Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ , ৭ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (23 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-০৩-২০১২

লন্ডনী কন্যার ফাঁদ!

এম শাহজাহান আহমদ


লন্ডনী কন্যার ফাঁদ!
অর্থ হারিয়েছেন, হারিয়েছেন সম্মান। তারপরও পেতে চান লন্ডনী বউ। তাইতো লন্ডনী বউ-এর খোঁজে তিন ভায়রা ভাই এক জোট হয়ে ঘুরছেন র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্প ও থানার বাবান্দায়। কিন্তু দেখা পাচ্ছেন না বউ-এর। পাচ্ছেন না শ্বশুর-শ্বাশুড়ির দেখাও। কথিত দাদা শ্বশুর ও বিয়ের কথিত ঘটক আছেন শ্রীঘরে। এক মুরগী বার বার জবাই করার নামে এক কন্যাকে বিভিন্ন সময়ে লন্ডনী কন্যা সাজিয়ে বিয়ের নামে প্রায় ১০ যুবকের দেয়া প্রায় কোটি টাকাও পড়েছে অনিশ্চয়তায়। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানের যুবকরা তাইতো একজোট হয়ে লন্ডনী কন্যাকে পেতে নতুবা তাদের কাছ থেকে লন্ডনী কন্যা বিয়ের নামে হাতিয়ে নেয়া প্রায় কোটি টাকা ফিরে পেতে ঘুরছেন প্রশাসনের দ্বারে-দ্বারে। গল্পটা রসালো মনে হলেও এতে রয়েছে অসহায় যুবকদের চোখের নোনা জলের ইতিহাস।

শনিবার সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত)’র কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, একটি সোফায় বিরস বদনে আড়াআড়ি করে একে অপরের কাঁদে হাত দিয়ে ধরে বসে আছেন লন্ডনী কন্যা বিয়ের নামে প্রতারিত অনুন্য ১০ যুবকের মধ্যে ৩ যুবক। কক্ষের এক পাশে এক আসামীকে জেরা করছেন প্রতারণা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নীহার রঞ্জন দেবনাথ। এ সময় সুদর্শন এই তিন যুবকের পরিচয় জানতে চাইলে নীহার রঞ্জন দেবনাথ হেসে বলেন ‘এরা তিন ভায়রা ভাই’। যুবকরাও মাথা নেড়ে সায় দিলেন তার কথায়। তারা নিজেদেরও ভায়রা ভাই হিসেবে পরিচয় দিলেন। তবে যতোটা সহজে তারা তিন যুবক ভায়রা ভাই হওয়ার পরিচয় দিলেন প্রকৃতপক্ষে ভায়রা ভাই হয়ে ওঠা ততটা সহজ নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতারিত তিন যুবকের একজন হলের দেওয়ান বেলাল আহমদ চৌধুরী। তিনি সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক শ্যামল সিলেট পত্রিকার বিজ্ঞাপন সহকারী। বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে। ভাগ্যের ফেরে প্রতারিত বেলাল ধরণা দিচ্ছেন শ্রীমঙ্গল থানায়। তিনি জানান, অফিসে, বাড়িতে না বন্ধুবান্ধব কারো কাছে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারেন না। নিজের আয় দিয়ে এখন পর্যন্ত একটুকরু জমি কিনতে পারেননি আজোবিদি। কিন্তু সোনার হরিণের আশায় পৈত্রিক ৩ বিঘা জমি বিক্রি করে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা দিয়েছেন লন্ডনী স্ত্রীর কাবিনে। একটাই উদেশ্য লন্ডনী কণ্যাকে বিয়ে করলে হয়তো জীবনটাকে আরো একটু স্বাচ্ছন্দে কাটাতে পারবেন। অনেকটা সহজ সরল ভাবেই চলতেন বেলাল। আর তার এই সহজ সারল্যকে পুঁজি করে প্রতারক চক্র তাকে আটকে দেয় তাদের জালে। একদিন সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গল বাসে চড়ে আসার পথে প্রতারক চক্রও তার সাথে বাসে উঠে গল্পের ফাঁকে অপার দেয় শ্রীমঙ্গল রূপসপুর এলাকায় একটি লন্ডনী মেয়ে আছে একটি ছেলে থাকলে দেখে দিতে কিংবা নিজেই বিয়ে করবে কিনা। মোবাইল ও ঠিকানা নিয়ে বেলাল তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। এক পর্যায়ে নিজেই স্বজনদের নিয়ে কন্যা দেখে পছন্দও করেন। সাব্যস্থ হয় দেন মোহরসহ বিয়ের তারিখ। সুকৌশলে তারা তার কাছ থেকে দেন মোহরের টাকা স্বর্ণ ও কনের কাপড় চোপড় বাবত প্রায় নয় লক্ষ টাকা নিয়ে নেয়। অপর দিকে তারা তাকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল বিভিন্ন দোকানে পরিচয় করিয়ে দেয় আমাদের বর পরে এসে উনি কাপড়, জুতা, স্বর্ণালংকার পছন্দ করে যাবেন এবং তারা টাকা দিয়ে নিয়ে যাবেন। বেলালও পরে প্রত্যেক দোকানে গিয়ে নিজের কাপড়, পায়ের জুতা ও হাতের আংটি পছন্দ করে প্যাকিং করে রেখে আসেন। এদিকে বেলাল আত্মিয় স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে বিয়ের সমস্ত প্রস্তুতিও নিয়ে নিয়েছেন। হঠাৎ করে বিয়ের আগের দিন দোকান গুলো থেকে বেলালের কাছে ফোন আসে জিনিশ গুলো এখনও তার শ্বশুর বাড়ির লোক নেয়নি। একই সাথে শ্বশুর বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য যে কমিউনিটি সেন্টার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তাদের সেন্টার বরাদ্ধ হয়নি। সাথে সাথে বেলাল তার ভাই ও চাচাকে নিয়ে ওই বাসায় গেলে তারা সমস্থ ঘটনা অস্বীকার করে। দেওয়ান মশিউর রেজা চৌধুরী রিপন নামে প্রতারক চক্রের এক সদস্য উল্টো তাদের উপর ক্ষেপে যায়। তারা সেখান থেকে তিরস্কিত হয়ে অভিযোগ জানান র‌্যাবে। র‌্যাব মামলা করার পরামর্শ দেয়। মামলা কবরার ফাকেই পালিয়ে যায় প্রতারক চক্রের সদস্য কথিত লন্ডনী কনে, ঘটক, শ্বশুর শ্বাশুড়ি। কিন্তু রয়ে যায় ওই বাড়ির সদস্যরা। মামলা দায়েরের রাতেই র‌্যাব তাদের বাসায় হানা দিলে বাসার অবস্থান করা রিপন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে র‌্যাবের চোখকে ধুলা দিতে উল্টো এক গল্প ফাদে। কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব ও পুলিশ নিশ্চিত হয় ওই বাসার ভেতরেই প্রতারনার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে সাংবাদিক রিপন বাদীর হাতে প্রমান নিশ্চিত হয়ে আর বাঁচার উপায় নেই দেখে সবাইকে নিয়ে পালিয়ে যায়। র‌্যাব পুলিশ হন্যে হয়ে ছুঠে তাদের পেছনে। ইতিমধ্যে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে বেলালের নানা শুশুরের ভূমিকা নেয়া ছমদু মিয়া। ছমদু মিয়া র‌্যাবকে জানায়, অল্প বাটোয়ারা পেয়ে সে এই কাজ গুলো করে। তারা মক্কেল ধরলেই তাকে খবর দিতো এবং সে লন্ডনী কন্যাদের কখনও দাদা, কখনও মামা, ও চাচা সাজতো। এক একটা ঘটনা শেষ হওয়ার পরপরই তারা বাসা পাল্টে দিতো। কখনও ধরা পড়লে নিজে সাংবাদিক এবং অন্য সাংবাদিক নিয়ে ধমক দিয়ে প্রতারিতদের তাড়িয়ে দিতো। এদিকে ঘটনার পর পর তারা বাসার মালামাল ও অবস্থান পাল্টে দিতো। তারা কৌশলে বাসার এক কক্ষে সমস্ত কাঠের আসবাব পত্র রেখে বসার কক্ষে অল্প আসবাবপত্র রেখে কন্যা দেখাতো। টাকা পয়সা নিয়ে রাতারাতিই আবারো ঘরের মামলামাল সরিয়ে অন্যরূপ ধারণ করাতো। পুলিশ কিংবা এলাকার লোক নিয়ে প্রতারিতরা যখন দেখে ওই কক্ষে কথা মতো আসবাবপত্র নেই তখন তারা বোকা বনে ফিরে আসতেন। অন্য দিকে রাত বিরাতে তাদের বাসায় আসবাবপত্র সরাতে গিয়ে প্রতিবেশীরা যখন বিরক্তি বোধ করতেন। এ নিয়ে একাধিক শালীশও হয়েছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ওইসব শালিশে নিজ সন্তানকে হত্যাসহ চাঁদাবাজী মামলার কারারুদ্ধ জনৈক ব্যক্তি নিজেকে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে শালিসে প্রতারক রিপন ও তার পরিবারের পক্ষে থেকে প্রতারিতদের হুমকী-ধামকী দিয়ে তাড়িয়ে দিতো। একটি সূত্র জানায়, সাংবাদিক পরিচয়দানকারী রিপনের এ রকম ঘটনায় এর আগে প্রতারিতরা শ্রীমঙ্গল ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতিসহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে বিচার প্রার্থী হয়েও কোন সুফল পাননি। অনেক প্রতারিত যুবক মান সম্মানের ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু দেওয়ান বেলাল আহমদ চৌধুরীর কাছ থেকে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেয়াই হলো ওই প্রতারক চক্রের কাল। তিনি মামলা দায়ের করার পর থেকে সুবিচার দাবী করে প্রকাশ্যে আসতে থাকেন লন্ডনী কন্যা বিয়ের নামে প্রতারিত বরেরা। এই প্রতারক চক্রের বিরোদ্ধে একে একে মামলা হয় শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিভিন্ন থানায়। ওইসব মামলার মধ্যে তিন মামলার বাদী শনিবার সন্ধ্যায় হাজির হন শ্রীমঙ্গল থানায়।

এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে ওই তিন যুবকের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার সাথে লন্ডনী কন্যার বিয়ের কথাবার্তা পাকা হবার পর কথিত এক লন্ডনী কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় রাত্রী যাপনও করেছেন তিনি। তিনি পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ওই প্রতারক চক্রটির ফাঁদে পা দিয়ে অনেক যুবক সর্বশান্ত হয়েছেন। এদের ফাঁদে পড়ে কেউ আট লাখ, কেউ দশ লাখ কেউ বারো লাখ এভাবে প্রায় কুড়িজন বরের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্র।

এদিকে এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে প্রতারণার শিকার বেলাল আহমদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সমস্থ প্রমানাদি থাকার পরও মূল আসামীরা ধরা পড়ছেনা।’ তিনি জানান, সাংবাদিক পরিচয়দানকারী রিপন আটক না হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। তিনি দাবী করেন, তার সহযোগী খুনি সাইদুর ও দুলু নামে দুইজনকে আটক করে জিজ্ঞাসা করলেই মামলার মূল আসামী রিপনের খোঁজ পাওয়া যাবে।

লন্ডনী কন্যা বিয়ের নামে প্রতারণার শিকার সিলেট দক্ষিন সুরমার মোমিন ও  কুলাউড়ার নাছির উদ্দিন রুহেল বলেন, ‘এই কয়েকটা মানুষ তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। একই কন্যার বর সেজে তারা হয়েছেন ভায়রা ভাই।’

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নীহার রঞ্জন দেবনাথ জানান, তিনি মামলার আসামীদের আটক করতে সাধ্য মতো চেষ্টা করে চলছেন।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে