Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ , ৪ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (21 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-০৭-২০১২

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে জয় – পরাজয়ের নৈপথ্য!

মোঃ হাবিবুর রহমান খান


কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে জয় – পরাজয়ের নৈপথ্য!
অধ্যক্ষ আফজল খানের পরাজয়ের নৈপথ্য!

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী  কুমিল্লা (দ.) জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম আহবায়ক প্রবীন বর্ষিয়াণ নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান ৯ মেয়র প্রার্থীর চেয়ে প্রবীণ ও যোগ্যতা মাপকাঠিতে সবচেয়ে বেশী থাকলেও জীবনের শেষ বয়সে এ নির্বাচনে পরাজয় বরণ করে নিয়েছে এ ব্যর্থতা কার? এটাই এখন নগরবাসীর মুখে মুখে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়-কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী অধ্যক্ষ আফজল খান’র পরাজয়ের নৈপথ্যে রয়েছে একাধিক অভিযোগ ও সমস্যা। অধ্যক্ষ আফজল খানের পক্ষে দলীয় এমপি-মন্ত্রীরা কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিভিন্ন গণসংযোগ, প্রচার প্রচারণা, উঠান বৈঠকে বক্তব্য রাখেন ঠিকই। সিটি কর্পোরেশন এলাকার ভোটারদের নেতা তারা নন। রাজনৈতিক বিশে-ষকদের মতে, বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে যারা রয়েছেন সিটি করপোরেশনের ভোটারদের ওপর তাদের প্রভাব খুব একটা নেই। আফজল-বাহারের মধ্যে দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের দীর্ঘদিনের বিবাদতো ছিলই। তারপরও প্রকাশ্যে হাজী বাহার অধ্যক্ষ আফজল খানের পক্ষে বিভিন্ন প্রচার প্রচারণা চালিয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রচারে দু-জনকে একসঙ্গে দেখা গেলেও ভোটের ফলে পুরনো বৈরিতার প্রভাব পড়েছে। এ দুই নেতার মধ্যে বনিবনা কখনোই ছিল না। নির্বাচনের পর এ বিবাদ আরও বাড়বে বলে দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন। আফজল খানের বয়স ও অসুস্থতার বিষয়টি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ¡ তৈরি করে। এছাড়া আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী দুই তরুণ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান মিঠু ও নূর উর রহমান মাহমুদ তানিমের নির্বাচনে অংশ নেওয়া পরাজয়ের বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না করার কারণেই তিনি পরাজয় বরণ করেরেছেন।  নির্বাচন শুরুর পর শারিরীক অসুস্থতার কারণে ব্যাপক গণসংযোগ করতে না পারা।

এছাড়াও ছাত্রলীগের দুই সাবেক নেতা নুর-উর রহমান মাহমুদ তানিম ও অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মিঠুর প্রার্থীতা সহ মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি প্রার্থী এয়ার আহমদ সেলিমকে প্রার্থীতা করায় আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থীর ভোট ব্যাংকে আঘাত লাগে। এতে মহাজোটের সমন্বয় হীনতাই অনেকটা ক্ষতি করেছে। নির্বাচনের শেষের দিকে দলীয় নেতাকর্মীরা যে ভাবে সক্রিয় হয়েছে শুরুর দিকে নির্বাচনী তৎপরতা ছিল ঢিলে-ঢালা ভাব। আফজল খান পরিবারের মেয়ে সহ ৪জন বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচন করায় নগরজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ৭০ বয়সে প্রবীর্ণ নেতা অ্যাডভোকেট আফজল খান  ১৯৬৫-৬৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ভিপি নির্বাচিত হন। ইয়াহিয়া-আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ষাটের দশকের এ ছাত্রনেতা ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর নির্বাচনে নেতৃত্ব দেন। কুমিল্লা শহর ও কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন তিনি। বর্তমানে দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম আহবায়ক। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। তিনি ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রধানমন্ত্রী সমবায় পদক ও বৃক্ষরোপণে স্বর্ণপদক লাভ করেন পেয়েছেন। কুমিল্লা চেম্বারের দীর্ঘদিনের সভাপতি ছিলেন। বয়সের কারণে এবারের নির্বাচনে তিনি অনেকটা অসুস্থ থেকেই নির্বাচন করেছেন। ৭০ বৎসর বয়সের প্রবীণ এই নেতাকে অনেক তরুণ ভোটার কখনো সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। তিনিও বাড়ি বাড়ি ভোটারদের কাছে যেতে পারেননি। আওয়ামীলীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আফজল খানের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। জেলার সব সাংসদ তার সঙ্গে প্রচারে নেমেছেন। এরপরও তিনি জয়ী হতে পারলেন না। প্রবীণ আওয়ামীলীগ একাধিক নেতা কর্মী মনে করেছেন- এখানকার আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের আভ্যন্তরিন কোন্দলন নিরসন না করে দলীয়ভাবে প্রার্থী দেওয়াটা বিশাল একটা বোকামি যার ফলে পরাজয়ের মূল অন্যতম কারণ। প্রকাশ্যে এমপি মন্ত্রীরা মাঠে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক করলেও কোন্দলের কারণে তা আজ খেসারত হিসেবে অধ্যক্ষ আফজল খানকেই দিতে হয়েছে। এছাড়াও নেতাকর্মীরা জানান – কুমিল্লায় যে কোন নির্বাচন হলেই বিভিন্ন ধরণের অন্তদ্বন্দর্¡, আভ্যন্তরিন কোন্দল, ক্ষমতা লোভের কারণে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে নেতাকর্মীরা। তারা আরও বলেন- এবারের নির্বাচনে উত্তর আর দক্ষিণের বিভক্তি নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। দক্ষিণের দায়িত্ব নিয়েছেন সাংসদ লোটাস কামাল ও নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। জাতীয় সংসদের হুইপ মুজিবুল হক ওই ধারার হলেও তিনি মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। উত্তরের (সাবেক কুমিল্লা পৌরসভা) দায়িত্ব দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতাদের ও সাংসদ হাজী বাহার ও জোবেদা খাতুন পারুলকে। তার মতে, জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক স্থবিরতা এ নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। দুই বিদ্রোহী প্রার্থী তানিম মিঠু ও মহাজোটের এয়ার আহমেদ সেলিম এবং হিন্দু ভোটারদের সমর্থন থেকেও এবার বঞ্চিত হয়েছেন আফজল খান। অন্যদিকে আফজল খান পরিবারের মেয়ে সহ ৪জন বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচন করায় নগরজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এদিকে বিএনপি কেন্দ্রীয় ভাবে ইভিএম পদ্ধতির বিরোধীতা করে নির্বাচন বর্জন ও দলীয় প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুকে অব্যাহতি দিলেও মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীরা তার পক্ষে কাজ করেছে। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও ভেতরে ভেতরে তাদের নেতা কর্মীরাও সাক্কুর পক্ষে কাজ করেন। এছাড়াও আফজল খানের ছোট ভাই আমানুল্লাহ খান ৭নং ওয়ার্ড থেকে প্রতিদ্বন্দি¡তা করে পরাজিত হয়েছেন। অবশ্য সংরক্ষিত ৩নং নম্বর ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন আফজলের মেয়ে সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আনজুম সুলতানা সীমা।

মনিরুল হক সাক্কু জয়’র নৈপথ্য

কুমিল্লা ৫ বার নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রী কুমিল্লা (দ.) জেলা বিএনপির কান্ডারী ও জনগণের আর্শিবাদ পুষ্ট প্রয়াত নেতা সাবেক মন্ত্রী কর্ণেল (অব.) আকবর হোসেনের হাত ধরে যার বেঁড়ে উঠা তিনিই হচ্ছে নতুন সিটি করপোরেশন নগর পিতা মনিরুল হক সাক্কু। যুবদলের মাধ্যমে তার প্রকাশ্যে দলীয়ভাবে রূপরেখা ও পরিচিতি লাভ করেন।  বিএনপির প্রয়াত নেতা ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) আকবর হোসেনের আপন মামাত ভাই। আকবর হোসেনের বিশ¡স্ত সহযোগী ছিলেন সাক্কু।  যদিও শিক্ষাগতভাবে তেমন একটা পড়া লেখা তিনি করেনি তারপরও তাঁর মধ্যে সব সময় হাসি খুশিতে প্রাণবন্ত একজন মানুষ। কর্মক্ষেত্রে খুবই গতিশীল। তার মধ্যে নেই বিন্দু মাত্র অহংকার ও দাম্ভিকতা। পৌরসভা মেয়র হিসেবে দীর্ঘদিন সততা ও নিষ্ঠুর সহিত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এলাকায় নিরবে নিভৃতে মানুষের সেবা করে আসছেন। তিনি অনেক সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। বিএনপি’র রাজনীতিতে তাকে কোনো বিশেষণ দিয়ে পরিচয় করে দিতে হয় না। সাক্কু-এই এক কথাতেই তিনি কুমিল্লার সর্বমহলে অতি পরিচিতি একটি নাম। তার মতো অত্যন্ত ডেডিকোটেড ও কমিটেড নেতা মেয়র নির্বাচিত হলে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের অবকাঠামোগত ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করে। উচ্চাভিলাসি মন মানসিকতা থেকে মুক্ত কোন দায়িত্বশীল নেতাই পারে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে একটি আধুনিক ও সময় উপযোগী সিটি কর্পোরেশন উপহার দিতে। তিনি ২০০৫ সালের ২১ মে কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাক্কু। এরপর ২০০৬-এর ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে বরখাস্ত করে। এরপর আইন-আদালত করে তিনি দ্বিতীয় দফায় ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পান। গত বছরের ১০ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পৌর মেয়র ছিলেন। কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত কামাল উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে মনিরুল হক সাক্কু চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল। দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে কুসিক নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করায় বিএনপি তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়। দলের কাছে তিনি নিজেই অব্যাহতি চেয়েছিলেন। এদিকে পৌরসভার দুই মেয়াদে দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ পান। এরই মধ্যে জেলা বিএনপির রাজনীতিতে তিনি একা হয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে ক্যাডার রাজনীতির যে অভিযোগ ছিল তা তিনি কাটানোর চেষ্টা করেন। এদিকে পৌর মেয়রের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি ড্রেন কালভার্ট পরিষ্কার ও ফুটপাতের পাশে বাগানসহ সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করে নগরবাসীর প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে পৌর মেয়র থাকাকালীন কোনো অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিল না। তবে ১/১১-এর সময় শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকায় তার নাম ছিল। এখনও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলমান। এবারের নির্বাচনে সাবেক সাংসদ মনিরুল হক চৌধুরী তাকে সমর্থন দেওয়ায় তিনি দক্ষিণের ৭টি ওয়ার্ডে ব্যাপক ভোট পান। মনিরুল হক চৌধুরী সদর দক্ষিণ উপজেলা ও পৌরসভা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। প্রয়াত কর্নেল আকবরের ৫ বারের সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছেন সাক্কু।  যদিও বিএনপি’র অধিকাংশ নেতাকর্মীই তাকে সমর্থন দেননি তারপরও তিনি নিজের ইমেজের কারণে হেভিয়েট ও সরকারী দলের প্রার্থীদের পরাজিত করে বিজয়ী হয়ে প্রথম নগর পিতা হিসেবে তিনি চমক দেখাতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম নগর পিতা মনিরুল হক সাক্কু বলেন-নির্বাচন নিয়ে আমার অনেক সংশয় ছিল। ইভিএম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমার নেতাকর্মীদের বাড়িতে যেভাবে হানা দিয়েছে আমি ভেবে ছিলাম আমাকে পরাজিত করতে হয়তো তারা মাঠে নেমেনে। ইভিএম নিয়ে ভীতিও ছিল। সবকিছু ম্লান করে দিয়ে আমি বিজয়ী হয়েছি। এখন আমার কাজ হবে নগরবাসীর আশা ও প্রত্যাশা। তাদেরকে আমি উন্নয়নের যে ইস্তেহার দিয়েছি তা পূরণ করতে। নগরবাসী আমাকে ভালোবেসে মেয়র নির্বাচিত করেছে। আমি তাদের ভালোবাসার জবাব দিবো। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ৩৩ বছর যে দল করেছি, তার প্রতি আমার গভীর অনুরাগ রয়েছে। শীঘ্রই ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করব। আমার ভোটারদের সঙ্গেও কথা বলব।


জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে