Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৪ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (80 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-২০-২০১৪

বন্ধুর প্রয়াণে

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী


আমার জীবনের দীর্ঘতম বন্ধুত্বের স্মৃতি যাকে নিয়ে, সেই বন্ধু, যার সম্পূর্ণ নাম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। যার অনেক বেশি পরিচিতি ডাকনাম শেলী দিয়ে, এভাবে আমাকে শেষ চমক দিয়ে চলে যাবে, আমি কখনো ভাবতে পারিনি। সারা জীবন সে আমাকে অনেক চমক দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দুজনের এই পরিণত বয়সেও সে আমার আগে জীবন থেকে বিদায় নেবে, আমার কল্পনারও অগোচর ছিল এটা। তার স্বভাবেই ছিল চমক দেওয়া, সেই তার ছাত্রজীবন থেকে।

বন্ধুর প্রয়াণে

আমার জীবনের দীর্ঘতম বন্ধুত্বের স্মৃতি যাকে নিয়ে, সেই বন্ধু, যার সম্পূর্ণ নাম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। যার অনেক বেশি পরিচিতি ডাকনাম শেলী দিয়ে, এভাবে আমাকে শেষ চমক দিয়ে চলে যাবে, আমি কখনো ভাবতে পারিনি। সারা জীবন সে আমাকে অনেক চমক দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দুজনের এই পরিণত বয়সেও সে আমার আগে জীবন থেকে বিদায় নেবে, আমার কল্পনারও অগোচর ছিল এটা। তার স্বভাবেই ছিল চমক দেওয়া, সেই তার ছাত্রজীবন থেকে। আমরা দুজনেই ছিলাম কলকাতায়, প্রেসিডেন্সি কলেজে। সে থাকত প্রেসিডেন্সির মুসলমান ছাত্রদের হোস্টেলে। দস্তুরি নাম যা-ই হোক, আমরা সবাই জানতাম জিন্নাহ হল—এই নামে। আমি থাকতাম বউবাজারে টেইলর হোস্টেলে। অনেক পুরোনো সরকারি হোস্টেল। তবে কোনো জাঁকজমক ছিল না পরে হওয়া বেকার বা কারমাইকেল হোস্টেলের মতো। এক হোস্টেলে না থাকলেও শেলীর সঙ্গে সহপাঠীসুলভ ঘনিষ্ঠতা হতে কোনো বাধা ছিল না। ১৯৪৬ সালের কলকাতা ছিল এক দাঙ্গাপীড়িত অরাজকতম জায়গা। সেই দাঙ্গার ধাক্কায় আমি কয়েক মাসের জন্য বাস্তুচ্যুত হলাম। কারণ, টেইলর হোস্টেল তখন থেকে বিলুপ্ত। শেষমেশ অবশ্য আমিও, আমাদের আইএ পরীক্ষার মাস তিনেক আগে, জিন্নাহ হলেই থিতু হলাম। পরীক্ষা আদৌ দিতে পারব কি না, রীতিমতো অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ, কলেজে যাওয়া-আসাও বেশ ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

.যা হোক, পরীক্ষা হয়ে গেল। আর প্রায় পায়ে পায়েই এল সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও দেশভাগ। শেলীর সঙ্গে আমি একসঙ্গে বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড় বেড়াতে যাব, এমন একটি পরিকল্পনাও ছিল আমাদের। সে জন্য একধরনের প্রস্তুতিও ছিল আমার। কিন্তু দেশভাগের পর সবই এলোমেলো হয়ে গেল। শেলীর ক্ষেত্রে আরও বেশি রকম এলোমেলো হয়ে গেল। কারণ, ওরা ছিল মুর্শিদাবাদের লোক। ওর আব্বা ওকালতি করতেন জেলা শহরে। এবং একই সঙ্গে মুসলিম লীগও করতেন। দেশভাগের ধাক্কায় তিনি দেশ ছাড়লেন, রাজশাহীতে বসতি হলো তাঁর। আমি গৌড় যাত্রার আশা ছাড়লেও রাজশাহী গিয়ে শেলীর সঙ্গে দেখা করতে পারলাম। পরবর্তীকালে আমিও রাজশাহীর বাসিন্দা হয়েছি। আমরা দুজনেই কয়েক বছর একসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছি—শিক্ষকতার কাজ।
সাতচল্লিশের দেশভাগের কারণে আমাদের পক্ষে কলকাতায় আমাদের ছাত্রজীবন টেনে নেওয়ার সুযোগ রইল না। এর ফলে আমরা অনেকেই ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম। শেলী রাজশাহীতেই রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়ে দু-বছরের বিএ অনার্স শেষ করল। আমরা যখন ঢাকায় অনার্স তৃতীয় বর্ষে, সে তখন দু-বছরের অনার্স গ্র্যাজুয়েট হয়ে ঢাকায় এমএ প্রথম পর্বে ভর্তি হলো। যেদিন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে প্রবেশ করল, সে তখন রীতিমতো স্যুট পরিহিত। কলকাতা থেকে তৈরি স্যুট। ওকে দেখে একটু ঈর্ষা বোধ করছি। আমরা তখনো কেউ স্যুট পরার পর্যায়ে পৌঁছাইনি।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আমরা একসময় পাশাপাশি সিঙ্গেল রুমে থেকেছি। হলের ইউনিয়ন নির্বাচন এসে গেল। এই প্রথম জেলাভিত্তিক নির্বাচনী জোট গড়ার পুরোনো রেওয়াজ ভেঙে গেল। ছাত্ররাজনীতির নব্যরূপ তখন কেবলই দেখা দিয়েছে। আমাদের জোট থেকে শেলীকে মনোনয়ন দেওয়া হলো ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য। আর আমাকে দেওয়া হলো জেনারেল সেক্রেটারি পদ। নির্বাচনে আমরা জয়ী হলাম, তবে দুই সপ্তাহ পরেই বাজেট পাস করতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম আমরা। আমাদের প্রতিপক্ষ দুটি দল একজোট হয়ে আমাদের বাজেট ফেল করিয়ে দিল। সলিমুল্লাহ হলের ইতিহাসে এ এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। দুজনই ফিরে এলাম সাধারণ ছাত্রজীবনে। এমএ পরীক্ষায় দুজনেরই প্রত্যাশিত ফল—ফার্স্ট ক্লাস পেলাম।
এর পর থেকে আমরা যার যার নিজের পথ ধরেছি। আমরা কেউ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসিনি। ইতিমধ্যে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে জেলও খেটেছে কয়েক দিনের জন্য এবং পুলিশের খাতায় তার নামও উঠেছে। আমি ছিলাম তুলনামূলকভাবে অরাজনৈতিক। তাই আমার অসুবিধা হয়নি সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিলেত যাওয়ার। শেলীর অসুবিধা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সে-ও সব বাধা উড়িয়ে বিলেত গেল—অক্সফোর্ডে, আমারই কলেজে। আমার একটু হাত ছিল তার অক্সফোর্ডে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে।
আমি কখনো শিক্ষকতার বিকল্প কিছু ভাবিনি ক্যারিয়ার হিসেবে। শেলী কয়েক বছরের জন্য রাজশাহীতে শিক্ষকতা করলেও তার জন্য বিকল্প পথ খোলা ছিল। কারণ, অক্সফোর্ডে সে তার ডিগ্রি করেও পরে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি গ্রহণ করে। উকিল বাবার ছেলে ব্যারিস্টার হয়েও কেন শিক্ষকতা করবে। সুতরাং কয়েক বছরের শিক্ষকতার ইতি টেনে শেলী চলে এল ঢাকায়, হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করার জন্য। আইন ব্যবসায়ে মজবুত অবস্থানে যাওয়া সহজ নয়। সেটাও হয়ে গেল শেলীর মেধা ও পরিশ্রমের ফলে। এরপর, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার পথ ধরে হাইকোর্টের জজ হওয়ার মধ্যে বিস্ময় কিছু ছিল না। ’৯১-এর শেষে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলো, তখন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অস্থায়ীভাবে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব লাভ করলেন। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রধান বিচারপতিত্বের মেয়াদ শেষে তিনি নিয়মিত নিয়োগে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন।
আমার আসল চমক অপেক্ষা করছিল শেলীর জজিয়তির জীবনে লেখক-গবেষক জীবনের সূচনার মধ্যে। এরশাদ সাহেব হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে শেলীকে কিছুদিন বরিশালের হাইকোর্টে কাজ করতে হয়েছিল। হয়তো কাজের চাপ কিছুটা কম ছিল, তাই শেলী তখন জজিয়তির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় মন দিল। তার প্রথম কাজ যথাশব্দ নিয়ে সে আমার সঙ্গে কখনো কখনো আলাপ করেছে। বইটা তৈরি হওয়ার পর যে চমক, সেটা সে অব্যাহত রেখেছে এই শেষ দিন পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথের ওপর তার বইগুলো প্রতিটি ব্যতিক্রমধর্মী, রবীন্দ্রচিন্তা ও ভাবনাকে সে অনুসরণ করেছে বিষয় ধরে ধরে। এবং শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একজন প্রধান রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ পরিচয়ে। দীর্ঘকাল তার এ সম্ভাবনা বিষয়ে প্রায় অজ্ঞ ছিলাম আমি, যদিও রাজশাহী থাকতে আমার পূর্বমেঘ পত্রিকার জন্য আমি তাকে দিয়ে একটি গল্পের অনুবাদ করিয়েছিলাম। তার সঙ্গে আমার যে পত্রালাপ ছিল আমার অক্সফোর্ড জীবনে, সে সময় আমি তার চিঠিতেই তার সাহিত্যিক সম্ভাবনার দেখা পাই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথেই আবদ্ধ থাকেনি শেলী। তার পরবর্তী বইগুলোও সাক্ষ্য দেয়, কীভাবে সতত ক্রিয়াশীল ছিল তার সাহিত্যভাবনা।
একই সঙ্গে, কত দুঃসাহসিক ছিল তার সাহিত্যকর্ম। কোরানসূত্র এবং কোরানশরিফ: সরল বাংলা অনুবাদ, আমার ধারণায়, তার দুঃসাহসিকতার অন্যতম প্রমাণ। এই দুঃসাহসের উৎস কোথায়? আমার মনে হয়, বিস্তর পড়াশোনার মাধ্যমে অর্জিত তার অসম্ভব আত্মবিশ্বাসে। যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসে, তেমনি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এই বাংলাদেশ নিয়েও তার বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল দৃঢ়। সেই অর্থে সে ছিল একজন আপাদমস্তক আস্তিক্যবাদী। তার আস্তিকতা ছিল সর্বব্যাপী। দেশের সমস্যাকে সে কখনো খাটো করে দেখেনি, শেষ পর্যন্ত আস্থা রেখেছে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর। মাতৃভাষা বাংলার ওপর। সে কেবল নিজের মাতৃভাষা নয়, সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার কথা ভেবেছে। এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
সুতরাং তার মৃত্যুতে সব ব্যক্তি, সব মহল যে কথাটা বলেছে, দেশের ক্রান্তিকালে সে ছিল এক পরম আস্থা ও ভরসার কেন্দ্র। কথাটা একটুও মিথ্যা নয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শেলী দৃষ্টি রেখেছে সব ঘটনার ওপর। নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে রাখেনি, নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে বৃহত্তর জনসমষ্টির মধ্যে। সব জায়গায় যায়নি, সবার সঙ্গে মেশেনি, তবে নিজেকে সবার থেকে দূরবর্তীও করেনি। নিজের স্বাতন্ত্র্যকে একটুও খর্ব না করে সে সবার মধ্যে একজন, সবার জন্য একজন—এই পরিচয় রেখে গেল। বাংলাদেশ তাকে সহজে ভুলবে না।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে