Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ , ১১ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (33 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১২-২০১২

শহীদ জননীকে মনে পড়ে

শহীদ জননীকে মনে পড়ে
(ভিডিও সংযুক্ত)জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর এ দেশীয় সবচেয়ে বড় দোসর। মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো নয় মাস তিনি পাকিস্তান যেন ভেঙে না যায়, সে জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে ইতিহাসের নির্মম ও জঘন্যতম গণহত্যায় মেতে ওঠা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি জানিয়েছে অকৃত্রিম উত্সাহ ও উদ্দীপনা। তিনি কেবল পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বক্তৃতা ও বিবৃতির মাধ্যমে উত্সাহই জুগিয়ে জানাননি। তাঁর রাজনৈতিক দল জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির) কর্মীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নৃশংস আল-বদর বাহিনী। ওই বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্থনে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় মেতে উঠে ‘পাকিস্তানের আদর্শে’র প্রতি জানিয়েছিল অকুণ্ঠ সমর্থন।

স্বাধীনতাযুদ্ধের গোটা নয় মাস গোলাম আযম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বিভিন্ন বক্তৃতা ও বিবৃতি দিয়ে বেরিয়েছেন। সে সময়ের পত্রিকা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই বক্তৃতা ও বিবৃতিগুলো তাঁর বাংলাদেশ-বিরোধিতার সবচেয়ে বড় প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এখনো অক্ষত আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্টের মাধ্যমে তিন মাসের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে আর ফিরে যাননি। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও গোটা আশির দশকে তিনিই ছিলেন জামায়াতের অঘোষিত আমির। সে সময় ক্যামোফ্লেজ হিসেবে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সুযোগ নিয়ে গোলাম আযম প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেন। অথচ তিনি তখন ছিলেন আইনত পাকিস্তানি নাগরিক। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামায়াত গোলাম আযমকে প্রকাশ্যে আমির ঘোষণা করলেও তত্কালীন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব তা দেখেও না দেখার ভান করে বসে থাকেন। দেশের রাজনীতিকদের এই মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রথম ফুঁসে ওঠেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ১৯৯২ সালে নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেন গণ-আদালত। সেই প্রতীকী গণ-আদালতের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এই কুখ্যাত ব্যক্তির বিচারসহ অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলেন তীব্র গণ-আন্দোলন।
সেই প্রতীকী গণ-আদালতের রায়ে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টির মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই অভিযোগের প্রতিটিই ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। এর মধ্যে ছিল গণহত্যায় ইন্ধন ও অংশগ্রহণ, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রভৃতি। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সে সময় কুষ্টিয়া থেকে এসেছিলেন তিন নারী। যাঁরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। গণ-আদালতের আবেগকে আমলে না নিয়ে তত্কালীন বিএনপির সরকার শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ মোট ২৪ জন দেশবরেণ্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। অন্যদিকে আদালত এক রায়ে গোলাম আযমকে ফিরিয়ে দেন তাঁর হারানো নাগরিকত্ব। স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার ‘অভিযোগে’ স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবন বিসর্জনকারী একজন মুক্তিযোদ্ধার জননীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সেই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা সে সময় প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল দেশের মানুষের মধ্যে।
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯৪ সালে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে চলে গেলেন পরপারে। তাঁর হাতে তিল তিল গড়ে ওঠা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন একসময় ঝিমিয়ে পড়ে। জাহানারা ইমামের শুরু করা সেই আন্দোলনটি আর টেনে নিয়ে বেড়াননি রাজনীতিবিদেরা। অথচ ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দলের সরকার।
এরপরের ঘটনাগুলো ইতিহাসেরই অংশ। ২০০১ সালে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট করে রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বাদ নেয়। মন্ত্রী হন জামায়াতের দুই স্বাধীনতাবিরোধী নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তবে বার্ধক্যের কারণে রাজনীতি থেকে অবসরে চলে যান স্বাধীনতার বিরোধীকূলের শিরোমণি গোলাম আযম।
গোলাম আযমকে নিয়ে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে আজকের দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এই পর্যায়ে আজ কারা হেফাজতে নেওয়া হলো সেই গোলাম আযমকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সবচেয়ে বড় মাইলফলক রচনাও বলা চলে একে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের যে আন্দোলন, গোলাম আযমের কারা হেফাজতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তা কি কিছুটা পূর্ণতা পেল? আজ যদি শহীদ জননী বেঁচে থাকতেন!

তথ্যসূত্র: শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মারকগ্রন্থ, অবসর প্রকাশনী, প্রকাশকাল ১৯৯৫

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে