Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ মে, ২০১৯ , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (91 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৬-২০১৪

একটি চুলের চুলচেরা প্রতিবেদন

মোল্লা বাহাউদ্দিন


একটি চুলের চুলচেরা প্রতিবেদন

চুলটা আবিষ্কার করেছিলেন আমার সহধর্মিনী, সহমর্মিনী, অর্ধাঙ্গিনী, চিরসঙ্গিনী,  চিরসখী, চির কেশিয়ার, আমার অতীতের সমস্ত ক্রিয়াকর্মের সংগ্রহকারি, যার আদেশ সর্বদা শিরোধার্য, যার প্রস্তুত অন্ন ভক্ষন করে টিকে আছি, আমার সেই প্রাণপ্রিয় বিন্দু।
ছুটির দিন। রবিবার। 
আদেশ অনুযায়ী নাস্তা করে বেরিয়ে গেলাম বাজারে। বাংলার ইলিশ, পাবদা ইত্যাদি নিয়ে ফিরলাম। আজ দুপুরে খুব মজা করে খাওয়া যাবে।  ঘরে এসে বিন্দুর হাতে বাজার দিতেই বলল, তোমার ময়লা কাপড় কি আছে সব বের করে দাও। এখন কাপড় ধুতে যাব। 
বললাম, কি জানি ময়লা কাপড় কি আছে জানি না। তুমি দেখে নাও বলে কম্পিউটারে বসলাম। মেইল চেক করব।
ময়লা কাপড় বের করতে গিয়েই তিনি চুলটা আবিস্কার করলেন। প্রায় দেড় হাত লম্বা, সোনালি রং, কোকড়ানো। আমার চোখের সামনে ধরে বিন্দু জিজ্ঞেস করল, এটা কী?
চুল।
কার চুল? 
আমি কি করে বলব কার চুল। কোথায় পেলে এ চুল?
পেয়েছি তোমার কোটে। বুক পকেটে লেপটে ছিল। ভাল করে দেখ। দেখলে চিনতে পারবে। এই চুল তো আমার নয়, তাহলে আসল কোথা থেকে?
আমি চুলটা কোথাও থেকে নিয়ে এসে কোটে লাগাইনি যে তোমাকে বলতে পারব কোথা থেকে এল!
আমি জানি এটা কার চুল, কোথা থেকে এসেছে!
জানলে তো ভালই। আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?
জিজ্ঞেস করছি এইজন্য যে আমার আরও কিছু জানার আছে।
আর কি জানার আছে?
জানার আছে আমি তোমার অফিসে ফোন করলে তোমার কথা বলার সময় থাকেনা কেন? সেদিন লাঞ্চের সময় টেলিফোন করলাম তখন মেয়েলি হাসির ঝড় বইছে! এত জোড়ে হাসির আওয়াজ হচ্ছিল মনে হচ্ছিল সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি আমার কথাই শুনতে পাওনি। তুমিও খুব হাসছিলে। অফিসে এত হাসাহাসির কারন এখন বুঝলাম।
চুলের সাথে হাসির কি সম্পর্ক?
সম্পর্ক আছে। এই চুল কোটের বুক পকেটে লেপটে ছিল। এখন বুঝলাম এই চুল তো পকেটে এমনিতেই আসেনি! এসেছে অন্য কারনে। 
আরে, তুমি চুল নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন? একটা চুল তো কোটে লাগতেই পারে। অফিসে আসা যাওয়ার সময় যে দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তা তুমি দেখনি। এটা নিউ ইয়র্ক! সাবওয়েতে গিয়ে ট্রেনের কাছে যাওয়া যায় না। ধাক্কাধাক্কি করে দূরেই দাড়িয়ে থাকতে হয়। ট্রেন এলে হেটে ট্রেনে উঠতে হয় না। মানুষের ধাক্কাতেই উঠা হয়। তখন কে কাকে ঠেলছে সেদিকে কারও খেয়াল থাকে না। তখন কার গায়ে কে লেগেছে তার দিকে কারও নজর থাকে না। কে পুরুষ, কে মহিলা তা কেউ তাকিয়ে দেখে না। সবাইকে কাজে যেতে হবে। ঠিক সময়ে। পরের ট্রেনের আশায় থাকলে অফিসে যাওয়া হবে না। এ দৃশ্য অফিসে যাওয়ার পথে এবং ফিরার পথে। নিত্য দিনের ঘটনা। এ অবস্থায় একটা চুল যদি উড়ে এসে আমার কোটে জুড়ে বসে তাহলে আমাকে দোষ দেয়া অন্যায়। বুঝতে চেষ্টা কর বিন্দু।
সব  বুঝি। এটাও বুঝি অফিস থেকে দেরি করে আসা হয় কেন!
অফিস ছুটির পর অত তাড়া থাকেনা। ভীড় কমার জন্য দুএকটা ট্রেন ছেড়ে দিয়ে ফাকা হবার পর আসি। তাতে দেরি হলে কোন অসুবিধা হয় না। এটাও তুমি এখন তোমার অংকের ভিতর ফেলবে! আশ্চর্য তো! আগে তো কোনদিন অনুযোগ করনি!
তখন বুঝিনি! আমি বোকা তাই। তুমিই বলেছ, তোমার রুমে আর কোন লোক নেই। একা বস। সেখানে মেয়েদের হাসির উল্লাস কেন? ওদের কাজ নেই? 
মেয়েরা তো উল্লাস করতে আসে না। আড্ডা দেবার সময় কারও নেই। এরা আসে তাদের কাজ নিয়ে। কিছুক্ষন থাকে, তাদের কাজ জমা দিয়ে চলে যায়। 
তোমার কাছেই জমা দিতে হয়?
হ্যা, আমি ভাইস প্রেসিডেন্টের সহকারি। আমার তত্বাবধানে তারা কাজ করে। আমি না থাকলে ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজ দেখে। কোন কোন সময় একে একে দুতিনজন এসে যায়। তখনই কথাবার্তা হয়, আর পিটার যদি থাকে তাহলে তো কোন কথাই নেই। সে কৌতুক দিয়ে কথা শুরু করে। সব সময়ই সে কৌতুক বলে। তার কৌতুক শুনে হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি পড়বেনা এমন লোক খুব কমই আছে। তুমি যেদিনের কথা বলছ আমার মনে পড়ছে। সেদিন পিটার ছিল আর তিনটা মেয়ে। তুমি যখন কল করলে তখন হাসতে হাসতে সবাইর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমি হাসতে হাসতেই টেলিফোন হাতে নিয়েছিলাম। তখন পিটার আর একটা শুরু করল। আর তখনই তিনজন মহিলা এক সাথে হেসে উঠল। তাতে চুলের কি সম্পর্ক তা বুঝতে পারলাম না।
সবই বুঝ। এখন না বুঝার ভান করছ! গল্প তো ভালই তৈরি করতে পার! তোমাকে আমি চিনি না? বলে কাপড় নিয়ে নীচে নেমে গেল।
বিন্দু চলে গেলে মনে হল ঘরের বাতাসটা গরম। চুলজাতীয় রচনার ভূমিকাটা বোধ হয় সন্তোষজনক হয়নি। আর কি কি ভূমিকা পেশ করলে পাশ মার্ক পাওয়া যাবে তা অনেক খুজেও কিছু পেলাম না। আকাশে পাতালে কোথাও না। শেষ পর্যন্ত চুলের উপর ছেড়ে দিলাম। মনে করলাম বিন্দু আর কথা বাড়াবে না।
না, বিন্দু কথা বাড়ায়নি। তবে বিন্দু এক বিন্দুও শিথিল হয়নি। কথাও বলেনি। কাপড় ধুয়ে ঘরে এসে সোজা বেড রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম নিয়ে রান্না ঘরে চলে যাবে। নিয়ম মত আমার পছন্দের সব খাবার রান্না হবে। 
দু ঘন্টা চলে গেল বিন্দু উঠেনি। তখনও আমি বুঝিনি, বিন্দু সিন্ধু আকার ধারন করে কোন্ মহাসাগরে মিশে গেছে যেখানে দেবতাও কোন হদিস করতে পারেনি। অনেক অপেক্ষার পর তার রুমে গিয়ে অকারনে এটা ওটা আওয়াজ করলাম। না, ঘুম ভাঙেনি। যে ঘুমায়নি তার ঘুম ভাঙানো যায় না। আমি ফিরে গেলাম লিভিং রুমে। টিভি ছেড়ে দিয়ে বসে রইলাম। টিভির দিকে তাকিয়ে ভাবলাম চুলের কথা। হে চুল! তোমাকে নিয়ে কত কবি সাহিত্যিক কত কাব্য রচনা করে বিখ্যাত হয়েছে। তোমাকে কত নামে ডেকে রসের সৃষ্টি করেছে! আমি তো কাব্য জানি না। চুল, তুই আর জায়গা পেলি না! আমার কোটে কেন? একে তো নাচনে বুড়ি, তার উপর ঢোলের বারি! এখন কি দিয়ে কিভাবে চুলের রচনা রচিত হবে! এত সখের মাছগুলো! রান্নাবান্নার কি হবে! তিনটা বেজে গেছে! তাহলে আজ আর রান্না হবে না। মাছগুলো পঁচে যাবে। আমি উঠে গিয়ে ফ্রিজে রেখে দিলাম। খিধায় পেট চুঁ চুঁ করছে। কি খাব! পাউরুটি ছিল তা নিয়ে বাটার লাগিয়ে দু টুকরা খেয়ে বিন্দুর পাশে গিয়ে শুলাম। কথা বলতে চেষ্টা করলাম। না, ঘুম ভাঙেনি। ঘুমন্ত মানুষের সাথে কথা বলা যায় না। চুল কত প্রকার ও কি কি, কোন্ জাতীয় চুল, কি ধরনের কত প্রকার অশান্তির সৃষ্টি করতে পারে এ জাতীয় রচনার মহড়া দিতে দিতে কখন আমি নিজেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙল বিকেল ছটায়। দেখি বিন্দু তখনও ঘুমে। এবার ডেকে উঠাতে হলো। তুমি কিছু খাবে না?
না, আমার খিধা নাই। 
আমি কি খাব?
একটা কিছু খেয়ে নাও। রুটি আছে, দেখ। পিটা ব্রেডও আছে। ফ্রিজে কালকের তরকারি আছে। 
রবিবারটা এমনি অকালে মারা পড়ল! সারাটা দিন গেল আমি তো যাই হোক দুটুকরো রুটি খেয়েছি, কিন্তু বিন্দু! কিছুই খেলনা! হাঙার ষ্ট্রাইক! একটা চুলের কারনে হাঙ্গার ষ্ট্রাইক করা মহা অন্যায়। আমি যতটুকু জানি কোন দাবী আদায়ের জন্য মানুষ হাঙ্গার ষ্ট্রাইক করে, বিন্দুর কোন দাবী নেই। থাকলে আমি এক কথায় মেনে নিতাম। অনশন ধর্মঘট! দাবী ছাড়া। ধর্মঘট ভাঙানোর যতরকম কায়দা কানুন আমার জানা ছিল সব গুলো চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। কিছুতেই কোন কাজ হল না। ইতিপূর্বে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। ছোটখাটো ধর্মঘট হয়েছে বটে, আমি হার মানলেই সব ধর্মঘট শেষ হয়ে যায়। এখনকার ধর্মঘট অন্য রকম। চুলের কারনে, নীরব ধর্মঘট। আমি আবার টিভির কাছে এসে বসলাম।
খিধা জানান দিচ্ছে। ভাতের খিধা। সারাদিন কতকিছু খেলাম! বাদাম, রুটি, বিস্কুট, জেলি (যা খুব একটা খাইনা), বাসি কদুর তরকারি দিয়ে রুটি ইত্যাদি। কিন্তু খিধা যায় না। ভাতের খিধা! বড় শক্ত। কোন ওষধেও কাজ হয় না। বিশেষ করে আমার মত যারা এখনও বাঙাল রয়ে গেছে।
টিভির দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুই দেখছিনা। দেখছি চুলটা। কুকড়ানো, সোনালি রঙএর চুলটা। মনে মনে এই চুলের চৌদ্দ গোষ্টি উদ্বার করছি। যতরকমের গালি আছে তা ঝাড়ছি চুলের উদ্দেশ্যে। এমন কি পৃথিবীর ঘৃন্য গালি রাজাকারও বলেছি। মনে হল একটা রাজাকার একটা সুখি পরিবারে ঢুকে, সুখের পায়রাগুলোকে হত্যা করে, রাইফেল হাতে বাড়ীর সামনে উল্লাস করছে। 
আবার উঠলাম। রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুললাম। বাসি তরকারি আরও একটু আছে। তা দিয়ে একটু রুটি খেয়ে লিভিং রুম আর বেড রুম করছি। কত রকমের কথা বললাম। দুএকটা কৌতুক বললাম যা শুনলে বিন্দু হাসি চেপে রাখতে পারে না। কোন কাজ হল না। কোরান হাদিসের কিছু উদ্বৃতি দিলাম। স্বামীর মনে কষ্ট দিলে এর শাস্তি কি, ইহকাল পরকালের কি ফলাফল হবে। হাদিসে নির্দিষ্ট আয়াতের উল্লেখও করলাম। তাতেও কাজ হল না। তারপর শুরু করলাম কবিতা বলা। কবিতা শুনে মনে হল আরও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলাম লিভিং রুমে।
নয়টা বাজল, দশটা বাজল বিন্দু উঠেনি। বারটার মধ্যে না ঘুমালে কাল ঠিক সময়ে অফিসে যেতে পারব না। এখন করি কি? বিন্দু কি এক বিন্দুও শিথিল হবে না! দেখি আর একবার শেষ চেষ্টা দিয়ে। 
বেড রুমের দরজায় দাড়িয়ে, বাতাসের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলাম: খিধায় আমার পেট চোঁ চোঁ করছে, খিধা থাকলে আমার ঘুম হয় না। ঘুমাতে না পারলে সকালে অফিসে যেতে পারব না। ফ্রিজে যা আছে তা খেতে পারি না। আমি তো রান্না করতে পারি না। পারলে রান্না করে নিতাম। এখন করব কী?
দেখলাম কাজ হয়েছে। নীরবে উঠে চলে গেল রান্না ঘরে। ঘন্টাখানেকের মাঝে টেবিলে গরম ভাত, ইলিশ ভাজা আর ডাল রেখে বসে রইল। মুখে কোন কথা নেই। বুঝলাম এখন কথা বন্ধ। আমি খাবার টেবিলে বসে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার প্লেট কই? 
আমি পরে খাব। 
তাহলে আমিও পরে খাব। বলে উঠে পড়লাম। 
যার জন্য রান্না হল সেই যদি না খায় তাহলে রান্নার প্রয়োজন ছিল না। বিন্দু উঠে গিয়ে তার প্লেট আনল। অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু খেল। 
বিছানায় গিয়ে অবাক হলাম। মাঝখানে দুটো বালিশ। সীমানা তৈরি হয়েছে। ওপারে যাওয়া নিষেধ। মাথাটা উঁচু করে দেখলাম। এই সীমানার শেষ মাথায়, বিছনার একদম শেষ ভাগে গুটিশুটি পড়ে আছে একটি মনুষ্য দেহ। মনে হয় ঘুমে অচেতন। আমার মনে হল মাঝখানে বালিশ নয়, চুলের পাহাড় তৈরি হয়েছে। ওপাশের মানুষটাকে নাড়া নাড়া করা ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে নিয়ম অনুযায়ী কিছু খেয়ে অফিসে চলে গেলাম। সারাদিন চুলটাকে নিয়ে ভাবলাম। একটা চুল যে কত বড় চুলোচুলি  বাধাতে পারে! কিভাবে কি বলে এই ঝামেলা দূর করা যায় তা নিয়ে অনেক ভাবলাম।  
অফিস থেকে ফিরে দেখি এখন চলছে আড়ি। কথা বন্ধ। কয়দিন চলবে কে জানে! কাজকর্ম সবকিছুই ঠিকঠাকভাবে চলছে। শুধু মুখে কথা নেই। 
সাত দিন চলে গেছে। বিন্দু সিন্ধুর রুপ ধারন করেছে। কিনারা নেই, ঢেউ নেই, নির্জীব, বাকহীন। একই ঘরে দুজন একা একা। যেন কেউ কাউকে চিনি না। ভাবখানা এই আমি একজন অসহায় মানুষ, রাস্তায় পড়েছিলাম। এই ভদ্রমহিলা আমাকে তোলে এনে তার ঘরে স্থান দিয়েছে। আমাকে সব নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে মাঝখানের দেয়াল। সীমানা লঙ্ঘন করা যাবে না। করলে কি হবে তাও ভেবে পেলাম না। 
চোর যখন চুরি করে পুলিশের হাতে ধরা পরে জেলে যায়, উত্তম মধ্যম খায় তখন তার একটা শান্ত্বনা থাকে চুরি করে মার খাচ্ছে। কিন্তু চুরি না করে যদি জেলে যায় বা মার খায় তাহলে তার কোন শান্ত্বনাই থাকে না। আমি এই চুলের জন্য অকারনে শাস্তি ভোগ করছি। 
আমি ঘরে গেলেই দেখি সেই চুলটা। একটা চিনের দেয়াল হয়ে দুজনের মাঝখানে দাড়িয়ে আছে। দেয়াল ভাঙতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
চুল দিয়েই চুলের দেয়াল ভাঙতে হবে। আমার একটা চুল চাই। কোথায় পাব একটা চুল! 
অফিসে বেশিরভাগ কর্মচারি মহিলা। সবাইর কাছে চুলের কথা বলা যায় না। আবার সবাইর চুল কাজেও লাগবেনা। কারও চুল বব কাটিং, কারও বাদাম ছাট, কারও বা লম্বা। একমাত্র ট্রুডির চুলই লম্বা। আমার সাথে খোলামেলা কথাবার্তা হয়। তার একটা চুল হলেই আমার কাজ সমাধা হতে পারে। কিন্তু কিভাবে সংগ্রহ করা যায়? ট্রুডিকে আমার কামড়ায় দিনে অনেকবার আসাযাওয়া করতে হয়। কোন ফাকে একটা চুল নিয়ে নিলে কেমন হয়! না, তা হবে চুরি। তাছাড়া ধরা পড়লে তার কাছে জবাব দিতে পারব না। তার চেয়ে তার কাছে সব ঘটনা বলে একটা চুল চেয়ে নিলেই হয়। একদম সোজা কাজ। আবার ভাবলাম, নাহ্, বিদেশির কাছে নিজের দুর্বলতা পেশ করা যায় না। তাহলে? শেফালি বৌদির কাছ থেকে একটা চুল চেয়ে নিলে কেমন হয়! বৌদিকে সব বলব। সে এ ব্যাপারে সাহায্যও করতে পারে। 
শেফালি বৌদি থাকে আমাদের কয়েকটা ব্লক পরে। সেদিন অফিস থেকে সোজা বৌদির বাসায় চলে গেলাম। বৌদিকে সব খুলে বললাম এবং মাঝখানের পাহাড়টা কত বড় তাও বললাম। 
সব শুনে বৌাদি বললেন, আসলে ভাবী খুব খুত খুতে। প্রবাসে এত খুত খুতে হলে চলে না। তিনি একটা না, কয়েকটা চুল দিয়ে বললেন, দেখুন এ চুল দিয়ে বর্ডার ভাঙা যায় কিনা। বলা বাহুল্য, বৌদির চুল কোকড়ানো।
চুলগুলো খুব যতনে আমার পকেটে রাখলাম। 
দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে। চুলের চুগলামিতে বাকহীন হয়ে গেছে বিন্দু। এখন আমি একা একা কথা বলি। চুল সংগ্রহের দুদিন পর রাতে শুয়ে সিলিংএর দিকে মুখ করে বলছি: আগামীকাল আমার ছুটি (আসলে আমি ছুটি নিয়েছি)। সারাদিন আমরা ঘুরব, ঘরে কোন রান্না হবে না। সবাইর ছুটি। ম্যানহাটনে একটা বাঙালি রেষ্টুরেন্টে বাংলাদেশের গলদা চিংড়ি খুব কম দামে দিচ্ছে। (আসলে এমন কোন খাবার আছে কিনা জানি না) এক সপ্তাহের জন্য। মোগলাই পরটাও আছে ওখানে। আমরা কাল সকালে বেরিয়ে পড়ব। (সকালে বের হবার উদ্দেশ্য বিন্দুকে সকালের সাবওয়ের দৃশ্যটা দেখানো। স্বচক্ষে না দেখলে বুজবে না অবস্থাটা কি।) তাই বললাম, মোগলাই নাস্তা করে মিউজিয়াম অব নেচারেল হিষ্ট্রিতে চলে যাব। মিউজিয়ামে এখনও দেখার অনেক বাকী রয়ে গেছে। দুপুরে গলদা চিংড়ি দিয়ে সাদা ভাত খাব, তারপর সেন্ট্রাল পার্কে ঘুরব। রাতে তোমার পছন্দমত রেষ্টুরেন্টে খেয়ে ঘরে ফিরব। তুমি সকালে প্রস্তুত হয়ে নিও। 
কোন কথার বদলে ছোট্ট একটা কাশির শব্দ শোনা গেল।
সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি বিন্দু গোসল শেষে বাথরুম থেকে রেরিয়ে আসছে। আমি প্রস্তুত হবার আগেই দেখলাম বিন্দু প্রস্তুত।
নয়টায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম। সাবওয়েতে ঢুকেই বিন্দু থমকে গেল। প্রায় দু সপ্তাহ পর এই প্রথম কথা বলল, এই ভীড়ে উঠা যাবে না। 
ভীড় কোথায়? আজকে তো কোন ভীড় নেই। সকালে আরও ভীড় হয়। আমি যখন আটটায় যাই তখন ভিতরে ঢুকতে পারি না। এখন বাজে নয়টা, ভীড় অনেক কমে গেছে। 
না, আমি উঠতে পারব না। মানুষ এভাবেই ট্রেনে উঠে! দাড়াবার জায়গা নেই! আমরা পরেরটায় যাব।
অপেক্ষা করলাম পরেরটার জন্য। ট্রেন চলে যেতেই বিন্দু বলল, ওমা! ভীড় তো একটুও কমে নাই! আরও তো বেড়েছে! 
বললাম, এবার বুঝ! ট্রেনের কি অবস্থা! ট্রেন ছাড়া কাজে যাওয়াও যাবেনা। এর নাম নিউইয়র্ক মহানগর! গাড়ী নিয়ে কেউ কাজে যায় না। মুষ্টিমেয় দুএকজন ছাড়া। যাদের নির্দিষ্ট পার্কিংএর ব্যবস্থা আছে তারাই গাড়ী নিয়ে যায়। তবে অনেক সময় লাগে। একমাত্র সাবওয়েতেই ঠিক সময়ে কাজে পৌছা যায়। তাই ট্রেনে যেতেই হবে। 
প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর ট্রেন। পরের ট্রেনটা আসার সাথে সাথে যারা পেছনে ছিল তাদের ধাক্কায় আমরা উঠে পড়লাম ট্রেনে। যদিও বিন্দু না না করছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমারও ইচ্ছা বিন্দুকে ট্রেনের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ করে তুলি। ভেতরে গিয়ে বিন্দু আমাকে আকড়ে ধরে বলল, আমি শ্বাস ফেলতে পারছি না। এমন অবস্থায় মানুষ যায় কি করে! কোন উত্তর না দিয়ে আমি মনে মনে হাসলাম।
আমরা যাব সিক্সথ ষ্ট্রিটে। ওখানেই সব বাঙালি রেষ্টুরেন্ট। একটাতে ঢুকে মোগলাইর অর্ডার দিয়ে বসলাম। বিন্দু জিজ্ঞেস করল, ট্রেনে প্রতিদিন এমনি ভীড় হয়?
সকালে তো আরও ভীড় হয়। প্রত্যেকটা ষ্টেশনে। মানুষের কাফেলা। শেষ হয় না। পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করলে আর কাজে যাওয়া হয় না। ভীড় ঠেলেই উঠতে হয়।
আমাদের দিনের কর্মসূচী নিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যূাতি ঘটাব না।
ঘরে ফিরলাম সন্ধ্যে ছটায়। ভীড়ের মোক্ষম সময়ে। বিন্দু সাবওয়ের চাপাচাপিতে একবারে কাহিল। অভিজ্ঞতা আর কাকে বলে! আমি ঘরের দরজা খুলতেই বিন্দু আমার আগেই ঢুকে পড়ল। বেডরুমের দিকে যাচ্ছে। এই ফাকে আমি আমার অস্ত্রগুলো হাতে নিলাম। বললাম, এই দাড়াও! তোমার পিঠে এটা কি দেখি!
সে দাড়াল। আমি একটা চুল হাতে নিয়ে বললাম, ও! একটা চুল। তার কাধের দিকে হাত নিয়ে বললাম, এইযে আর একটা। তারপর একটু ঘুরে তার সামনে গিয়ে তার বুকের উপর থেকে আর একটা চুল তোলে বললাম, এই যে আর একটা। একবারে বুকে লেপটে আছে। কোকড়ানো চুল। একটাও তোমার নয়। এসব এই ট্রেনের ভীড় থেকে লেগেছে। ভাল করে খুজলে আরও পাওয়া যাবে। যেমন আমার কোটে পাওয়া যায়। 
বিন্দু মুচকী হেসে বেডরুমে চলে গেল। এখন সে ঘুমাবে।
পরের দিন শেফালি বৌদি এল। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, দেয়াল ভেঙেছে?
বললাম, ভেঙেছে, তবে খরচ একটু বেশি পড়েছে।
বিন্দু  জিজ্ঞেস করল, কিসের দেয়াল?
বৌদি বলল, এইযে আপনাদের চুলের দেয়াল।
সবাই এক সাথে হেসে উঠলাম।

 

গল্প

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে