Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৯ , ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (69 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৯-২০১৪

৬৬ বছর পর ঐতিহ্য ফিরে পেল কুমার নদী

রতন বালো


৬৬ বছর পর ঐতিহ্য ফিরে পেল কুমার নদী

ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি- ১৮ কিলোমিটার মৃত লোয়ার কুমার নদী খনন করে ৬৬ বছরের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হতে টেকেরহাট পর্যন্ত নতুন করে শুরু হয়েছে নৌ চলাচল।

বিশেষ করে ৮ ফুট ড্রাফটের নৌ-যান নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে। ফলে নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সাশ্রয়ী হয়েছে। স্থানীয়দের গৃহস্থালীর কাজে নদীর পানির চাহিদা মিটিয়ে কৃষি জমিতে সেচের সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। সব মিলে ভরাট হওয়া এ নদী এখন সচল নদীতে পরিণত হয়েছে।

রাজৈর ও টেকেরহাট উপজেলার মোস্তফাপুর, আপাসী, কবিরাজপুর, হরিদাসদী, শাখারপাড়, টেকেরহাট, বোলতলী, কংসুর গঙ্গারামপুর, কলিগ্রাম জলিলপাড়, মানিকদাহসহ প্রায় ২২টি গ্রামের প্রায় ১ কোটি মানুষের উপকার হয়েছে বলে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে।

ব্রিটিশ আমলে মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জে নৌ-পথ ছিল। ছিল নৌ-সার্ভিস। তা শুধুই অতীত হয়ে গিয়েছিল। কালের বিবর্তনে কুমার নদীর তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। হারিয়ে ফেলে নাব্যতা। ফলে এ অঞ্চলের এক সময়ের পাট শিল্প ও পাট বাণিজিক কেন্দ্র হিসেবে ঐতিহ্যবাহী চরমুগুরিয়া বন্দর সুখ্যাতিও হারিয়ে ফেলে।

৬৬ বছরের নৌপথের হারানো এ ঐহিত্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১১ সালে ১৪৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদারীপুর-চরমুন্ডরিয়া, টেকেরহাট ও গোপালগঞ্জ ২শ’ কিলোমিটার নৌ-পথ খনন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের ৫৫ দশমিক ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এতে করে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন স্থানীয়রা।
 
জানা গেছে, মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া, টেকেরহাট ও গোপালগঞ্জ নৌ-পথের আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা রক্ষা, বোরো সেচের উপযুক্ত পরিবেশ ও ৮ ফুট ড্রাফটের নৌ চলাচল উপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকার গত ২০১১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে খনন কাজ শুরু করে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন বাস্তবায়ন হলে নৌ-যান চলাচল করে দেশের আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলে এলাকাবাসীদের আশা।

দরপত্র অনুযায়ী, নদী খননের  মাটি দিয়ে নদীর দুই তীরে রাস্তায় তিন লেভেলে বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। যা আগামী ১০ বছরে খননের সমস্ত ব্যয় উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান।

ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কাজ হয়েছে ৩ বছর ১ মাস। এ সময়ে ১০টি প্যাকেজে ৫৫ দশমিক ৫০ ভাগ কাজ হয়েছে। ২০১৫ সালের জুন মাসে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

এ ব্যাপারে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, ‘বর্তমান সরকার আমলে নৌ-বিপ্লব ঘটিয়েছে। ৮৭০ কিলোমিটার নৌপথ আমরা খনন করেছি। ৬৬ বছর আগে লোয়ার কুমার নদী এখন সচল হয়েছে। এক সময় এখানে অজুর পানিও থাকতো না। বর্তমানে নৌ-চলাচল শুরু করছে।’

বিআইডব্লিউটিএ প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) আব্দুল মতিন বলেন, ‘এ দেশের পরিবহন সেক্টরে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা একটি সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু নাব্যতা সঙ্কটের কারণে ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্যবাহী নৌ-পথ আমরা হারাতে বসেছি। নৌ-পথের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে দেশের আবহমান ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারসহ সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। সে প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ নৌ-পথের নাব্য ফিরিয়ে এনে এ অঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।’

প্রকল্প পরিচালক ও অন্য সহ-প্রকল্প পরিচালকরা বলেছেন, ‘মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ নৌ-পথ খনন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদীর মাদারীপুর হতে মোস্তফাপুর পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার, চরমুগুরিয়া থেকে ওআইসি পলি পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার, লোয়ার কুমার নদীর মোস্তফাপুর হতে টেকেরহাট প্রায় ১৮ কিলোমিটার এবং মধুমতি নদীর টেকেরহাট হতে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কিলোমিটার অর্থাৎ প্রায় ৬৫ কিলোমিটার নৌ-পথের ড্রেজার দ্বারা ড্রেজিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।  

এসব প্রকল্পের আওতায় মাদারীপুরের রাস্তী ইউনিয়নের রূপরাইয়া এলাকায় নদী খননের পলি মাটি লক্ষীগঞ্জ, রূপরাইয়া নামক বাওরে ফেলার ফলে বাওরের প্রায় ৭৫-৮০ একর অনাবাদি জমিকে আবাদি জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া নদীর ড্রেজিং করা বালু মাটি পাঠককান্দি হিন্দুদের তীর্থস্থান, মাদারীপুর পৌরসভার কবরস্থান (ইয়ার হাওলাদার জুট মিলের মধ্যে), ইউনাইটেড ইসলামিয়া স্কুল, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স এর নীচু জায়গা, শীল্পকলা একাডেমী নিচু জায়গা, নাজিম উদ্দিন কলেজ মাঠ, পাবলিক স্কুল মাঠ, মোস্তফাপুরের মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান কলেজ মাঠ, মোস্তফাপুর কৃষি মার্কেট, ঘটক চর বাজার এলাকা, কুকরাইল মসজিদ ও মাদ্রাসার নীচু জায়গা, চরমুগুরিয়ায় গরুর হাট, চরমুগুরিয়ায় ঈদগাহ মাঠ ও গার্লস স্কুলের মাঠ, নয়ারচর গুচ্ছ গ্রামের নীচু জায়গা, চরমুগুরিয়ায় শিপ পার্সোনেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের নিচু জায়গা, গাছবাড়িয়ায় ৩টি ও নয়ারচরের ১টি মসজিদের নীচু জায়গা, গাছবাড়িয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পতিত প্রায় ২০ একর নীচু জায়গা, চোদ্দার ব্রিজ এলাকায় মসজিদ, মাদরাসা ও প্রাইমারি স্কুলের মাঠ ভরাট করে ভূমি উন্নয়ন করা হয়েছে।

অপরদিকে মধুমতি নদী খনন করা ড্রেজিংয়ের বালি মাটি গোপালগঞ্জেন মোকসুদপুর উপজেলার গঙ্গারামপুর প্রাইমারী স্কুলর মাঠ, কলিগ্রাম গির্জার নিচু জায়গার প্রায় ১০ একর অনাবাদি জমি আবাদী জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া কলিগ্রাম খ্রিস্টান কবর স্থান, তালবাড়িয়া হিন্দুদের মন্দিরের নিচু জায়গা, কলিগ্রাম গরিব লোকের বসতি স্থানের পাশ দিয়ে নিচু জায়গাসমূহ ও গঙ্গারামপুর, কংশুর, সাতপাড় এলাকায় পাউবো’র প্রায় ২৭ একর রাস্তার পাশে নিচু জায়গা, কনপাড়া পূর্ব নিদ্রা গ্রাম খেলার মাঠ, আশ্রয় কেন্দ্র, বৈলতৈলী বাজার সংলগ্ন ৮২ পরিবারের নিচু জায়গা ভরাট করে ভূমি উন্নয়ন করা হয়েছেও বলে জানা গেছে।

আপার কুমার নদী খনন করা ড্রেজিংয়ের বালি পাড় হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল, মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ, রাস্তার দুই পাশে নিচু, শাখার পাড় ভাঙ্গনরোধে মাটি ফেলা হয়েছে। হরিদাসদী মাতবর বাড়ী কবর স্থান, মহেন্দ্রদী উচ্চ বিদ্যালয়, পশ্চিম মহেন্দ্রদী মুন্সিবাড়ী কবর স্থান, হরিদাসদী গ্রামের রাস্তার দুই পাশে নীচু জায়গা, ভাটিয়াকান্দি গ্রামের রাস্তার দুই পাশে নীচু জায়গা, পশ্চিম মহেন্দ্রদী রাস্তার দুই পাশে নীচু জায়গা, হরিদাসদী, ভাটিয়াকান্দি, পশ্চিম মহেন্দ্রদী গ্রামের ডোবা, নালা, নিচু জায়গা ভরাট করে ভূমি উন্নয়ন করা হয়েছে।  

মৃত লোয়ার কুমার নদী খননের ফলে নদীতে প্রয়োজনীয় গভীরতায় সারা বছর পানি থাকায় মাছের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মৎসজীবী0রা সারা বছর মাছ শিকার করে তাদের স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি করতে পেরেছেন। এবং নদীর গভীরতা থাকায় বর্ষাকালে পানি নদীর দুই পাড় উপচিয়ে প্রবাহিত না হওয়াতে বন্যার প্রকোপ  হ্রাস পেয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে ফসল, আবাসন ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস এবং পরিবেশের ভারসম্য রক্ষা পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান।

পরিবেশ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে