Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ , ৯ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.5/5 (22 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৭-২০১৪

একটি রহস্যোপন্যাস

সিয়াম আনোয়ার


একটি রহস্যোপন্যাস

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। রাতভর তার মরদেহ’র পাশে বসেছিলেন তার আত্মীয়-পরিজনরা। ছিলেন দুই দশকের চলচ্চিত্র জীবনের সঙ্গী সুচিত্রা সেনও। সেদিন উত্তমকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়েছিল এই পৃথিবী।

অনেকটা সেই দিনটিতেই যেন বিদায় নিলেন সুচিত্রা সেনও। উত্তমের শেষ শয্যার পাশ থেকে উঠে ফিরে গেলেন কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ২৪/৪/৪ ঠিকানার বাড়িতে। সেই যে আড়ালে গেলেন, তারপর ফিরলেন মাত্র একবারই। ১৯৮২ সালের কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহের সীমিত পরিসরে জমায়েতে অল্পসংখ্যক মানুষের সামনে উপস্থিত সুচিত্রা। সে-ই শেষবারের মত। এরপর থেকে আর কখনো জনসম্মুখে আসেন না মহানায়িকা। প্রতীক্ষা তখন থেকেই।

কেমন আছেন সুচিত্রা, কী ভাবছেন? এখন দেখতেই বা কেমন হয়েছেন? দিনে দিনে মানুষের মাঝে কৌতুহল বাড়ে। জিজ্ঞাসার সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু কোন উত্তর নেই।

বছর কয়েক পরে হঠাৎ একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়। ভারত সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য ছবি তুলছে। ছবি তুলতে আসবেন সুচিত্রাও।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবারও নানান জল্পনা-কল্পনা চারিদিকে। নির্ধারিত দিনে ছবি তোলার কেন্দ্রে হাজির উৎসুক জনতা, সাংবাদিকরা। সকাল থেকে অপেক্ষা -কখন আসবেন মহানায়িকা, কীভাবে আসবেন?

সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা। সুচিত্রা আর আসেন না। হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে যায় ভক্ত-কৌতুহলীরা। পরে খবর বেরোয়, সুচিত্রা সেন সেদিন ছবি তুলতে এসেছিলেন। কঠোর গোপনীয়তায় ছিল সেই আগমন-গমন। উপস্থিত সবাইকে কোন এক সম্মোহনে ফেলে ফাঁকি দিয়েছেন জাদুর নায়িকা। এলেন, কিন্তু দেখল না কেউই। আড়ালের মানুষ থেকে গেলেন আড়ালেই।

কতটা আড়ালে ছিলেন সুচিত্রা?
এর পর থেকে সুচিত্রা লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন কাটাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তাঁকে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মেয়ে মুনমুন, মেয়ে জামাই,আর দুই নাতনি রাইমা, ও রিয়া সেন ছাড়া কেউ তাঁকে আর দেখেনি। কিন্তু কেন? কেন এই অন্তরালে একাকী নিভৃতে বসবাস?

অন্তরালে থাকার জন্য সুচিত্রার তীব্র চেষ্টা দেখা যায় ২০০৫ সালের এক ঘটনায়। সে বছর আজীবন সম্মাননায় দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনিত হয়েছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু অন্তরাল থেকে বের হয়ে মানুষের সামনে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণে তিনি অস্বীকৃতি জানান। এরপর পুরস্কার থেকে তার নাম প্রত্যাহার করা হয়। তবুও চেষ্টা চালিয়েছিল ভারত সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ফালকে পুরস্কার প্রদানের আটত্রিশ বছরের নিয়ম বদলানোর চিন্তা ভাবনা করছিল। তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সি বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করেছিলেন। নিয়ম বদলানো সম্ভব হলেও তিনি আর পুরস্কার নিতে যাননি।

গত বছর একটি টিভি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুনমুন সেন আর তার দুই মেয়ে রাইমা-রিয়া। সুচিত্রা সেন কেমন আছেন, কীভাবে সময় কাটান জিজ্ঞেস করা হলে কোন জবাব দেননি তারা। সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন প্রসঙ্গ। রাইমা রিয়া কখনো কোন সাক্ষাৎকারে ভুলেও দিদিমা সম্পর্কে একটা কথা বলেন না।

সংবাদমাধ্যম সুচিত্রার খবরের জন্য বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেও তার নাগাল পায়নি। যারা সুচিত্রার দেখা পেতেন তারা ছিলেন সবসময়ই চুপ। দুই বছর আগে দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার কলকাতা প্রতিনিধির পাঠানো এক রিপোর্টে বলা হয়, সুচিত্রার ২৪/৪/৪ বাড়িটির এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘২০০৫ সালে যখন এ ফ্ল্যাটের জন্য চুক্তিবদ্ধ হই, তখন প্রথমেই শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিল, সুচিত্রা সেনকে নিয়ে বাড়তি কৌতুহল প্রকাশ করা যাবে না এবং এ সংক্রান্ত খবর বাইরে পরিবেশনও করা যাবে না। শুধু তাই নয়, বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের পর্যন্ত প্রচার মাধ্যমে কথা বলা নিষেধ।”

সময় কাটত কীভাবে?
বালিগঞ্জের বাড়িটিতে একা থাকতেন সুচিত্রা। মেয়ে নাতনীরা নিজেদের মত করে আলাদা। বিভিন্ন সময় পত্রিকান্তরে জানা যায় বছর কয়েক আগেও ঘরে বসে টিভিতে নিজের ছবিগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখতেন। তবে গত কয়েক বছর রামকৃষ্ণ মিশনের হেডকোয়ার্টার বেলুর মঠ-এ গিয়ে অনেক সময় পূজা-অর্চনা করে সময় কাটাতেন।

আনন্দবাজার পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্ব সংক্রান্ত বিবিধ সমস্যায় সহায়তা পেতে লিখিতভাবে ফরম পূরণ করে কলকাতা পুলিশের একটি প্রকল্পে নাম লিখিয়েছেন সুচিত্রা। ‘প্রণাম’ নামের এই প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তবে এই প্রকল্প থেকে কখনো কোন সহায়তা নিয়েছেন বলে জানা যায়নি।

আড়ালে থাকার কারণ কী?
কলকাতার স্বনামধন্য সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র এক স্মৃতিকথায় একটা ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। কলকাতা দূরদর্শনে ‘সাত পাকে বাঁধা’য় সুচিত্রা সেনের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে ফোন করেছিলেন কণা। ততদিনে সুচিত্রা চলচ্চিত্র থেকে বহু দূরে। কণা ফোনে তাকে বললেন ‘সাতপাকে বাঁধায় আপনার অভিনয় দেখে আমি আপ্লুত..অসাধারণ। সুচিত্রা সেন কণাকে থামিয়ে বললেন ‘ওটা অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন, আমি নই।’
অভিনয় ক্যারিয়ারে একবার সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা বলেছিলেন’ ‘আমাকে শুধু স্ক্রীনেই দেখা যাবে, কারণ আমি একজন অভিনেত্রী।’

লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজের ইন্ডিয়ান কালচারস এন্ড সিনেমার অধ্যাপক ব্যখ্যা করেছেন কেন সুচিত্রার মত তারকা আড়ালে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি বলেন, “এখানে দুটি কারণ থাকতে পারে। একটা হচ্ছে, যারা খুবই সুন্দর। নিজেদেরকে তারা বয়স্ক দেখতে অপছন্দ করেন। সম্ভবত তাদের এই পরিবর্তনকে তারা আমাদের চেয়েও কঠিনভাবে নেন। আর দ্বিতীয় কারণ এমন হতে পারে যে,  তারা হয়তো নিজেদের যে সৌন্দর্য মিডিয়া বা মানুষের কাছে ছড়িয়েছে সেটি থেকে আলাদা থাকতে চায়। পুরনো নিজেকে শেষ করে ফেলে পুরনোতেই। আর এটাতো খুবই স্বাভাবিক কেউ তার একান্ত জীবন বা দাম্পত্যকে গোপন করেই। সুচিত্রার ক্ষেত্রে হয়তো এমনই কিছু একটা হয়েছে।`
 
তার মায়াবী লক্ষ্মী টেরা চোখ, মায়া ভরা মুখ, লজ্জাবতী হাসি, সময় এর আবর্তে আজ হয়তো হারিয়ে গেছে। বয়স হয়েছে অনেক। কিন্তু দর্শক তাঁকে যেভাবে চিনতো ঠিক সেভাবেই মনের মনি কোঠায় লালন করুক এই চিন্তা থেকে সুচিত্রা বোধ হয় কারো সামনে আর আসেন না।

অমীমাংসিত রহস্যোপন্যাস
বাঙালি মিসির আলী পড়েছে, মাসুদ রানা পড়েছে। জগদ্বিখ্যাত শার্লক হোমস ও পড়েছে। রহস্য আর রহস্য। সব রহস্যই খুলেছে। খুলেনি শুধু সুচিত্রা সেন রহস্যের জাল। কেন তিনি এতটা আড়ালে থাকলেন। নানান মানুষ নানান ভাবে বিশ্লেষণ করলেন, নানান কথা বললেন। কিন্তু আসল রহস্যটি শেষ পর্যন্ত অজানাই থেকে গেল। সুচিত্রা সেনের অন্তরালে বাস শেষ পর্যন্ত একটি ‘অমীমাংসিত রহস্যোপন্যাস’ হয়েই থাকল।

 

 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে