Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ , ৯ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (40 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-০৪-২০১২

কাকে ছোট করা হলো, ড: ইউনুস না গোটা জাতিকে!-নিউ ইয়র্ক থেকে সাঈদ তারেক

কাকে ছোট করা হলো, ড: ইউনুস না গোটা জাতিকে!-নিউ ইয়র্ক থেকে সাঈদ তারেক
বছরের শেষ শুক্রবারটায় বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারন সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার রেওয়াজ। সে হিসেবে গত বছরের শেষ শুক্রবার ছিল ৩০ ডিসেম্বর। অনেক দিন যাওয়া হয়না, মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম এ বছর যখন ঢাকায়ই আছি সময় থাকলে যাবো একবার। যাওয়া মানে পুরনো বন্ধু বান্ধবদের সাথে দেখা সাক্ষাত হওয়া। অতীত দিনের স্মৃতিচারন এর ওর খোঁজ খবর নেয়া আর দুপুরের খাবার খেয়ে কেটে পড়া। আমার মত অবস্খা অনেকেরই। অনেক গুরু গম্ভীর আলোচনা হয় সে সভায়। সকালে ভাব গম্ভীর পরিবেশে উদ্বোধনী পর্ব, এই ভাষন ওই ভাষন- এই পর্যন্ত মোটামুটি সকলেই প্যান্ডেলে থাকেন। তারপরই শুরু হলো এখানে ওখানে জটলা, আড্ডা।

আসলে বাংলা একাডেমির কাজকর্ম সম্পর্কে আমার ধারনা একেবারেই কম। বাংলা ভাষা বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনের জন্য এরা কি করে চলেছেন, যাই করে চলুন আসলেই তা ভাষার সমৃদ্ধিতে কোন ভূমিকা রাখতে পারছে কিনা, ব্যপাক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব এইসব উদ্যোগ আয়োজনের কোন প্রভাব আছে কিনা- সেসব নিয়ে কোনদিন মাথা ঘামাই নাই। একাডেমির আজীবন সদস্য, বছর শেষে একটা নিমন্ত্রণ পাই, সাধারন সভায় গিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা মারি, এক বেলা ভুড়িভোজ- এর বাইরে বাংলা একাডেমি থেকে কোন প্রাপ্তি আমার নাই। দেবারও কিছু নাই আমার। মনে আছে ইহ জীবনে সম্ভবত: একবার নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম। একাডেমিকে ওইটুকুই আমার দেয়া। এরপর থেকে ভোট কবে আসে কবে যায় সে খবরও পাই নাই কোন দিন।

যাই হোক, এবার মনে মনে একটা আশা ছিল সাধারন সভায় একবার যাবো। বছর প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে কোন চিঠিপত্র আসে নাই। কাজের চাপে খোঁজও নিতে পারিনা। একবার ভ্রমও হলো তাহলে কি কোন ফাঁকে দিনটা চলে গেল! তেমনটা হওয়ার কথা নয়। একটা কাজে একাডেমির লোকজন করিৎকর্মা, চিঠিপত্র বাসায় পৌঁছানো। কিন্তু কোন দাওয়াতপত্র তখনও আসে নাই। ভুলেই গেছিলাম প্রায়, আগের দিন রাতে বাসায় ফিরে দেখি বাংলা একাডেমির প্যাকেট।

হ্যাঁ দাওয়াতপত্র, পুস্তিকা। পর দিন সকালেই সাধারন সভা। ভাবলাম, যাক আগের দিন রাতে হলেও কাগজপত্র পৌঁছেছে তো। না পাঠালেই বা কি করতে পারতাম। শুক্রবার, কাজ তেমন নাই। সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া ছিল, মনে মনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। ক’টায় যেতে হবে দেখতে আমন্ত্রণপত্র খুলেই মনটা দমে গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে অনুষ্ঠানে যাবেন। না, মন খারাপের কারন সেটা নয়। অনুষ্ঠানে দুইজন বিশিস্ট ব্যক্তিকে একাডেমির ফেলোশীপ প্রদান করা হবে। মন খারাপের সেটাও কারন নয়। এই দুই বিশিস্ট ব্যক্তির একজন হচ্ছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং অপরজন ভারতের বাংগালী নোবেলজয়ী ড: অমর্ত্য সেন। দুইজনই থাকবেন মঞ্চে, বসবেন পাশাপাশি। মনটা দমে গেল, এই দেশেরই সন্তান, শুধু বাংগালী নন জাতির মুখোজ্জলকারি একজন বাংলাদেশী নোবেলজয়ীর কোন স্খান নাই সে মঞ্চে!

নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো। এমন হিপোক্রাট আমরা, নিজেদেরকেও সম্মান করতে জানি না। এর আগে একবার এমনটা ঘটেছিল। প্রধানমন্ত্রী ড: অমর্ত্য সেনকে নিয়ে এক মঞ্চে বসেছিলেন। ভাষনে বাংগালী নোবেলজয়ী হিসেবে ড: সেনের গুন কীর্তনে মুখর হয়েছিলেন। একবারও বাংলাদেশী নোবেলজয়ীর নাম মুখে আনেন নাই। তখনই ছি: ছি: উঠেছিল। আমরা বলেছিলাম, ড: ইউনুসের নোবেল জয় কোন ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়- জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের জন্য বিরল সম্মান। সেই নোবেলজয়ীকে অসম্মান করলে জাতিকে ছোট করা হয়, অসম্মান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এ ব্যপারে বরাবরই ড্যাম কেয়ার। সুরঞ্জিত বাবুর কথায় ‘বাঘে ধরলে বাঘে ছাড়ে, শেখ হাসিনা যারে ধরে.....’- প্রধানমন্ত্রী ড: ইউনুসকে ছাড়েন নাই। তাকে হেয় করা ছোট করা অসম্মান করার সর্বচেষ্টা চালানো হয়েছে। গ্রামীন ব্যাংক থেকে তাড়ানো হয়েছে। এ সবের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে ম্যাসেজ দেয়ার চেষ্টা হয়েছে ড: ইউনুস নোবেল পাবার যোগ্য নন। নোবেল কমিটি ড: ইউনুসের মত লোককে নোবেল দিয়ে ভুল করেছে। এই প্রচারণায় বাতাস দিতে দেখা গেছে দিল্লীকে। তখনই বোঝা গেছে গেমটা কোথায়।

সে সব যাই হোক, ড: ইউনুস গ্রামীন ব্যাংক ইস্যু এখন গত। এ সরকার বিদায় হলে আবার সিনারিও পাল্টে যাবে, কাজেই এখন এসব নিয়ে আলোচনা নিরর্থক। আমার দু:খের কারন, সেই একই ভুলটা বাংলা একাডেমি আবারও করলো! ড: অমর্ত্য সেন একজন বাংলাভাষী নোবেলজয়ী তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু পরিচয়- তিনি ভারতীয়। ড: সেনকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনি কোন দেশী কোন জাতি কি আপনার পরিচয়, তিনি একবাক্যে বলবেন আমি ভারতীয় আমি ভারতীয় জাতি এবং আমি একজন ভারতীয়- এটাই আমার পরিচয়। লন্ডনে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্র পড়ান সেখানেও তার পরিচয় তিনি একজন ভারতীয়, বাংগালী তার দিবতীয় বা ঘরোয়া পরিচয়। বাংলা একাডেমি তাদের আমন্ত্রনপত্রে ড: অমর্ত্য সেনকে একজন ‘বিশ্ব বরেণ্য’ বাংগালী অর্থনীতিবিদ বলে বিশেষায়িত করেছে। এমন অনেক ‘বিশ্ব বরেন্য’ আছেন যারা সারা বিশ্বে নিজেদেরকে ভারতীয় পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন, এরা বাংগালী হয়ে যান বাংলাদেশে এসে। এদেরকে যদি বলা হয় আপনি তো বাংগালী, আমাদের জাতীয়তাবাদও বাংগালী, বাংগালীদের একটাই দেশ, আসুন ভারতের নাগরিকত্ব ছেড়ে এই দেশের নাগরিক হয়ে যান- আমার বিশ্বাষ ঝেড়ে দৌড় দেবেন। আর দ্বিতীয়বার ঢাকায় এসে প্রণাম নমষ্কার নেবেন না!

এইসব ‘বিশ্ব বরেণ্য’দের সাথে ড: ইউনুসের পার্থক্য হচ্ছে তার পরিচয় তিনি একজন বাংলাদেশী। কোথাও পরিচয় দিতে গেলে তিনিই বলবেন আমি একজন বাংগালী, আমি বাংলাদেশী। দু:খ হচ্ছিল এই একমাত্র বাংগালী-বাংলাদেশী নোবেলজয়ীর স্খান হলো না বাংলা একাডেমির মঞ্চে! ড: অমর্ত্য সেনকে ফেলোশীপ দিতে হবে, ভাল কথা। একাডেমি ইচ্ছা করলে যে কাউকে সে সম্মান দিতে পারে। আমাদের ড: ইউনুস কি দোষ করেছেন! ফেলোশীপ না দেয় যায় অন্তত: তাকে মঞ্চে তো রাখা যেত! কি মনে করলেন ড: অমর্ত্য সেন! নিজের দেশের নোবেলজয়ীকে বিদেশে তাড়িয়ে দিয়ে আর এক দেশের একজনকে ডেকে এনে ফুল চন্দন দিয়ে বরন করাকে কি তিনি খুব ভালভাবে নিয়েছেন। যে কোন ভদ্রলোকের জন্য এটা একটা অস্বস্তিকর ব্যপার। ড: অমর্ত্য সেন একজন ভদ্রলোকের সন্তান বলে আমার বিশ্বাষ, নিশ্চয়ই তিনিও ব্যপারটায় আহ্লাদিত হন নাই। আমাদের বাংলা একাডেমির হর্তাকর্তা নীতি নির্দ্ধারকদের গায়ের চামড়া এতই মোটা, মান সম্মান জ্ঞান এতটা লোপ পেয়েছে যে, দুইজনমাত্র বাংগালী নোবেলজয়ী, তাদের একজনকে বিশেষ সম্মান দিলে আর একজনকে মঞ্চেও আমন্ত্রণ না জানালে যে গোটা জাতিকেই অসম্মান অপমান করা হয়- এই বোধটাও নাই!

একটা কৈফিয়ত হতে পারে- আমাদের প্রধানমন্ত্রী ড: ইউনুসকে দেখতে পারেন না। তাকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক মঞ্চে তুলি কি করে। মেনে নিলাম। সেক্ষেত্রে ড: অমর্ত্য সেনকেও কি এ যাত্রা না আনলে চলতো না? কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী এবং ড: সেনকে ফেলোশীপ দেয়া হবে। এই সাধারন সভায় প্রধানমন্ত্রীকে, পরে যে কোন এক সময় আলাদা অনুষ্ঠান করেও ড: সেনকে সম্মানটা জানানো যেতো। ড: ইউনুসকে সে মঞ্চে ডাকা যেতো না ডাকলেও ক্ষতি ছিলো না। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য দেশের অন্য জাতির নোবেলজয়ীকে এক মঞ্চে আনলে দেশের এবং জাতির একমাত্র নোবেলজয়ীকেও যে সেখানে আনা উচিত এ বোধটা তাদের নেই না ইচ্ছা করেই তারা এ কাজটা করেছেন বোধগম্য হলো না। কেউ হয়তো মনে মনে আত্মতৃপ্তি পেতে পারেন ড: ইউনুসকে ভাল একটা অপমান করা হলো। কিন্তু এ অপমান যে গোটা জাতির তা বোঝার মত বিবেকবোধ এ সরকারের একজনেরও নাই! ভাবতে কষ্ট লাগে।

না, বাংলা একাডেমি কাজটা ভাল করে নাই। আরও ভাল করে নাই প্রধানমন্ত্রী আর ড: অমর্ত্য সেনকে এক মঞ্চে বসিয়ে। এমনিতেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে নানা প্রচারণা- তিনি ভারতপ্রেমী বাংলাদেশী বিদ্বেষী দাদা বলতে অজ্ঞান। এক মঞ্চে দাদা-দিদির এই যুগল ছবি নিশ্চিতভাবেই তার ভাবমূর্তি উজ্জল করে নাই। দিল্লীর কাছে হলেও কোন বাংলাদেশীর কাছে নয়ই। তৈল মর্দন বা খুশী করতে গিয়ে বাংলা একাডেমি কি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতিই করে ফেললো না! বাংলাদেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন। অন্তত: বাংলা একাডেমিকে আমরা দেখতে চাই একটি দল নিরুপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে। আর সব প্রতিষ্ঠানের মত এই সংস্খাটিও প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারকে ডোবানোর কাজে লিপ্ত হবে- তাহলে আর অন্যদের সাথে পাথর্ক্য কি রইলো।

আশা করেছিলাম বাংলা একাডেমির এই হিপোক্রাসীর কোন প্রতিবাদ হবে। কেউ একজন মুখ খুলবেন, লিখবেন। কাউকে পাই নাই। উচিত ছিল সাধারন সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ড: অমর্ত্য সেনের উপিস্খিতিতেই আপত্তি জানানো, প্রতিবাদ করা। বাংলাদেশে সে সাহস আজ কারও নাই।

আমারও নাই।

তবু প্রতিবাদ করেছি। সাধারন সভার সে উদ্বোধনী অধিবেশনে আমি যাই নাই।

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে