Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ , ৭ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (21 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৩-২০১২

 সৌদি বাদশাকে সাত বার অনুরোধ:

 সৌদি বাদশাকে সাত বার অনুরোধ:
বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বে নিযুক্ত ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভূমিকা আজ অনেকেই স্মরণে আনছেন। কারণ তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিলে প্রাণপণ লড়েছিলেন। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আবেদন প্রেসিডেন্ট জিয়া, প্রেসিডেন্ট সাত্তার এমনকি প্রেসিডেন্ট এরশাদও মঞ্জুর করে যাননি। সেই নাগরিকত্ব তিনি চূড়ান্তভাবে লাভ করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। আর সেই মাইলফলক রায়ের মূল অথর জাজ ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সুপ্রিম কোর্টে নথিপত্র সাক্ষ্য দেবে, বঙ্গবন্ধুর সেই আদেশ যাতে টিকে থাকে সেজন্য বেগম খালেদা জিয়া একটা সর্বাত্মক আইনি যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। তার প্রধান সিপাহশালা ছিলেন ব্যারিস্টার আমিনুল হক। রাষ্ট্র তখন বলেছিল, গোলাম আযম সর্বোতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। এবং তা শুধু নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নয়। তার বাপ-দাদারা আজকের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেছেন বলেই তিনি জন্মসূত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্বের দাবিদার হতে পারেন না। ১৯৭২ সালে সৌদি আরবে পাকিস্তানি পাসপোর্টে হজ করতে গিয়ে আসলে তিনি বাংলাদেশ বিরোধিতায় মেতে ওঠেন। বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পরেও তিনি লাহোরে ‘ইস্ট পাকিস্তান রিকভারি কমিটি’ গঠন করেছিলেন। একই বছরে রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইসলামী যুব সম্মেলনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার আন্দোলনে শামিল হতে আহ্বান জানান। ওই সময়ে তিনি একই লক্ষ্যে লন্ডনেও একটি কমিটি গঠন করেছিলেন।
১৯৭৩ সালে লিবিয়ার বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত ওআইসি দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে বাংলাদেশকে তারা যাতে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয় সেজন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। এমনকি বাংলাদেশকে সৌদি আরব যাতে স্বীকৃতি না দেয় সেই অনুরোধ নিয়ে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে সাতবার তিনি সৌদি বাদশাহ’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।    
জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটন সংক্রান্ত  যেসব যুক্তি-তর্ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সামনে পেশ করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে সেসবের কিছু বিষয় ওইসময় ব্যারিস্টার আমিনুল হক সুপ্রিম কোর্টেও পেশ করেছিলেন।
অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে একজন বিদেশী নাগরিক হিসেবে প্রবেশ করেন। তার নাগরিকত্ব ১৯৭৩ সালে অপর ৩৭ জনের সঙ্গে বাতিল করা হয়েছিল। সাধারণভাবে অনেকের ধারণা, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি সহজেই নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য ভিন্ন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকার এ মর্মে বিজ্ঞপ্তি দেয় যে, ১৯৭৩ সালে যাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল তা ফিরে পেতে তাদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হচ্ছে। একাত্তরের ২২শে নভেম্বর জামায়াতের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে লাহোর গিয়েছিলেন। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা ফিরেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তাকে বহনকারী বিমানটি ঢাকা এয়ারপোর্টে অবতরণ করতে পারেনি। প্লেনটি করাচিতে যেতে পারেনি। কারণ সেখানে বোমা বর্ষণ চলছিল। প্লেনটি তাই প্রথমে কলম্বোতে অবতরণ করে। পরে সেটি যায় জেদ্দায়। ১৯৯২ সালে হাইকোর্টে দায়ের করা হলফনামায় গোলাম আযম বলেন, কয়েকদিন পরে তিনি অন্য যাত্রীদের সঙ্গে করাচিতে ফেরেন। ওই সময় পাকিস্তান সরকার কোন বাংলাদেশী নাগরিককে দেশে আসতে বাধা দেয়ায় তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। ১৯৭২ সালের মার্চে তিনি তার পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে লন্ডন যেতে চাইলেও পাকিস্তান সরকার তাকে সুযোগ দেয়নি। বাহাত্তরের ডিসেম্বরে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে হজ পালন করতে যান। এ সময় তিনি দেশে তার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ চলছে বলে জানতে পারেন।  তিয়াত্তরের এপ্রিলে তিনি জেদ্দা থেকে লন্ডন যান। ১৮ই  এপ্রিল ১৯৭৩, এক প্রজ্ঞাপনে তিনিসহ ৩৮ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। পঁচাত্তরে সরকারের পরিবর্তন ঘটে। ১৭ই জানুয়ারি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাতিল হওয়া নাগরিকদের আবেদন করার সুযোগ দেন। গোলাম আযম ২০শে মে ১৯৭৬ সালে তার নাগরিকত্ব ফিরে পেতে আবেদন করেন। কিন্তু তাতে কোন সাড়া  না পেয়ে তিনি ১২ই জানুয়ারি ১৯৭৭ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের কাছে পুনরায় আবেদন করেন। কিন্তু ১২ই জানুয়ারি ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেন। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দুঃখের সঙ্গে আপনার আবদেনটি মঞ্জুর করতে অপারগতা প্রকাশ করছে।
১৯৭৩ সালে গোলাম আযমের বাবা মারা যান। ১৪ই নভেম্বর ১৯৭৭ সালে তার বৃদ্ধা মাতা ছেলের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে আবেদন করেন। সেই আবেদনও নাকচ করা হয়। তবে এ সময় তার অসুস্থ মাকে দেখতে তাকে ভিসা দিতে লন্ডন বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে সরকার অনুমতি দেয়। ১১ই জুলাই ১৯৭৮ সালে তিন মাসের ভিসা নিয়ে গোলাম আযম একজন পাকিস্তানি হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এরপর দুবার তার ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়।  ৮ই নভেম্বর ১৯৭৮ সালে তিনি তার পাকিস্তানি পাসপোর্ট সমর্পণ করে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে আবেদন করেন। ২৭শে মে ১৯৮০ সালে সংসদে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন যে,  তার সর্বশেষ আবেদনখানা সরকারের  বিবেচনাধীন। এরপর আসে ২৮শে এপ্রিল ১৯৮১। সরকারের ইমিগ্রেশন সেকশন গোলাম আযমকে বাংলাদেশের আনুগত্য বিষয়ে হলফনামা দিতে পত্র প্রদান করে। সে অনুযায়ী ৩০শে এপ্রিল ১৯৮১ সালে গোলাম আযম তা প্রদান করেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এ বিষয়ে এরপর অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ধরে ঝুলতে থাকে।
১৯৮৬ সালের ৩রা ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ সরকার গোলাম আযমের বাংলাদেশে অবস্থানের বৈধতা জানতে চেয়ে একটি চিঠি দেয়। ২২শে ডিসেম্বর ১৯৮৬ সালে তিনি এর উত্তর দেন। কিন্তু সরকার তার আবেদন মঞ্জুর করেনি। এর দু’বছর পর ১৯৮৮ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো নিজেকে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে দাবি করেন। এর আগে ৫ই আগস্ট ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ভোটারলিস্টে তার নাম মুদ্রিত হয়। এরপর ১৯৯০ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ভোটারলিস্টেও তার নাম দেখা যায়। সে হিসেবে মহাজোট সরকারের মিত্র এরশাদই গোলাম আযমের নামটি ভোটারলিস্টে তোলেন। যা বিএনপি নেতা জিয়া বা সাত্তার করেননি। ইতিমধ্যে গোলাম আযম জামায়াতের আমীর পদবি গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠনের জন্য ব্যক্তিগতভাবে গোলাম আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।  প্রায় একই সময়ের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী গোলাম আযমের দোয়া প্রার্থনা করতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২৩শে মার্চ ১৯৯২ সালে হঠাৎ করেই গোলাম আযমকে কেন বহিষ্কার করা হবে না সেমর্মে পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়। বিদেশী নাগরিক হিসেবে তিনি কি করে জামায়াতের আমীর হলেন- তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। ২৪শে মার্চ ১৯৯২ সালে গোলাম আযম তার জবাব দেন। কিন্তু এদিনই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মিডিয়ায় ২০১২ সালে তার নতুন গ্রেপ্তারের খবর যেভাবে হেডলাইন হয়েছে সেভাবে বড় হেডলাইন হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও। গোলাম আযমের আটকাদেশ যথেষ্ট কঠিন ছিল। সেই আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে ১১৪৮ নম্বর রিট দায়ের করা হয়েছিল ৩০শে মার্চ ১৯৯২ সালে। সেই মামলায় আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের সূত্রে অধ্যাপক গোলাম আযম ফিরে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। তবে বেগম খালেদা জিয়ার এক গ্রেপ্তার থেকে শেখ হাসিনার আরেক গ্রেপ্তারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২০ বছর। এ সময়ে বুড়িগঙ্গা দিয়ে বাংলাদেশ রাজনীতির অনেক পানি গড়িয়ে গেছে।
তবে দেখার বিষয় হবে- গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা বেগম খালেদা জিয়া সরকারের অভিযোগ শেখ হাসিনা সরকার কতটা কিভাবে ছাড়িয়ে যায়।            

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে