Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৭ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-০৫-২০১২

বনে বনে

মীজান রহমান


বনে বনে
এক
   ক্যালিফোর্নিয়ার এই ছোট ছোট পাহাড়গুলোর সঙ্গে মোটামুটি একটা ভাব হয়ে গেছে আমার। ওরা আমাকে চেনে। আমি এলে খুশি হয়, কাছে টেনে নেয়। আমি কোথাও গেলে ওরা আমার সঙ্গ নেয়---সারাক্ষণ আমার সাথে সাথে থাকে। স্মৃতির মত, গত জীবনের কোনও বলতে-না-পারা কথার মত। পাহাড়গুলোর নাম মিশন হিলস্। দু’তিন হাজার ফুটের বেশি উঁচু হয়ত কোনটাই নয়, কিন্তু আমার চোখে তারা বিশাল। তারা আকাশের সন্তান। মেঘেদের খেলার সাথী। উচ্চতার প্রতিকৃতি। তারা আমার মধ্যে আরোহণের স্পৃহা জাগায় নতুন করে। উচ্চাকাঙ্খার নির্বাপিত শিখাটিতে অগ্নিসংযোগ করতে উদ্যত হয়। মিশন হিলসের পায়ের নিচে সরু পথের ওপর দিয়ে আমি রোজ হাঁটি। এপথের ধারে সারি সারি গাছ লাগিয়েছে পৌরকর্মীরা---ম্যাগনোলিয়া গাছ। আমি বলি ম্যাগনোলিয়া দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট। সাধারণ ফুল তারা নয়। গন্ধরাজের মত রঙ ও গন্ধ, তবে আকারে তার চেয়ে অনেক, অনেক বড়---এমনকি পাতাগুলোতেও একপ্রকার বৃহততা আছে। আমি যখন হাঁটতে বেরুই সকালবেলা, এই ম্যাগনোলিয়াগুলোও যেন সতেজ হয়ে ওঠে আমাকে দেখে। আমাকে ছায়া দেয়, রোদের তাপ থেকে রক্ষা করে, ফুলের পাপড়ি ছড়ায় গায়ে। এপাশে ওপাশে নিটোল নিঃশব্দ ছবির মত বাড়িগুলো। ক্যালিফোর্নিয়ার বড় বড় গোলাপের গাছেতে ছেয়ে গেছে ওদের বাগান। চারধারে মালির কাঁচিতে নিখুঁতভাবে ছাঁটা চিরহরিতের সাজানো বন। স্বয়ংক্রিয় ঝর্ণার জল ঝরছে অবিরামধারে। পথঘাট প্রায় জনশূন্য---কাজের মানুষেরা সব কাজে চলে গেছে। কচিৎ কদাচিৎ দর্শন মেলে আমারই মত জীর্ণদশা, কুব্জদেহ, হাঁটতে-বের-হওয়া প্রবীনদের। কারো কারো সঙ্গে তাদের পোষা কুকুর, ধীরলয়ে হেঁটে যাচ্ছে কুকুর-প্রভু উভয়ই। এখানে মানুষ পাহাড়ের গা কেটে তৈরি করেছে এক অবাস্তব জগৎ।
  ক্যালিফোর্নিয়ার কথা উঠলে মানুষ কেবল তার চিররৌদ্রময় আবহাওয়ার কথাই ভাবে--যেন নীল আকাশ ছাড়া আর কিছু নেই এখানে। আসলে আকাশ যে এখানে এত নিরঙ্কুশভাবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে নীল, ঐটিই ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে নেতিবাচক দিক বলে মনে হয় আমার কাছে। প্রতিদিন সকাল বিকেল দুপুর সন্ধ্যা অন্তবিহীন এই নীলের সাগর সমস্ত আকাশব্যাপী, আমাকে বড় ক্লান্ত করে তোলে মাঝে মাঝে। ইচ্ছে হয় একটু যদি মেঘের দেখা পেতাম ঈশানকোনেতে, একবার যদি শুনতে পেতাম বজ্রধ্বনি, একবার যদি ঝলসে উঠত বিদ্যুৎ। কিন্তু তা হয়না সচরাচর। প্রায় দু’সপ্তাহ হয়ে গেল এসেছি এখানে, একটুকরো মেঘ দেখিনি এখনও। না, ক্যালিফোর্নিয়ার আবহাওয়া আমাকে উতলা করে না। নির্মেঘ, নিঃস্পন্দ নিসর্গ আমাকে কখনোই আকৃষ্ট করেনি, এখনও করেনা। আমাকে আকৃষ্ট করে অন্যকিছু। আকৃষ্ট করে মানুষ, প্রধানত মানুষ এবং তার পরিপার্শ্বের প্রকৃতি।

                         দুই

  গত চার পাঁচদিন ধরে ছেলেবৌমা রোজই আমাকে নিয়ে এখানে ওখানে যাচ্ছে। বেশির ভাগ সময় গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাপথের দৃশ্যমালাই বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে আমার কাছে। এদের এই শহরটির নাম ফ্রিমন্ট। শহরটি বেশ পুরনো----১৭৯৭ সালে এর গোড়াপত্তন। কিন্তু নামটি নতুন। পাঁচটি ছোট ছোট জনপদ মিলে ১৯৫৬ সালে এর নামকরণ হয় ফ্রিমন্ট----জন চার্লস ফ্রিমন্ট নামক এক স্থানীয় কৃতিপুরুষের ( তাঁকে বলা হত ‘দ্য গ্রেট পাথফাইণ্ডার’) নামানুসারে। ’৫৬ সালে ফ্রিমন্টের ততটা গুরুত্ব হয়ত ছিল না যতটা হয়েছে ’৮০ আর ’৯০ দশকে সিলিকন ভ্যালির বিপুল প্রভাব বিস্তার হবার কারণে। বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ নেই যেখানে সিলিকন ভ্যালির নাম কেউ শোনেনি, অন্তত শিক্ষিত সমাজে। তবে ‘সিলকন ভ্যালি’ যে একটি শহর বা কাউন্টির নাম নয়, একটা বড়সড় অঞ্চলের নাম, যেখানে Apple, Google, আর Intel সহ বিশাল কতগুলো হাইটেক কোম্পানির সদর দপ্তর, ছোটবড়য় মিলিয়ে শত শত নয়, হাজার হাজার কোম্পানির ঠিকানা এই অঞ্চলেই, সেটা হয়ত সবার জানা নয়। বড় কোম্পানিগুলো এতই বড় যে এদের কর্মস্থলগুলো একেকটা ছোটখাটো শহরের মত----শহর না হলেও প্রকাণ্ড এক পাড়ার মত, ঢাকার বনানী যেমন একটা বড় পাড়া, বা ধানমণ্ডি। সিলিকন ভ্যালির গা-ঘেঁষা দুটি বড় শহর---Union City, আর Fremont. এগুলোর অধিকাংশ মানুষই সিলিকন ভ্যালির কোন-না-কোন কোম্পানির চাকরিতে নিযুক্ত। এবং দুটি শহরই, প্রায় আক্ষরিক অর্থেই, সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক। বাইরের পৃথিবী থেকে, প্রধানত বাইরের তথাকথিত তৃতীয় বিশ্ব থেকে, কতখানি ব্রেন ড্রেন বা মেধাপাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলটিতে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যাবে এখানে এলে। কেবল ফ্রিমন্ট শহরটিরই একটা খতিয়ান দেওয়া যাক। প্রায় ২ লক্ষ ১৫ হাজার লোকের বসবাস এই শহরটিতে। তার মাঝে মাত্র ৩২.৮ শতাংশ হল শ্বেতাঙ্গ, ৩.৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান, ০.৫ শতাংশ আদিবাসী আমেরিকান। সিংহভাগ সংখ্যা, ৫০.৬ শতাংশ, হল এশিয়ান। তার মাঝে ১৮.১ ভারতীয়, ১৭.৭ চাইনীজ, ৬.৭ ফিলিপিনো, ১.৪ কোরিয়ান, ১.০ পাকিস্তানী, ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি যে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে, চীন বা অন্য কোন দেশ থেকে নয়, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই----এই ভারতীয়দের বেশির ভাগই IIT থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রী। এতে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে---ভারতীয় নেতাদের, বিশেষ করে প্রথম দিককার নেতাদের, জাতীয় চেতনা, উচ্চাকাংখা ও দূরদৃষ্টির এই যে প্রত্যক্ষ পরিচয় ফুটে উঠেছে আজকের প্রযুক্তিজগতে, তা থেকে আমাদের অভাগা দেশটির অনেক কিছুই শিখবার আছে। বাংলাদেশী পাঠক হয়ত গভীর আগ্রহে জানতে চাইছেন ওই সংখ্যাগুলোতে আমাদের দেশের এই যে এত এত উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা বিদেশে এসে নামধাম করছে বলে শোনা যাচ্ছে, তাদের স্থান কোথায়? প্রশ্নটা আমার নিজেরও। দুঃখের বিষয় যে বাংলাদেশের কোনও উল্লেখ দেখা যায়নি কোনও আন্তর্জাতিক জরিপে। এ থেকে আপনার নিজের সিদ্ধান্তটি নিজেই টেনে নিন। ভারতে, স্বাধীনতার গোড়া থেকেই, নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ভারতের আঞ্চলিক মাতৃভাষা, এবং ইংরেজি---উভয় ভাষার ওপরই সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে জাতীয়  শিক্ষাব্যবস্থায়। ইংরেজিকে ভারতের নেতারা বিদেশী ভাষা বা সাম্রাজ্যবাদী ভাষা হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন আধুনিক বিশ্বের অগ্রগতির সিংহদ্বার হিসেবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আমাদের জাতীয় নেতাগণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে হয়ত অতটা মাথা ঘামাননি।
  ক্যালিফোর্নিয়ার এ-অঞ্চলটির আরো অনেক বৈশিষ্ট্য। এবং তার সবগুলোই ঈর্ষণীয়। এখান থেকে ত্রিশ মাইল উত্তরে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অন্যতম ক্যাম্পাস বার্কলে। বার্কলের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ফ্রিমন্টের পঁচিশ মাইল পশ্চিমে আরো এক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষানিকেতন---স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বজরিপে এদুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছরই প্রথম দশটির মাঝে স্থান পেয়ে এসেছে। গতবছর একটা জরিপে দেখেছি বার্কলে একবারে চূড়ায়, আরেকটিতে স্ট্যানফোর্ড। মানে হার্ভার্ড, এম-আই-টিকে ছাড়িয়ে। তার সঙ্গে আমাদের তথাকথিত ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মিলিয়ে দেখতে চান? গত বছর ঢাকার স্থান ছিল ৪,০৬৬ বা সেরকমই একটা বিপুলাকার সংখ্যাতে। সুতরাং ‘নিজে যারে বড় বলে---‘ সেই পুরনো প্রবাদটি স্মরণে রাখতে পারলে শরমের মাত্রা হয়ত একটু কম হবে। বার্কলে আর স্ট্যানফোর্ডের মাঝে প্রতিযোগিতা কার কত নোবেলবিজয়ী। একসময় পদার্থবিদ্যা আর রসায়নশাস্ত্রে বার্কলেতে বিশ্বের সবচেয়ে অধিকসংখ্যক নোবেলবিজয়ী ছিলেন। এখন তারা প্রায় সমান সমান। আমার স্বদেশী ভাইব্রাদাররা হয়ত বলবেন এগুলো সবই ‘ইহুদীদের’ স্বজাতিপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের পরিচয়। না ভাই, আমার মনে হয়না। এদেশে সেসব হয়না খুব একটা। অন্তত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে না। গতসপ্তাহে আমি প্যালো আল্টোতে গিয়েছিলাম ‘ইসলামিক গণিত’এর ওপর একটা জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনতে। স্ট্যানফোর্ড গণিতবিভাগের এক অধ্যাপক সেখানে চমৎকার বর্ণনা দিলেন কিভাবে দশম শতাব্দীতে পারস্যের মুসলিম পণ্ডিত ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি ‘এলজেব্রা’ নামক এক নতুন শাখা সৃষ্টি করেছিলেন গণিতশাস্ত্রে, যার প্রভাব আজকে বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা-উপশাখায় ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। ইসলামিক গণিতের ওপর এমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা আমি ঢাকা বা অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে শুনিনি। এই পণ্ডিত ব্যক্তিটি ইহুদী না খ্রীস্টান তা জেনে নেবার প্রয়োজন বা স্পৃহা আমার ছিল না বলে নেওয়া হয়নি, কিন্তু তিনি যদি ইহুদী হয়ে থাকেন আমি মোটেও আশ্চর্য হব না। জ্ঞানের বিষয়ে তাঁরা ধর্মভেদ খুব একটা গ্রাহ্য করেন বলে আমার মনে হয়নি, গত চল্লিশ বছরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতে।

                        তিন
  ফ্রিমন্টের কাছাকাছি সবচেয়ে বড় শহর হল স্যানফ্রান্সিস্কো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যময়তায় সমৃদ্ধতম শহরগুলোর অন্যতম। অবশ্য স্বল্পকালীন পর্যটকদের জন্যে শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় দৃশ্যগুলোর চাইতে বরং নিকটবর্তী ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজ’এর আকর্ষণই বেশি। স্যানফ্রান্সিস্কো বলতে তাদের মনে এই ব্রিজটার ছবিই ভেসে ওঠে সর্বপ্রথম। এখানে এসে ‘গোল্ডেন গেট’ ব্রিজ না দেখে ফিরে যাওয়া রীতিমত লজ্জার ব্যাপার। এটা হতেই পারেনা। আমার মত ভিড়ভিরু মানুষ, সেই আমারও বারতিনেক দেখা হয়ে গেল---যদিও, কেবল ব্রিজ দেখতে যাওয়া, সেটা একবারই হয়েছিল। ছেলের বাড়ি ফ্রিমন্টে না হলে পরের দুবার হত কিনা সন্দেহ।
  ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ডেন গেট ব্রিজ প্রকৌশলজগতের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। ১৯৩৭ সালের ২৭ শে মে’তে যখন এর দ্বারোদ্ঘাটন করা হয় জনসমুক্ষে তখন বিশ্বপ্রকৌশলীরা একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন যে পৃথিবীর শীর্ষতম অত্যাশ্চর্যের মধ্যে স্থান পাক বা না পাক, প্রকৌশলিক নির্মাণশিল্পে সারা বিশ্বের সেরা সৃষ্টির দাবিদার নিঃসন্দেহে এই অবিশ্বাস্য কাজটি। সেতুটির সর্বমোট দৈর্ঘ ১.৭ মাইল, প্রস্থ ৯০ ফুট, উচ্চতা ৭৪৬ ফুট। তখনকার বিচারে পৃথিবীর দীর্ঘতম ও উচ্চতম ঝুলনসেতু (Suspension Bridge)।কেবল ঝুলে থাকা অংশটুকুর দৈর্ঘই ৪,২০০ ফুট। পরবর্তিতে নিউইয়র্কের ভেরাজানো ব্রিজ তৈরি হয়েছিল আরো ৬০ ফুট ঝুলন দিয়ে। বিশ্বজোড়া এখন আরো অনেক ঝুলনসেতু তৈরি হয়েছে যাদের দৈর্ঘ-প্রস্থ-উচ্চতা গোল্ডেন গেটের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু গোল্ডেন গেট ছিল ’৩৭ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ান---সে রেকর্ড কেউ ভাঙ্গতে পারবে না। তাছাড়া রেকর্ড সম্বন্ধে সেই যে পুরনো প্রবাদঃ রেকর্ড তৈরি হয় একটি কারণেঃ একদিন ভাঙ্গা হবে বলে। সে প্রবাদের রেকর্ডই বোধ হয় একমাত্র রেকর্ড যা কেউ ভাঙ্গতে পারবে না কোনদিন।
  ব্রিজটির নামকরণ বিষয়ে ছোট একটা গল্প আছে। নামটি চয়ন করেছিলেন সেই একই ব্যক্তি---- ‘পথপ্রদর্শক’ বলে যিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন সারা দেশব্যাপী, ক্যাপ্টেন চার্লস ফ্রিমন্ট, যাঁর নামানুসারে পরবর্তিতে ফ্রিমন্ট শহরের নামকরণ। ক্যাপ্টেন ফ্রিমন্ট কেবল যে বীর যোদ্ধা ছিলেন তাই নয়, দক্ষ প্রকৌশলী হিসেবেও নামধাম ছিল তাঁর। গোল্ডেন গেটের নির্মাণকর্মে তাঁর একটা বড় ভূমিকা ছিল। তিনি একবার তুরস্কে গিয়েছিলেন বেড়াতে। তুর্কি ভাষার একটা শব্দ তাঁর খুব ভাল লেগেছিল---‘ক্রিসোসেরাস’, যার অর্থ golden horn, আক্ষরিক বাংলায় স্বর্ণশৃঙ্গ। আফ্রিকার মানচিত্রে সোমালিয়া দেশটির অবস্থান অনেকটা গণ্ডারের শিঙ্গের মত দেখতে বলেই তো ওটাকে ‘হর্ণ অফ আফ্রিকা’ বলে অভিহিত করা হয় মাঝে মাঝে। তাঁর ইচ্ছে ছিল পুলটার নাম দেবেন ‘ক্রিসোপাইলি’। শব্দটি আসলে গ্রীক থেকে উদ্ভূত। ‘ক্রিসস’ মানে সোনা, আর ‘পাইলি’ মানে দুয়ার। দুয়ে মিলে স্বর্ণদ্বার। শেষে কি ভেবে বললেনঃ তার চেয়ে সোজা ইংরেজিতেই এর নাম হোক ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজ’। বেশ তাৎপর্যপূর্ণ নামও বটে। এ তো প্রশান্ত মহাসাগরের দুয়ার খুলে দিয়েছে স্যানফ্রান্সিস্কো উপসাগরের কাছে----একটির জল গড়িয়ে গড়িয়ে আরেকটিতে মেশে এর তলা দিয়ে।
  এই অঞ্চলে আরো কতগুলো বিশাল বিশাল সেতু আছে। বে ব্রিজ (পুরনো ও নতুন), রিচমণ্ড ব্রিজ, ডামবার্টন ব্রিজ। ছেলেবৌমার সৌজন্যে সবগুলোই মোটামুটি দেখা হয়ে গেছে আমার। ‘দেখা’ বলতে আমি ভাসা ভাসা দেখাটির কথাই বলছি, যেমন করে দেখে সখের পর্যটকরা----ডিজিটাল ক্যামেরাতে ঝটপট কটা ছবি তুলে নেয়া, ব্যস, দেখা হয়ে গেল। দুচারবার ওগুলোর ওপর দিয়ে যাওয়া আসা করা, তাতেই বিশারদ হয়ে যাওয়া। আমিও সেরকম বিশারদই। তবে বড় বড় সেতুর অন্তত দুটি সত্ত্বা আছে। এক, তার দৈহিক বা যান্ত্রিক সত্ত্বা। লোহালক্কড় শীলপাথর ইত্যাদি। যাতে মানুষের মেধার প্রকাশ। দুই, তার নান্দনিক সত্ত্বা, যেখানে নির্মিত সৌধের দেয়ালে দেয়ালে অদৃশ্য অক্ষরে খোদাই করা হয় মানুষের কল্পনা দিয়ে গাঁথা বিজয়গীতি। সেখানে কবি পায় কবিতার খোরাক, শিল্পী পায় ছবির খোরাক। আমি এক সামান্য গাণিতিক----তথাপি আমি দেখি ফলিত গণিতের জয়জয়াকার সেতুগুলোর প্রতিটি গ্রন্থিতে। সাথে সাথে আমার কিঞ্চিৎ কাব্যবিলাসী মনও যে মেঘের রাজ্যে ডানা মেলে উড্ডীন হতে চায় না এখানে এসে তা নয়। দূর থেকে যখন দেখি ডাম্বার্টনকে, চারপাশের বিপুল শূন্যতার মাঝে হঠাৎ করে ভেসে ওঠা কোনও প্রাগৈতিহাসিক দৈত্যের মত, অথবা ব্রিজের মাঝখান থেকে গোল্ডেন গেটের দিকে চোখ ফেরালে মনে হয় প্রশান্ত মহাসাগরের অশান্ত জলে ভাসমান কোনও রহস্যপুরি, তখন মনে হয়, আহা, যদি এমনি করে ভেসে যেতে পারতাম অপার ছন্দে অপার আনন্দে এক সমুদ্র থেকে আরেক সমুদ্রে, এক আকাশ থেকে আরেক আকাশে। সাঁঝের গোধূলি এই ব্রিজগুলোকে আরো রহস্যময় করে তোলে। মনে হয় তারা যেন কুয়াষার দেশে হারিয়ে যাচ্ছে, একাকার হয়ে যাচ্ছে নিসর্গের অন্তহীনতার সাথে। সাঁঝের বেলার মুগ্ধ নীরবতায় তারা এক কুহকিনী সত্ত্বা অর্জন করে। তখন ডাম্বার্টন ব্রিজ কোনও খনিজ ধাতুনির্মিত নিশ্চল সেতু থাকে না, ধ্যানমগ্ন ঋষির আকার ধারণ করে। উপসাগরের নীল জলের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়।
                          
                        চার

  মঙ্গলবার সকালবেলা আমরা রওয়ানা হলাম উত্তরের পথে। কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি সেসব নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাইনা ক্যালিফোর্নিয়াতে এসে। ওরা যেমন বলেনি আমাকে, আমিও জানতে চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। যেখানেই যাই সূর্য ডোবার আগে আগে যেতে পারলেই হয়। আমাকে জায়গায় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজটি সাধারণত সোফিয়ার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়----পাকা টুর ম্যানেজার বলতে পারেন। কখন কোন পথে গেলে সময় বাঁচানো যাবে (যদি সময় বাঁচানোটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকে), বা কোন রাস্তায় ভিড় কম ঠিক কোন্ সময়গুলোতে সেসব তথ্য ওর নখদর্পণে। ও সঙ্গে থাকলে আমি নিশ্চিন্ত। সকালে নাস্তা খেতে খেতে ও বললঃ আব্বু আজকে আপনাকে আরমস্ট্রং ফরেস্ট অঞ্চলে নিয়ে যাব। এখান থেকে শ’খানেক মাইল উত্তরে। বেশতো, চল, বলে আমি তৈরি হয়ে গেলাম।
  ডিসেম্বর ঠিক অক্টোবর-নভেম্বরের মত চিত্তাকর্ষক নয় ক্যালিফোর্নিয়ার এ অঞ্চলটিতে। মানে, বনবনানীর বাইরের রূপের দিক থেকে। গাছে গাছে রঙের বাহার ছোটা, সেটা কেবল হেমন্তেরই কপালে জোটে। তবে ডিসেম্বরেরও একটা রূপ নেই তা নয়। পাতাঝরা গাছগুলোও অরূপা নয় আমার চোখে। অনেক সময় দুধারের সারি সারি নিষ্পত্র লম্বা গাছগুলো দেখতে মনে হয় যেন এরা উদ্ভিদজগতের উলঙ্গ মডেল। আশেপাশের পাতাভরা গাছগুলো, চিরহরিৎ যাদের বলি আমরা, তারা যেন কোনও যাদুকরি তুলি দিয়ে আঁকছে মডেলগুলোর পত্রপুষ্পরহিত মূর্তি। প্রকৃতির শিল্পভাবনার খবর আমরা কেমন করে জানব। ডিসেম্বরের নেংটা গাছেরও সৌন্দর্য আছে। তাই আমার চোখে মে আর ডিসেম্বর, উভয়ই সমান সুন্দর। সমান সৌম্যতায় সুমহান।
  ক্যালিফোর্নিয়ার প্রকৃতি আর আমাদের অন্টারিও-কিউবেকের প্রকৃতিতে তারতম্য আছে খানিক---ভৌগলিক কারণেই অবশ্য। ক্যানাডার পূর্বাঞ্চলের বনবাদাড়ে ওক-মেপল আর পাইন-সিডারের যতটা প্রাধান্য, এখানে তেমন নয়। এখানে বরং আকাশচুম্বী রেডউডেদেরই রাজত্ব। বিপুলদেহী, অভ্রংলিহ মহীরুহ তারা----গাছগুলোর দিকে তাকালে বিগত প্রাগৈতিহাসিক যুগের দৈত্যাকার জীব ডাইনাসোরদের ছবি কল্পনায় এসে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার এই ঐরাবতদের নিচে দাঁড়িয়ে আমি উচ্চতার অর্থ বুঝি। এবং সেই উদ্বাহু উদ্ধত উচ্চতার কাছ থেকে নম্রতা শিখি।
   ছোট শহর----পাখির নীড়ের মত পেলবদেহী এক ক্ষুদ্র শহর গুর্ণভিল। শহরে ঢুকবার পথে ছোট্ট একটা ব্রিজ পার হতে হয়েছিল। ব্রিজে ওঠার সাথে সাথে সোফিয়া বেশ উত্তেজিত হয়ে দেখাতে লাগলঃ আব্বু আব্বু দেখুন দেখুন, নিচে তাকান, বিখ্যাত ‘রাশিয়ান রিভার’। গাড়ির ভেতর থেকে যতটা ভাল করে তাকানো সম্ভব আমি তাকালাম। উত্তেজিত হওয়ার মত কিছু চোখে পড়ল না আমার। আমাদের হাসনাবাদ গ্রামের মাঘের শীতে শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে পড়া আড়িয়লখাঁর চেয়ে বেশি সুস্থ বলে মনে হল না----তাহলে ‘রাশিয়ান নদী’ বলে খ্যাতি পেয়ে গেল কোন্ গুণে? ইতিহাস জিজ্ঞেস করাতে দেখলাম মাথা চুলকানি শুরু হয়ে গেছে। ইতিহাস আমার নিজেকেই খুঁজে বের করতে হল। পুরাকালে, অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গজাতির আগমন বা আক্রমনের আগে নদীটার নাম ছিল ‘আশাকোনা’----স্থানীয় ইণ্ডিয়ান নাম, যার অর্থ ‘পূর্বস্রোতা নদী’। ১৮২৭ সালে এর স্পেনীশ নামকরণ হয় ‘স্যান ইগনাচিও’ (আমরা যেন ভুলে না যাই যে ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়া ছিল স্পেনীশ ভাষাভাষী মেক্সিকোর দখলে। আমেরিকানদের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যাবার পর মাত্র তিনবছরের মধ্যে, ১৮৪৯ সালে, রাজ্যটি গোটা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে)। সেসময় ক্যালিফোর্নিয়ার সীমানা থেকে অল্পবিস্তর উত্তরে ছোটখাটো একটা রাশিয়ান কলোনি ছিল। তাদের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ফোর্ট রস’ নামক জায়গাটি। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ছিল রাশিয়ান-আমেরিকান ফার কোম্পানি নামক এক যৌথ সংস্থা। আমেরিকান ‘স্বর্ণযুগের’ আগে ফার ব্যবসাই ছিল ইউরোপ থেকে আসা ভাগ্যসন্ধানীদের প্রধান লক্ষ। যা’ই হোক, ফোর্ট রসের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে স্পেনীশ নাম বদলানো দরকার ইগনাচিও নদীর। রাশিয়ানদের প্রভাব বেশি ছিল বলে প্রথমে এর নাম হল ‘স্লাভিয়াঙ্কা রিভার’ যার অর্থ ‘স্লাভ নামক এক নারী’। শেষে ইতিহাসের ক্রমিক বিবর্তনে স্লাভ শব্দটি মুছে গিয়ে দাঁড়ালো রাশিয়ান। মজার ব্যাপার যে ’৫০ থেকে ’৮৯ পর্যন্ত এতগুলো বছর কেটে গেল দুই শত্রুর ঠাণ্ডা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, অথচ ‘রাশিয়ান নদীর’ রাশিয়ান কেটে কেউ আমেরিকান বা ওয়াশিংটন করার প্রস্তাব করেনি। ভাগ্যিস। গল্পটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হল আমার কাছে। বিজয়ীর পদতলে বিজিতের জনপদই দলিত হয় না কেবল, নদীনালার নামও হয়। আদিবাসীর নাম বদলে হয় বিজয়ীর নাম, পরে সেই বিজয়ীর নাম বদলে হয় শেষ বিজয়ীর নাম।
  গুর্ণভিল শহরটি আমেরিকার অন্যান্য ছোট শহরগুলো যেরকম তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এখানেও একটা ‘মেইন স্ট্রীট’ আছে, একটা ‘চার্চ স্ট্রীট’ আছে, একটা ‘কিং স্ট্রীট’ আছে। ব্যবসাবানিজ্যের বেশির ভাগই সেই ‘মেইন স্ট্রীট’এর ওপরই। এখানে গাড়ি পার্ক করতে পয়সা লাগে না, পার্কিঙ্গের জায়গা পেতে দশবারো ব্লক চক্কর দিতে হয়না। আমরা পার্ক করে অলস দুপুরের মৃদুমন্দ বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। রেস্টুরেন্টটির নাম ‘বুন’। একটু অস্বাভাবিক মনে হল নামটা। সোফিয়ার কাছ থেকে নামের তাৎপর্য জানা গেল। এটি মালিকের পোষা কুকুরের নাম। প্রতিটি দেয়ালে সেই কুকুরের ছবি দেয়া পেইন্ট। আর কোন ছবি নয়, কোনও বাড়তি অলঙ্করণ নয়, কেবল একটি কুকুর বার বার দেখা দিচ্ছে সর্বত্র। রেস্টুরেন্টটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অবশ্য কুকুরের ছবি নয়, আহার্যবস্তুর অভিনবত্ব। এখানে সব খাবারই ‘সবুজ’, অর্থাৎ শাকসবজি থেকে শুরু করে মাছ মাংস সবই স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন, এবং স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে। এমনকি পানীয় দ্রব্যাদিও। অবাক লাগল সবচেয়ে বেশি ওতেই। মাদকদ্রব্য সচরাচর স্থানীয়ভাবে তৈরি হতে কোথাও দেখিনি আমি। এখানে দেখলাম। ক্যালিফোর্নিয়া বলেই বোধ হয় সম্ভব হয়েছে---এ অঞ্চলে উত্তর আমেরিকার বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য চাষ হয়। দোকানের আয়তন কিন্তু বিশাল কিছু নয়, গোটা ত্রিশেকের বেশি লোক একসাথে ধরবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু রেস্টুরেন্টটির নামধাম নিশ্চয়ই চারদিকে ছড়িয়ে গেছে----আমরা প্রায় বিশ মিনিট অপেক্ষা করে পাঁচ সীটের একটা টেবিল পেলাম শেষ পর্যন্ত।
  খেয়েদেয়ে পাশের একটা সুভেনিয়ার শপে ঢুকলাম আমরা। বিশেষ কিছু কেনার জন্যে নয়, ঘুরে ঘুরে চোখ বুলানোর জন্যে। দু’টি স্থানীয় ছবিওয়ালা কার্ড চোখে পড়ল আমার। আজকাল তো লোকে এভাবে কার্ড পাঠায় না কাউকে---সবই তো ই-কার্ড, আর ই-মেসেজ। কার্ড কিনে পয়সা দিতে গিয়ে দেখা গেল যে দোকানদার নিজেই সেই ক্যাশিয়ার। এবং তিনি বেশ লেখাপড়া জানা লোক---রসায়নশাস্ত্রে ডিগ্রি করেছেন, বিবর্তন তত্বের ওপর পড়াশুনা করেছেন, দেশবিদেশের খবরাখবর রাখেন ( যা আমেরিকান জাতির জন্যে এক পরমাশ্চর্য ব্যাপার)। ইচ্ছে হচ্ছিল জিজ্ঞেস করি এতটা শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে তিনি এই নাম-না-জানা শহরে সুভেনিয়ার ব্যবসার প্রতি আকৃষ্ট হলেন কেমন করে। থেমে গেলাম। ‘নান অফ মাই বিজিনেস’। তাছাড়া বর্তমান যুগের আমেরিকায় বেকারসমস্যা যে কোন্মাত্রায় পৌঁচেছে সেটা নিউইয়র্কের পি.এইচ.ডি ডিগ্রিধারী ট্যাক্সিওয়ালাদের জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে। তবে এটাও সত্য যে ইউরোপ-আমেরিকার সাধারণ লেখাপড়ার মান এতটাই উন্নত অন্যান্য দেশের তুলনায় যে কর্মজীবনে অত্যন্ত সাধারণ বৃত্তিভোগী মানুষও অনেক সময় উঁচুমানের জ্ঞানের পরিচয় দিয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন প্রবাসজীবন যাপন করে এই অভিজ্ঞতাটি আমার অনেকবারই হয়েছে। দুঃখের বিষয় যে এই প্রজন্মটি এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরনোযুগের চিঠিপত্রের মত সখের জ্ঞানচর্চাও একরকম সেকেলে ‘সময়ের অপব্যবহার’ ছাড়া কিছু নয়।

                             পাঁচ

   গুর্ণভিল থেকে আমাদের গন্তব্য দু’মাইল উত্তরে। সোফিয়ার কাছ থেকে জানা গেল যে সেখানেও সমুদ্র আছে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সামান্য বেঁকে আসা একটি ক্ষুদ্রতর উপসাগর। কিন্তু সে-সাগরকে দেখতে হবে অরণ্যের চোখ দিয়ে---বনবনানীতে আচ্ছন্ন পরিবেশ। অরণ্য আমার অত্যন্ত প্রিয়----পাহাড় বা সমুদ্রের চেয়ে কম নয় তার আকর্ষণ আমার কাছে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিম উপকূলে বিপুলাকার প্রহরীর মত দণ্ডায়মান লোহিতবৃক্ষের(Redwood trees)অরণ্য। ছেলেবৌমার কর্মস্থল বেশ কাছাকাছি জায়গাতে হওয়ার ফলে গত সাত আট বছরে বেশ ক’টি বনই আমার দেখা হয়ে গেছে। কর্ণেল মুয়ের, সান্টাক্রুজ, ইউসেমিটি----কত না অজানার কত সম্ভারভরা অন্তঃপুরিতে প্রবেশ করে প্রকৃতির মুখোমুখি হবার সুযোগ হল জীবনে। তবু যেন তৃপ্তি হলনা এখনও। এদেশের বড় ম্ন আর বড় মেধার মানুষগুলো আমাদের মত ছোট ছোট মানুষগুলোর জন্যে কতনা অপার ঐশ্বর্য দিয়ে ভরাট করে গেছেন জীবনের আনন্দভাণ্ডার। যেখানে যাই সেখানেই দেখি উণ্মুক্ত আনন্দদুয়ার, দেখি বিস্ময়, যেদিকে কান পাতি সেদিকেই শুনি বিপুলের আহ্বান।
  ‘মাত্র’ দু’মাইল রাস্তা বটে, কিন্তু সে-পথ প্রাদেশিক হাইওয়ের প্রশস্ত সড়ক নয়, সে-পথ যেন অন্ধকারের সুড়ং দিয়ে তার গুপ্ত প্রকোষ্ঠে বলপূর্বক প্রবেশ করতে চাওয়ার মত। উপত্যকার উঁচুনিচু, বুনো পথ, দিনের আলো যেখানে নিশার কাছে নতজানু, সেই পথে আস্তে আস্তে, সন্তর্পনে, অতীব সতর্কতায়, গাড়ি চালিয়ে বাবু আমাদের নিয়ে এল Armstrong Redwoods State Natural Reserve এর পার্কিং লটে। পার্কিঙ্গের বিস্তর জায়গা সেখানে। পরিবেশটিতে পুরোপুরি বুনো গন্ধ থাকলেও দর্শক-পর্যটকদের সুবিধার জন্যে আধুনিক ব্যবস্থাদির কোনটাতে কোন ত্রুটিই ছিল না, অন্তত আমাদের দৃষ্টিতে। এদেশের সরকার-সংরক্ষিত পার্কগুলোর সর্বত্র প্রায় একই ব্যবস্থা। ওয়াশরুমগুলো ঠিক ফাইভস্টার হোটেলের মত আহামরি না হলেও ভদ্রভাবে ব্যবহারযোগ্য নয় এ-অপবাদ দেওয়া চলবে না। ছোটখাটো একটা চায়ের দোকান, সুভেনিয়ার দোকান, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেগুলোও খোলা থাকে। গাড়ি রেখে, গায়ে ভারি জামাকাপড় জড়িয়ে, ভেজামাটিতে হাঁটার মত মোটা জুতোমোজা  পরে আস্তে আস্তে যাত্রা শুরু করা---সহজ ইংরেজিতে দিকনির্দেশনা ও ঐতিহাসিক বর্ণনাসম্বলিত প্ল্যাকের ট্রেইল ধরে ধরে বনের অন্ধকারে ডুব দেওয়া, এই হল বনদর্শনের প্রস্তাবিত ও প্রচলিত রীতি। ব্যতিক্রম করতে চাইলে কেউ হয়ত বাধা দেবে না, কিন্তু আনাড়ি দুঃসাহসীদের জন্যে তার পরিণাম খুব রোমান্টিক না’ও হতে পারে। বিপদসঙ্কুল টুরিস্ট এলাকাগুলোতে এধরণের ব্যত্যয়বাদী উদাহরণ স্থাপন করতে গিয়ে লোকজন নিখোঁজ হয়ে যাবার খবর মাঝে মাঝেই শোনা যায় সংবাদমাধ্যমে। ৪৪০ একর আয়তনের জনমানবহীন বনের নিশ্ছিদ্র নিরালাতে হারিয়ে যাওয়া, বিশেষ করে যেখানে দিনের বেলাতেও শ্বাপদ জন্তুদে্র আকস্মিক সাক্ষাৎলাভ মোটেও অশ্রুতপূর্ব নয়, সেখানে সুবোধ সুশীল বালকের মত ট্রেইল ধরে ধরে পরিচিত পথ অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
  এ-পার্কটির স্বত্বাধিকারি ও তত্বাবধায়ক বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য সরকার, কিন্তু এর ইতিহাসের পেছনে আছেন একজন বিশাল উদ্ভিদপ্রেমিক, সংরক্ষণবাদী ব্যক্তিত্ব। তাঁর নাম কর্নেল জেমস আর্মস্ট্রং। তাঁর জন্মস্থান ওহায়োতে। ঊনবিংশ শতাব্দীর একটা সময় ছিল যখন আমেরিকার কাঠের বণিকদের রমরমা ব্যবসা। কাঠের আকর্ষণেই কর্ণেল আর্মস্ট্রং ওহায়ো থেকে চলে এসেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেযুগে কাঠের কোনও অভাব ছিল না----চতুর্দিকে তো কেবল গাছ আর গাছ ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকাতে, সুতরাং কাঠের কারখানা খুলে ব্যবসা শুরু করতে পারলে অল্পদিনের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়াটা কোন সমস্যাই ছিল না তখন। আর্মস্ট্রং সাহেব সেভাবেই বিপুল অর্থসদম্পদ ও জমিজমা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু অন্যান্য ধনকুবের কাষ্ঠব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই মানুষটির খানিক তফাৎ ছিল একটা জায়গায়। তিনি কাঠ কেটে পয়সা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু গাছকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন, বৃক্ষসম্পদকে তিনি দেশের পারিপার্শ্বিক শোভাবর্ধন ও সুস্থ আবহাওয়াসৃষ্টির এক অপরিহার্য অংশ বলে গণ্য করতেন। কেবল টাকার লোভে বাসামাল বৃক্ষ উৎপাটনকে তিনি একপ্রকার অপরাধ বলে মনে করতেন। উৎপাটন ও সংরক্ষণ, এদু’টি প্রক্রিয়াকে তিনি পাশাপাশি রেখে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যে করেই হোক বনের এই অসম্ভব সুন্দর গাছগুলোকে কাঠুড়ের করাত থেকে রক্ষা করতে হবে, সেই উদ্দেশ্য মনে নিয়ে তিনি প্রথমত ক্যালিফোর্নিয়ার বনবনানীপূর্ণ উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা জুড়ে বনভূমি ক্রয় করে ফেললেন। দ্বিতীয় পদক্ষেপঃ স্ত্রীকন্যাপুত্র পরিবার নিয়ে ভিটেমাটি স্থাপন করা এ-অঞ্চলে। তৃতীয় পদক্ষেপঃ এবং এতেই প্রকাশ পায় লোকটার দূরদৃষ্টির পরিচয়--- সেই সংগৃহিত বনভূমির একটা মোটা অংশ, ৪০০ একর জমি, তিনি দলিল করে লিখে দিলেন তাঁর আদরিনী কন্যা কেইট আর্মস্ট্রঙ্গের নামে। দলিলের লিখিত শব্দগুলো ইতিহাসের কিংবদন্তীয় স্থান করে নিয়েছেঃ “ এক ডলার মূল্য ও সীমাহীন আদর আর ভালোবাসার বিনিময়ে”। আদরটা যে কার জন্যে সেটা তো পরিষ্কার, কিন্তু ভালোবাসাটি কি কেবল তাঁর কন্যারই জন্যে? নাকি তাঁর স্বপ্নের সংরক্ষিত বনভূমিরও জন্যে? দলিলের তারিখ ছিল ১৮৭৪ সাল। দুর্ভাগ্যবশত কেইট আর্মস্ট্রং ছিলেন চিররুগ্না---তিনি মারা যান ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে, বাবার মৃত্যুর দু’বছর আগে। পরম ভাগ্য যে কর্ণেল সাহেবের দ্বিতীয় কন্যা, এলিজাবেথ, তিনিও পিতার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি ও তাঁর স্বামী রেভারেণ্ড উইলিয়াম জোন্স গোটা জমিটা ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য সরকারের হাতে সমর্পণ করে দেন ১৯৩৪ সালে। ১৯৩৬ সালে সরকার প্রকৃতিপ্রেমিক জনসাধারণের জন্যে Armstrong Redwoods State Park এর দুয়ার উণ্মুক্ত করে দেন। পার্কটির জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৯৬৪ সালে সরকারি সমন দ্বারা গোটা অঞ্চলটিকে একটি সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়। তদুপরি সরকারি তহবিল নিয়োগ করে এর চতুপার্শ্বের আরো বিপুল পরিমাণ(সর্বমোট ৮০৫ একর) জায়গা ক্রয় করে এক বৃহত্তর বিনোদন প্রাঙ্গন সৃষ্টি করা হয়। আর্মস্ট্রং অরণ্যসহ এই বিশাল এলাকাটির সম্মিলিত নাম হয়েছে এখন---Armstrong Redwoods State Park and Austin Creek State Recreation Area. গালভরা নাম বটে!
  ১.১ মাইল লম্বা ট্রেইল। ঢোকার সাথে সাথে একটা সোঁদা বুনো গন্ধ আশ্রয় নিল নাসারন্ধ্রে। তাপমাত্রা যেন টুপ করে নেমে গেল দশ বারো ডিগ্রি। যেন বিরাট কোনও ফ্রিজের দরজা খুলে গেল কোথাও। প্রকাণ্ড সব গাছগুলো চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরল আমাদের---আদরে, আমন্ত্রণে। তারা যেন তোরণ সৃষ্টি করে রেখেছে আগন্তুকের জন্যে। এখানে সেখানে পতিত বৃক্ষ---যুগ যুগ ধরে পড়ে আছে হয়ত একই জায়গায়, তাদের গলিত ক্ষয়িত দেহের ওপর বসতি স্থাপন করেছে সবুজ মখমলের মত দেখতে স্তূপ স্তূপ শেওলা। অনভ্যস্ত চোখ অনায়াসে ভুল করে ভাবতে পারে কারো লিভিংরুমের মেঝেতে মসৃণ করে বিছানো দামি কার্পেট। কত শত বর্ষ ধরে তারা সার সংগ্রহ করে চলেছে সেই মৃত বৃক্ষের শরীর থেকে কে জানে। প্রাচীন বনভূমির এই এক বৈশিষ্ট্য---সেখানে সময় ভিন্ন নিয়মে চলে। কিম্বা চলেই না----একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন কালের গতির সঙ্গে তাল হারিয়ে। সেখানে সময় ডিপ ফ্রিজারে ঘনীভূত হয়ে আছে।
  একটি গাছের সামনে এসে দেখলাম ছোটখাটো একটা জটলা যেন---সাত আটজন লোক দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, ছবি তুলছে একে অন্যের, অগণিত ছবি (ধন্য হে ডিজ়িটাল প্রযুক্তি), গাছেদের ছায়াতে আড়াল হয়ে যাওয়া ছবি, অন্ধকারের ছবি। ওখানে বিশাল একটি বৃক্ষ একাকি দাঁড়ানো। একটা প্ল্যাক বসানো সামনে---Parsons Tree. উচ্চতায় ৩১০ ফুট, বয়স ১,৩০০ বছর! মাত্র তেরোশ’ বৎসর। মাথায় হাত দিয়ে রইলাম। গাছটির যখন শৈশব তখন মুসলমানদের স্বর্ণযুগ শুরু হবার উপক্রম, যদিও তখনও জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে স্পেনের দক্ষিণ উপকূলে প্রবেশ করা হয়নি। তার একটু পর বেশ বড়সড় একটা চত্ত্বর জুড়ে আরেকটি মহীরুহ। ওটাই নাকি আর্মস্ট্রং বনের প্রবীনতম বৃক্ষ----উচ্চতায় ৩০৮ ফুট, অর্থাৎ আগেরটির চেয়ে দুই ফুট ছোট, কিন্তু এর বয়স ১,৪০০ বছর! অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের সূচনা থেকে শুরু করে আধুনিক যান্ত্রিক যুগের প্রায় পুরোটাই তার দেখা হয়ে গেছে। মনে মনে আওড়ালাম কয়েকবারঃ চৌ-দ্দ-শ-ব-ছ-র! আশেপাশের কতগুলো মরা গাছ, বাজপোড়া গাছ, রোগেতাপে-ক্ষয়প্রাপ্ত গাছ, তারাও সব থিতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্টুডিওর মডেলদের মত। এরাও সেই পটে-লিখা ছবির মত কালের ললাটে আঁকা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে মানবচিত্তের অন্তহীন জিজ্ঞাসাকে অমর করে রেখেছে। এদেশের প্রাচীন বনগুলো এভাবেই মানুষকে সময় নামক রথের ভেতর বসিয়ে গতির বিপরীতে ধাবিত হয়ে দূর অতীতে নিয়ে যায়। আমরা ক্ষণিকের জন্যে মহাকালের সঙ্গী হই। ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে স্থানান্তরিত হয়ে পড়ি নিজেদের অজান্তে। ভাবতে থাকি, আমরা কি এখন না তখন, এখানে না সেখানে। বন আমার কালের সম্বিৎ হরণ করে।

                            ছয়

   নববর্ষের পরের দিন সবাই মিলে স্যানফ্রান্সিস্কো গেলাম। উদ্দেশ্যঃ সোফিয়ার বাবার কবরে গিয়ে নীরবতা পালন করব (তিনি মারা গিয়েছিলেন গত বছরের ৫ই জানুয়ারিতে)। স্যানফ্রান্সিস্কোর বৃহত্তম কবরস্থান এটি, এবং দেখবার মত জায়গা। গাড়ির ভেতর থেকে তাকালে দুতিনমাইল দূর থেকেই দেখা যায় হাজার হাজার কবর কাতারে কাতারে সাজানো পাহাড়ের গায়ে----মনে হয় যেন কোনও সখের কৃষকের বিরাট এক ফুলকপির ক্ষেত, ঢালে ঢালে ছড়িয়ে পড়েছে দিগবিদিক জুড়ে। সে এক অভিনব দৃশ্য বটে। দেখে কি মন হল, সোফিয়াকে বললামঃ শহরটা যেন মরামানুষের দেশ, মৃতের নিবাস। জবাবে ও যা বলল তাতে আরো অবাক হলাম। আব্বু, এটা কোনও বাড়িয়ে বলা নয় যে স্যানফ্রান্সিস্কোতে জীবিত মানুষের চেয়ে মৃতের সংখ্যাই বেশি। এতে অবশ্য অবাক হবার নেই কিছু। শহর যত পুরনো হবে ততই বাড়বে মৃতের সংখ্যা, জীবিতের সংখ্যা বাড়ুক বা না’ই বাড়ুক। বিশেষ করে মরার পর কবর দেওয়াই যেখানে সাধারণ নিয়ম।
  ফেরার পথে সোজা ফ্রিমন্ট না এসে সোফিয়া বললঃ চলুন আব্বু, আপনাকে টুইন পিক্স্ দেখতে নিয়ে যাই। গোটা বে এরিয়াতে যত টিভি স্টেশন তাদের বড় বড় দু’টি টাওয়ার সেখানে----শহরের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার। টুইন পিক্স্কে কেন্দ্র করে বিরাট এক পর্যটক বানিজ্য গড়ে উঠেছে এখানে। এই নামের পেছনে ছোট্ট কাহিনী আছে। টেলিভিশন টাওয়ার তৈরি করার আগে জায়গাটা ঠিক উপযোগী হবে কিনা সেটা পরীক্ষা করতে হেলিকপ্টারে করে তদন্ত করছিলেন কর্মকর্তারা। তাদের চোখে পড়ল পাশাপাশি দুটো মাটির ঢিবি পাহাড়ের চূড়াতে---যেন কোনও রূপসী নারীর দুটি সুডোল স্তন। তা থেকেই নাকি নামটির সূত্রপাত। কেবল স্যানফ্রান্সিস্কোর মত ব্যতিক্রমধর্মী শহরেই সেটা সম্ভব এদেশে। শহরটি সর্বব্যাপারেই ব্যতিক্রম। ‘৬০এর হিপি আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবরোধী আন্দোলন, প্রতিবাদসভা, বর্তমান যুগের সমকামী আন্দোলন, এধরণের প্রায় প্রতিটি সামাজিক আন্দোলনেরই জন্মভূমি এই শহর।
  টুইন পিক্সের চূড়াতে পৌঁছলাম বেলা তিনটের দিকে। মনে হল লোকের চেয়ে গাড়ির সংখ্যাই যেন বেশি। হাঁটার জায়গা নেই এমন অবস্থা। সৌভাগ্যবশত সেদিন আবহাওয়া ছিল একেবারে ছবির মত সুন্দর। এত উঁচু থেকে কুয়াসামুক্ত শহরের দৃশ্য দেখা, সচরাচর ভাগ্যে ঘটে না। কুয়াসা বা মেঘ এ-শহরটির যেন একটা বৈশিষ্ট্য। গোটা শহরটাই তো পাহাড়ের ওপর, তাই। কিন্তু সেদিন বিন্দুমাত্র ঝাপসা ছিল না কোথাও---একেবারে পরিষ্কার। সেখান থেকে পুরো শহরটা, এবং তার আশেপাশের অন্যান্য ছোটখাটো শহরগুলো খালি চোখ দিয়ে দেখতে পারা, সে এক শিহরণ বটে। সেখান থেকে আমরা দেখলাম গোল্ডেন গেট ব্রিজ, দেখলাম বিখ্যাত আলকাট্রাজ বন্দীশিবির, দেখলাম অপর পারের ওকল্যাণ্ড শহর, বার্কলে, দেখলাম ওকল্যাণ্ড বন্দরে নোঙ্গর করা সারি সারি বাণিজ্যজাহাজ। একেই বলে প্যানোরেমিক ভিউ। সংসারের নিয়মই এই। কোন জায়গা, কোন দেশ, কোন জাতি, দেয়ালের একটা ছবি, এমনকি কোন একটি মানুষকেও ভালো করে দেখতে চাইলে, একটু দূরত্ব নিয়ে দেখতে হয়, একটু উঁচুতে উঠে।

ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া
৪ঠা জানুয়ারি,’১২

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে