Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২০ , ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১০-২০২০

বিশেষ আদালতে শেখ হাসিনার পক্ষে লড়েছিলেন সাহারা খাতুন

মুহাম্মদ ফজলুল হক


বিশেষ আদালতে শেখ হাসিনার পক্ষে লড়েছিলেন সাহারা খাতুন

ঢাকা, ১০ জুলাই- দেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক সংগঠক, মুজিব আদর্শের নির্ভীক সৈনিক ও নিবেদিত প্রাণ ছিলেন সাহারা খাতুন।

তিনি ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ ঢাকার কুর্মিটোলায় পিত্রালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি ফার্মগেটের ৩৪, এয়ারপোর্ট রোড, তেজগাঁও-এ বসবাস করতেন। পিতা মরহুম ডা. আবদুল আজিজ মাস্টার ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক।

কুর্মিটোলা হাইস্কুলে তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর তাকে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে মুসলিম গার্লস হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাইস্কুলে ১০ম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৯৬০ সালে ইস্ট-পাকিস্তান বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তিনি সিটি নাইট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে পাস করে জগন্নাথ কলেজে বি.এ-তে ভর্তি হন। বি.এ (ফাইনাল) পরীক্ষার সময় অসুস্থ থাকায় এক বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারেননি। পরে চাচা মরহুম আবুল হাশেমের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি চলে যান। সেখানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইংরেজি মাধ্যমে দ্বিতীয় শ্রেণিতে বি.এ (ডিগ্রি) অর্জন করেন।

তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা আসেন এবং পুরোদমে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে পুনরায় করাচি গিয়ে রেজাল্ট নিয়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ছাত্রদের মধ্যে একটি নির্বাচনে তিনি ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। সেটি ছিল তার জীবনের প্রথম নির্বাচন। এরপরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এত বেশি জড়িয়ে পড়েন যে আর ‘ল’ পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যার প্রতিবাদের ৪ নভেম্বর তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩২নং ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পর্যন্ত মিছিল করেছিলে। ৫ নভেম্বর চার নেতার লাশ পাওয়া যায়। তার ‘ল’ পরীক্ষার একটি বিষয় ৫ নভেম্বর ছিল, তিনি তখন ভাবলেন পরীক্ষা পরেও দেয়া যাবে কিন্তু জাতীয় নেতাদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। এ কারণে সে বৎসর আর পরীক্ষা দেননি তিনি। এর পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ল’ (অনার্স) কোর্স শুরু হয়। তখন শিক্ষকদের পরামর্শে বিজয়নগরে সেন্ট্রাল ‘ল’ কলেজে ভর্তি হন তিনি। আইন পেশায় আসার অদম্য ইচ্ছায় সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২য় শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে আইনপেশা পরিচালনার সনদপ্রাপ্ত হয়ে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ গ্রহণ এবং আইনপেশা শুরু করেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমানের জুনিয়র হিসেবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনপেশা পরিচালনার সনদ পান এবং আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। তিনি পরবর্তীতে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত এবং বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ৬ দফার আন্দোলনে অংশনেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৬ দফার বই বিলি করেন। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগের মহিলা শাখা যখন গঠিত হলো তাতে তিনি সক্রিয় অংশ নেন এবং ঢাকা শহরে মহিলাদেরকে প্রয়াত আইভি রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত করতে শুরু করেন। তখন থেকেই মিটিং মিছিল সবকিছুতেই অংশ গ্রহণ করেছেন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দিনও তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখনকার ছাত্রলীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের দিন তিনি আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার অনেক নারী নেতাকর্মীদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন ঢাকা-৫ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে একই আসনে খালেদা জিয়া সিট ছেড়ে দিলে শূন্য আসনের উপ-নির্বাচনেও তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়নি।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা দেয়। তিনি তখন আইনজীবীদের নিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে অধিকাংশ নেতাকর্মীর মামলা পরিচালনা করেন। আহত কর্মীদের হাসপাতালে এবং বাসায় দেখতে যেতেন। বিশেষ করে নারী কর্মীদেরকে গ্রেফতার করে থানায় নিলে তাদেরকে যাতে নির্যাতন করা না হয় সেজন্য আইনজীবীদের নিয়ে থানায় যেতেন। পরিবারকে সান্তনা দিতে বাসায় ছুটতেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলাগুলো সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমান, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, রহমত আলী, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আবু, অ্যাডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম, মো. মোখলেছুর রহমান বাদল ও আবদুর রহমান হাওলাদারসহ অনেকের সঙ্গে তিনিও পরিচালনা করেছেন। অন্যান্য নেতাকর্মীদের মামলাও দেখতেন। তখন অনেকে জননেত্রী শেখ হাসিনার মামলাসহ নেতা-কর্মীদের মামলায় যেতে ভয় পেতেন। সব ভয়-ভীতিকে অতিক্রম করে তিনি সব আদালতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন এবং সব কার্যক্রমে তিনি অংশ নিয়েছেন।

তিনি ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং নেতাকর্মীদের জন্য সাংবাদিকদের কাছে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। তিনি প্রথমে নগর আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে মহিলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক, পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদিকা এবং একই সঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-আইন সম্পাদক, পরে আইন সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন তিনি নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদকের পদ গ্রহণ করেননি।

এর পর তিনি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণের পর ৬ জানুয়ারি ২০০৯ সালে চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেদিন যুক্ত হয়েছিল প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সফলতার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরে পৌনে চার বছরের মাথায় তাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি পুনরায় ঢাকা-১৮ আসন থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি পরবর্তী কাউন্সিলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকেই তিনি মহিলা সমিতির সদস্য মনোনিত হন। তখন আইভি রহমান মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ড. নীলিমা ইব্রাহিম সভানেত্রী ছিলেন। তিনি পরিবার পরিকল্পনা সমিতির আজীবন সদস্য, ঢাকা আইনজীবী সমিতির আজীবন সদস্য, গাজীপুর আইনজীবী সমিতির আজীবন সদস্য, ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়শনের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য ছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যশানাল এলাইন্স অব ওমেন্সের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আজীবন আস্থাশীল ছিলেন। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি বহুবার নির্যাতিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন, তারপরও তিনি কখনও থেমে থাকেননি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন।

এই খ্যতিমান রাজনীতিক ৬ জুন শনিবার জ্বর, অ্যালার্জিসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ৭ জুলাই থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুইদিন ভর্তি থাকার পর বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এম এন  / ১০ জুলাই

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে