Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (50 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৫-২০১১

প্রেক্ষিত রুমানা-সাইদঃ নির্যাতনের ব্যাখ্যায় বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান-লিখেছেন: রিয়াজ উদ্দীন ((ব্লগ নেম) - মুক্তমনা ব্লগ

প্রেক্ষিত রুমানা-সাইদঃ নির্যাতনের ব্যাখ্যায় বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান-লিখেছেন: রিয়াজ উদ্দীন ((ব্লগ নেম) - মুক্তমনা ব্লগ
অপরাধের প্যাথলজি?

সামাজিক অপরাধকে প্যাথলজিকাল দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখার বিপদ হোলো এটার মাধ্যমে অপরাধকে প্রশ্রয় দেবার মত পরিস্থিতির তৈরি হয়। ফলে পপুলিস্ট প্রতিরোধের মূখে রাজনৈতিক শুদ্ধতার চর্চার প্রয়োজন এবং প্রবণতা দেখা দেয়। এতসব পর্দা পেরিয়ে দরকারি কথাটুকু অনেক সময় বলা হয়ে ওঠে না-- আবার বলা হলেও বার্তাটা ঢাকা পরে যায় পর্দার আড়ালে। কিন্তু জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে আচরনবাদি দৃষ্টিতে দেখার সক্ষমতা বেড়ে গেছে মানুষের। এই আচরনবাদি দৃষ্টিভঙ্গীগুলোকে কি প্রক্রিয়ায় সামাজিক রীতিনীতির অংশে পরিণত করা যাবে বা করা উচিৎ সেটা একটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু জ্ঞান--বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমাজজীবনের ঘটনা প্রবাহকে মূল্যায়নের চর্চা না থাকলে একই সমস্যাগুলোকে যুগের পর যুগ টিকিয়ে রাখাই হবে মাত্র, সামাজিক অপরাধগুলির ক্রমাগত পুরনরুৎপাদন হতে থাকবে ক্রমবর্ধমান হারে। তাই বিবর্তনের দৃষ্টিতে পারিবারিক নির্যাতনের মূল্যায়ন বিষয়ক পুরোনো এই লেখাটাকে আবার সামনে এনে ফেললাম। বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্য আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখছি।

লেখাটার ব্যকগ্রাউন্ড

লেখাটি যখন লিখেছিলাম রুমানা-সাইদের ঘটনাটি তখন ভিন্ন এক প্রেক্ষিতে চলছিল। সত্যাসত্য না জেনে কোনো পক্ষ নেয়াটা কঠিন ছিল — আজকেও সেটা খুব সহজ হয়ে যায়নি। তবু সাইদের মৃত্যুর ঘটনায় কিছুটা হলেও ঘটনার আঙ্গিক পাল্টেছে — হয়ত নির্মোহ ভঙ্গীতে যেকোন পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন আরেকটু বেশি করে আমাদের মনে আসতে পারে এই পরিস্থিতিতে। তাই লেখাটির পূর্ববর্তি সংস্করনে কিছুটা পরিমার্জন করে মুক্তমনায় দিচ্ছি। যখন লেখাটি লিখি সেদিন মুক্তমনায় দেইনি অভিজিৎ দা’র এই বিষয়ে অনেক বেশি সুলিখিত লেখা চলে আসে। অবশ্য সেই লেখাটি আগে চোখে পড়লে এই লেখাটা লেখাই হোতো না, অথবা যেটুকু পড়াশোনা করেছিলাম সেটাও করা হোতো না।

এইবারে মূল লেখাটাঃ

“সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়োনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা :
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে -- আরও দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়োনাকো আর। ”
(জীবনান্দ দাসের কবিতা আকাশলীনার অংশ)

সুরঞ্জনাকে “ঐ যুবকের” সাথে কথা বলতে বারন করেছিলেন জীবনানন্দ দাস — পুরুষ মনের চিরন্তন আকুতি এটা। মানব পুরুষের কাছে তার এই আকুতির আবেদনের অর্থ অগম্য নয় বোধগম্য কারনে, সঙ্গিবিহীন পুরুষও বোঝে “ঐ যুবকের” সাথে কথা বললে মনে কতটা চোট লাগে-- নারীর কাছেও পরুষের এই আকুতি অপরিচিত নয়। পুরুষসঙ্গির প্রতি নারীরও কাছাকাছি অনুভূতি থাকার কথা। নারি-পুরুষের আদিরূপের ধারাবাহিকতায় এইধরনের হিংসার অনুভুতি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোন মানুষকে হিংস্রও করে তুলতে পারে। যদি এমনটা ঘটে সেখানে কাব্যময় ব্যপারটা আর কাব্যময় থাকেনা। যেই অনুভূতিটা একটা পর্যায় পর্যন্ত “রোমান্টিক”, সেটা একটা সীমানা ছাড়িয়ে গেলে রীতিমত সমাজসুদ্ধ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে, মারমুখী করে তোলে। মনোবিজ্ঞানীরা এরকম সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। আর অধুনা এই চেষ্টার পালে লেগেছে বিবর্তনবাদি হাওয়া। মানবজাতির জ্ঞানের ভান্ডার এতে আরো সমৃদ্ধ হয়েছে বলতে বাঁধা নেই। সমাজবিজ্ঞানের শাখাগুলোর মধ্যে মোটাদাগে রয়েছে দু’টি প্রবল রিডাকশনিস্ট ভাবধারা। একভাগ মনে করেন সব কিছুই সামাজিক কাঠামোর দ্বারা নির্ধারিত হয় আবার বিপরিতে রয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনা যেখানে সমষ্টির চরিত্রকে ব্যক্তির চরিত্রের যোগফল হিসাবেই কেবল দেখা হয়। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের বিভাগটিও এই দুই এক্সট্রিমিটির যাতাকল থেকে মুক্ত নয়। সেই বিচারে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের প্রাক্সিস কিভাবে কাজ করবে সেটা নিয়ে জল আরো অনেকদিকেই গড়াবে অনুমান করা যায়।

মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টায় বিবর্তনবাদি ধারণার ব্যবহার খুব বেশি দিনের নয়। মানুষের সমাজে কেন চিড়িয়াখানা তৈরি হয়, প্রকৃতির কাছে যেতে কেন আমাদের মন কাতর হয়, কাঠামোবদ্ধ জীবন কেন ক্লান্ত করে আমাদের, সভ্যতার এত আরাম আয়েশের ভেতরে সময়ে সময়ে কেন আমাদের মন প্রতিবাদ করে হয়ে ওঠে — এসব পরিচিত ধারনাগুলিকে আমাদের ফেলে আসা জীবনের ধারাবাহিকতায় সহজেই স্থাপন করা যায়। বিশেষ করে ত্রিশ চল্লিশ লক্ষ বছরের অভ্যাস, কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবেই — যেখানে মানুষের জীন নাকি আবার স্বার্থপর। এছাড়া কাটিয়ে ওঠাটা যে জরুরী সেটাই বা বলা যায় কি করে? কেননা অভ্যাস গুলোতো তৈরিই হয়েছে টিকে থাকার প্রয়োজনে। অন্যদিকে সমাজের কাঠামোতেও হচ্ছে পরিবর্তন — জিনের বার্তার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সমাজের পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারছে কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন। একশ বছরে সমাজ যতটা পালটায় বিবর্তনের হিসাবে সেখানে একচুল অগ্রগতিও হয় না হয়ত। এটারও কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে। ফলে সমাজের পরিবর্তনের গতির সাথে দৌড়ে পেরে ওঠে না বিবর্তন। তবে জিনের স্বভাব আর তার প্রকাশভঙ্গী বোঝার চেষ্টাও থেমে নেই। অধুনা বিবর্তনবাদ থেকে তৈরি নানা ব্যখ্যা মনস্তাত্তিক গবেষনায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। মনস্তত্বের নানা বিষয় বস্তুর পাশাপাশি পারিবারিক নিরব নির্যাতনের ব্যখ্যাতেও এই দৃষ্টিভংগির প্রয়োগের দরুন পাওয়া গেছে কিছু কৌতুহল জাগানো ফলাফল।

পারিবারিক নির্যাতনের ব্যখ্যা খুঁজতে গিয়ে পুরুষকেন্দ্রিক সমাজে পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটা মাধ্যম হিসাবেই প্রধানত দেখা হয়েছে বিষয়টি — সেই আদলের ব্যখ্যাবিশ্লেষনই প্রচলিত মাধ্যমগুলিতে বেশি দেখা যায়। এর বিপরীতে বিবর্তনীয় ব্যখ্যাগুলো আসার পর প্রচলিত ধারনাগুলো আরো বাস্তব সম্মত এবং পরিমার্জিত করার সুযোগ তৈরি হয়। সেগুলো নিয়ে একাডেমিক পর্যায়ে নানা আলোচনার ধারা চলছে। সেটার একটা অংশ থেকে এখানে উপস্থাপন করব তাদের মূল প্রস্তাবনাগুলো — মোটাদাগে ইম্পিরিকাল পরীক্ষা নিরীক্ষা সেগুলোর পক্ষেই যাচ্ছে। অনেকের মতে এই নতুন ধারনাগুলোর ভবিষ্যতে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে সাহায্য করবে।

জৈব প্রতিক্রিয়াঃ হিংসার জ্বলন

ক্ষুধা-তৃষ্ণা-রাগ-ভয় মানুষের জন্য অত্যন্ত দরকারি প্রতিক্রিয়া। এর যেকোনটি ছাড়াই মানুষের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব-- বিবর্তনের হাত ধরেই এই প্রতিক্রিয়াগুলো মজ্জাগত ভাবে ঢুকে আছে মানুষের মধ্যে। একই রকমের অনুভূতি হিংসার জ্বলন — যেটা সংগীকে ঘিরে বাস্তব বা কাল্পনিক প্রতিযোগীর প্রতি তৈরি হয়। বিবর্তনবাদিরা বলছেন এই জ্বলনের ফলেই নারী-পুরুষের মধ্যে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় যেটা একই সাথে সাম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে এবং সঙ্গীকে সম্পর্ক ছেড়ে চলে যাবার পথে বা বিশ্বাস ভঙ্গের ক্ষেত্রে বাঁধা সৃষ্টি করে। যেহেতু নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আদিম মানুষ এই রকমের অনুভূতির মুখোমুখি হয়েছে — এখনকার মানুষের হিংসার জ্বলনের অনুভূতি অটুট আছে আগের মতই, যেভাবে আছে ক্ষুদা-তৃষ্ণা-ভয়-ক্ষোভের মত দরকারি অনুভুতি গুলো। আর এগুলোর ওপর ভিত্তি করে মানুষের সমাজে মোটাদাগে বহুগামীতাকে ঘৃনার চোখে দেখা হয় — এবং সম্পর্কের মধ্যে যুগলের ধারনা তৈরি হয়। সন্তানের যদি সনাক্তযোগ্য বামা-মা না থাকে তাহলে কিভাবে মানুষ টিকে থাকবে এই পৃথিবীতে — কে নিজের খেয়ে পরের বাচ্চা মানুষ করতে যাবে? ফলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের হাত ধরে আসা এই চিরন্তনতার জন্যেই জীবনান্দের “ঐ যুবকের” সাথে কথা না বলার আকুতি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার কাছে গভীর আবেদন রাখতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন এই আবেদনের ধরন নারী এবং পুরুষ ভেদে কিছুটা ভিন্ন। মানুষ হিসাবে টিকে থাকার প্রয়োজনে নিজের জীনকে পরবর্তি প্রজন্মে বাহনে নারী-পুরুষের ভূমিকার পার্থক্য থেকেই এই জ্বলুনির ধরনে গুনগত পার্থক্যটা তৈরি হয়।

নারীর হিংসার জ্বলনের ধরণ

সন্তান প্রতিপালনের মাধ্যমে জীনকে প্রজন্মান্তরে বাঁচিয়ে রাখার যে তাগিদ তাতে একজন নারীর উদ্বেগের প্রধান যায়গা হোল তার স্বামী যেন সেই নারীর সন্তানকে প্রতিপালনের পেছনেই একনিষ্ঠভাবে তার মনযোগ দেয়। অন্য নারীর গর্ভে যদি তার স্বামীর সন্তান হয়ও সেই সন্তান বা তার মায়ের প্রতি কোন আবেগীয় আকর্ষন যেন তার পুরুষসংগী অনুভব না করে সেটা নিশ্চিত করতে একজন নারী অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। ফলে তার পুরুষ সংগী যদি পরনারীতে আসক্ত থাকে সেটা যদি মূলত যৌন আকর্ষনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক এটাই নারীসঙ্গীটির কাম্য থাকে। পুরুষ সংগীটি যদি অন্য নারী গর্ভে সন্তান জন্ম দিয়েও তার প্রতি আবেগের টান বোধ না করে নারী সঙ্গী তাতে কিছুটা আস্বস্ত থাকে। ফলে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নারীদের ক্ষেত্রে প্রকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া আবেগিক বিশ্বাসভঙ্গের ব্যপারেই বেশি স্পর্শকাতর হয়ে থাকে।

পুরুষের হিংসার জ্বলন

পুরুষের উদ্বেগের ধরনটা আবার অন্যরকম। সে চায়না তার বাসায় কোন কোকিল এসে ডিম পেরে যাক আর সেটা থেকে বের হয়ে আসা ছানা তাকে নিজের ছানা মনে করে প্রতিপালন করতে হোক । ফলে নারিসঙ্গী যদি আবেগের দিক থেকে কোন পুরুষের প্রতি আসক্তও থাকে সেটাতে ততটা বিচলিত না হলেও যৌন সংসর্গের সম্ভাবনার ব্যপারে পুরুষেরা বেশি স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। কোকিল যেন ডিম পারার সুযোগ না পায় সে জন্য পুরুষসঙ্গীটি অনেক কৌশল নিয়ে থাকে যার একটা হচ্ছে নির্যাতন — মার খাবার ভয়ে সঙ্গী বিশ্বাস ভঙ্গ করতে সাহস করবে না। কোকিলাক্রান্ত হবার ব্যপারে তার ভয় অনেক রকম — কোকিল ছানা পালনের ঝুঁকিতো আছেই পাশাপাশি তার নারীসঙ্গীটির মনোযোগের ভাগও নিয়ে নিচ্ছে সেই কোকিল ছানা; আর অন্যরা যদি এটা সম্পর্কে জানতে পেরে যায় তাতে থেকে যাচ্ছে লোকলজ্জার ভয়। মানুষকে খাদ্যগ্রহনে প্রবৃত্ত করার জন্য ক্ষুদা নামের অনুভূতি তাকে খাদ্যের অনুসন্ধানে ব্রতি করে জীবন বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে — একইভাবে নিরাপদ নিশ্চিন্ত পিতৃত্বের তাড়না একজন পুরুষের মধ্যে মধ্যে হিংসার জ্বলন তৈরি করে তাকে মারমুখি হতে তাড়িত করে। পিতৃত্বজনিত নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে সঙ্গিনীর যৌনজীবন নিয়ন্ত্রনের উদ্দেশ্যে মারমুখি আচরনের প্রবনতা দেখা দেয় পুরুষ সঙ্গীটির মধ্যে। পুরুষদের আচরনের আরো কিছু দিক নিয়েও আলোচনা করেছেন বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা — যার কিছু এখানে বিবৃত করার চেষ্টা করব।

মারমুখি হবার আগে হিসাব নিকাশ!

পুরুষরা প্রকৃতিগতভাবে এমন ভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে করে সঙ্গিনীর যৌন বিশ্বাস ভঙ্গের সম্ভাবনা এবং ঝুকি নিরূপনে সে সবিশেষ পারঙ্গম। এর মধ্যে রয়েছে সঙ্গীনি যৌনতা ঘটিত বিশ্বাস ভঙ্গের মত সময় তার কাছ থেকে দূরে থাকল কিনা সেটার মূল্যায়ন করা, সঙ্গিনীকে পটিয়ে বিশ্বাসভঙ্গে বাধ্য করতে পারে এরকম অন্যপুরুষদের উপস্থিতি আঁচ করতে পারা, তার স্ত্রীর প্রজননঘটিত উৎপাদনশীলতা যাচাই করা অথবা সঙ্গিনীর দিক থেকে বিশ্বাস ভঙ্গ করার সম্ভাবনা কতটা প্রকট সেটার আঁচ করা ইত্যাদি। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই সব ব্যপারে পুরুষের মন অতিস্পর্শকাতর হতে পারে। মানে যদি তার আঁচ করার ক্ষেত্রে ভুল হয়, ভুলটা সে নিরাপদ এলাকায় থেকে করে। মানে “ফলস পজিটিভ” (False Positive) হতে পারে কিন্তু “ফলস নেগেটিভ” (False Negative) হবার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ সঙ্গিটি কোকিলের পাল্লায় পড়ে নি কিন্তু পুরুষটি ভাবছে পড়েছে — এমনটা হবার সম্ভাবনাই বেশি — তার বিপরীতের চেয়ে। তবে পুরুষটি মারমুখি হবে কিনা সেটা নির্ভর করে আরো কিছু নিয়ামকের ওপরও । সেগুলো সম্পর্কেও সে মনে মনে কিছুটা হিসাব করে নিয়ে তবে মারমুখি হয়। যেমন সামাজিকভাবে সঙ্গিনীকে পেটানো কতটা খারাপ চোখে দেখা হয়, সঙ্গিনীর অত্মীয়রা কতটা প্রতিশোধ পরায়ন হতে পারে, আর পুরুষটি তার সঙ্গিনীর ওপর আর্থিকভাবে কতটা নির্ভর করছে সেগুলোও নিয়ামক হিসাবে কাজ করে নির্যাতনের সম্ভাবনার নিরূপক হিসাবে। এছাড়া সঙ্গিনী কতটা বিশ্বাসযোগ্য সেটা যাচাই করতেও পুরুষরা কিছুটা পাহাড়াদারি কৌশল প্রয়োগ করে থাকে।

পাহারাদারি

সঙ্গিনী কখন কোথায় যাচ্ছে সেটার খোঁজখবর রাখা, সঙ্গিনী কি করছে যাচাই করতে হঠাৎ করে না বলে বাসায় ফিরে আসা, সম্ভব হলে অন্য পুরুষদের দৃষ্টির আড়ালে সঙ্গিনীকে লুকিয়ে রাখা। এই পাহাড়াদারি যে মূলত পিতৃত্বের নিরাপত্তার খাতিরে, সেটার প্রমান হিসাবে দেখা গেছে পুরুষেরা মুলত তখনই পাহারাদারি কড়া করে যখন তার সঙ্গিনীর প্রজনন সম্ভাবনা অথবা অন্য পুরুষের হাতে পরার ভয় বেশি থাকে। আপাত নির্ভেজাল রোমান্টিক একটা ভঙ্গিও মারমুখি অবস্থার পূর্বাভাস হতে পারে। যেমন পাহারাদারি তুঙ্গে থাকার সময়কালের পরেই সঙ্গিনীকে মারধর করার ঘটনা বেশি দেখা যায়। আবার যেসব পুরুষ সঙ্গি হঠাৎ না বলে বাড়িতে ফিরে এসেছে অথবা স্ত্রীকে বলছে “তোমাকে ছাড়া বাঁচবনা” (প্রেমিকদের কাছে ক্ষমা চাই!!) তাদের পক্ষে সঙ্গিনীর প্রতি মারমুখি হবার সম্ভাবনা বেশি। অপর দিকে যারা তার সঙ্গিনীকে ধরে রাখার জন্য নিজের ভালবাসা বা নিজের যোগ্যতার দোহাই দেয় তাদের ক্ষেত্র সঙ্গিনীর প্রতি নির্যাতনের সম্ভাবনা কম। এগুলোর পক্ষে নারী এবং পুরুষ সঙ্গিদের প্রশ্ন করে যে উত্তর পাওয়া গেছে তা এই ব্যাখ্যাগুলিকেই সমর্থন করে। এর বাইরেও আছে যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত আলোচনা।

দুইতত্ত্বের ঠোকাঠুকিঃ শুক্রানুর প্রতিযোগীতা

ঘনিষ্ট সঙ্গিনীর প্রতি যৌন নিপীড়ন, জবরদস্তি বা মেরিটাল রেপ নিয়ে প্রচলিত তত্ত্ব হচ্ছে — এটা কিছু কিছু পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যে প্রতিষ্ঠার একটা মাধ্যম — Dominance and Control hypothesis। এর এর বিপরীতে বিবর্তনবাদি তত্ত্ব হচ্ছে শুক্রানুর প্রতিযোগীতা তত্ত্ব বা Sperm Competition Hypothesis। এখানেও কোকিলাক্রান্ত হবার ভয়ে পিতৃত্ব ঘটিত অনিশ্চয়তা বোধ থেকে জবরদস্তি হয়। অর্থাৎ যখন পুরুষ সঙ্গী জবরদস্তি করে তখন তার মনে সঙ্গিনী সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গের সন্দেহ কাজ করে। কোকিল এসে ডিম পেরে গেছে বা যেতে পারে এই ভয়ে পুরুষটি মরিয়া হয়ে ওঠে তার নারী সঙ্গীর দেহে শুক্রানু প্রবেশ করিয়ে দিতে। তখন সঙ্গিনী বাঁধা দিলে পুরুষটির সন্দেহ আরো দানা বাঁধে এবং সে জবরদস্তি বাড়িয়ে দেয়। দেখা গেছে যখন পুরুষরা তার নারিসঙ্গীর ব্যপারে বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ করছে তার পরপরই জবরদস্তির ঘটনা ঘটছে বেশি। যুগল পর্যায়ে এই ধরনের জবরদস্তির ঘটনা যাচাইয়ের জন্য অন্য প্রানীদের আচরনও বিশ্লেষন করে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। যেহেতু বেশিরভাগ প্রানীর ক্ষেত্রেই এই যুগলের ধারনা নেই — ফলত যুগলের মধ্যে জবরদস্তির ব্যপারটি যাচাই করার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। তবে দেখা গেছে পাখিদের কিছু কিছু প্রজাতির মধ্যে সামাজিক একগামিতার বা Social Monogamy-এর প্রচলন আছে — মানে এরা যুগলবদ্ধ থাকে। কারন যুগল বদ্ধ না থাকলে এই তুলনার কোন অর্থ হয়না। তাদের ওপর পর্যবেক্ষন থেকে পাওয়া যায় চমকপ্রদ ফল। দেখা গেছে এইসব পাখিগুলোর ক্ষেত্রে মিলনের জবরদস্তির ঘটনা তখনই ঘটে যখন অন্য পুরুষকে আশে-পাশে বেশি দেখা যায়। অল্পসময়ের ব্যবধানে এক নারী একাধিক পুরুষের সাথে মিলিত হবার সম্ভাবনার যখন বেশি থাকে তখন পুরুষসঙ্গীটি চায় মিলনের পরে একাধিক পুরুষের শূক্রবীজের মধ্যে যেন অন্তত প্রতিযোগীতা হতে পারে; সেজন্যেই জবরদস্তির ঘটনা ঘটে। ইতিহাস বিশ্লেষনে দেখা গেছে মানুষের বিবর্তনীয় ধারাক্রমে একই নারীর ক্ষেত্রে কাছাকাছি সময়ে একাধিক পুরুষের সাথে মিলিত হবার ঘটনা অহরহ ঘটেছে যাতে একই নারীর প্রজনন অঙ্গে একাধারে একাধিক পুরুষের বীর্য বর্তমান ছিল। যুগল বদ্ধ কিছু পাখির ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিশ্বাস ভঙ্গের সময়ে নারীর প্রজনন অঙ্গে অন্যসময়ের চেয়ে বেশিবীর্য ঢেলে দেবার ক্ষমতাও দেখা যায়। হিংসার জ্বলনের সাথে এই ধরনের জবরদস্তির সম্পর্ক আছে বলে প্রমান মিলেছে। আর পুরুষ এবং নারিদের বক্তব্য থেকেও অবিশ্বাস এবং জবরদস্তির সময়কালের মিল পাওয়া গেছে — অর্থাৎ অবিশ্বাস থেকেই যে এধরনের জবরদস্তি হয় সেটার পক্ষে প্রমানের পাল্লা ভারী হয়েছে। তবে হিংসার জ্বলন থেকে নারীর ওপর আক্রমনের ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যেও রকম ফের দেখা গেছে। বিশেষ করে হীনমন্য পুরুষদের এই ধরনের অবস্থায় বেশি আক্রমনাত্মক হতে দেখা গেছে।

হীনমন্য পুরুষের বিশেষ ক্ষেত্র

সঙ্গির মধ্যে যেসব গুন থাকলে একজন নারী তাকে বেঁছে নিতে পারে সেগুলোর বিচারে যেই পুরুষ পিছিয়ে থাকে মানে Competitively Disadvantaged Male — তাদের আচরন ভালভাবে পর্যবেক্ষন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এদের পিছিয়ে থাকাও নানারকমের হতে পারে। যেমনঃ এরা হয়ত মেয়ে বন্ধুদের মন জয় করার কৌশল জানেনা কারন তাদের সামাজিক দক্ষতা কম; অথবা শারিরীকভাবে এরা তেমন আকর্ষনিয় নয় অথবা এদের অর্থিক সঙ্গতি কম। এরকম নানাকারনে “প্রেমের বাজারে” এদের কদর কম থাকে যেটার ব্যপারে এরা নিজেরাও মোটামুটি সচেতন। দেখা গেছে এধরেনের পুরুষেরা তাদের স্ত্রীদের ওপর জবরদস্তি বেশি করে থাকে। ইম্পিরিকাল গবেষনার ফল থেকে পাওয়া যায়, এই ধরনের ক্ষেত্রে নির্যাতনের হার নারী-পুরুষের মিলনের সাথে বিপরীতানুপাতিক, যুগলের সন্তানের সংখ্যার সাথে সমানুপাতিক। পুরুষটি পিছিয়ে থাকলেও যদি স্বামী-স্ত্রীর নিয়মিত দৈহিক মিলন ঘটে সেক্ষেত্রে নির্যাতনের হার কম হয়। হয়ত পুরুষটি নিরাপদ বোধ করে বলে। আবার যদি এই যুগলের সন্তানের সংখ্যা বেশি হয় তাহলে সঙ্গিনী ছেড়ে চলে যাওয়াটা বেশি ঝুকির। সেই ক্ষেত্রে পুরুষটি বেশি আগ্রাসী আচরন করে থাকে।

আগ্রাসী আচরনের সাথে বয়সের সম্পর্ক

আগ্রাসি আচরনের ধরন সম্পর্কে দু’টি বিকল্প তত্ত্ব ছিল। একটার বক্তব্য ছিল — সাধারনত কম বয়সের পুরুষেরাই বেশি আগ্রাসী হয় — কারন তাদের নিজেদের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রন কম। তবে এই ক্ষেত্রে বিবর্তন বাদি ব্যখ্যা হচ্ছে — যেকোন পুরুষই নারিদের প্রজনন ক্ষমতা যখন বেশি থাকে অর্থাৎ যুবা নারি সঙ্গীদের প্রতি বেশি স্পর্শকাতর হয়। অর্থাৎ পঞ্চাশ বছরের পুরুষও যদি বিশ বছর বয়সি নারির সঙ্গী হয় সেও নির্যাতন প্রবন আচরন করে। কারন মেয়েদের মনোপজ পেরিয়ে গেলে প্রজনন গত কারনে বিশ্বাসভঙ্গের ফলাফল বেশি ক্ষতিকর হয় না। যেহেতু নারি সঙ্গীটির প্রজনন ক্ষমতা ততদিনে প্রায় বা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় ফলে পুরুষ সঙ্গীটি তেমন একটা পাত্তা দেয়না আগের মত। যেহেতু যুবা বয়সের পুরুষদের নারী সঙ্গীরাও বয়সে যুবা সেই কারনে হয়ত প্রথম তত্ত্বটি এসে থাকতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে দু’টো তত্ত্বের পক্ষেই প্রমান পাওয়া গেছে। নিউইয়র্ক শহরের পুলিশের নির্যাতন সংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যানিকভাবে যাচাই করে যে ফল পাওয়া গেছে তার ফলাফল মোটামুটি এরকমঃ (ক) মেয়েদের বয়স বাড়ার সাথে পারিবারিক নির্যাতনে হার কমতে থাকে (খ) যুবা পুরুষদের নির্যাতক হবার সম্ভাবনা বেশি (গ) প্রজনন ক্ষম যুবা নারিসঙ্গীদের নির্যাতনের শিকার হবার সম্ভাবনা প্রজননে অক্ষম বয়স্কা নারীদের চেয়ে ১০ গুন বেশি (ঘ) প্রজননক্ষম বয়সের মেয়েদের বেশি নির্যাতনের শিকার হবার ক্ষেত্রে যুবা বয়সের দুর্বল আত্মনিয়ন্ত্রনক্ষম পুরুষের সঙ্গী হওয়া একমাত্র কারন নয়।

পরিশেষে

উপরের অনেক ক্ষেত্রেই আলোচনায় মনে হতে পারে পুরুষটি ইচ্ছা করে জেনে শুনে তার প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায় — কিন্তু বিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনায় একটা বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার যে আচরনগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় সহজাত — কারন লক্ষ লক্ষ বছরের অভ্যাসের দরুন মানুষের আচরনে এই ধরনের প্রতিক্রিয়াগুলো এমন ভাবে গেঁথে আছে যে একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এখনকার সমাজব্যবস্থায় সেটা প্রযোজ্য না হলেও সঙ্গি বা সঙ্গিনীর আচরনে হেরফের হয় না। যেমন আধুনিক সমাজে বিয়ের মাধ্যমে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা অনেকটা কমিয়ে আনা হয়েছে ফলে প্রাচীন সমাজের তুলনায় বহুগামীতার ভয় কম। আবার যেখানে পরকিয়ায় শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জন্মনিরোধক ব্যবহার করার সুযোগ থাকার দরুন পুরুষ সঙ্গিটির পক্ষে স্ত্রীর দিক থেকে বিশ্বাসভচঙ্গের ঘটনা ঘটলেও অন্যের সন্তান পালনের ঝুঁকি কম। কিন্তু তাতে কি, বিবর্তনিয় আচরনের ধারাবাহিকতায় কাল্পনিক শুক্রানুর প্রতিযোগীতার জন্য স্ত্রীর ওপর জবরদস্তি যৌন নির্যাতন চালাতে পারে আবার সন্দেহের বশবর্তি হয়ে স্ত্রীর ওপর শারিরীক নির্যাতনও চালাতে পারে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে