Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯ , ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (54 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৫-২০১১

দান্তের জীবনে প্রেম, নারী ও কবিতা -লিখেছেন: জিয়া রায়হান (ব্লগ নেম) - শব্দনীড় ব্লগ

দান্তের জীবনে প্রেম, নারী ও কবিতা -লিখেছেন: জিয়া রায়হান (ব্লগ নেম) - শব্দনীড় ব্লগ

1951

ফ্লোরেন্স। একটি শহরের নাম। একটি কিংবদন্তি। রেনেসাঁর আতুর ঘর। সভ্যতার তীর্থস্থান। পিয়াজ্জা সিনিওরা পিছনে ফেলে পশ্চিমের যে কোন রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে গেলেই প্রবাহমান “আরনো”। এই আরনোর দু’তীর ঘেষে গড়ে উঠেছিল ফ্লোরেন্স। আর সেই ফ্লোরেন্সে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের বরপুত্র, জগৎ বিখ্যাত সব শিল্পী সাহিত্যিক কবি ও আবিষ্কারক। তাদেরই একজন দান্তে। দান্তে আলিগিয়েরী।

দান্তে ১২৬৫ সালে মে- র শেষ দিকে কিংবা জুনের প্রথমে ফ্লোরেন্সের সেস্ত দি পর্তা সান পীয়েত্র- এ জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বাত্তেজ্জাতো (জন্ম শুদ্ধি) করা হয় ফ্লোরেন্সের সান জোভান্নী গির্জায়। এ সময় ফ্লোরেন্সে রাজনৈতিক মতাদর্শের দুটি ধারা বিদ্যান ছিল। একটি গুয়েলফি যার নেতৃত্বে ছিলেন পোপ্ এবং অন্যটি গিবেল্লীনি, এটি ছিল রাজতন্ত্রের ধারক বাহক। গুয়েলফি মতাদর্শের একটি সম্ভান্ত পরিবারে জন্ম হয় দান্তের। তার বাবা আলগিয়েরী মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন এবং নিজস্ব জমি চাষাবাদে তদারকি করতেন। তাঁর মা-র নাম বেল্লা যার অর্থ সুন্দরী। সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়াতে দান্তে ফ্লোরেন্সের খুব ভাল স্কুলে পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছিলেন। স্কুল জীবনেই দান্তের সংগে কবি গুইদো কাভালকান্তি ও অন্যান্য “স্তিল নুওভো” কবিদের সংগে পরিচয় ঘটে এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে। “স্তিল নুওভো” কবিতার কবিদের “স্তিল নভেস্তি” নামে সম্বোধন করা হতো। সে সময় কবিরা শুধু মিষ্টি প্রেমের কবিতাই লিখতেন বলে তৎকালীন কাব্য সাহিত্যকে “দোলচে স্তিল নুওভো” নামে চিহ্নিত করা হয়।

দান্তের নামের সংগে আরো একটি নাম আরো একটি স্বত্তা আজো কিংবদন্তি হয়ে আছে। তিনি ছিলেন দান্তের স্বপ্ন প্রেম ভালবাসা প্রত্যাশা ও কবিতার একক দেবী- বেয়াত্রিচে। বেয়াত্রিচের বাবা ফোলকো পোরতিনারি। বেয়াত্রিচের বাবার নামে রোমের মোন্তে ভেরদে এলাকার একটি রাস্তার নাম করন করা আছে। বেয়াত্রিচে ছিলেন দান্তের সমবয়সী। দান্তে বেয়াত্রিচেকে প্রথম দেখে নয় বছর বয়সে। ১২৭৪ সালে ফ্লোরেন্সের ফেস্তা দি রাগাৎসিতে। সেদিন বেয়াত্রিচের পরনে ছিল সাদা ধবধবে পোষাক। প্রথম দেখার পর থেকেই দান্তে বেয়াত্রিচের প্রেমে পরে এবং নিরব ভালবাসায় নিজেকে নীল করে। দান্তে এ ভালবাসার কথা বেয়াত্রিচেকে জানাতে পারেনা। প্রথম দেখার ঠিক নয় বছর পর দ্বিতীয়বার বেয়াত্রিচের সংগে দান্তের দেখা হয় এবং কথা হয়। মাঝে এই নয় বছর দান্তে বেয়াত্রিচেকে দূর থেকে থেকে দেখেছে বটে কিন্তু কথা কিংবা কুশল বিনিময় হয়নি কখনো। দ্বিতীয়বার দেখা এবং কথা বলার সময়ও বেয়াত্রিচের পরনে ছিল সেই সাদা পোষাক। দান্তেকে দেখার পর বেয়াত্রিচে মধুর সম্ভাষনে কুশল জিজ্ঞাসা করলে দান্তের নিরব ভালবাসা যেন সমুদ্রের ঢেউ হয়ে ফুলে ওঠে বুকের ভেতরে। বেয়াত্রিচে বিদায় নিয়ে চলে গেলে দান্ত ঘরে ফিরে জাগরিত স্বপ্নে বিভোর হয়ে পরে। সে দেখে- প্রেমের দেবতার কোলে বেয়াত্রিচে বসে আছে এবং সেই দেবতা বলছে আমি বেয়াত্রিচের সৃষ্টিকর্তা ও প্রভু। সে দেবতা দান্তের হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে যায় বেয়াত্রিচেকে খাওয়ানোর জন্য। বেয়াত্রিচেকে নিয়ে এমনি আরো হাজার কল্পনা তখন দান্তের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে।
এ সময় (১২৯২- ১২৯৪) পর্যন্ত) দান্তে বেয়ত্রিচেকে নিয়ে “ভিতা নুওভোধ নামের একটি ৪২ অধ্যায়ের অপেরা বা কবিতার বই লিখেন। যার মধ্যে ২৫টি সনেট, ৪টি গান, একটি গীতি কাব্য ও একটি স্তানজা। “ভিতা নুওভা”- র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিষয় বস্তু বেয়াত্রিচে। উপরে উল্লেখিত তাদের প্রথম দেখা দ্বিতীয় দেখা ও দেবতার কোলে বেয়াত্রিচে এ সবই ভিতা নুওভা- র বিষয় বস্তু। বেয়াত্রিচের প্রতি দান্তের এই নিরব ভালবাসা কিংবা দূর্বলতা যাতে কেউ না জানতে পারে সে জন্য দান্তে অন্য দুজন মেয়ের সংগে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দান্তের এই প্রেমকে কেন্দ্র করে বেয়াত্রিচে ভাবে তার প্রতি দান্তের ভালবাসা আসলে একটা লোক দেখানো ব্যাপার। এ পর্যায়ে দান্তের সংগে বেয়াত্রিচে কথা বলা ও কুশল বিনিময় বন্ধ করে দেয়। বেয়াত্রিচের এই আচরনে দান্তে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরে কারন বেয়াত্রিচের মধুর সম্ভাষন ও কুশল জিজ্ঞাসা ছিল দান্তের কাছে অনেক কিছু। দান্তে বেয়ত্রিচেকে ভালবাসতো সত্যি কিন্তু বিনিময়ে বেয়াত্রিচে দান্তেকে কখনই ভালবাসেনি। দান্তের প্রতি তার একটা অনুরাগ কিংবা দূর্বলতা ছিল সত্যি কিন্তু সেটা ছিল একজন কবির প্রতি ভক্তের ভালবাসা। সে সময় দান্তে বেয়াত্রিচেকে ফ্লোরেন্সে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন তার কবিতার নায়িকা হিসেবে। তখন সবাই জানতো দান্তের সব কবিতাই এখন আবর্তিত হচ্ছে বেয়াত্রিচেকে ঘিরে। দান্তের মাধ্যমে এই ব্যাপক পরিচিতি ও খ্যাতির একটা লোভ বেয়াত্রিচের মনে বোধহয় বাসা বেঁধেছিল। দান্তের একতরফা এই নিরব ভালবাসার দেবী বেয়াত্রিচেকে বিয়ের ব্যাপারে দান্তে কখনো প্রস্তাব পাঠায়নি কারন তিনি জানতেন বেয়াত্রিচের বাবা এ প্রস্তাবে রাজি হবেন না। কারন বেয়াত্রিচের সামাজিক পরিচিতি ছিল দান্তের চেয়ে উঁচু।
বেয়াত্রিচে কথা বলা বন্ধ করে দিলে দান্তে মানসিক ও শারীরিক ভাবে ভীষণ ভেঙ্গে পরেন।এর কিছু দিন পর এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বেয়াত্রিচেকে দেখে দান্তের সমস্ত শরীরে অস্বাভাবিক কম্পন দেখা দেয় এবং তিনি পাগলের মত আচরন শুরু করলে এক ভদ্রলোক তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। এ দৃশ্য দেখার পর বেয়াত্রিচের মনে দান্তের ভালবাসা সম্পর্কে আর কোন দ্বিধা থাকে না কিন্তু তারপরেও বেয়াত্রিচে দান্তেকে এক বুক দুঃখ ও হতাশা ছাড়া কিছুই দেয়নি জীবনে। এ অবস্থায় সিমোনে দে বারদি-র সংগে বেয়াত্রিচের বিয়ে হয়ে যায়।

বেয়াত্রিচের বাবার মৃত্যু হয় ঠিক এই সময়। বেয়াত্রিচে ভীষণ ভেঙ্গে পরেন। দান্তে এ সময় প্রায় বেয়াত্রিচের মৃত্যু স্বপ্ন দেখতেন। বাবার মৃত্যু শোকে কাতর বেয়াত্রিচেকে শান্তনা দিয়ে দান্তে একটি কবিতা লিখে পাঠান। কিন্তু সম্ভবত এই কবিতাটি বেয়াত্রিচের হাতে পৌঁছায়নি কারন বাবার মৃত্যুর চার মাসের মধ্যেই দান্তের স্বপ্ন সত্যি হয়ে উঠে- প্রসবকালীন মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। ২৫ বছর বয়সে সন্তান প্রসবা বেয়াত্রিচের মৃত্যু দান্তের হৃদয়কে ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। তার চোখের কোলে কালি জমতে থাকে, দাড়িগুলো বড় হতে শুরু করে, নিজের প্রতি অত্যাচার ও অনিয়ম দেখা দেয়। কিন্তু সময়ের স্রোতে আস্তে আস্তে একদিন দান্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন এবং পরবর্তী কয়েক বছর সাধনায় রচনা করেন তার বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ বা অপেরা “লা দিভীনা কম্মেদিয়া”। এর তিনটি পর্ব- (ক) লি’নফেরনো (নরক) (খ) ইল পুরগাতরিও (স্বর্গ ও নরকের মধ্যস্থল) (গ) ইল পারাদীজো (স্বর্গ)। লা দিভীনা কম্মোদিয়াতে দান্তে মৃত্যু পরবর্তী বেয়ত্রিচেকে ঘিরে তার নিজস্ব কল্পনার এক অদ্ভুত ছবি এঁকেছেন। খৃষ্টপূর্ব এক বিখ্যাত কবি ভিরজিলিও। কিন্তু তার বাত্তেজ্জাতো না হওয়ায় তিনি স্বর্গে প্রবেশ করতে পারনেনা। তিনি ইনফেরনো অধিবাসী। ভিরজিলিও দান্তেকে ইনফেরনো থেকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন পুরগাতরিওতে। বেয়াত্রিচে সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাবেন পারাদীজোতে। দান্তে পারাদীজোতে গিয়ে দেখছেন বেয়াত্রিচের সমস্ত শরীর এক অদ্ভুত আলোয় মোড়ানো। সে তার মুখ, শরীর কিছুই দেখতে পারছেনা। শুধু তার পা দুটো দেখা যাচ্ছে, আর সে আলোয় মোড়া শরীর নিয়ে বেয়াত্রিচে নীল আকাশে উঠে যাচ্ছে।

এ অপেরার মধ্যে দিয়ে দান্তে স্তিল নুওভো যুগের কবিদের প্রেমিক হৃদয়ের এক চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন। তখন প্রেম ছিল মানসিক। প্রেমকে মনে করা হত স্বর্গীয়। এ কারনেই দান্তের বিশ্বাস সত্যিকারের প্রেমিক প্রেমিকারা মৃত্যুর পর ফেরেস্তার রূপে স্বর্গে বসবাস করে। বেয়াত্রিচের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই।
দান্তের প্রথম জীবনী লেখক, জোভান্নি বোকাচ্চোর মতে, বেয়াত্রিচের মৃত্যুর পর দান্তের মাসসিক অবস্থার উত্তরনের জন্য তাঁর মা বাবা বাধ্যতামূলক জেম্মা দনাতীর সংগে বিয়ে দেন। কিন্তু অন্য আর একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যে জানা যায়- ১২ বছর বয়স থেকেই জেম্মা- ও দান্তের পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। দান্তে জেম্মা-র দুই ছেলে, পীয়েত্র ও ইয়াকোপো এবং এক মেয়ে আনতনীয়া। আনতনীয়া ছিল বাবার অন্ধ ভক্ত। দান্তের মৃত্যুর পর আনতনীয়া “মনাকো” জীবন গ্রহন করে আমৃত্যু অবিবাহিতা থাকে এবং বেয়াত্রিচে নাম গ্রহন করে রাভেন্নাতে বসবাস করে।

বেয়াত্রিচের মৃত্যুর পর দান্তে পরিবার সহ রাজনৈতিক কারনে ফ্লোরেন্স ত্যাগ করে। গুয়েলফি দলের সাদা কাল উপদলের অভ্যন্তরীন কলহ গৃহযুদ্ধ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং দান্তের উপদলের পতন হলে তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফ্লোরেন্স ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ভেনিস যাওয়ার পথে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন এবং রাভেন্নাতে এসে মৃত্যু বরন করেন ১৩২১ সালে। তাকে সমাধিস্থ করা হয় রাভেন্নার সান ফ্রানসিস্কো গীর্জায়। পরবর্তীতে রাভেন্না থেকে তার মৃত দেহ ফ্লোরেন্সে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কবর খনন করা হলে তার মৃত দেহ সেখানে আর পাওয়া যায়নি। এই অলৌকিক ঘটনা তৎকালীন মানুষের মনে ভীষণ আলোড়ন তুললে, পোপ্ বলেন- লা দিভীনা কম্মোদিয়াতে দান্তে যা লিখেছেন, তার মৃত্যুর পর হয়তো তাই ঘটেছে। দান্তে বেয়াত্রিচের সংগে স্বর্গে আছেন।

1961

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে