Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ , ৭ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 1.5/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৩-২০১২

বিপজ্জনক আমাজান যাত্রায় বাংলাদেশী শ্রমিকরা

বিপজ্জনক আমাজান যাত্রায় বাংলাদেশী শ্রমিকরা
ব্রাজিলে মহাবন আমাজান বনভূমির একদম উত্তরের শহর ব্রাসিলেইয়া, মাত্র কুড়ি হাজার ৩৩৮ জন লোকের বাস এখানে- যাদের মধ্যে ক্যারিবিয়ার গরিব দেশ হাইতি’র লোক হবে প্রায় ১,২০০ জন।
হাইতির এই ‘কালো মানুষেরা’ আমাজানের ভ্যাপসা গরমের মধ্যে এখানে সেখানে ছায়া খুঁজে বেড়ায়, ছাউনির নিচে অপেক্ষা করে কবে তাদের বৈধতার কাগজপত্র তৈরি হবে- ব্রাজিলের অন্যান্য এলাকায় কবে তাদের জন্য মিলবে একটি চাকরি।
কিন্তু গত মঙ্গলবার এখানে এমন এক ছাউনির যে দু’জন লোক আমার নজর কেড়েছে, যাদের আমি ঠিক ব্রাসিলিয়ার সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম না। চেহারা-সুরত-গায়ের রং মিলে মনে হলো এরা হয়তো প্রতিবেশী বলিভিয়ার লোক হতে পারতো, কিংবা ব্রাজিলেও এমন চেহার লোক আছে বলে আমি দেখেছি। কিন্তু তারা না ব্রাজিলের না বলিভিয়ার।
কথা বলতে সামনে এগোতেই  তাদের একজন বললেন, ‘উই আর ফ্রম বাংলাদেশ’ (আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি)। জানলাম ওনার নাম এএইচএম সুলতান আহমেদ, বয়স ৩৬।
সুলতান সাহেবের বন্ধু আবদুল আওয়াল আর আমার আলোকচিত্রী সাংবাদিক মারিয়া এলেনা রোমেরো মিলে ঘাসের ওপর বসে পড়লাম কথা বলার জন্য।
মাত্র এক রাত হলো ওনারা ঢাকা থেকে ব্রাসিলিয়া এসেছেন। যাওয়ার জায়াগ নেই কোথাও, শহরের প্রধান চত্বরের মেঝেতে ঘুমিয়েছেন। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাদের, কিন্তু দেখা গেল ঘনঘন মুচকি হাসি দেবার মতো শক্তিটুকু আছে।
ব্রাজিলে কেন এসেছেন?
সুলতান বললেন, “আমি শুনেছিলাম ব্রাজিলের অর্থনীতি দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছে, এখানে আমাদের জন্য ভালো কাজ আছে। শিগগিরই আমরা কাগজপত্র পাবো, কাজ পাবো। আমি খুশি আছি।’’
সুলতান বললেন, ‘‘আমি মনে করি দক্ষিণ আমেরিকায় এখন প্রচুর কাজ আছে, আমাদের দেশ থেকে প্রচুর লোক এখন এখানে আসতে চায়।’’
সুলতান এর আগে কখনোই ব্রাজিলে আসেনি কিংবা পর্তুগিজ ভাষার একটা শব্দও জানে না।
সুলতান জানালো, উনি একজন দক্ষ রং মিস্ত্রী এবং গ্রিসে কাজ করতেন এর আগে। তার বন্ধু আওয়াল কাজ করেছেন মালেশিয়ায়, পেশা বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী।
দুজনই বললেন, পরিবারের দরকারেই তাদের কাজ দরকার। সুলতানের বাড়িতে রেখে এসেছে স্ত্রী আর কন্যাকে, কন্যার বয়স সাত। আওয়ালের স্ত্রীর এক মেয়ে আর দুই ছেলে।
একুশ দিনের বিপজ্জনক যাত্রা
ব্রাজিলের এই সবচেয়ে প্রত্যন্ত এক কোণায় কী করে দুজন লোক চলে এলো বাংলাদেশ থেকে? এ প্রশ্ন না করে উপায় ছিল না আমার।
জবাবের শুরুতেই তারা আমায় জানালো, এখানে আসতে তারা এক দালালকে আশি হাজার টাকা দিয়েছেন। সেই সব ব্যবস্থা করেছে। দালালটি তাদের এও ওয়াদা দিয়েছে যে, খুব সহজেই সে ইকুয়েডরে তাদের জন্য উঁচু বেতনের কাজ যোগাড় করে দেবে। সে অনুযায়ী তারা প্রথমে ঢাকা থেকে দুবাই এসেছেন, বিমানে সাড়ে চার ঘণ্টার যাত্রা।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘দুবাইতেই কাজ করেন না কেন?’’
সুলতান বললেন, ‘‘ওখানে এখন তেমন কাজ নেই, আমি মনে করি ব্রাজিলেই ভালো।’’
আরব আমিরাত থেকে ১৫ ঘণ্টার বিরতিহীন উড়ে তারা পৌঁছলেন ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরের বিমানবন্দরে। কিন্তু ব্রাজিলের ভিসা নেই তাদের। বিমানবন্দর ছেড়ে বেরোনো মুশকিল। পরে আরো তিন ঘণ্টা ১৫ মিনিটের ফ্লাইটে চলে গেলেন চিলি’র সান্তিয়াগো’তে।
সান্তিয়াগো’তে দীর্ঘ বিরতির পর আরেক ফ্লাইটে চলে গেলেন ইকুয়েডরের কুইটো’তে। পাঁচ ঘণ্টার বিমান যাত্রা। কুইটো শহরে তারা দীর্ঘদিন ছিলেন।
কিন্তু দালালের ওয়াদা মতো কোনো কাজ মিললো না ইকুয়েডরে। এরপর আরেক দালালের খপ্পরে। গন্তব্য ব্রাজিল। তারা শুনেছেন ব্রাজিলের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ রমরমা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।
কিছুটা ঠিক শুনেছেন তারা। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা ব্রাজিলকে দুনিয়ার ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ধার্য করেছে।
কিন্তু ভিসা ছাড়া ব্রাজিলে আসার কৌশল জানা ছিল না তাদের। দালালটি বললো, ‘‘এটা জটিল কাজ। কিন্তু চিন্তা নেই। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলবো।’’ দালালটিকে ৫,৪০০ ডলার দিতে হয়েছে।
অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি
শিগগিরই শুরু হলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ব্রাজিলাভিযান। প্রথমে পাশের দেশ পেরু’র উদ্দেশ্যে। ইকুয়েডরের কুইটো থেকে পেরুর লিমা শহরে পৌঁছতে তাদের সময় লেগেছে টানা ২৬ ঘণ্টা। বাস যাত্রা। সেখান থেকে আরেক বাসে দেশটির আরেক শহর ইনাপারি’তে। ব্রাজিলের সীমান্তের কাছে এক নোংরা শহর, ধুলিধূসর শহর ইনাপারি।
সীমান্তপারে তারা দুজন। কিন্তু ব্রাজিলের ভিসা তো নেই! ‘সব ব্যবস্থা করে ফেলবো’ বলা দালালটির পর আরেক দালাল। স্থানীয় ওই লোকটি ৬০০ ডলার দাবি করলো। ভিসা ছাড়াই এবং অবশ্যই গোপনে তাদের সীমান্ত পার করে দিতে পারবে বলে দাবি করলো লোকটি। শুধু তা-ই নয়। ব্রাজিলে ঢুকিয়ে পরে অনেক মাইল জঙ্গল-পথ পাড়ি দিয়ে লোকালয়ে পৌঁছে দেবে সে।
কিন্তু দুই বন্ধুর আছে তখন আছে মাত্র ৩২০ ডলার। ইনাপারি শহরের সেই ধুলিমাখা চেহারার দালালটি জানালো, সুলতানের মোবাইল ফোনটি দিলে ৬০০ ডলারের অর্ধেকের দাবি মিটে যায়। নিরুপায় সুলতান তা-ই করলেন।
সবশেষে, মাত্র গতকালই তারা পৌঁছলেন ‘জঙ্গল-পথের ওপারের শহর’ ব্রাসিলেইয়া’য়। ঢাকা থেকে যাত্রার ২১ দিনের পর।
এখন সুলতানের সম্বল মাত্র ২০ ডলার এবং ব্রাজিলের স্থানীয় মুদ্রার কিছু পয়সা। বাড়িতে কথা বলার মোবাইল ফোনটুকুও তে গেছে!
তারপরও সফল ব্রাজিলাভিযানের সমাপ্তিতে তারা কিছু নাস্তা-পানি কিনেছেন। দশ ডলার গেছে সেখানে।
পরে স্থানীয় থানায় তারা নিজেদের পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন ওয়ার্ক পারমিট পাবার উদ্দেশ্যে।
এখন এই আমাজান অঞ্চলের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হবার পালা। ওয়ার্ক পারমিট পেতে সাধারণত চার সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।

 

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে