Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০২-১১-২০১৪

বিদায় নিলেন মার্কিন লোকসংগীতশিল্পী পিট সিগার

হাসান ফেরদৌস


বিদায় নিলেন মার্কিন লোকসংগীতশিল্পী পিট সিগার

৯৪ বছর বয়সে চলে গেলেন মার্কিন লোকসংগীতশিল্পী ও নাগরিক অধিকার কর্মী পিট সিগার। গলায় গান, হাতে ব্যঞ্জো, শুধু এই নিয়ে পিট সিগার ৭০ বছরের বেশি সময় লড়ে গেছেন। ‘আমি থামতে জানি না’, নিজের গানে পিট আমাদের বলে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তন আসবে, কিন্তু একদিনে নয়। সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন মানুষ ছোট-বড় অসংখ্য কাজ করছে, পরিবর্তন আসবে সেসব ছোট-বড় কাজের ভেতর দিয়েই।

গান ছিল তাঁর হাতিয়ার। নিজের আনন্দে এই গান নয়, এর লক্ষ্য প্রতিবাদ, নিজের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তোলা। অন্যকে নিজের সঙ্গে শামিল করে গাওয়া এই গান। চৌরাস্তার মোড়ে, স্টেডিয়ামে, ব্যারিকেডের সামনে, হাজার মানুষের সঙ্গে মিছিলে চলতে চলতে তিনি গান গেয়েছেন সব সময় সবাইকে নিয়ে। ‘যারা গানের কথা জানো, তারা আমার সঙ্গে গলা মেলাও, যেন তোমার প্রতিবেশী সে গান থেকে সাহস পায়’, পিট এ কথা প্রায়ই বলতেন। নিউইয়র্কে মার্টিন লুথার কিংয়ের স্মরণে এক অনুষ্ঠানে তাঁর গলায় প্রথম গুনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এই গানটি:

উই শ্যাল নট—উই শ্যাল নট বি মুভড, উই শ্যাল নট—উই শ্যাল নট বি মুভড। জাস্ট লাইক এ ট্রি, দ্যাট ইজ স্ট্যান্ডিং বাই দি রিভার, উই শ্যাল নট বি মুভড।
পিট নিজেও নদীর ধারের অবাধ্য গাছটির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। কিছুতেই নুয়ে পড়েননি। কমিউনিস্ট পিতা-মাতার সন্তান পিট ছাত্রাবস্থাতেই নাগরিক অধিকার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। হার্ভাডের ছাত্র ছিলেন, কিন্তু সুবিধাভোগীদের সেই বিদ্যালয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি পিট। পরে কমিউনিস্ট এই অভিযোগে মার্কিন কংগ্রেসের সামনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, কমিউনিস্ট সহযোগীদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকার করায় কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন তিনি। ‘আমেরিকান-বিরোধী’ এই অভিযোগ প্রকাশ্যে গান করায় নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে গান বাধার জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে পাড়ার পাদ্রির সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। আমেরিকার শত্রু, এই যুক্তিতে এবিসি টিভি তাঁকে লোকসংগীতের উৎসবে অংশ নিতে দেয়নি, যদিও সে লোক-উৎসবের প্রতিষ্ঠাতা তিনিই ছিলেন। ষাটের দশকে আমেরিকায় নাগরিক আন্দোলন দানা বাঁধার গোড়া থেকেই পিট সে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। মার্টিন লুথার কিংয়ের সঙ্গে লংমার্চে অংশ নিয়েছেন। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এনথেম হিসেবে পরিচিত গান ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ পিটের কারণেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়, এমনকি বাংলাতেও, সে গান রয়েছে। একাত্তরে সে গান আমরাও গেয়েছি।

গানের শক্তিতে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন পিট। ‘উই শ্যাল ওভারকাম: দি সং দ্যাট চেঞ্জড দি ওয়ার্ল্ড’, এই নামের শিশুপাঠ্য একটি গ্রন্থের ভূমিকায় পিট নিজেই লিখেছেন, ‘সবাই যখন একসঙ্গে গান ধরে, তখন আমরা বুঝি পরিবর্তন সম্ভব। কারণ গান ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে একত্র করে, তাদের কর্মযোগী করে।’ পিটের গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের একটি ‘হোয়ার অল দি ফ্লাওয়ার্স আর গন?’ কয়েক শ মানুষের সঙ্গে শোনার অভিজ্ঞতা আমার আছে। পিটের মৃত্যুর কয়েক দিন পর জাতিসংঘে শিক্ষকদের একটি সম্মেলনে আমাদের সে গান গেয়ে শোনান পিটের একসময়ের সঙ্গী পিটার ইয়ারো (বিখ্যাত ব্যান্ড ‘পিটার-পল-মেরির অন্যতম সদস্য)। তিনি এক লাইন গান, আমরা তাঁর সঙ্গে গলা মেলাই। যুদ্ধিবিরোধী গান, অথচ গানের শেষ স্তবকে আসার আগ পর্যন্ত বোঝা দুঃসাধ্য এই গানের রাজনৈতিক বার্তা।

‘ফুলগুলো সব কোথায় গেল? সে কবেকার কথা
ফুলগুলো সব কোথায় গেল? কত আগের কথা।
মেয়েরা এসে সব তুলে নিয়েছে। আহ, কবে
ওরা শিখবে?
মেয়েরা সবাই গেল কোথায়? সে কবেকার কথা।
গেল কোথায় মেয়েরা? সবাই গেছে বর খুঁজতে।
আহ, কবে ওরা শিখবে?
ওদের বরেরা গেল কোথায়? সে কবেকার কথা।
ওদের বরেরা গেল কোথায়? কত আগের কথা।
সবাই গেছে যুদ্ধে। আহ, কবে ওরা শিখবে?
সৈনিকেরা সব গেল কোথায়? কবেকার কথা।
সৈনিকেরা সব গেল কোথায়? কত আগের কথা।
তারা সবাই গোরস্তানে। আহ, কবে ওরা শিখবে?’

এই গানের প্রথম কয়েক স্তবক পিট সিগারের নিজের লেখা, বাকিগুলো অন্যরা বিভিন্ন সময়ে যুক্ত করেছেন। এই গানটির বাণী যুদ্ধবিরোধী, কিন্তু মার্কিন প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে তা ‘মার্কিনবিরোধী’—আন-আমেরিকান। গানটি সমঃস্বরে গাওয়া হলে পিটার ইয়ারো আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, তোমরা সবাই যে এই গানটি গাইলে, তার মূল কথা তোমাদের কাছে কী মনে হলো?’ উত্তরে কেউ কেউ বললেন, প্রতিবাদ, কেউ বললেন, যুদ্ধের প্রত্যাখ্যান। পিটার বললেন, ‘কেন, তোমাদের কাছে কি মনে হয় না, এই গান আসলে শান্তির কথা বলে?’

পিট সিগার বিশ্বের ৫০টির মতো দেশে গান গেয়ে শুনিয়েছেন। একাধিকবার মস্কো গেছেন, সেখানে রুশ লোকসংগীত গেয়ে ১০ হাজার শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন। হাভানায় গেয়েছেন হোসে মার্তির লেখা বিপ্লবী গান ‘গুয়ানতানামেরা’। যত লোক তাঁর গান শুনেছে, এক মার্কিন গবেষক বলেছেন, তাঁদের সংখ্যা যোগ করলে ৪০-৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছিলেন পিট। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। হলিউডেও তিনি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন সংগীতের ‘হল অব ফেম’-এ সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে। তাঁর নিজের কাছে প্রিয় সম্মাননা ছিল আমরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামার অভিষেকে গানের আমন্ত্রণ। ভ্রুস স্প্রিংস্টিনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সে অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছিলেন উডি গাথরির সেই অমর গান ‘দিস ল্যান্ড ইজ ইয়োর ল্যান্ড’।

পিট তাঁর জীবনের শেষ কয়েকটি বছর নিয়োগ করেছিলেন নিউইয়র্কের হাডসন নদীর পুনরুদ্ধারে। দীর্ঘদিনের অবহেলায় নদীটির পানি দূষিত হয়ে পড়ে, এর মাছ খাবার কথাও ভাবা যেত না। ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি এই নদী পুনরুদ্ধারে নেমে পড়েন পিট। এই নদীর পারে নিজ হাতে তৈরি করেন কাঠের বাড়ি, বনিয়ে নেন একটি কাঠের নৌকা। গান দিয়েই তিনি মানুষকে আহ্বান করলেন নদী বাঁচাতে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে প্রায় মৃত সেই নদীতে তিনি তাঁর পুরোনো শ্রীতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। একা নয়, সবাই মিলে এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে, বলতেন তিনি।

দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হয়েছিলেন পিট। চার বছর আগে নিউইয়র্কে পিট সিগারের নব্বইতম জন্মবার্ষিকীতে সে কথা স্মরণ করে ব্রুস স্প্রিংস্টিন মন্তব্য করেছিলেন, ‘পিট, সব কয়টা বদমাশ গেছে, কিন্তু তুমি এখনো দাঁড়িয়ে।’
তাঁর গান ও হাতের ব্যঞ্জো নিয়ে পিট পৃথিবী বদলাতে চেয়েছিলেন। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর গান রয়ে গেল আমাদের জন্য। পৃথিবী এখনো বদলায়নি, কিন্তু তেমন বদল যে সম্ভব, পিট আমাদের সে বিশ্বাসে উজ্জীবিত করে গেছেন।
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, নিউইয়র্ক

আমরা গেয়েছিলাম একসঙ্গে
কবীর সুমন

পিট সিগার... বললেন, ‘বাংলা গান গাওয়া যায় একটা? একটা বাংলা গান শিখিয়ে দেবে আমায়? এই যে এত বছর পরে আবার কলকাতায় এলাম, একটা বাংলা গান গাইতে পারলে ভালো হতো।’

আমি ওঁদের হোটেলের ঘরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গানটির প্রথম স্তবক পিট সিগারকে শিখিয়ে দিলাম। কর্ডচার্ট করে দিলাম। ওঁকে বললাম, প্রথম স্তবকটা তুমি গাইবে। আমি সঙ্গে থাকব। পরে গানটা আমিই গাইব। তুমি গিটার বাজাবে। উনি সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় কাগজে মোটা ফেল্ট পেন দিয়ে প্রথম স্তবকটা লিখে নিলেন। আমরা মহড়া দিলাম। সন্ধের অনুষ্ঠান চলছে। মঞ্চে হঠাৎ উনি আমার উল্লেখ করলেন। সাংবাদিক হিসেবে। তারপর মঞ্চে ডেকে নিলেন। নির্ঘণ্ট অনুযায়ী এমন হওয়ার কথা ছিল না। তবু উনি এটা করলেন। কারণ, উনি হক বুঝেছিলেন, আমাদের যুগলবন্দী নিয়ে কোনো রকম হাওয়া বওয়ানো হয়নি! এর পরের অনুষ্ঠানটি ছিল কলামন্দিরে। সেখানে ছিল গানের লেনদেন। উনি ওঁর একটা গাইছেন। আমি আমার একটা গাইছি। একেকটি বিষয় ধরে ধরে। এক ঐতিহাসিক ঘটনা! পিট সিগার পরে আমায় বলেছিলেন, ওঁর সারা জীবনে এমন অভিজ্ঞতা কোনো দেশে গিয়ে হয়নি যে, সে দেশের একজন সংগীতকার তাঁর ভাষায় গাইছেন আর তিনি তাঁর ভাষায় গাইছেন একের পর এক গান! গানের এহেন দেওয়া-নেওয়া ঐতিহাসিক। সমবেত কণ্ঠেও আমরা সে দিন গেয়েছিলাম একাধিক গান।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এবেলা পত্রিকায় প্রকাশিত কবীর সুমনের ‘দ্বিতীয়বার পিতৃহীন হলাম’ শিরোনামের লেখার অংশবিশেষ।

সংগীত

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে