Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (209 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-০৭-২০১৪

শীতবিলাসের হারানো খেলা

গুলশনারা


শীতবিলাসের হারানো খেলা

আহ্লাদে আটখানা/ সাতে পাঁচে নেই/ মাঝখানে যেইজন/ পথ পাবে সেই...'! শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসে কিতকিতের এই ছকই ভূতনাথকে পাতালঘরে প্রবেশের আশ্চর্য উপায় শিখিয়ে দিয়েছিল। আপাত ভাবে কিতকিত কিন্তু অট্টালিকার ঘরের খেলা হতে পারেনি। ছবির দৃশ্যে তাই শীতে মোড়া গ্রামের বালিকাদের কিতকিতের ছকটাই উঁকি দেয়। কিন্তু শীতের কলকাতা আর মায়ামাখানো এই শহরের কমলা-মিঠে রোদের স্মৃতিতে কিতকিতের মতো আরও বড় চেনা খেলার দৃশ্যগুলোও কেমন আবছা হয়ে যাচ্ছে। বড়দিনের ছুটিতে পাড়া উজিয়ে ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা হোক বা গলি ক্রিকেটের কম্পিটিশন, শীতকে মোটেও ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে দেয়নি এই শহর। শীতের হিমেল পরশ গায়ে মেখেই কবাডির হুল্লোড়ে মেতেছে, মেতেছে খো-খো, হা-ডু-ডু, পিট্টুর হার-জিতে! শীতের মজা বললেই তাই আসে এই হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলো। এখন তারা কোথায় গেল?

বোধহয় হারিয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির অতলেই! ক্রিসমাসের টুকরো কেকে সাহেবপাড়ার পার্টির মজাটুকু শেষেই এক সময় অথচ দৌড়-দৌড় পড়ে যেত পাড়ায়। কোথাও হয়তো কিতকিতের ছক কাটা খতম। কোথাও মাঠে কবাডি, হা-ডু-ডু নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে, পেশির জোর নিয়ে তৈরি দুই দল। আবার দক্ষিণের এলিট পাড়া হলে ব্যাডমিন্টনের বারোয়ারি নেট। গলি ক্রিকেটের উত্তর-দক্ষিণ এই খেলাগুলোর জনপ্রিয়তায় বিশেষ দেখা যেত না। তবু কয়েক বছরে অস্বাভাবিক বদলে যেতে থাকা এই শহর খেলাধুলোর ক্ষেত্রেও নিজেকে বদলে নিল। কিন্তু খেলাগুলো ছেড়েও পুরোটা ছেড়ে গেল না। নইলে কি শীত এলেই পুরনো অলি-গলির এমন খেলাগুলো সব মনে ভিড় করে?

প্রশ্ন উঠবে, কেন হারিয়ে গেল এই ঘরোয়া খেলার জগৎ? উত্তর খুঁজতে গেলে সবাই আঙুল তুলবে এই শহরের দিকেই। এই শহর যেমন খেলার জায়গাটুকু কেড়ে নিয়ে ঝলমলে হাইরাইজে সাজতে ব্যস্ত, তেমনই শহরের বাসিন্দারাও সেই তালে তাল মিলিয়ে ভুলে গেছে শীত-যাপনের অতীত মাহাত্ম্য। বিনোদন যেমন ঠাঁই করে নিয়েছে ড্রয়িংরুমে, তেমনই খেলাধুলোও সেঁধিয়ে ঘিয়েছে ঘরের চার দেওয়ালে। এই প্রজন্মের কাছে খেলা মানে অনেকটাই ভিডিও-গেম! তাহলে এখন এই শহরের শীত মানে কি? উত্তর-দক্ষিণের কাছে এই মুহূর্তে এমন প্রশ্ন গেলেই ক্রিসমাস পার্টি ছাড়া আর বিশেষ উত্তর আসে না। এই যেমন যাদবপুর বিশ্বিদ্যালয়ের সায়ন বসু ক্রিসমাস পার্টির জন্য ক্রিসমাস ট্রি কিনে এনেছিল। ওটুকুতেই শহরের আরও অনেকের মতো তার কাছে শীতের হুল্লোড় শেষ। কেন না, সায়ন এইসব 'বোগাস' খেলা নিয়ে মোটেই আগ্রহী নয়। 'কিতকিত ভীষণ বস্তি টাইপ খেলা। ওটা নিয়ে বলতে পারব না। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের কম্পাউন্ডে কিতকিত কখনও খেলা হয়নি। তবে এক সময় ব্যাডমিন্টন আমরা খুব খেলতাম। এখন সেটাও হয় না। আসলে আমাদের প্লেজার টাইমটা খুব শর্ট। তাই পার্টি বা নাইট আউটিং-টাই বেশি ইন। ক্রিসমাস বা নিউ ইয়ার ইভে নাইট ড্রাইভিং-এ যত মজা, বিকেলে কম্পাউন্ডের নিচে ব্যাডমিন্টন বা গলি ক্রিকেটে সেই মজা নেই। আগের কলকাতায় অনেকেই এটাই মজা মনে করতেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সময় পালটেছে। সেইসঙ্গে নিজেদেরও পালটাতে হবে'।

অবশ্য ছকে ঘেরা সাধের কিতকিতকে সায়কের মতো একেবারেই ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? শুধু কিতকিতই বা কেন? পুরনো খেলার মধ্যে একেবারে লোপ পেতে বসা পিট্টুই বা কম কি ছিল? সাত ঘুঁটি সাজিয়ে, ৩ টাকার প্লাস্টিক বল মেরে দে ছুট দৌড়ের সেই খেলা এখন নেহাতই অলীক মনে হয়। অথচ শীত মানেই ছিল এই শহরের পাড়ায় পিট্টু কম্পিটিশন। এ খেলায় আবার হার-জিৎ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। বরং কাকে কে কতবার মারতে পারল, তারই প্রতিযোগিতা। কম্পাউন্ডের বিলাসিতা যাদের ছিল না, খোল দিয়ে ছক কেটে এই পিট্টু, কানামাছি, কিতকিতের কম্পিটিশন যে তাদের ভীষণ আপন। আপন খেলার মাঠের কবাডিও!যেমন, সাউথ সিথির বাসিন্দা অনিমেষ দত্ত জানাচ্ছেন, 'আমরা তো আসল কলকাতার বাসিন্দা। বস্তির ধারণা তৈরি হবার আগে থেকেই আমরা কিতকিত খেলে বড় হয়েছি। এখানে আবার ছেলেমেয়ে ভাগ ছিল। ছোটবেলায় দিদির সঙ্গে কিতকিত খেলে অনেক শীত-বসন্ত কাটিয়েছি। এখনও শীত মানে আমার কাছে পার্টি নয়, ছোটবেলার মিষ্টি দিনগুলো। আর এখনকার ছেলেমেয়েদের দোষ দেব না। ওরা খেলার সুযোগ পায় না। ফলে খেলাধুলা নিয়ে আলাদা করে প্যাশন জন্মাবে না, এ তো বলাই বাহুল্য'।

বুড়ি ছোঁওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলেও এখন অনেকে চোখ কপালে তুলবেন। বুড়ি বানিয়ে তার চারপাশে ঘুরে নিজের নম্বর কুড়িয়ে খেলার নাম ছিল বুড়ি ছোঁওয়া। আর প্রেমের খেলার আর একনাম কুমির ডাঙা। না ছুঁতে পারা মানুষটাকে কুমির ডাঙার ছকে একটু ছুঁয়েই আবার স্থলে উঠে গেলে কুমির ডাঙা শেষ হয়। লং ড্রাইভের মহিমায় কোথায় আছে এই কুমির ডাঙ্গার রোম্যান্টিসিজম? কোথায়ই বা বন্ধুরা মিলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধুলোর মাঝে কবাডি? তবে নিশ্চিত সাত আর পাঁচের ছক দিয়ে শীতের কলকাতার আঁকিবুঁকি বোধহয় কফিনে যাবার তোড়জোড় করছে। এই মাঝে এখনও যাঁরা গলির মধ্যে থেকে অকারণের 'ছয়' চিৎকার শোনেন, তাঁরাও থমকে দাঁড়িয়ে শুনে নিন। সত্যিই হয়তো বইয়ের পাতাতেই মিলবে একদিন এ শহরের শীতবিলাসের খেলার কথা।

 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে