Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ , ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (9 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০১-২০২০

ত্রাণের জন্য বানভাসিদের হাহাকার

ত্রাণের জন্য বানভাসিদের হাহাকার

কুড়িগ্রাম, ০১ জুলাই- কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নদ-নদীগুলোতে সামান্য পানি কমলেও বেড়েছে ভোগান্তি। ৭০ ভাগ বানভাসিদের কাছে পৌঁছায়নি ত্রাণ সামগ্রী। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নেই বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেট সুবিধা। গত চারদিন ধরে ব্রহ্মপূত্র ও ধরলা নদী অববাহিকায় পানিবন্দি দেড় লাখ মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন পার করছে।

বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৫৮ ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৬৮ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদী ব্রিজ পয়েন্টে ৫৪ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সরেজমিনে কুড়িগ্রাম পৌরসভা এলাকার চর ভেলাকোপা এবং উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে গিয়ে জানা যায় বানভাসিদের নানান ভোগান্তির কথা। হাতিয়ার বাবুরচর গ্রামের বিধবা রুপালী ও তার পরিবারের একমাত্র নলকূপটি বন্যায় তলিয়ে যাওয়ায় গত চারদিন ধরে বন্যার পানি পান করছেন তারা। হাতিয়ার নীলকণ্ঠ গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার খোলা বাঁধে আশ্রয় নিলেও টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাধ্য হয়ে স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে ডুবন্ত বাড়িতে গিয়ে প্রাকৃতিক কাজ সারতে হচ্ছে তাদেরকে।

অপরদিকে চর ভেলাকোপার অটো চালক মেহেদী হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়িতে থাকতে না পেরে ৯ মাসের গর্ভবতী স্ত্রী মুক্তাকে মাঝরাতে বাঁধে নিয়ে গেছেন। হাঁপানিতে আক্রান্ত বৃদ্ধ গহুর আলীকে অনেক কষ্টে উজানে ছোট বোন শেফালীর বাড়িতে নিয়ে গেছেন বড় বোন বিজলী।

হাতিয়া ইউনিয়নের প্রায় ২৫ গ্রামের তিন হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জিআর চাল এবং জিআর ক্যাশ থেকে শুকনো খাবার কিনে ছয় শতাধিক পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হলেও বাকিরা রয়েছে ত্রাণ সেবার বাইরে।

সকালে কুড়িগ্রাম পৌরসভার চর ভেলাকোপায় পোঁছালে এই প্রতিবেদককে ঘিরে ধরেন বানভাসিরা। চারদিন ধরে তারা বাড়িছাড়া। ঘরে গলা পর্যন্ত পানি। বাঁধে ছোট্ট ডেরায় গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে তাদের। চাল থাকলেও সবজি নেই। নেই শুকনো লাকড়ি। ছোট্ট শিশুরা ক্ষুধার জ্বালায় বারবার মাকে বিরক্ত করছে।

সাংবাদিক জেনেও নিজের নামটা দেয়ার জন্য কাজ ফেলে ছুটে এসেছেন তারা। একটাই আকুতি ‘বাবা, মোর নামটা নেন বাহে! এলাও হামাকগুলাক কাঁইয়ো কিছু দেয় নাই।’

ওই গ্রামের সুফি মিস্ত্রির স্ত্রী কল্পনা (৩২) বলেন, ‘স্বামীর কাজ নাই। চারদিন ধরি ইট দিয়া ভাসিয়া কোনো মতে চকির উপরেত আছি। শাক-সবজি লাগাইছিনু সউগ পানিত নষ্ট হইছে। ছওয়ারাতো তরকারি ছাড়া ভাত খাবার চায় না।’

খোকা মিয়ার স্ত্রী জরিনা (৫০) ও ট্রাক্টরচালক মোকছেদুলের স্ত্রী কমেলা বলেন, ‘আটা দিয়া চিতাই পিঠা বানায়া খাবার নাগছি। রাস্তাত একটা সরকারি নলকূপ আছে সেটে থাকি কষ্ট করি পানি আনি খাই। হামার এটে নলকূপও নাই। লেটটিনও নাই। সিয়ান ছওয়ারা খুব কষ্টোত আছে।’

এই এলাকার ৩০টি পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে গর্ভবতী মুক্তা (১৮) ও রেনুকার (২৫) প্রতিবেশীরা বলেন, ‘এমনিতে করোনার ভয়োত মানুষ হাসপাতালে যাবার চায় না। তার উপরে বন্যা হয়া পোয়াতি বউগুলার খুব কষ্ট হইছে। এটোত ডাক্তার-কবিরাজও পাওয়া যায় না।’

মৃত কলিমুদ্দিনের সন্তান প্রতিবন্ধী জসিমকে (১৫) নিয়ে চিন্তায় থাকে তার বিধবা মা। ছেলে বন্যার স্রোতে পড়ে ভেসে যাবে নাতো! আশির্ধ্বো গহুর আলী হাঁপানির রোগী। পানি তার শত্রু। এই পানিতে একদিন থাকার ফলে কাশতে কাশতে প্রাণ যাবার যোগার তার। বৃদ্ধ বাবাকে উজানে ছোট বোন শেফালীর কাছে রেখে এসেছে বড় বোন বিজলী। সাংবাদিক দেখে সেই বৃদ্ধও ছুটে এলেন। বললেন- ‘বাবারে কাঁইয়ো কিছু দেয় না। এটে কোনো ডাক্তারও আইসে না।’

দুপুরে উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় আরেক চিত্র। এখানকার গুজিমারী, দাগারকুটি, গাবুরজান, নয়াডারা, বাবুরচর, নীলকণ্ঠ, কলাতিপাড়া আর শ্যামপুর এলাকায় প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দি। চারদিন ধরে ১৫শতাধিক পরিবার বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ঝড়বৃষ্টিতে পরিবারগুলো চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। দুদিন আগে এই এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। এখন পর্যন্ত মাত্র ছয় শতাধিক পরিবার ১০ কেজি চাল ও দুটি সাবান পেয়েছে। বাকিরা হতাশায় আছে। অপরিচিত লোক দেখলেই ছুটে আসছে সাহায্যের আশায়।

হাতিয়ার বাবুর চরে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধ মানিক মিয়া তার স্ত্রী তহুরা, বিধবা কন্যা রুপালী ও তার দুই সন্তানসহ বসবাস করেন। বাড়ির দুদিকে বন্যার পানির তীব্র স্রোত! এই পরিবারের উপার্জনকারী রুপালীর হাতেও এখন কাজ নেই। বন্যার ফলে গৃহবন্দি তিনি। অন্য সময়ে পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধানকাটাসহ মাটিকাটার কাজ করেন তিনি। যে টাকা পান তাই দিয়ে সংসার চলে। এছাড়াও হাঁস-মুরগি পালন করেন। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত তাদের বাড়ির চুলোয় রান্না ওঠেনি। একমাত্র নলকূপটি নিচু স্থানে বসানোয় তা তলিয়ে গেছে। এখন বাধ্য হয়ে গত চারদিন ধরে বন্যার পানি জমিয়ে খাচ্ছেন তারা।

গাবুরজান চরের জয়নাল মিয়া (৭০), গোলজার আলী (৫৬), আলম (৪৬) ও আব্দুর রহমানের (৫৪) প্রায় ১২ একর জমির টোসা পাট কাটার আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে। চারদিনেই পচন ধরেছে। এতে তাদের প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকার লোকসান হয়েছে। জয়নাল মিয়া পাটক্ষেতে নৌকা নিয়ে দিকভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে আছেন।

অনন্তপুর কলাতিপাড়ার মনোয়ারা (৪০), ছামসুল (৪৫), ফজলুল (৫২), নুরনাহা (৩৫), উমর ফারুক (৪২) ও মোর্শেদা (৩৮) জানান, তারা এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাননি। বাড়ি ছেড়ে চারদিন ধরে বাঁধে ও উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ খোঁজ নিতে আসেনি।

উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন মাস্টার বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রায় ২৫ গ্রামের তিন হাজার পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চারদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে। সরকারিভাবে ছয় শতাধিক পরিবারকে সহযোগিতা করতে পেরেছি। বাকিরা এখনও ত্রাণ পায়নি। আমি কোথাও যেতে পারছি না। বানভাসিরা আমাকে জেঁকে ধরছে। এখন সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে। আশ্রয়স্থলগুলোতে বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপ ও টয়লেট বসানোর কাজ চলছে। গবাদিপশুর আশ্রয়ের জন্য পলিথিনের চালা তৈরি করে দেয়া হবে। মানুষ যাতে কষ্ট না পায় সেটা আমরা দেখছি। আশা করছি সকলকে নিয়ে আমরা এই দুর্যোগ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো।

সূত্র: জাগোনিউজ

আর/০৮:১৪/১ জুলাই

কুষ্টিয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে