Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ , ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (53 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-০৩-২০১৩

বাংলাদেশের বর্তমান পর্যটন শিল্প

বাংলাদেশের বর্তমান পর্যটন শিল্প

কেউ যদি প্রশ্ন করে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বর্তমান অবস্থা  কী তাহলে আমি বলব বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেরিতে হলেও বর্তমানে সঠিক পথেই ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। অতীতের অসামঞ্জস্যতা দূরে করে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিরিখে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের সঠিক পথকে চিহ্নিত করা গেছে। আশা করা যায় দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বিখ্যাত পর্যটন গন্তব্যের মতোই একটি অনন্য গন্তব্যস্থলে পরিণত হবে। এর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইনি পরিকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো। বর্তমানে পর্যটন উন্নয়নে বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের জন্য  একটি আধুনিক এবং যুগোপযোগী পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

এটি ইতোমধ্যে গ্যাজেট  আকারে প্রকাশিত হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ সরকার ‘পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ পর্যটন এলাকা’ আইন-২০১০ প্রণয়ন করেছে।  যার বাস্তবায়ন কাজও শুরু হয়েছে। এ বছর পাবলিক-প্রাইভেট সেক্টরের যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দেশের সুষ্ঠু ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটন উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড গঠিত হয়েছে। আশা করা যায় এসকল কিছুই দেশের পর্যটন উন্নয়নের জন্য যৎসামান্য হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে এ শিল্পের সন্তোষজনক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে আরো দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে। ঢাকার অসহনীয় ট্র্যাফিক জ্যাম, অপর্যাপ্ত পর্যটন উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা, অপ্রতুল বিনোদন কেন্দ্র, অপেশাদারী জনবল, বাজেট , ওভারসিজ মার্কেটিং এর অনুপস্থিতি ইত্যাদি পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে অনেক পর্যটন দর্শনীয় স্থান এবং বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠছে। তবে এগুলো অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের জন্য তো বটেই, বিদেশি পর্যটকদের জন্যও যথেষ্ট নয়। আমরা চাই আরো গড়ে উঠুক। বাংলাদেশের পর্যটন প্রাইভেট সেক্টরের নেতৃত্বে গড়ে তোলার জন্য সরকার নতুন নীতিমালা অতিশয় গুরুত্ব দিয়েছে। যেখানে প্রাইভেট সেক্টর পর্যটন সুবিধাদি গড়ে তুলতে সাহস করছে না বা অনাগ্রহী, সরকার সেখানে পর্যটন অবকাঠামো ও সুবিধাদি গড়ে তুলবে। প্রাইভেট সেক্টর সেখানে গেলে সরকার ধীরে ধীরে তার বিনিয়োগ তুলে ফেলবে। প্রাইভেট সেক্টরকেও  সরকারের চাইতেও আকর্ষণীয় অবকাঠামো বা পর্যটন সুবিধাদি গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে । এক্ষেত্রে সরকারের সকল ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: নীল পাহাড়ের দেশে: ঝর্নাটিলা

আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কিছু সমস্যা এখনো বিরাজ করছে এবং সমস্যাগুলো উত্তরণের ব্যাপারে আমাদের আরো মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের সমস্যা অতীতে যা ছিল তা সরকার বেশ কিছু চিহ্নিত করে সমাধান করার চেষ্টা করছে। আর্থ-সামাজিক কাঠামোর নিরিখেই যে কোনো শিল্পের উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হয়। অতি উচ্চাবিলাসী পদক্ষেপ এবং অবাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্ত আমাদের গ্রহণ করা কখনোই ঠিক হবে না। অতীতে এ সেক্টরের দিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই কম ছিল। প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগও তেমন ছিলো না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও  সংস্থার মধ্যে পর্যটন উন্নয়নের তেমন ছিলো না। বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ সংকট ছিলো, এখনো কিছুটা রয়েছে।

এ শিল্পে এখনো বিদেশি বিনিয়োগ আশানুরূপ ঘটেনি। দক্ষ মানব সম্পদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের শক্ত ভিত এখনো গড়ে ওঠেনি। আমাদের এ সকল বিরাজমান সমস্যাগুলো দূর করে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। তাছাড়া টেকসই পর্যটন উন্নয়নের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তাই করা দরকার। রাতারাতি পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন করতে গেলে অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য রক্ষাও আমাদের করতে হবে পর্যটন শিল্পের জন্য। এ জন্য সুপরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্পের উন্নয়নই সকলের কাম্য।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এ শিল্পে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশ পর্যটন শিল্পকে দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমরাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র বিমোচনের জন্য এটিকে সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত করতে পারি। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোও পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন বিষয়টি তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর উন্নয়নের জন্য সকলের সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে।

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোকে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে কিছু কার্যকরী উদ্যোগ নিয়েছে। পর্যটকদের বিমানবন্দর স্থলবন্দরে ভিসা অন-এরাইভালসহ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সহজীকরণের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাছাড়া অন-লাইন পর্যটন প্রচারণা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন পৃথকভাবে দুটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন দুটি ওয়েবসাইট করেছে।

বাংলাদেশে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিষয়ে একটু বলা দরকার। অনেকে মনে করেন বিদেশি পর্যটক এখানে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কিন্তু  বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকদের উপর হামলা হয়েছে এরকম ঘটনা নাই। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আমাদের পর্যটন আকর্ষণীয় এলাকার লোকজন এখন অনেক সচেতন হয়েছে। তারা বুঝতে পারছে পর্যটক না এলে উপার্জন হবে না, পর্যটন আকর্ষণ না টিকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। তাই তারা নিজেরাই পর্যটকদের সেবা দিচ্ছে এবং তাদের নিরাপত্তা দেবার ব্যাপারে সোচ্চার। পাহাড়পুর, কান্তজীর মন্দির ও সুন্দরবন ভ্রমণ করলে এর বাস্তব চিত্র দেখা যাবে। বিশ্বের অনেক দেশে পর্যটকদের উপর জঙ্গি হামলা হচ্ছে, সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে, পর্যটকবাহী গাড়ি ছিনতাই করা হচ্ছে। কিছুদিন পূর্বে হংকং, ফিলিপাইনে যে ঘটনা হলো তা সর্বজনবিদিত। কিন্তু বাংলাদেশে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। এ ব্যাপারে সকলের যথেষ্ট সতর্ক থাকা দরকার। সরকার ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠন করেছে যারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে এর পরিধি আরো বাড়বে।

পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অনেকগুলো পরিকল্পনা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন খাগড়াছড়ির আলুটিলায়, রাঙামাটির কাপ্তাই লেক, বান্দরবানের বগা লেক ইত্যাদি এলাকায় পর্যটন সুবিধাদি গড়ে তোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাঙামাটিতে আরো একটি মোটেল নির্মাণ এর কাজ শুরু হয়েছে। কুয়াকাটায় ওয়াচ টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু সেতুর কাছে পর্যটন সুবিধাদি, ভৈরব সেতুর কাছে পর্যটন অবকাঠামো, ভোলার মনপুরায় পর্যটন সুবিধাদি তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া, সেন্টামার্টিন ও সন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশ বান্ধব পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সারা বাংলাদেশের এ পর্যন্ত ৭৮০টি পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসকল এলাকাগুলো প্রত্যেকটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পর্যটন সুবিধাদি গড়ে তোলা হবে। নেত্রকোণার হাওড়গুলোকে কেন্দ্র করে পর্যটন সুবিধাদি এবং ওখানকার আদিবাসী সম্প্রদায় গারো এবং হাজংদের সহযোগিতায় এথ্‌নিক ভিলেজ স্থাপন করা হবে। এছাড়া আগামি ২০২১ সালকে লক্ষ  রেখে একটি সমবায়বদ্ধ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সারা বাংলাদেশে পর্যটন অবকাঠামো তৈরির কাজ আরম্ভ করা হবে।

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪ লাখ লোক জড়িত। দেশে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট বাস্তবায়ন করলে এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ স্থানসমূহের যেমন-কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুয়াকাটাসহ প্রত্নতাত্ত্ব্বিক সমৃদ্ধ জেলাসমূহে বহুলসংখ্যক লোক এ শিল্পের সাথে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিভিন্ন জেলায় পর্যটন কর্মকান্ডের বৃদ্ধির ফলে হস্তশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম, মৎস্য খামারসহ নানা ধরনের শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারমূলক কাজের সাথেও অনেক লোক জড়িত।

পর্যটনের বেনিফিট সমাজের  নিম্নস্তরে পৌঁছে দিয়ে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (গউএ) অর্জনের জন্য বাংলাদেশে পর্যটন একটি অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। সুতরাং এ শিল্পের উন্নয়নে আমাদের মনোনিবেশ করা জরুরি। পর্যটন উন্নয়নে সরকার ও ব্যক্তিখাতসহ সকল সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

 

পর্যটন

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে