Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ , ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-২৯-২০২০

সুন্দরবনে পুলিশের শ্বাসরুদ্ধকর সফল অভিযানের গল্প

সুন্দরবনে পুলিশের শ্বাসরুদ্ধকর সফল অভিযানের গল্প

বাগেরহাট, ৩০ মে- প্রতিদিন কত ঘটনা ঘটে চারিদিকে। কত ঘটনা চাপা পড়ে যায় অন্য ঘটনার তোড়ে। এরমধ্যেও একটি ঘটনা সাধারণত সিনেমায় সত্য মনে হলেও বাস্তবে রূপ দিলো বাগেরহাটের শরণখোলার পুলিশের একটি চৌকস টিম। পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে হারিয়া যাওয়া ছয় কিশোরকে দশ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে উদ্ধার করেছেন তারা। শুধু তাই নয়, জীবনে বেঁচে যাওয়া ছয় কিশোরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে পরিবারের হাতে তুলে দেয় পুলিশের এই যোদ্ধারা।

অভিযানে নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় কিছু লোকজনও পুলিশকে সহায়তা করেছে। তবে এই অভিযানের পেছনে নেয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে জরুরি হেল্পলাইন নম্বর ‘৯৯৯’। কারণ পথ হারানো এই কিশোরদের একজন বিপদের কথা জানিয়ে ফোন করেছিলেন ‘৯৯৯’ এ। অন্যথায় কী পরিণতি হতে পারত তা হয়তো সময় বলে দিত।

ঘটনাটি বুধবার সকালের। কিশোররা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি টের পায় বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে তখন। পরে পুলিশ বিপদের কথা জেনে উদ্ধার অভিযান শেষ করে রাত তিনটায়।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল সাইদ বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি আমরা। কিন্তু এই ঘটনাটি সব থেকে ব্যতিক্রম ছিল। বাচ্চাদের অসহায়ত্বের কথা শুনে খারাপ লাগছিল কীভাবে উদ্ধারে করবো। চেষ্টা করেছি সবসময় যতদ্রুত সম্ভব তাদের নিরাপদে স্বজনদের কাছে পৌঁছাতে পারি। যখন সফল হলাম তখন অনুভূতিটা কেমন ছিল বলে বোঝানো যাবে না।’

পুলিশের ফেসবুক পেজসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরার পর প্রশংসায় ভাসছেন উদ্ধার অভিযানে যাওয়া সদস্যরা। ‘৯৯৯’এর সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এমনটাও বলছেন কেউ কেউ।

পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, যে ছয় কিশোর সুন্দরবনে হারিয়ে যায় তারা হলো- জয়, সাইমুন, জুবায়ের, মাঈনুল, রহিম ও ইমরান। তাদের বয়স ১৬-১৭। দুজন ঢাকায় থাকে। বাকি চারজন গ্রামে। ঈদ উপলক্ষে সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। যেই ভাবনা, সেই কাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বুধবার সকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগরে বেড়াতে আসে। পরে সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বনের ভেতরে মনের সুখে হাঁটতে থাকে। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে তাদের যখন ফেরার কথা মনে হয় ততক্ষণে যেপথ দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে সে পথ ভুলে যায় জয়রা। বের হওয়ার পরিবর্তে উল্টো বনের গহীনে যেতে থাকে তারা। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে আসে। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বাঘসহ হিংস্র প্রাণীর ভয়ও চেপে বসেছে কিশোরদের মনে।

কী করবে এই চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়ে তারা। ছয়জনের মধ্যে তিনজনের কাছে থাকা তিনটি মোবাইলে নেটওয়ার্কও তেমন কাজ করছিল না। পরে একজন তাদের স্বজনদের বিপদে পড়ার কথা জানায়। অন্য একজন বুদ্ধি করে ‘৯৯৯’এ ফোন করে। পরে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক শরণখোলা থানার সঙ্গে সংযোগ দেয়া হয়। বিষয়টি জানানো হয় নৌ-পুলিশকেও। পরে পুলিশকে নিজেদের বিপদ থেকে উদ্ধারের আকুতি জানায় পথহারা কিশোররা।

যেভাবে পরিচালিত হয় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান
কিশোরদের কাছ থেকে খবর পেয়েই উদ্ধারে নেমে পড়ে পুলিশ। কিন্তু এতবড় সুন্দরবনের কোনদিক দিয়ে অভিযান চালাবেন তা নিয়েও দ্বিধায় পড়েন তারা। শেষ পর্যন্ত কিশোরদের উদ্ধারে এমন কোনো কৌশল নেই যা প্রয়োগ করেনি পুলিশ। অন্যদিকে কিশোরদের সঙ্গে থাকা দুটি ফোন বন্ধ হয়ে যায় চার্জের অভাবে। সচল থাকা একটি ফোনেই যোগাযোগ রেখে রেখে সামনে এগুতে থাকে পুলিশ।

অভিযানের শুরুতেই কিশোরদের বনের মধ্যে হাঁটাচলা না করে গাছে চড়ে থাকার পরামর্শ দেয় পুলিশ। কারণ বনের চাঁদপাই রেঞ্জের ওই অংশে বাঘের চলাচল আছে। কিন্তু কিছু সময় পরই শুরু হলো বৃষ্টি। এতে বনের মধ্যে এক গুমোট অন্ধকারের সৃষ্টি হলো। এতে আরও ভড়কে গেল কিশোররা। এর মধ্যেই আবার তাদের ফোনের নেটওয়ার্কও চলে গেল।

প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টার পর তাদের মোবাইলে সংযোগ পায় পুলিশ। কথার এক পর্যায়ে তারা জানায়, মাইকে এশার আজানের শব্দ শুনেছে তারা। এ কথা শুনে নতুন করে পরিকল্পনা করে পুলিশ। কিন্তু সমস্যাটা হলো বনের ওই এলাকার পাশের লোকালয়ে দুই পাশে দুটি মসজিদ আছে। কাজেই কোন মাইকের শব্দ তারা শুনতে পেল, সেটি জানতে পারলে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।

পরে একপাশের মসজিদের মাইক দিয়ে তাদের ডাকা হলো। আর ফোনে জানতে চাওয়া হলো, আওয়াজ শোনা যায় কি-না। জবাব এলো, খুবই কম। সিদ্ধান্ত পাল্টে এবার বনের অন্য পাশের মসজিদের মাইক দিয়ে ডাকা হলো। কিশোররা জানালো, আগের থেকে স্পষ্ট শব্দ শুনছে তারা। পরে পুলিশ সেই প্রান্ত থেকে অভিযান শুরু করে।

সুন্দরবনের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে ৩-৪ কিলোমিটার পর্যন্ত শব্দ শোনা যায়। আর রাতে সেটি আরও গহীন থেকে শোনা যায়। তাই সুন্দরবনের ৪-৫ কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এগুতে থাকে পুলিশ। তবে কেওড়ার শ্বাসমূলের সঙ্গে লতাগুল্ম , ঝোপঝাড় আর নানা ধরনের কাঁটা। রাতের অন্ধকারের সাথে বৃষ্টি। পিচ্ছিল পথে কয়েক ঘণ্টা ধরে সেই পথ পাড়ি দিয়ে বনের আরও ভেতরে গেল পুলিশ।

ততক্ষণেও কোনো সন্ধান না পেয়ে নতুন কৌশল নেয় পুলিশ। ফোনে কিশোরদের বলা হয়, আমরা হাঁক তুলবো। শুনতে পেলে তোমরাও হাঁক তুলবে। পুলিশ বনের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে হাঁক তুললো। কিন্তু ওই পাশ থেকে সাড়া নেই। ঘণ্টাখানেক পর ওপাশ থেকে হাঁকের জবাব এলো। এবার পুলিশ বুঝতে পারলো, কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। হাঁক দিতে দিতে এক সময় হারিয়ে যাওয়া কিশোরদের খুঁজে পায় পুলিশ। ততক্ষণে রাত তিনটা বেজে গেছে।

দীর্ঘক্ষণ বনের মধ্যে এমন প্রতিকূল পরিবেশে থেকে মুষড়ে পড়ে ছয় কিশোর। পুলিশ ধরাধরি করে তাদের নিয়ে থানায় ফিরতে ফিরতে রাত পেরিয়ে ভোর। অনেকক্ষণ কিছু না খেতে পেরে আরও ক্লান্ত তারা। থানায় এনে প্রাথমিক শশ্রুষার পাশাপাশি খাবার খেতে দেয় পুলিশ। এরপর সকালে মিষ্টিমুখ করিয়ে কিশোরদের পরিবারের হাতে তুলে দেয় পুলিশ।

সন্তানদের ফিরে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের চোখে তখন আনন্দ অশ্রু। বুকে সন্তান জড়িয়ে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলেন তারা। জানালেন অশেষ কৃতজ্ঞতা।

থানা থেকে বিদায় নেয়ার সময় হারিয়ে যাওয়া দলের এক তরুণ থমকে দাঁড়ালো। পুলিশকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বনের ভেতরে যখন হারিয়ে গিয়েছিলাম, তখন বারবার মনে হয়েছে এ জীবনে আর ফেরা হবে না। কিন্তু পুলিশের কারণে আমরা ছয়জন আবার নতুন জীবন পেলাম। আমি পড়াশোনা করে পুলিশ হতে চাই। বিপদে এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

শরণখোলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, পুলিশর টিমের সঙ্গে নৌ-বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় কিছু লোক আমাদের সহযোগিতা করেছেন। তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল 

আর/০৮:১৪/৩০ মে

বাগেরহাট

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে