Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ , ১২ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.3/5 (19 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৭-২০১৪

সংলাপেই সমাধান ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

সৈয়দ আনাস পাশা


সংলাপেই সমাধান ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

লন্ডন, ১৭ জানুয়ারি- ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিষয়ক এক দীর্ঘ বিতর্কের উপসংহারে বলা হয়েছে- সহিংসতা বা রাজনৈতিক হয়রানি নয়, একমাত্র সংলাপেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক বিরোধের সমাধান নিহিত রয়েছে।

বিতর্কে অংশ নেওয়া এমপিদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ফরেন অফিস মিনিস্টার ডেভিড লিডিংটন বলেন, ইতিবাচক সংলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচনের পর পরই সিনিয়র ফরেন অফিস মিনিস্টার ব্যারোনেস ওয়ার্সি বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ব্রিটেনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।

সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচনী নিয়মকানুন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে স্বীকার করে ব্রিটিশ ফরেন অফিস মিনিস্টার বলেন, তবে এই নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি আসনে জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের কোনো সুযোগ পাননি। আর যেসব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। ব্রিটেনের হতাশা এখানেই।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান কী, কয়েকজন এমপির এমন প্রশ্নের জবাবে ফরেন অফিস মিনিস্টার বলেন, বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকার মাত্র ১২ জানুয়ারি শপথ নিয়েছে। এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

লিডিংটন বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্রিটেনের মনোভাব সম্পর্কে আমি পার্লামেন্টকে জানাতে চাই, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও চলমান অস্থিতিশীল রাজনীতি বিষয়ে ব্রিটেনের অবস্থান বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষের কাছেই পরিস্কার।

তিনি বলেন, ইতিবাচক সংলাপের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সব রাজনৈতিক দলকে ভূমিকা রাখতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে সহিংসতার তীব্র বিরোধী আমরা।

রাজনৈতিক হয়রানি সম্পর্কে তিনি বলেন, রাজনৈতিক হয়রানির মাধ্যমে বিরোধীদলকে মোকাবেলাও আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ফরেন অফিস মিনিস্টার ডেভিড লিডিংটন বাংলাদেশ সম্পর্কে তার সরকারের অবস্থান সম্পর্কে বলেন, আমাদের এই অবস্থান বাংলাদেশের বিবদমান উভয় রাজনৈতিক পক্ষকে আমরা বার বার জানান দিচ্ছি। ইতিবাচক সংলাপের কথা আমরা বার বার বলে আসছি; যে সংলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতি থেকে দেশটির জনগণকে বের করে নিয়ে আসা যায়।

নির্বাচনকালীন সময়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়াসহ ব্যাপক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, অস্থির রাজনীতি ও সহিংসতার কারণে বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতি যে বার বার হোঁচট খাচ্ছে, এটি যদি বাংলাদেশের রাজনীতিকরা না বোঝেন, তাহলে তা খুবই দুঃখজনক! নির্বাচন পরবর্তী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বিষয়ে এমপিদের উদ্বেগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে লিডিংটন বলেন, শুধুমাত্র ‘সংবিধান’ ও কথায় ‘সেক্যুলার’ গণতন্ত্রের কথাই আমরা বার বার শুনে আসছি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মুখে। কিন্তু রাজনৈতিক মতদ্বৈততার কারণে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, এটি বুঝতে হবে এসব হামলার সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক দলের কর্মীদের।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে দেশটির সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়, একজন এমপির এমন আহ্বানের সঙ্গে একমত পোষণ করে ফরেন অফিস মিনিস্টার বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশটির সাধারণ মানুষের কোনো দায় নেই। এর দায় রাজনৈতিক দলগুলোর। এই দায় স্বীকার করেই দেশটির গণতান্ত্রিক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ইতিবাচক সংলাপে বসতে হবে।

বাংলাদেশ ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মন্তব্য করে ডেভিড লিডিংটন বলেন, শুধুমাত্র কমনওয়েলথ সদস্যভুক্ত দেশ হিসেবেই নয়, ব্রিটিশ সোসাইটিতেও স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির রয়েছে বিরাট অবদান।

বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ব্রিটেনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে ফরেন অফিস মিনিস্টার লিডিংটন বলেন, দেশটির একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য ব্রিটেন সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থা ও দেশটিতে ব্রিটেনের উন্নয়ন কর্মসূচি বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে  লিডিংটন বলেন, বাংলাদেশের জনগণের সমৃদ্ধির জন্য শুধুমাত্র অনুদান নয়, দেশটির সঙ্গে রয়েছে ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক। বাংলাদেশে রয়েছে, ব্রিটেনের প্রায় দুই বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগ।

এ ছাড়া ব্রিটেনের প্রায় ১০০টি কোম্পানি বাংলাদেশে সফলভাবে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তিনি বলেন, ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আগের সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আর এই মুহূর্তে ব্রিটেন হলো বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস ও সীফুড ক্রেতা দেশ।

বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের সহযোগিতার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ফরেন অফিস মিনিস্টার বলেন, ব্রিটেন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অনুদান দাতাদেশ। ২০১৩-১৪ সালে এর পরিমাণ ছিল দুইশ ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড।
 
এর আগে বিতর্কের সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশ বিষয়ক অলপার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ার সরকারদলীয় এমপি আনমেইন বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ম-কানুন মেনে অনুষ্ঠিত হলেও দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, নির্বাচনে ভোটারদের সম্পৃক্ততা আশাব্যঞ্জক ছিল না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিরোধীদলীয় দাবি বিষয়ে একজন এমপি’র মন্তব্যের জবাবে আন মেইন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি যে, পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য ছিল, তা কিন্তু ঠিক নয়।

তিনি বলেন, ২০০৬ সালে এ পদ্ধতিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আস্থাহীনতাই তার প্রমাণ।

আলোচনায় অন্যান্য এমপিরা বিগত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাপক প্রাণহানি, সহিংসতা, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত  রয়েছে, তা থমকে যেতে বাধ্য। শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন (এমডিজি), অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্জনগুলোর প্রশংসা করে বিতর্কে অংশ নেওয়া ব্রিটিশ এমপিরা বলেন, একমাত্র রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই এই অর্জনগুলোকে নিরাপদ রাখতে পারে। নিজেদের ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থকে পেছনে রেখে প্রধান দুই নেতাসহ রাজনৈতিক নেতারা যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারেন, তবেই সম্ভব সাম্প্রতিক এই অর্জন ধরে রাখা।

ডেপুটি স্পিকার লিন্ডসে হলির সভাপতিত্বে বিতর্কে অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন রোশনারা আলী, এমপি, জেরিমি করভিন, এমপি, জিম ফিটজ পেট্রিক, এমপি, রেহমান চিশতি, এমপি, মার্ক ফিল্ড, এমপি, নিক ডি বয়েস, এমপি, জনাথন আশওয়ার্থ, এমপি, মার্ক লেজারোউইজ, এমপি, নিক ডাকিন, এমপি, জিম কানিংহাম, এমপি, মার্টিন হারউড, এমপি, সায়মন ডানজাক, এমপি, গেভিন সুকার, এমপি, কেরী মেককার্থি, এমপি, নেইল পারিস, এমপি, বব ব্লেকম্যান, এমপি ও রিচার্ড ফুলার এমপি প্রমুখ।

দীর্ঘ প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এ বিতর্কে অংশ নেওয়া সব এমপিই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ছিলেন এককাট্টা সোচ্চার।

তারা সাম্প্রদায়িক এ হামলা চিরতরে বন্ধে বাংলাদেশ সরকারকে আরো সক্রিয় হতে চাপ প্রয়োগের জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে মোশন
এদিকে, বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টও দুটো মোশন আনা হয়েছে বৃহস্পতিবার।

চার্লস টেনক এমইপি ও পাওয়েল রবার্ট কোয়ালের আনা দুটো মোশনের ওপর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আলোচনা হয়েছে। মোশনে বাংলাদেশে বিরাজমান সহিংসতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন মোশন উত্থাপনকারী দুই এমইপি।

মোশনে বলা হয়, বছরব্যাপী অব্যাহত সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গেই মূলত বিরোধীদল ও ধর্মীয় চরমপন্থীরাই জড়িত।

উত্থাপিত মোশনের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণকারী এমইপিরা বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইতিবাচক সংলাপের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সম্ভাবনাময় দেশটির উন্নয়নমূলক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। আর এই স্থিতিশীলতা সহিংসতা বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করে যে সম্ভব নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিকরা এ বিষয়টি যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, ততই মঙ্গল।

মোশনে যে বিষয়গুলোর প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, তা হলো- ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানানো ও প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করা; সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে সংলাপে বসতে উৎসাহিত করা; গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে সব পক্ষকে রাজি করানো; দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজি উৎসাহিত করা; বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতারে উদ্বেগ প্রকাশ ও সহিংসতার সঙ্গে বিরোধীদলীয় কর্মীদের জড়িত থাকায় নিন্দা জানানো, গণগ্রেফতার বন্ধ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে বিরোধীদলকে বাধা না দিতে বাংলাদেশ সরকারকে রাজি করানো; ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ আদায়ে চেষ্টা চালানো ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মামলার সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেওয়া ইত্যাদি।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে