Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০ , ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-২৭-২০২০

'দেশে বিদেশে' টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠান ও একজন হাসি রহমান

নাঈমা সিদ্দিকা


'দেশে বিদেশে' টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠান ও একজন হাসি রহমান

গত ২৪ মে ২০২০ 'দেশে বিদেশে' (deshebideshe.tv) কানাডা ভিত্তিক টিভি চ্যানেল একটি অনুষ্ঠান প্রচার করে। ঘটনাক্রমে অনুষ্ঠানটি আমার দেখা হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন কলকাতার দুজন সংগীত শিল্পী এবং কানাডা প্রবাসী সংগীত শিল্পী রিনা দেব আর আবৃত্তি শিল্পী হাসি রহমান। উপস্থাপক, একটি লাইভ অনুষ্ঠান যেরকম স্থিরতার দাবি করে সেটা মিটিয়েছেন, সেই সাথে শিল্পী এবং দর্শকের মাঝে সেতু বন্ধন করতে পেরেছেন।

কলকাতার সংগীত শিল্পীদের পরিবেশনা ছিল বৈচিত্রময়, এই কারণে উপভোগ্য। রিনা দেবের সংগীত আমারভালো লাগে। তিনি টরন্টো থেকে দূরে এক প্রান্তে বসবাস করে শুধুমাত্র সংগীতের উপর ভর করে শিল্পী হিসেবে নিজের একটি জায়গা করে নিয়েছেন। 'শুধুমাত্র' শব্দটা বলছি এই কারণে যে, অনেক শিল্পী আছেন ব্যাক্তিগত যোগাযোগ অথবা প্রভাব দিয়ে নিজের জায়গা করে নেন। সেইজন্যে তার প্রতি শ্রদ্ধা। 

আসলে এই লেখাটির উদ্দেশ্য এসব বলা নয়। আমি আলোকপাত করতে চাই হাসি রহমান এর আবৃত্তির উপর। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জয়গোস্বামি, রবীন্দ্রনাথ সহ বেশ কয়েকজন কবির কবিতা আবৃত্তি করেছেন। সত্যি বলতে অমলের কাছে চিঠি এই কবিতাটি ছাড়া সবগুলো কবিতাই ছিল আবৃত্তির জন্যে চ্যালেঞ্জিং। যেমন ত্রাণ কবিতাটি তিনি পড়েছেন এটি একটি ছন্দ ভিত্তিক বহুল পঠিত কবিতা। অনেক বড়ো আবৃত্তিকার এই কবিতা পড়েছেন, কবিতাটির খারাপ আবৃত্তি হলে সহজেই ধরা পরার ভয় থাকে।

এই কবিতা আবৃত্তির ঝুঁকি হলো ছন্দের ঝোক, কোনো কোনো শব্দ পতন হবার সম্ভাবনা থাকে, তাতে আবৃত্তিটি মনোটোনাস হয়ে যায় এবং দর্শকের মনোযোগ হারানোরও ভয় থাকে। হাসি রহমান সেটা নিপুন শিল্পীর মতোই দারুন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি কবিতার টেক্সট ও চরিত্র বোঝেন, আছে ছন্দের উপর নিয়ন্ত্রণ, গলায় বৈচিত্র।

উপস্থাপক বলছিলেন হাসি রহমান অন্যদের থেকে আলাদা তার এই গুণাবলীই তাকে আলাদা করেছে। তার যে দীর্ঘ চর্চা আছে সেটা তার গলায় স্পষ্ট। চর্চার বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। সাধারণের মনে এবং কোনো কোনো সংস্কৃতি কর্মীদেরও মনে এই ধারণা আছে যে কবিতা ছন্দের সাথে ঝুকে ঝুকে, দুলে দুলে বা চিৎকার করে অথবা গলার স্বর বেস এ নিয়ে গম্ভীর ভাবে পড়লেই আবৃত্তি হয়ে যায়। একটি কবিতা হাতে নিয়ে দেখে পড়ে দিলেই আবৃত্তি হলো। প্রকৃতি বিষয়টি তা নয়। অন্য শিল্পের মতোই এক্ষত্রেও দীর্ঘ প্রস্তূতি দরকার হয়।

একটি কবিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, চরিত্র, অথবা কবিতার বোধ কিভাবে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে প্রকাশ করবেন সেটা সাধনা করেই তৈরী করতে হয়। প্রয়োজন হয় শিল্পীর গভীর সাহিত্য পাঠের সাথে চিন্তা শক্তি, বোধ ও সৃজনশীল মনের সমৃদ্ধির জন্যে ক্রমাগত চর্চা। সেই সাথে দরকার হয় ভালো শিক্ষাগুরু ও প্রকৃত চর্চার পরিবেশ। একজন আবৃত্তি শিল্পী একইসাথে নির্দেশক, কম্পোজার এবং পরিবেশক। গান এর সাথে তুলনা করলে সেখানে সুর কম্পোসিশন সব আগে থেকেই তৈরী থাকে, কিন্তু আবৃত্তির ক্ষেত্রে সেই সুযোগ থাকেনা বলেই এটা কঠিন শিল্প মাধ্যম। এই কঠিন মাধ্যমে যারা পরিশ্রম দিয়ে নিজেদের তৈরী করেন তাদেরকে আলাদা মনে হয়। উপস্থাপক নিজেও বার বার বিস্ময় নিয়ে বলছিলেন তার ভালো লাগার কথা এবং তিনি তার সরল বিস্ময় প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি, দৰ্শকদেরও সেটা ভালো লেগেছে নিঃসন্দেহে। জয়গোস্বমীর কবিতাটি হাসি পড়লেন যে টন দিয়ে, দক্ষ আবৃত্তিকার না হলে সেটা সম্ভব না।

সবচেয়ে বড়ো যে চমকটি হাসি দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার অসাধারণ পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে। এই কবিতাটি দীর্ঘ, আছে ছন্দের প্রাবল্য, আছে অনেক চড়াই উতরাই, দর্শকের মনোযোগ কেটে যাবার বিপদ। দর্শক দারুণভাবে কবিতাটি উপভোগ করেছে , তাদের হৃদয় হাসি রহমানের আবৃত্তির সাথেই দুলে উঠেছে, ভেসে চলেছে। কবিতাটির শেষ লাইনটি এক মাত্রা উপরে ছাড়লে হয় তো ভালো হতো, লাইন টি পরে গেছে, কিন্তু সেটা নিতান্তই তুচ্ছ।

হাসি রহমান আরো ভালো আবৃত্তি উপহার দিবেন এই প্রত্যাশা। সেই সাথে আশা করছি তিনি নিজেকে ক্রমাগত অতিক্রান্ত করবেন। শিল্পী যখন বোঝেন তিনি সমসাময়িকদের থেকে ভালো পড়েন তখন একটা আত্মতৃপ্তি কাজ করে, এই মনোভাব শিল্পীর বিকাশের পরিপন্থী, হাসি রহমান এই সীমাবদ্ধতায় আটকে পরবেন না নিশ্চয়ই ।

এবার আসি আমার জাবাবদিহিতায়, হাসি রহমানকে এই অনুষ্ঠানেই প্রথম দেখেছি এবং তার সাথে আমার বাক্তিগত পরিচয় নেই। তবে কেন এইসব আলোচনার অবতারণা, আসলে এই লেখাটি লিখলাম আবৃত্তি শিল্পের উপর দায়বদ্ধতা থেকে। অনেক অশিল্পীর (যারা আবৃত্তির নামে কুস্তী করেন) মধ্যে মেধাবী শিল্পী যারা অনেক ত্যাগ শিকার করে নিজেকে তৈরী করেন তারা যেন হারিয়ে না যান। সাথে একজন আবৃত্তি শিল্পীর শক্তিমত্তার জায়গাটা কোথায় সেটাও আলোচনা করা দরকার। বাংলাদেশে একশত’রও আবৃত্তি সংগঠন আছে, আছে আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। দীর্ঘ কয়েক দশক আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের কাছাকাছি কাজ করবার এবং নিজের সংগঠন এর দায়িত্ব পালনের সুযোগ হওয়ায় আবৃত্তির সমসাময়িক মান সম্পর্কে একটা ধারণা হয়েছে।

বেশিরভাগ প্রবাসী আবৃত্তি শিল্পীদের পরিবেশনা যখন শুনি তখন খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শিল্পীর আবৃত্তি শিল্পের বর্তমান রূপ এবং মূলধারার মান সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার নয়। এই ধারনা তৈরী হয় আর্টিস্টিক ক্রিটিকাল এপ্ৰাইযাল করতে শেখার মাধ্যমে। অনেক শিল্পী আছেন দেশে তারা অন্য মাধ্যমে কাজ করতেন, প্রবাসে এসে আবৃত্তি করছেন তাদের মধ্যেও শিল্পর ধারার সাথে যোগাযোগ হয়নি সেটা স্পষ্ট। ঠিক তখনই হাসি রহমান একটি আশার আলো, উপস্থাপকের ভাষায় আবিষ্কার হয়ে দেখা দিলেন।

( হ্যামিলটন )

এম এন  / ২৭ মে

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে