Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (80 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-৩১-২০১৩

গাদ্দাফি পরবর্তী লিবীয় নারীদের ভাগ্যবিপর্যয়

আইকা আল মাগরেবি


গাদ্দাফি পরবর্তী লিবীয় নারীদের ভাগ্যবিপর্যয়

ত্রিপোলি, ৩১ ডিসেম্বর- আইকা আল মাগরেবি লিবিয়ার প্রথমসারির লেখিকা ও নারী অধিকারকর্মী। ২০১১ এর লিবিয়া বসন্ত-বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক। বার্তাসংস্থা ইন্টার প্রেস সার্ভিসের (আইপিএস) সঙ্গে সাক্ষাৎকারে লিবিয়ার চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট, অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ ও তার প্রেক্ষাপটে সে দেশের নারীদের বর্তমান অবস্থান চিহ্নিত করেছেন। লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন হামিম কামাল।
 
প্রশ্ন: গত অক্টোবর মাসে মুয়াম্মার গাদ্দাফি নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এ সময়ের মাঝে লিবিয়ার নারীদের অবস্থান কেমন পরিবর্তিত হয়েছে?
 
আইকা: পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু ভালো কিছু হয়নি। আমরা বরং আরও কিছু অধিকার হারিয়েছি। বহুবিবাহ প্রসঙ্গে আসা যাক: লিবীয় সমাজে এখনও চালু আছে এ প্রথা। তবে গাদ্দাফির আমলে (১৯৬৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত) এতটুকু সৌজন্য ছিল যে, কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন হতো। এখন তার প্রয়োজন হয় না।
 
মজার ব্যাপার হচ্ছে, মাহমুদ জিবরিল, যিনি কি না অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান, তিনি গাদ্দাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাতিকে পুনর্গঠনের ব্যাপারে কথা বলারও আগে বহুবিবাহের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছেন তার বিখ্যাত ভাষণটিতে।
 
আর পরিবর্তনের কথা বলছেন? লিবিয়ার নারীরা এখন যুদ্ধের লুণ্ঠিত দ্রব্য।
 
রাজপথে নারীরা যখনই প্রতিবাদে নেমে আসে তখনই সহিংসতার শিকার হয়। যেসব নারী তাদের অধিকারের কথা বলেন, তারা অপমানিত লাঞ্ছিত হন, জীবনের হুমকির শিকার হন। বিপ্লবে আমাদের অনেক অবদান আছে, অনেক নারী প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন নারীদের পক্ষে আসেনি।
 
প্রশ্ন: কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নারীদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে আছেন, সেটি কি সত্যি নয়?
 
আইকা:  হ্যাঁ সত্যি। কিন্তু তারেদরকে প্রচণ্ড সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে পদ ধরে রাখার জন্যে। আর তাদের রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের শুধু নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্যে রেখেছে। লিবিয়ার সংবিধান লেখার জন্যে যে ৬০ সদস্যের পরিষদ তৈরি হয়েছে, সেখানে নারীদের জন্যে মাত্র ৬টি আসন বরাদ্দ।  
 
লিবিয়ার বিধানসভা জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেসের একজন সদস্য আছেন, তিনি তো মিটিংগুলোতে নারী-পুরুষ একসাথে না বসতে পরামর্শ দেন। আরও কিছু মজার আলঙ্কারিক ব্যাপার আছে। সেটা হলো, শিক্ষকদের মাঝে ৯০ ভাগ নারী। কিন্তু নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা আছে মাত্র ২ ভাগের।
 
প্রশ্ন: দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চেয়েও ধর্মীয় নেতা মুফতি সাদিক আল ঘারিয়ানি অনেক বেশি প্রভাব রাখেন। অনেকে বলেন কার্যত তিনিই লিবিয়ার শাসক, নীতিনির্ধারক। এ ব্যাপারে আপনার কী মত।
 
আইকা: মুফতি সাহেব ধর্মীয় ক্ষমতায় সর্বেসর্বা, একইসাথে অনেক রাজনৈতিক নেতা এবং সামরিক ব্যাক্তিত্বের মদদপুষ্ট। তারা লিবিয়ার দণ্ডবিধি, ভবিষ্যৎ সংবিধানে শারিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে চান।
 
মূলত তারা যা প্রতিষ্ঠা করেতে চাইছেন, তা কোরআনের আয়াতের ব্যাপারে তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা, আর তাই এটা ধর্মগ্রন্থের অনেক সিদ্ধান্তের চেয়েও ভয়ঙ্কর। দেখা যায় সবাই শুধু শরিয়া শব্দটিকে ধরে অনেক কথা বলে ফেলছেন, কিন্তু শব্দটির এতরকম বিভক্তি কারো চোখে পড়ছে না। আমরা কোন শরিয়া চাই? ইরানের? আফগানিস্তানের? নাকি মরক্কোর।
 
আসলে তাদের আসল লক্ষ্য হচ্ছে কোরআনকে ব্যবহার করে নারীদের দমিয়ে রাখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা। এটা এড়ানোর জন্যই ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখা প্রয়োজন। স্কুলের মেয়েদের হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়। মুফতি তো সারাক্ষণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, মেয়েদের চুল ঢেকে রাখতে হবে  
 
আমি ত্রিপোলির জয়তুনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি এবং একমাত্র আমিই সেখানে হিজাব ব্যবহার করি না। আমার নারী সহকর্মীদের সবাই হিজাব, এমনকি নেকাব ব্যবহার করে। তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটা যতটা আইনের জন্যে, তারচেয়ে অনেক বেশি পারিপার্শ্বের চাপের কারণে।
 
প্রশ্ন: একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে এমন যে, জানুয়ারি ২০১৪ থেকে একটি বিশেষ ফতোয়া চালু হতে যাচ্ছে তা হলো, লিবিয়ার নারীরা দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে একাকী যাতায়াত করতে পারবেন না। তাদের সাথে একজন পুরুষ সঙ্গী বা মুহাররাম লাগবে। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।
 
আইকা: এটা হয়ে থাকলে আমি মোটেও অবাক হবো না। আমি শহরের বাইরে থাকি। এ বছরের ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে, কাজে যাওয়ার পথে অস্ত্রধারীদের একটি দল, আমাকে তাদের অস্ত্রের মুখে এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল এটাই, আমার সাথে কেন কোনো মুহাররাম নেই। ব্যাপারটা পরবর্তীতে আমি মিডিয়ায় প্রকাশ করিয়েছি এবং সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছে গেছে। ১৪ মার্চ আমরা এর বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিই, নাম- দ্য মার্চ ফর ডিগনিটি অব উইম্যান, নারীর মর্যাদার জন্যে অভিযাত্রা। আমাদের শান্তিপূর্ণ যাত্রায়, যথারীতি, নগ্ন হামলা চালানো হয়। আমাদের লাঞ্ছিত করা হয়, আমাদের ওপর লাঠি চালানো হয়।
 
প্রশ্ন: লিবিয়ার ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসই কি বর্তমানে নারীদের ওপর আরোপিত সবচেয়ে বড় সমস্যা?
 
আইকা: এটি অনেক সমস্যার একটি মাত্র। এ দেশে নারীরা কঠিন সব সামাজিক শেকলে বাঁধা পড়ে আছে, রাস্তা তাদের জন্যে নিরাপদ না। নারীরা রাস্তায় বোরোলেই হামলা, সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। নতুন সংবিধানে কিন্তু এসব রদে কিছুই যুক্ত হচ্ছে না।
 
আর নারীর পক্ষে নাগরিক সমাজের প্রকাশ্য সমর্থন এবং অংশগ্রহণ খুবই কম। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালে আমরা নারীরা কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়ছি। এর চেয়ে হতাশার আর কিছু নেই যে, বিপ্লবে নারীরা এতো অবদান রেখেছে, এত কাজ করেছে একসাথে, কিন্তু এখন সকলেই ফতোয়া, শরিয়া দিয়ে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে চাইছে। নতুন প্রজন্মের কাছে কিন্তু ফতোয়া, শরিয়া এসবের প্রভাব খুব বেশি দেখতে পাই।
 
গাদ্দাফি বুঝেছিলেন ধর্মকে কীভাবে মানুষের ওপর প্রভাব বজায় রাখার, ছড়ি ঘোরানোর দারুণ শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ১৯৮০ তে তিনি তাই করেন, দারুণভাবে ধর্মে ফিরে আসেন। যাহোক, তার সময়ে অধিকার ও স্বাধীনতাহরণের হিড়িক কিন্তু আরও ঘোরালো পরিস্থিতির দিকে লিবিয়াকে ঠেলে দেয়। মানুষ আরও কট্টর দিকে ঝুঁকতে থাকে, যেমন মুসলিম ব্রাদারহুড বা জিহাদিস্ট- এদের দিকে।
 
প্রশ্ন: এমন কঠিন পরিস্থিতে নারীদের জন্যে কী সবচেয়ে কল্যাণকর হবে বলে মনে করেন?
 
আইকা: আসলে, মানবাধিকারের শক্ত ভিত স্থাপিত হবে এমন একটি সংবিধান অদূর ভবিষ্যতে আমরা পাবো এমন সম্ভাবনা নেই। সবার আগে যা করতে হবে তা হলো, নারীদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ধীরে ধীরে আরেকটি বিপ্লবের দিকে তাদের এগিয়ে নেয়া যায়।
 
এ মুহূর্তে, সামরিক আইন ভাঙতে হবে। একই সাথে সামরিক বাহিনী আর পুলিশের ছত্রছায়া থেকে অস্ত্রধারীদের দলকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। এটা যদি করা না যায়, নারী অধিকারের প্রশ্নে আফগানিস্তানের পথে হাঁটবে লিবিয়া, এটা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

আফ্রিকা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে