Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.3/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৭-২০১৪

তারকা সত্ত্বাকে ত্যাগ করার অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি লাগে

রাইমা সেন


সুচিত্রা সেনের ৮১ তম জন্মদিন উপলক্ষে রাইমা সেন একটি লেখা লিখেছিলেন সুচিত্রা সেনকে নিয়ে। লেখাটি একটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিলো। সেই লেখাটি ভাষান্তর করে পাঠকের জন্য প্রকাশ করা হলো...

তারকা সত্ত্বাকে ত্যাগ করার অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি লাগে
দিদিমা সুচিত্রা সেনের কোলে নাতনী রাইমা সেন

দিদিমা সুচিত্রা সেনের জন্মদিনে বড় কোন আয়োজন হয় না। এদিন আমরা একত্রিত হই বালিগঞ্জের বাড়িতে। লাঞ্চের জন্য চাইনিজ আর ডিনারের জন্য ছোটে নবাব থেকে মোঘলাই অর্ডার করি। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি মানুষের সম্মুখ থেকে দূরে। কিন্তু মানুষ আমাদের কিংবদন্তি দিদিমা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। জানতে চায় কেন তিনি এমন অন্তরালের জীবন বেছে নিলেন?

এভাবে নিজের তারকা সত্ত্বাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করার জন্য অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি লাগে। আমরাও তাই দিদিমার প্রাইভেসিকে সম্মান করি। বিস্ময়কর ব্যপার হলো, আমরা দিদিমা’র সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ কখনো খুঁজে দেখিনি। আমার কাছে তিনি শুধুই আম্মা। ঘরে থাকার সময় যে মানুষটির চারপাশে ঘুরতে আমার ভালো লাগে।

ছোটবেলায় আমি আর রিয়া সাপ্তাহিক ছুটির সময় তার বাসাতেই কাটাতাম। কখনোবা আবার স্কুলের পর তাকে নিয়ে বাইরেও যেতাম। কলকাতা এসি মার্কেটে মাঝে মাঝে ছোটখাটো জিনিস যেমন পেন্সিল বক্স, ইরেজার কিনতে যেতাম। দিদিমা তখন সানগ্লাস পরতেন। তার মুখের তিন-চতুর্থাংশই তখন ঢাকা যেত। তিনি তখন শাড়ি অথবা সালোয়ার কামিজ পরতেন। মাথার উপর থাকত দোপাট্রা। এতসব সত্ত্বেও অনেকে তাকে চিনে যেত, অটোগ্রাফ চাইত।

তরুণ বয়সে আমরা অনেকগুলো সুন্দর নারী বেষ্টিত হয়ে থাকতাম। আমার সুপারস্টার দিদিমা তো অবশ্যই, ছিল আমাদের মা, গায়ত্রী দেবী (দাদি), এবং কোচবিহার ও জয়পুরের রাজকীয় পরিবারের মহিলারা। আমার মাকে ফিল্ম শুটিংয়ের জন্য ড্রেস পরার সময় দেখতাম। আমাদের পেশা পছন্দ হয়ে যায় তখনই। এই কাজটির গ্ল্যামারে আমরা মুগ্ধ হতাম।

কয়েক বছর পর যখন আমি চলচ্চিত্র জগতে পা রাখলাম, তখন তার সিনেমাগুলো দেখতাম আর প্রতিটা ফিল্মের মর্যাদা মাহাত্ম বুঝতে শুরু করলাম। তার চরিত্রগুলো মানুষের মনে এত গভীরভাবে দাগ কেটেছে যে তার কাছাকাছি কিছুও কখনো করতে পারবো না। বড় ব্যপার হলো তিনি সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে বিশাল সফলতা পেয়েছেন। যেটা অনুপ্রেরণার বড় উৎস।

আমার দিদিমার সিনেমাগুলোর মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭), ‘সাত পাকে বাঁধা’ (১৯৬৩), ‘দত্ত’ (১৯৭৬) এবং হিন্দি ভাষার ‘আঁধি’ (১৯৭৫)। প্রতিটা ফ্রেমেই আশ্চর্যরকমের উপস্থিতি; তার নাটকাভিনয় পুরো মনোযোগ কেড়ে নেয়। তার সাহসী কিন্তু নিয়ন্ত্রিত পারফর্মেন্স অভিনয়ের বড় শিক্ষা দেয়। আঁধিতে আরতি দেবী চরিত্রটি আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয়। কুতর্ক এবং সুরুচিপূর্ণতা একইসাথে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা কঠিন।

এতদিন ধরে তিনি আমার অভিনীত কোন সিনেমা দেখেননি। এর মাঝে টিভিতে ‘অনুরণন’ যখন প্রচার হয়, তখনই প্রথম দেখেছেন। তারপর তিনি আমাকে জানিয়েছেন ফিল্মে আমাকে তার পছন্দ হয়েছে। এরপর ছবিটি তিনি আরো চারবার দেখেছেন। আমাকে বললেন টনি দা’র সাথে যেন আরো কাজ করি। ( টনি: অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী, অনুরণন ছবির নির্মাতা)। যখন তিনি আমার আরো কিছু সিনেমা দেখতে চাইলেন আমি তাকে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘নৌকাডুবি’ দেখালাম। তিনি এটিও পছন্দ করেছেন।
                     

দিদিমা ‘নৌকাডুবি’ এবং ‘চোখের বালি’ দুটো সিনেমারই টেক্সট দেখে দিয়েছেন আমাকে। এগুলোর চরিত্র বুঝতে সাহায্য করেছেন। আমি যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে কাদম্বিনি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন তিনি আমাকে বোঝালেন আমার চরিত্রটা নৌকাডুবি’র হেমনলিনী থেকে কীভাবে আলাদা।

রাইমা সেনএকদিন আমার একটি শুটের কিছু ফটো দেখিয়েছি তাকে। তিনি মন্তব্য করলেন, ছবির ফ্রেমে আমার হাত খুব স্পষ্টভাবে রাখা ঠিক নয়, কারণ এতে করে মুখ থেকে মনোযোগটা চলে যায়। তিনি আমাকে আরো একবার অভিনয়ের টিপস দিলেন। এবং বেশ মজা করে তার অতীত দিনের কথা উল্লেখ করলেন; এর মধ্যে আছে উত্তম কুমারের সাথে করা তার সাড়ে চুয়াত্তর, সাগরিকা, পথে হলো দেরি, চাওয়া পাওয়া, সপ্তপদী সিনেমাগুলোর কথা। উত্তম কুমার এবং দিদিমা সংলাপ ডেলিভারি দিতে গিয়ে সবসময় একে অপরকে তুলে ধরতেন । ওই সময়ে অভিনয়ের জন্য একাগ্রতার পাশাপাশি অনেক কষ্ট করতে হতো। তার ফিল্ম সেটে কাউকে ঢুকতে দেয়া হত না। আমার মনে হয় মানুষও তাকে সংরক্ষিত ভাবত।

কয়েক বছর আগে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি নিজে গিয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে চাননি। প্রায়ই আমরা তাকে বলি আমাদের সাথে মুম্বাইতে আসতে। তিনি আসবেন ও বলেন। তবে আমরা জানি এমনটি কখনো হবে না। তিনি আসলে মুম্বাইকে পছন্দ করেন না। যদিও মাঝে মাঝে তার আঁধি’র সহ অভিনেতা সঞ্জিব কুমারের কথা বলেন। তিনি কখনোই মুম্বাইকে আপন করে নিতে পারেননি। তিনি সবসময় কলকাতাকেই ভালোবেসেছেন।

এখন তিনি আমাদের পাশের বাসাতেই থাকেন। যখন আমরা কলকাতায় থাকি তখন একসাথেই খাবার খাই। আমি তার কাছে অভিযোগ করি যে তার কাছে আসলেই আমার ওজন বেড়ে যায়। কারণ তিনি আমাকে শুধু খাবার খাওয়াতে থাকেন। দিদিমা ডায়েট করা নিয়ে আমাকে কখনোই কিছু বলেন না। কিন্তু নিয়মিত জিমে যাওয়ার জন্য বলেন। তিনি ডাক্তার আর কয়েকজন আত্মীয় ছাড়া কারো সাথে দেখা করেন না। কিন্তু তিনি খুবই ধারালো চিন্তার মানুষ। চারপাশে যা ঘটছে সবই জানেন।

ক্ষুধার্তের মত দিদিমা শুধু পড়েন, অধিকাংশই বাংলা সাহিত্য। অনেক সময় ব্যয় করেন পূজা করে। আম্মা প্রায়ই বলেন, আমি দেখতে তার মত হয়েছি। তার ছোট পুতুল হতে পেরেই আমি অনেক খুশি।

লেখক : রাইমা সেন। অভিনেত্রী ও সুচিত্রা সেনের নাতনি।
ভাষান্তর: সিয়াম আনোয়ার।

 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে