Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৬-২০১৪

বিএনপির ঢাকার নেতারা ব্যর্থ, মাঠের কর্মীরা ক্ষুব্ধ

মেহেবুব আলম বর্ণ


বিএনপির ঢাকার নেতারা ব্যর্থ, মাঠের কর্মীরা ক্ষুব্ধ

ঢাকা, ১৬ জানুয়ারি- শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অধীনে হয়ে গেছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সরকার গঠনের কাজও শেষ। দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি এতে অংশ নেয়নি। গত আড়াই বছর ধরে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনের নির্বাচন আর ঠেকানো যায়নি। এই আন্দোলনে বিএনপির কি প্রাপ্তি ঘটলো? সফলতা,ব্যর্থতা কতটা? এ প্রশ্নে বিএনপির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের ভাবনাগুলো নিয়ে মেহেবুব আলম বর্ণ‘র তিন কিস্তির প্রতিবেদন। আজ পড়ুন দ্বিতীয় কিস্তি:

বিএনপির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় নেতাদের কারণেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তাঁদের দাবি, সারাদেশের জেলা, উপজেলা, পৌরসভা পর্যায়ে বিএনপির কর্মীরা রাজপথ দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় রাজপথে নামার ক্ষেত্রে দলের ব্যর্থতার চিত্র কর্মীদের চাঙ্গা করার চেয়ে হতাশ করেছে বেশি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির সঙ্গে দেশের যে ৯০ ভাগ সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল, তাঁরাই কোন সহিংস কর্মসূচি মেনে নেননি। সরকার রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে কোনঠাসা করতেই জামায়াত-শিবিরেকে সহিংসতা চালাতে দিয়েছে বলেও বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতা মন্তব্য করেন। কমপক্ষে ১০টি জেলার নেতা প্রিয়.কম-এর কাছে অভিযোগ করেছেন, সরকার দলীয় নেতাদের মদদে শিবির সহিংসতা চালিয়েছে। আর মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা। সরকারের নানান কৌশলের কাছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা হেরে গেছেন বলে মত দিয়েছেন তৃণমূল নেতারা।

নেতৃত্বে সমন্বয় ঘাটতি
তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা মনে করেন, কেন্দ্রে নেতাদের মধ্যে পরস্পরকে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সম্পর্কের এই ফাটল ধরেছে ১/১১ এর সময় থেকেই। সে সময়ের ‘সংষ্কারপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত নেতাদের দল থেকে বিদায় না করায় নেতৃত্বে সমন্বয় নেই বলেই কয়েকটি জেলার নেতারা মন্তব্য করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলে ধীরে ধীরে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন সংষ্কারপন্থীরা। ২০০৮ সালে যাঁরা প্রয়াত মহাসচিব খন্দোকার দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে থেকে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন, তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করেন কয়েকজন নেতা। মেহেরপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনসারুল হক বলেন, ‘এখন দলে সংস্কারপন্থীরাই শক্তিশালী।’ এ বিষয়ে তিনি তাঁর জেলার দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, ‘সংষ্কারপন্থী প্রয়াত মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার দপ্তর সম্পাদক ছিলেন সাবেক সাংসদ মাসুদ অরুন। তিনি এখন কেন্দ্রের কাছেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা।’

২০০৭-২০০৮ এ রাজপথে থাকা নেতাদের সঙ্গে সংষ্কারপন্থীদের দ্বন্দ্ব বিভিন্ন কর্মসূচি পালনকালে আরও প্রকট হয়ে উঠে বলে জানা গেছে। তৃণমূল থেকে দলের স্থায়ী কমিটি পর্যন্ত এই সমস্যা রয়েছে বলে জানান পিরোজপুর, খুলনা, ফরিদপুরের কয়েকজন সিনিয়র নেতা।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সমন্বয়ের অভাবের কথাও জানিয়েছেন তৃণমূল পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা। কিন্তু তাঁরা কেউই নিজেদের নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নন। এ ব্যাপারে তাঁদের স্পষ্ট জবাব, বিভাগ, জেলা ও ঢাকার নেতাদের চটিয়ে মফস্বলেও পদ ধরে রাখা সম্ভব নয়। তৃণমূলের নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে, ইউনিয়ন ও পৌরসভার নেতারাই মূলত দলের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের নানান কর্মসূচিতে কর্মী ও লোক সরবরাহ করে থাকেন। কিন্তু জেলা, মহানগর বা বিভাগীয় কমিটি গঠনের সময় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, পৌরসভা এলাকার ত্যাগী নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ পদ পান না।

আসল নেতা অনেক দূরে
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হলেও এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নীতি নির্ধারণের দিকটি তাঁর বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেখেন বলেই বিশ্বাস করেন দলটির মাঠ পর্যায়ের সাধারণ কর্মীরাও। কেন্দ্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতাও এমন কথা বলেছেন।

জানা গেছে, চলমান আন্দোলনে স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত পাল্টে গেছে। তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় স্থায়ী কমিটির সব নেতার সঙ্গে তাঁর একসঙ্গে কথা হয় না। ফলে আলোচনা বৈঠকে কে কি বললেন, তা তিনি কয়েকজনের কাছে শোনেন। এরমধ্যে খালেদা জিয়ার বিশ্বাসী সবাই আবার তারেক রহমানের কাছে সমান আস্থা অর্জন করতে পারেননি। দূরে থাকার ফলে তারেককেও বিভ্রান্ত করা সহজ হয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতা। বিএনপির নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতার আর একটি দিক এটি।

তৃণমূলের কাঠগড়ায় ঢাকা মহানগর কমিটি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলনে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সম্পৃক্ত হয়েছিল বলে স্বীকার করেন কেন্দ্রীয় নেতারাও। ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা প্রিয়.কম-কে বলেছেন, জেলা উপজেলার নেতারা নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলনে রাজপথে থেকে, সরকারের নানান অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু ঢাকাতেই তৃণমূলের প্রত্যাশা মতো রাজপথে নামা সম্ভব হয়নি।

এদিকে তৃণমূল জেলা উপজেলা পর্যায়ের নেতারা শেষ পর্যন্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে না পারার জন্য ঢাকা মহানগর কমিটির নেতাদেরই বেশি দায়ী করেছেন। এ বিষয়ে ১২টি জেলার নেতাদের সঙ্গে কথা হলে প্রায় সবাই ঢাকায় কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে ত্যাগী ও সাহসী নেতাদের সমন্বয়ে তা গঠনের কথা বলেন। জামালপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শামিম তালুকদার বলেছেন, ‘ঢাকায় সরকার চরম ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল এ কথা ঠিক। অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাও ঠিক। জেলা শহরেও তো প্রায় এমন ঘটনায় ঘটেছে। কিন্তু জেলায় জেলায় নেতা-কর্মীরা তো কর্মসূচির দিনগুলোতে নিয়মিত মিছিল-সভা করেছে। কিন্তু ঢাকায় নেতারা সে সাহস দেখাতে পারেননি।’

ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাক আকন্দ জানান, ‘চেয়ারপারসনের ডাকে ‘গণতন্ত্রের জন্য অভিযাত্রা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঢাকায় লাখো কর্মী হাজির হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকার গলি গলিতে কর্মীরা ছিল। সবার অপেক্ষা ছিল কেন্দ্রীয় নেতারা একসঙ্গে হাতে হাত ধরে রাজপথে নামবেন। কিন্তু পরপর দুই দিন ঢাকার বড় বড় নেতারা কর্মীদের হতাশ করেছেন।’

‘ঢাকায় বিএনপির কোন সংগঠনই নেই। সেখানে সংগঠনের কাঠামো ঠিক করা দরকার’ এমন মন্তব্য করেছেন লক্ষীপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভোকেট হাসিব। সিলেটের স্বেচ্ছাসেবক দলের মহানগর সভাপতি ফরহাদ চৌধুরী শামিম প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটির নেতাদের আন্দোলন সফল করার যোগ্যতা নিয়ে। তাঁর অভিযোগ, ‘আপোষকামী নেতাদের কারণেই ঢাকায় আন্দোলন তুঙ্গে উঠেনি। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে জেলাগুলোতে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তৃনমূলের নেতারা দলের শীর্ষ নেতাদের রাজপথে দেখতে চায়।’

কুষ্টিয়া জেলার বিএনপি নেতা এ্যাডভোকেট শামিমুর রহমানের মতে, ঢাকা মহানগর কমিটিকে যত দ্রুত সচল করা যাবে তত দ্রুতই বিএনপির আন্দোলনের সুফল পাবে। এদিকে কুষ্টিয়া জেলার বিএনপির যুগ্ম সাধার সম্পাদক শামিম আরজুর অভিমত হলো, বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক চর্চা তাতে কোন সরকারই বিরোধী দলকে রাজপথে আন্দোলন করতে দেবে না। সরকারের সব বাধার মুখেই দাবি আদায়ের রাজপথে নেতা কর্মীদের নামতে হবে। তাঁর মতে, ঢাকার নেতারা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে করছেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকার নেতাদের ভূমিকা বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিলে দল উপকৃত হবে।

নেতাদেরকে অবিশ্বাস
বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের অনেকেরই ধারণা, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান দলের যেসব নেতাদের চক্রের মধ্যে রয়েছেন তাঁরা শীর্ষ দুই নেতাকে ঠিকমতো সহযোগিতা করেন না। মাঠের প্রকৃত চিত্রও তাঁদের দেওয়া হয় না বলেও সন্দেহ আছে তৃণমূলের নেতাদের। জেলার মাঠ পর্যায়ের সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে কেন্দ্রের সাধারণ কর্মীরাও ঢাকার অনেক নেতার ভূমিকা নিয়েই সন্ধিহান। কয়েকজন সাধারণ কর্মীর সঙ্গে কথা বলে এমন মনোভাব জানা গেছে। তাঁরা আন্দোলনের মাঝে অনেক নেতার গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকেও সন্দেহের চোখে দেখেন। আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহুর্তে ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতেই কয়েকজন নেতা ধরা দিয়েছেন বলেও সন্দেহ আছে দলটির মাঠের কর্মীদের মধ্যে।

 

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে