Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ , ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (53 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২০-২০১৩

পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় স্থান রাঙ্গামাটির যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্র

এ কে এম জহুরুল হক


পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় স্থান রাঙ্গামাটির যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্র

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিখ্যাত শমথ ও বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র যমচুগে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। রাঙ্গামাটি শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে বন্দুকভাঙা মৌজার সর্Ÿোচ্চ পাহাড়চূড়ায় এই কেন্দ্রের অবস্থান। যমচুগের চারিদিকে অনেক ছোট-বড় উঁচু নিচু পাহাড় রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া ও ঝর্ণা। কর্ণফুলী নদীর শাখা নদী কাচালং ও চেঙ্গী নদীর মাঝখানের পাহাড়টিতে যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রটি ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ যমচুগে উঠলেই চেঙ্গী ও কাচালং নদীর স্বচ্ছ ও নীল জলরাশি আগন্তুকদের মন ছুঁয়ে যায়। এছাড়া নদীতে চলাচলকারী ছোট বড় নৌযানগুলোর ঢেউ তুলে নদীর বুক চিড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য আবেগের সৃষ্টি করে। আশপাশের উঁচু-নিচু ছোট-বড় পাহাড়গুলোতে সবুজের সমারোহ যেন অনবরত পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে।

এ বিহারে রয়েছে বহু বছর আগে যম চাকমা রোপিত পত্র-পল্লবে সুশোভিত একটি বোধিবৃক্ষ। যার নিচে রয়েছে মহামতি গৌতম বুদ্ধের প্রতিমূর্তি। রয়েছে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন, নির্মাণাধীন রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট বুদ্ধ মন্দির। শমথ ও বিদর্শন ভাবনা অনুশীলনের জন্য রয়েছে ৯টি ছোট ছোট ভাবনা কুটির ও একটি মাটির গুদাম, একটি দেশনালয়, দুটি চংক্রমণ ঘর, একটি বেইন ঘর, ১টি ভিক্ষুদের ভোজনশালা, অষ্টশীলধারীদের জন্য একটি কুটির, একটি রন্ধনশালা ও একটি অতিথিশালা।

নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছ ছাড়াও বিহারের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট বড় অনেক বট গাছ ও নাগেশ্বর গাছ রয়েছে। এসব গাছের নিচে ছায়ায় বসে ভিক্ষু শ্রমণরা একাগ্রমনে সুত্র আবৃত্তি ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন এবং সুমধুর স্বরে ধর্মীয় গাথা ও বন্দনাদি আবৃত্তি করেন। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির আকর্ষণীয় ফুলগাছ ও ফুলের বাগান। যেখানে আগন্তুকরা এক নজর দৃষ্টি না দিয়ে চলে যেতে পারেন না। বিহারের চারিদিকে ঘোরাফেরা করার সুবিধার্থে সুন্দরভাবে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা। বিহারের পূর্বপাশে রয়েছে যমকুয়া বা যমপুঅ। যম চাকমা এ কুয়া থেকে পানি খেয়েছেন বলে এ নাম। এ কুয়া থেকে এখনো খাবার পানি সংগ্রহ করা হয়। কুয়ার পাশে ছড়ায় ছোট একটা দেয়াল দিয়ে অন্য একটি কুয়াও নির্মাণ করা হয়েছে। ভিক্ষু-শ্রমণ ও দায়ক-দায়িকারা সেখানে স্নান কার্যাদি সম্পাদন করেন এবং এই কুয়া থেকে মেশিন দিয়ে বিহারে পানি সরবরাহ করা হয়।

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ফুট উচ্চতার এ পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগ ছাড়া দালান নির্মাণ করা দুঃসাধ্য হলেও যমচুগ এলাকার মানুষ এ অসাধ্য সাধন করেছে। যেখানে সড়ক যোগাযোগ নেই সেখানে দালান নির্মাণ করা হয়েছে যা বিস্ময়কর হলেও সত্য। ধর্মের প্রতি অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধা ও বিহার উন্নয়নে নিজেদের অপরিসীম কষ্ট সহিঞ্চুতা সত্যিই অতুলনীয়। ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় ইট, বালি, সিমেন্ট, কংক্রিট, লোহার রড সব কিছু সরঞ্জাম কাঁধে-পিঠে বহন করেছে এলাকাবাসী। এলাকার অধিকাংশ মানুষই অস্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও তাদের টাকা পয়সা দিয়ে বিহারের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

স্থানীয়রা জানান, যমচুগ পাহাড়টির পুর্ব নাম ছিল বন্দুককোণা মোন। মোন মানে হচ্ছে উঁচু পাহাড় চূড়া। দূর থেকে পাহাড়টিকে অনেকটা বন্দুকের মত দেখাতো বলে এলাকার লোকজন এ নামকরণ করেছিলেন। কথিত আছে প্রায় শত বছর আগে বন্দুককোণা মোনে ইমিলিক্যা চাকমা যম নামে এক চাকমাতান্ত্রিক সাধক এই পাহাড়ে যোগ সাধনা করেছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল যাবৎ সেখানে বসবাস করেন। ১৯৮৩ সালে এখানে বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠাকালে ইমিলিক্যা চাকমার স্মৃতিকে ধরে রাখার মানসে তারই নামানুসারে বিহারের নামকরণ করা হয় যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্র। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিংবদন্তী বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তের দিক-নির্দেশনা ও আর্শীবাদ নিয়ে স্থানীয় লোকজন এই বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। বিহারের পুর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫০টি গ্রামের মানুষ বিহার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন কাজে এগিয়ে আসে।

প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে এলাকাবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রটি একটি পবিত্র বৌদ্ধ তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছে। বনভান্তের শিষ্যরা এখানে নিয়মিত শমথ ও বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করেন। কেউ কেউ ধুতাঙ্গব্রতও পালন করেন। ভিক্ষুদের বিদর্শন ভাবনা চর্চা ও বিহারটি তীর্থস্থানে পরিণত হওয়ায় দেশী-বিদেশী পর্যটক ও বৌদ্ধ ভিক্ষু এ বিহার পরিদর্শনে আসেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন ও ভিক্ষুরা। তারা জানান, কোরিয়া থেকে একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু এসে অনেকদিন এখানে ধ্যান সাধনা করেছিলেন। সিঙ্গাপুর, থাইওয়ান, ভারত থেকে এখানে বিভিন্ন সময় ভিক্ষু ও দায়ক-দায়িকা এসেছিলেন।

রাঙ্গামাটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এ বিহার সফর করে গেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমা, চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার প্রমুখ। ভারতের অরুণাচল প্রদেশের খামতি উপজাতীয়দের প্রধান ও প্রাক্তন এমএলএ চৌ পিংটিকা নামচুম সস্ত্রীক যমচুগে ঘুরে গেছেন। সফরকারীরা প্রত্যেকে বিহার উন্নয়নে আর্থিক শ্রদ্ধাদান করেছিলেন। কল্পরঞ্জন চাকমা বিহারে যাতায়াতের সুবিধার্থে নদী থেকে বিহার পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। সাবেক উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান এ বিহারের জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিলেন।

বনভান্তের প্রধান শিষ্য নন্দপাল মহাস্থবির বহু বছর এই যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রে শমথ ও বিদর্শন ভাবনা করেছিলেন। ১৭ বছর ধরে এই পাহাড়ে ধ্যান-সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন বলে তাঁর সতীর্থ, শিষ্য-প্রশিষ্য ও ভক্ত দায়ক-দায়িকাদের বিশ্বাস। বর্তমানে তিনি ভারতের বুদ্ধগয়া ও অরুণাচল, মুম্বাই, কলকাতা, নয়াদিল্লীসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধধর্ম প্রচার করে চলেছেন। দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ভগবান বুদ্ধের অহিংসা সাম্য মৈত্রী ও মুক্তির বাণী প্রচারের পাশাপাশি তার গুরু বনভান্তের হিতোপদেশ প্রচারে ব্রতী হয়েছেন।

নন্দপাল মহাস্থবিরের শিষ্যরা বর্তমানে এই যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রে ধ্যান সাধনা ধর্ম চর্চা ধর্ম প্রচার ও সামাজিক দায়িত্ব কর্তব্য পালন করছেন। কেউ বিদর্শন ভাবনা কেউ ধুতাঙ্গব্রত পালন করে যাচ্ছেন মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে। প্রতিবছরের মত এ বছরও যমচুগে উদযাপন করা হবে দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব। এটি হবে যমচুগে ৩০তম দানোত্তম কঠিন চীবর দান। এলাকার হাজাছড়া, পানছড়ি মোন আদাম, পেত্যাছড়ি ও দক্ষিণ উকছড়ি এই ৫টি গ্রামের মানুষের আর্থিক শ্রদ্ধাদান ও বিহার পরিচালনা কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ উৎসব পালিত হয়।বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুশীল জীবন চাকমা ও অর্থ সম্পাদক বাসক্ষী চাকমা জানান, প্রতিবছর এ বিহারে চীবর দানের সময় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। ভারত থেকেও আসে লোকজন।

রাঙ্গামাটি শহর থেকে নদীপথে যমচুগে যেতে হয়। রাজবন বিহার ঘাট, রাজবাড়ী ঘাট, পাবলিক হেলথ ঘাট, বনরূপা সমতা ঘাট, রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে দেশীয় ট্রলার যোগে সেখানে যাওয়া যাবে। এছাড়া স্পীড বোটেও যাওয়া যায়। রাঙ্গামাটি শহর থেকে স্পীড বোটে যমচুগের ঘাটে পৌঁছতে সময় লাগে সোয়া এক ঘন্টা। সাধারণ দেশীয় ট্রলারে যেতে সময় লাগে আড়াই ঘন্টা। ঘাট থেকে হাঁটা পথে যমচুগে উঠতে সময় লাগে এক ঘন্টা। ওঠার সময় রাস্তার পাশে পাহাড়িদের বাড়িতে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ রয়েছে। চাই কি রাত্রিযাপনও করা যায়। সেখানকার মানুষগুলো খুবই অতিথি পরায়ণ। তাছাড়া যমচুগে যাওয়া হচ্ছে জানলে কদরটা আরেকটু বেড়ে যায়। যমচুগে যাচ্ছে মানে সেতো অত্যন্ত ভালো মানুষ। তাই তাদের বেশ যতœ-আত্তি করা হয়।

পর্যটন

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে