Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (48 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৫-২০১১

১৯৭১- আলিফজান বিবিকে খুঁজে পাওয়া-লিখেছেন: ৯য়ন (ব্লগ নেম) - আমারব্লগ

১৯৭১- আলিফজান বিবিকে খুঁজে পাওয়া-লিখেছেন: ৯য়ন (ব্লগ নেম) - আমারব্লগ

দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় যখন আলিফজান বিবির সঙ্গে দেখা হল, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। সারাদিনের ক্লান্তি আর মানুষের মিথ্যাচারে দিকভ্রান্ত হয়ে শেষমেশ দেখা মিলল বীরাঙ্গনার আলিফজান বিবির। ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা এখন বয়সে ভারে অনেকটাই ন্যুব্জ।

একাত্তরের পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিতা এ নারীর শরম ভাঙ্গার আগে তাকে লুকিয়ে রেখেছিল এ সমাজ।

উপজেলার চণ্ডিপুর গ্রামের খাতুনপাড়া বাড়িতে বসবাস করলেও ১২ ডিসেম্বর রাতে স্থাণীয় কাউন্সিলর মোসাহিদ মিঞা জানান, আলিফজান বিবি নামে কোনও বীরাঙ্গনা এ গ্রামে নেই।

অবশ্য আলিফজান বিবি বলেন, মোসাহিদ মিঞা তাকে চেনেন এবং গত ঈদেও তাকে একটি কাপড় সাহায্য করেছেন।
খাতুনপাড়ায় যাওয়ার রাস্তা ভালো নয়। দিরাই থেকে টমটম করে ঘাটে গিয়ে আবার নদীর পাড় ধরে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছাতে হয় আলিফজানের ঘরে।
গত ৮ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আউটরিচ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর রনজিৎ কুমার ‘শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং মানবাধিকার ও শান্তি সম্প্রীতির ভাবধারায় উদ্বুদ্ধকরণ প্রকল্প’র কথা জানান।
২০০৯ সালের মে মাসে সংকলিত সংগ্রাহক তালিকা ৬’ এ দেখলাম আলিফজান বিবি’র কথা। ২০০৯ সালে দিরাই উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের মোছা. রুনা বেগম নামে দশম শ্রেণীর একটি মেয়ে তার কথা উল্লেখ করেছে।

রনজিৎ কুমার থেকে রুনার যে মোবাইল নম্বর পাওয়া গেল তা বর্তমানে বন্ধ।

১২ ডিসেম্বর রাতে সুনামগঞ্জ পৌছেঁ দিরাই পৌরসভার কাউন্সিলর, চণ্ডিপুর গ্রামের কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু কেউ বলতে পারেন না আলিফজান বিবির কথা। দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যানকেও ফোন দেওয়া হলে তিনিও বলতে পারলেন না।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলরের কাছেও অজানা আলিফজান।
দিরাইয়ে চণ্ডিপুর গ্রামের কথা জিজ্ঞাসা করলে দুয়েকজন বললেন, এ নামে কোনও গ্রামই নেই। পরে জানলাম সে গ্রামের নাম এখন চান্দিপুর।
‘চণ্ডি’ হিন্দু নাম বলে এখন তা ‘চান্দি’ নামে পরিচিত। আবার গ্রামও নাকি পূর্ব-পশ্চিম দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে।
১৩ তারিখ খুব ভোরে উঠে রওনা দিলাম দিরাইয়ের উদ্দেশে। লোগুনায় করে প্রায় দু’ঘণ্টার পথ।
দিরাই উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার কাছে জানতে চাইলাম রুনা বেগমের কথা। বললেন রুনা পাশ করে বেরিয়ে গেছে, বর্তমানের কোনও খবর তারা জানেন না।
এ প্রকল্পটি ছিল আরও প্রায় তিন বছর আগের। সে সময় যিনি প্রধান শিক্ষক এবং দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন তারা দুজনেই এখন অবসরে গেছেন। দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক শোলেল চন্দ্র সাহার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও রুনার ব্যাপারে কোনও তথ্য দিতে পারলেন না।
স্কুলের আরবি শিক্ষক মাওলানা সাহেব অবশেষে রুনার পাশের বাড়ির ৭ম শ্রেণীর একটি মেয়ের থেকে খোঁজ নিয়ে জানালেন, পূর্ব চণ্ডিপুর গ্রামে রুনাদের বাড়ি। আক্তার হোসেনের বাড়ির উত্তর পার্শ্বের বাড়ি।
আলিফজান বিবি’র কথা তারা বলতে পারলেন না। উপস্থিত শিক্ষকরা মাথায় একটি শঙ্কা ঢুকিয়ে দিলেন, হয় তো রুনা অন্য কারও কাছ থেকে শুনে এ ঘটনা লিখেছে। রুনার বিয়েও হয়ে যেতে পারে। আবার আলিফজান নামে কেউ থাকলেও হয়তো মারা গেছেন।
স্কুল থেকে বেরিয়ে পূর্ব চণ্ডিপুর গ্রামে যাওয়ার জন্যে মোটর সাইকেলে উঠলাম। নানা ধরনের শঙ্কা’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঘাটে এসে মোটর সাইকেল ড্রাইভার জানালেন, বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে।
কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, আক্তার হোসেনের বাড়ি কোনটা। উত্তর, ‘সামনে’।
ঢাকায় এসে সিলেটবাসীর কাছে শুনলাম, ‘হাওর অঞ্চলের মানুষ যদি বলে সামনে, ধরে নিতে হবে, সেই সামনের অর্থ কয়েক কিলোমিটারও হতে পারে।’
তবে কেউই দিতে পারছিলেন না আলিফজান বিবির খোঁজ। শুধু মাত্র ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ আব্দুর রহমান জানালেন তিনি চিনেন।
তবে বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন তা বলতে পারেন না। বেশি কথা বাড়ালেন না বৃদ্ধ।
প্রায় দুই কিলোমিটার মাটির রাস্তায় হেঁটে রুনার ঘরের দেখা পেলাম। জরাজীর্ণ মাটির ঘর। হাঁক দিলে বেরিয়ে আসেন রুনার বড় ভাই।
জানালেন, রুনা এখন সিলেট শহরে বিএ পড়ছেন। তবে তিনি আলিফজান বিবির খোঁজ দিতে পারলেন।
বেঁচে আছেন আলিফ জান, রুনা কারও থেকে শুনে বা বানিয়ে কিছু লেখেননি। নিশ্চিত হলাম। এটা আলিফজানের এলাকা। এখানে সবাই তাকে চেনে, সবাই জানে তার ত্যাগের কথা।
নদীর পাড় ধরে ছোট্ট খুকির পেছন পেছন যেতে থাকলাম সামনে। বুঝতে পারলাম, এ এলাকায় হতদরিদ্রদেরই বাস।
দৈর্ঘ্যে খাতুনপাড়া অনেক বড় বাড়ি। ঢাকার বস্তিগুলোর মতোই ঘরের সঙ্গে ঘর লাগানো।
ব্রাকের একটি প্রাথমিক স্কুলও রয়েছে। তার দু’ঘর পরেই আলিফজান বিবির ঘর। মাটির ছোট্ট কুড়ে ঘর। উচ্চতায় আমার চাইতে ছোট সে ঘর। ঘরের সামনেই মাটির চুলা। অন্ধকারে ভেতরে কিছু দেখা যায় না।
পাশের ঘরের ছালেহা বিবি জানালেন, এখানকার সবার সঙ্গে আলিফজান বিভিন্ন পরিচয়ে মিশে আছে। ছোট ছেলে মেয়েরা সবাই তার নাতি নাতনী।
এক নাতনীর নিউমোনিয়া হয়েছে চারদিন হলো। দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। সেখানে খাবার পৌঁছে দিতে গেছেন তিনি।
কোন রাস্তা দিয়ে গিয়েছে জানতে চেয়ে হাঁটা দিলাম। এ পথ পুরোটাই নদীর পাড় দিয়ে। ঘাটে এসে বুঝলাম, হাসপাতালেই যেতে হবে।
হাসপাতালের ৩ নং ওয়ার্ড দেখা হলো আলিফজান বিবির সঙ্গে। অভাবের তাড়নায় শরম ভেঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন আলিফজান।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে