Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ , ৩ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.3/5 (18 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০৪-২০১৪

ঝুঁকির নেশায় বুঁদ বাঙালি কন্যে

ঝুঁকির নেশায় বুঁদ বাঙালি কন্যে

কলকাতা, ০৪ মার্চ- রাঁধেন, চুল বাঁধেন, বড়জোর ঘরে-বাইরে সামলান সমানতালে। কিন্তু দড়ির ভরসায় পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়া কয়েকশো ফুট নীচে, ঢেউয়ে চড়ে সাগরপাড়ি, অসমান পাহাড়ি পথে বাইকিং কিংবা তারে ঝুলে পৌঁছে যাওয়া ঢালের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত? না, এমন বিপদপথে পা বাড়ানো তাঁদের কর্ম নয়। অন্তত তেমনটাই ছিল বরাবরের ধারণা। যে ধারণাটাকে চুরমার করে দিতে চাইছেন এ কালের বাঙালি কন্যে। নাই বা থাকল পেশাদারি প্রশিক্ষণ, দেশ-বিদেশে বেড়াতে গিয়েও ভয় কাটিয়ে দিব্যি চষে ফেলছেন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের পুরুষালি দুনিয়া। জীবন বাজি রেখেও উপভোগ করে নিচ্ছেন প্রতিটা মুহূর্তের রোমাঞ্চ।

টিভিতে স্কাইডাইভিং আর স্কুবা ডাইভিং দেখতে দেখতেই ঠিক করে ফেলেছিলেন সন্তোষপুরের প্রিয়াঙ্কা রায়। হিসেব কষা সরলরেখার জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেই হবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। সঙ্গী বলতে দিন কয়েকের রক ক্লাইম্বিং-এর অভিজ্ঞতা, তা নিয়েই বাইশের তরুণী একা একাই পাড়ি দেন হৃষিকেশে। লক্ষ্য র্যাফটিং আর বাঞ্জি জাম্পিং। খরস্রোতা নদীতে র্যাফটিং অতটা ভয় ধরায়নি। বরং কনকনে ঠান্ডায় চ্যালেঞ্জ নিয়েই ডুব দিয়েছেন জলে। কিন্তু পায়ে দড়ি বেঁধে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটায় হাত পা সিঁটিয়ে গিয়েছিল মেয়ের। আর তার পর? “ভাবলাম বাড়ির কারও কথা না শুনে, এতগুলো টাকা খরচ করে এসেছি যখন, ঝাঁপ দেবই। যা হয় হোক। ব্যস! কয়েকটা মুহূর্ত সময় থমকে যাওয়া, হাওয়ার ঝাপটা, পায়ে বাঁধা ইলাস্টিক কর্ডের টানে শূন্যে ওঠা-নামা! ভয়-টয় সব কোথায় হারিয়ে গেল। দারুণ অভিজ্ঞতা। পরে শুনেছি, দুটো ছেলে সে দিনই বাঞ্জি জাম্পিং করতে গিয়ে টাকাপয়সা জমা দিয়েও শেষ পর্যন্ত ভয়ে আর করে উঠতে পারেনি। বেশ গর্ব হয়েছিল ভেবেই! স্কাইডাইভিংটাও এক দিন করবই আমি।” বলছেন প্রিয়াঙ্কা।

পেশাদার প্রশিক্ষণ ছিল না বাঁশদ্রোণীর সুস্মিতা সাহারও। মালয়েশিয়ায় গিয়ে সাধ মিটিয়ে নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে পা বাড়ানো একটুও আটকায়নি তাতে। প্যারাসেলিং-এ আকাশপাড়ি, গহীন জলে সি-ওয়াক কিংবা ব্যাম্বু বোট-এর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে এগিয়ে গিয়েছেন স্রেফ সাহসে ভর করে। ভয় করেনি? সুস্মিতা বলছেন, “প্যারাসেলিং আর আন্ডার সি ওয়াক খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু ব্যাম্বু বোট! বাপরে! সমুদ্রের ঠিক মাঝখানটায় নৌকোটাকে একেবারে খাড়া করে দিল। রড ধরে কোনও রকমে প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম। তবে সারাজীবন মনে থাকবে সেই অভিজ্ঞাতাটা! তবে আমি দেশে জিপ লাইনিং করেছি। মানে ওই পুলিতে টানা তারে ঝুলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া। আর সিঙ্গাপুরে লিউজ। সেগুলোও বেশ লেগেছিল।”

আড়িয়াদহের মেয়ে প্রমিতা মুখোপাধ্যায় যেখানেই বেড়াতে যান না কেন, অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস তাঁকে টানবেই। হৃষিকেশ থেকে মুম্বই, গোয়া কোথাও করেছেন বাঞ্জি জাম্পিং, কোথাও জিপ লাইনিং, কোথাও বা কোয়াড বাইকিং। “প্রায় এক ঘণ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম কোয়াড বাইকিং-এর চার চাকার ভারী বাইকটা। তবে হ্যাঁ, এর জন্য কিন্তু মোটরবাইক বা স্কুটি চালাতে জানতে হবে,” বলছেন প্রমিতা।

সল্টলেকের আশা সরকার আপাতত বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেকিং-এর মজায় মশগুল। তবে সুযোগ পেলে এক দিন স্কাইডাইভিংটাও করে ফেলবেনই।

ভয়কে জয় করে বাঙালি মেয়েদের এই এগিয়ে যাওয়ার সাক্ষী দক্ষিণ আফ্রিকাও। সম্প্রতি কলকাতায় এক পর্যটন মেলায় যোগ দিতে এসেছিলেন ভারতে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যটন দফতরের প্রধান হ্যানেলি স্ল্যাবার। তিনিও জানান, ক্যানোপি ট্যুর, বাঞ্জি জাম্পিং-এর পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকায় বালিয়াড়ি দিয়ে পিছলে নামার স্যান্ড বোর্ডিং, স্কাইডাইভিং, প্যারাগ্লাইডিং বা হ্যান্ড গ্লাইডিং-এর আকাশপাড়ি, পাহাড়ি নদী-সমুদ্রে ক্লুফিং, স্কুবা ডাইভিং, হেলিকপ্টার ফ্লিপ, র্যাফটিং, শার্ক কেজ বা ক্রোকোডাইল কেজ ডাইভিং, কোয়াড বাইকিং-এর মতো নানা ধরনের রুদ্ধশ্বাস অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবস্থা রয়েছে। এর সবগুলোতেই অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাঙালি মেয়েদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সংখ্যাটা বাড়ছে দিনদিন।

মানছেন এ দেশে মেয়েদের অ্যাডভেঞ্চার নেটওয়ার্ক সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক বিমলা নেগি দেওস্করও। গোটা দেশের মেয়েদের পর্বতারোহণ-সহ বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে টেনে এনে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলেন তাঁরা। বিমলা বলেন, “টিভি, ইন্টারনেটের হাত ধরে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের প্রতি আকর্ষণটা বাড়ছিলই। বাঙালি মেয়েদের সাহসটাও এ ব্যাপারে নজর কাড়ছে সবচেয়ে বেশি। এখন যতগুলো পর্বতারোহণ অভিযান হয় এ দেশে, তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশেই থাকেন বাঙালি মেয়েরা। এটা নিঃসন্দেহে গর্বের।”

বিদেশের মতো এখন এ দেশেও দিনদিনই বাড়ছে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ঠিকানা। হৃষীকেশ, মুসৌরি, মুম্বই-গোয়া, তামিলনাড়ু, কিংবা এ রাজ্যেরই তাজপুর বিভিন্ন জায়গায় ডালপালা মেলছে রুদ্ধশ্বাস খেলাধুলোর মজা। বেড়াতে গিয়ে যে দিকে গুটি গুটি পা বাড়ানোর সংখ্যাটাও বাড়ছে ক্রমেই। কিন্তু সেই সঙ্গেই বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এ ধরনের খেলাধুলোয় ঠিকমতো নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ। সম্প্রতি তামিলনাড়ুর সালেমে স্কাইডাইভিং করতে গিয়ে প্যারাসুট ঠিকমতো কাজ না করায় এক তরুণীর মৃত্যু ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সেটা। প্রমিতা বা প্রিয়াঙ্কাও জানাচ্ছেন, বেশ কিছু জায়গাতেই ঠিক মতো থাকে না নিরাপত্তা বলয়। ফলে তাঁদের দু’জনেরই পরামর্শ, “প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যে কোনও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে অংশ নেওয়ার আগে খুঁটিয়ে দেখে নিন সুরক্ষার কী ব্যবস্থা রয়েছে। আশ্বস্ত হলে তবেই এগোন। আনন্দ করতে গিয়ে জীবনটাই শেষ করে ফেলার তো দরকার নেই!” বিমলার পরামর্শ, “ভয় কাটিয়ে মেয়েরা যে ভাবে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে এগোচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এতে পা বাড়ানোর আগে একটু পেশাদার প্রশিক্ষণ নিয়ে রাখা উচিত। যে খেলায় অংশ নিচ্ছেন তাতে ঝুঁকি কতটা, কী ভাবে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, সেগুলো বুঝে নেওয়ার জন্যও এই প্রশিক্ষণটা প্রয়োজন।”

প্রশিক্ষণ থাক বা না থাক, অ্যাড্রেনালিন রাশ! সেটাই আপাতত বাঙালি কন্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কে বলে ননীর পুতুল!

অন্যান্য

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে