনেক তথ্য পেয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে জাকারিয়া জানান, সুধীদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা পেতেন তিনি। এমন তথ্য পাওয়ার পরই জেএমবির সুধীদের শনাক্তে কাজ শুরু করেন গোয়েন্দারা। জাকারিয়ার ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখা হয়। ২০১২ সালের পর থেকে জেএমবির অর্থ শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন জাকারিয়া। এরপর থেকে এক কোটি টাকা সংগ্রহ করেন তিনি। নামে-বেনামে একাধিক ব্যাংক হিসাব নম্বরে এই টাকা গচ্ছিত রাখেন জাকারিয়া। এই টাকার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে ত্রিশালের অপারেশনে।

ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, জেএমবি এখন নতুন কৌশলে অর্থ সংগ্রহ করছে। জঙ্গিদের অর্থনৈতিক ভিত খুবই শক্তিশালী। যেসব সুধী টাকা সরবরাহ করেন, তারা সংগঠনের ব্যাপারে ‘ডেডিকেটেড’।

ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ছানোয়ার হোসেন জানান, জেএমবির গ্রেপ্তারকৃতরা আট মাস আগে কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, গাজীপুর এলাকায় একাধিক বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গি ছিনতাই করার জন্য সুবিধাজনক একটি স্থান খুঁজতে থাকে। কিন্তু তারা নির্ভরযোগ্য কোনো স্থান না পাওয়ায় পাঁচ মাস আগে অপরাধ সংঘটনস্থল পরিবর্তন করে ভালুকা-ত্রিশাল এলাকা বেছে নেয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেএমবি সদস্যরা দুটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান অন্য মালিকদের কাছ থেকে কেনে। আর গার্মেন্ট কিনতে যে বিপুল টাকা প্রয়োজন পড়ে তার জন্য অনেক অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে তারা। এ জন্য জাল টাকার ব্যবসা, নারী, শিশুসহ ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ছিনতাই ও জমির দালালিসহ আরো অনেক অবৈধ কাজ তারা করেছে বলেও স্বীকারোক্তি মিলছে। গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠনের কর্মী ও অনুসারীদের অনেককে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া যাবে ও রাজধানীতে বিপুল সংখ্যাক কর্মীকে একত্রে রাখা যাবে বলে ধারনা ছিল জেএমবি নেতাদের। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা মাফিক তারা বিনিয়োগ করেছে।

জঙ্গিদের সাংগঠনিক কার্যক্রম, তৎপরতা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র-বিস্ফোরক সংগ্রহ, যোগাযোগ, পরিবারের ভরণপোষণসহ অন্যান্য কাজে বিপুল পরিমানে অর্থ খরচ হয়। এছাড়া মামলা ও কারাগারে থাকা জঙ্গিদের জামিন ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের জন্যও টাকার প্রয়োজন। বিদেশ থেকে আসা অর্থ সহায়তায় গোয়েন্দা নজরদারি থাকায় তারা ভিন্ন পথে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন উপায়ে পাওয়া কয়েক কোটি টাকা জেএমবির কোষাগারে জমা করে গত দুই বছর ধরে তারা ব্যবসার পরিকল্পনা করে আসছিল। সিএনজি, ট্যাক্সিক্যাব, বাসের ব্যবসার পাশাপাশি ইটের ভাটা ও গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিরা অর্থ বিনিয়োগ করেছে বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এর আগে জঙ্গি সদস্য আসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পর র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছিল সংগঠন থেকে তাকে একটি ট্যাক্সিক্যাব কিনে দেয়া হয়। এছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরে জঙ্গিদের রিকশার ব্যবসা রয়েছে। অনেক জঙ্গি সদস্য রিকশার মাধ্যমেও ছদ্মবেশে সংগঠনের কাজ করে। সাবেক জেএমবি প্রধান শায়খ রহমানও গ্রেপ্তার হওয়ার পর স্বীকার করেছিলেন, জেএমবির মাঠ পর্যায়ের অনেক সদস্য রিকশা চালায়। আবার একই সঙ্গে তারা সংগঠনের কাজও করে।

সূত্র মতে, অর্থ সংগ্রহে মনোযোগী হয়ে ওঠা জেএমবি নেতাদের অনেকে জাল মূদ্রা তৈরিসহ নানা অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। পুলিশ ও র‌্যাব এসব নেতাদের সনাক্তে জঙ্গি অর্থায়ন বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় দু’টি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে। অন্য প্রায় এক ডজন প্রতিষ্ঠানে জঙ্গি অর্থায়নের ব্যাপারে গোয়েন্দারা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিদের অর্থায়ন বন্ধ করতে পারলে সাংগঠনিকভাবে তাদের দুর্বল করে দেয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে শনাক্ত করা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, আগে থেকে জঙ্গিদের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে খোঁজ নেয়া হলেও প্রমাণ মিলেছে কম। সর্বশেষ ত্রিশালে জঙ্গি ছিনতাই ঘটনার পর তদন্তে বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য মেলে। আর সে সূত্রেই মিলছে জেএমবির নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে