Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২০ , ২৬ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২২-২০২০

করোনাভাইরাস নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা

আবদুল গাফফার চৌধুরী


করোনাভাইরাস নিয়ে রাজনীতি ও ব্যবসা

করোনা আতঙ্কে সারাদেশ কাঁপছে। সারাবিশ্ব কাঁপছে। এ সময় রাজনীতির কথা কারও মাথাতেই আসছে না। কিন্তু যাদের মাথায় আসার কথা, তাদের মাথায় ঠিকই আসছে। করোনাভাইরাসকেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাদের স্নায়ুযুদ্ধে ব্যবহার করতে চান। চীনের সঙ্গে ট্রেড ওয়ারে পেরে না উঠে এখন তিনি করোনাভাইরাসকে স্নায়ুযুদ্ধে ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে হয়তো বিশ্বব্যাপী ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে আগ্রহী। মানবতার এই মহাবিপদের মুহূর্তে যখন বিশ্বের সকল মানুষের সকল ভেদাভেদ ভুলে এই মহাদানবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করা দরকার, তখন ট্রাম্প চাচ্ছেন, এই লড়াইকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে করোনাভাইরাসের নাম দিয়েছেন চীনা ভাইরাস। অপর একটি নাম দিয়েছেন কংফ্লু, সাংবাদিকরা বারবার তাকে বলেছেন, সারাবিশ্বে এই ভাইরাসের সংক্রমণ চলছে। আপনি এটাকে চীনের লেবেল লাগাচ্ছেন কেন? ট্রাম্প তবু বলছেন, এটাকে আমি চীনা ভাইরাস বলবই। ট্রাম্পের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলার সাহস অথবা ইচ্ছা কোনো সাংবাদিকের কেন হলো না যে, আমরা কি তাহলে এটাকে আমেরিকান ভাইরাস নাম দেব? কারণ এই ভাইরাস বেছে বেছে আমেরিকার দুই বড় শত্রু চীন এবং ইরানের ওপর বড় হামলা চালিয়েছে।

ভারতেও চলছে করোনাভাইরাস নিয়ে রাজনীতি। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একহাত নিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে কংগ্রেস ভারতের রাজনীতিতে করোনাভাইরাসকে একটা ইস্যু করতে চাইলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। কমিউনিস্ট উত্তর কোরিয়াকে বিপাকে ফেলার জন্য পশ্চিমা প্রোপ্রাগান্ডা-শিবির থেকেই হয়তো ফেসবুকে এই গুজবটা ছড়ানো হচ্ছে যে, উত্তর কোরিয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অনেক রোগীকে গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছে। এই গুজব শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হয়নি।

বাংলাদেশে একশ্রেণির মোল্লা ও হাতুড়ে ডাক্তারের জন্য করোনাভাইরাস বিনা মূলধনে ব্যবসা করার অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাদের অনেকেই স্বপ্নে দৈব অনুগ্রহে করোনার অব্যর্থ ওষুধ পেয়েছেন। হাতুড়ে ডাক্তাররা ভাইরাস দূর করার বনৌষধটি আবিস্কার করেছেন। আর এই তুকতাক ও ওষুধের বিজ্ঞাপনে ফেসবুক ভরপুর। বাংলাদেশের এক মোল্লা তো দাবি করেছেন, ইতালিতে এক বাংলাদেশিকে করোনাভাইরাস স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে এত বেশি ওয়াজ মাহফিল হয় যে, এ জন্য এ দেশে করোনার অ্যাটাক হবে না। যদি কারও হয়, বুঝতে হবে সে আল্লাহ ও রসুলের (সা.) বিরোধী।

এই প্রচারণাটি খুবই বিপজ্জনক। এই মোল্লার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়নি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। ওই মোল্লা সাহেবের কথা অনুযায়ী এই আক্রান্ত সকলেই কি আল্লাহ ও রসুলের বিরোধী? ট্রাম্প যেমন করোনা নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে লোক খেপাতে চাইছেন, বাংলাদেশের একশ্রেণির মোল্লা তেমনি করোনা রোগ নিয়ে ব্যবসা এবং এই রোগাক্রান্তদের বিরুদ্ধে মানুষের মন বিষাক্ত করতে চাইছেন।

তাদের ভবিষ্যদ্বাণী যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি লোক খেপানোর চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। তবু এদের প্রচারণা ও অসাধু ব্যবসা বন্ধ করার জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এই ভয়াবহ ব্যাধির সংক্রমণ বন্ধ করার জন্য ইউরোপের চার্চে প্রেয়ার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সরকার জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পর্যন্ত কাটছাঁট করেছে। এই অবস্থায় এক শ্রেণির মোল্লার তাবিজ ও হাতুড়ে চিকিৎসার সুবিধার জন্য ওয়াজ মাহফিলের নাম ভাঙিয়ে গণসমাবেশও সরকারের উচিত অবশ্যই বন্ধ করা।

আমার ধারণা, করোনাভাইরাসকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন তার চীনবিরোধী রাজনীতিতে ব্যবহার করতে চান, বাংলাদেশে তেমনি একশ্রেণির জামায়াতি মোল্লা এই ভাইরাসকে তাদের সরকারবিরোধী রাজনীতিতে ধর্মপ্রচারের আবরণে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। মুফতি কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম নামে এক ব্যক্তির তথাকথিত ওয়াজে ফেসবুক ভরপুর। মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায় আগে তিনি এক 'ওয়াজ মাহফিলে' বলেছেন, 'দেশে এক বিদেশিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একে আনার ব্যাপারে শেখ হাসিনা যদি আলেম ওলেমা মাশায়েখদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে ভালো করবেন।'

এই বক্তার 'ওয়াজের' ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর অন্যান্য নেতার সঙ্গে ১৭ মার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং মোদিও জানিয়েছেন তিনি আসবেন। বিএনপি অপ্রকাশ্যে এবং জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক দলগুলো প্রকাশ্যেই এই আমন্ত্রণের বিরোধিতা শুরু করেছিল। দিল্লির সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে এই প্রচারণা শুরু করা হয়। দিল্লির নির্যাতিত মুসলমানদের রক্ষা করা নয়, উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক নষ্ট করা এবং বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করা। মুফতি ইব্রাহিম একটু নরম ভাষায় জামায়াতিদের এই দাবিটিই তার 'ওয়াজে' ঢুকিয়েছেন। মানুষকে ভয় দেখাতে চেয়েছেন। মোদি ঢাকায় এলে করোনাভাইরাসও আসবে।

করোনাভাইরাস কভিড-১৯-এর মহামারির মতো বিপর্যয় মানবসভ্যতার ইতিহাসে খুব কম। এ সময় মানবতাকে রক্ষার জন্য যখন সকল দেশের সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তখন এই বিপর্যয়কে ট্রাম্পের স্নায়ুযুদ্ধে ব্যবহার কিংবা কোনো দেশে ধর্মকে পুঁজি করে একশ্রেণির মানুষের বিনা মূলধনে মোটা মুনাফায় ব্যবসা করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের উচিত, এদের কার্যকলাপ ও তথাকথিত 'ওয়াজ' সম্পর্কে সতর্ক থাকা।

ঢাকার কাগজের সাম্প্রতিক খবর থেকেই অনুমিত হচ্ছিল, মোদির ঢাকা সফরের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দল এটাকে সরকারবিরোধী রাজনীতির একটা ইস্যু করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। দিল্লিতে বিজেপিসহ গেরুয়াধারী দলগুলো যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল, ভারতের বুদ্ধিজীবীসহ গণতান্ত্রিক মানুষ তার তীব্র নিন্দা করেছে। এর প্রতিকার নিজ দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নয়। বরং ভারতের জনগণের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা জোরদার করা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এ দেশে আসতে বাধা না দিয়ে তাকে সম্মানের সঙ্গে আসতে দিয়ে তার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা।

কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তা করেনি। তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে 'জল্লাদ, বর্বর, মুসলমান নিধনের হোতা' ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তাকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করার জন্য হাসিনা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে। হাসিনা সরকার মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নয়; নেপাল, ভুটানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট নেতা সীতারাম ইয়েচুয়িকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ বাতিল করা হলে তাতে ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নয়, গোটা ভারতকেই অপমান জানানো হতো। তাতে দু'দেশের সম্পর্কের অবনতি হতো মারাত্মকভাবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি এটাই চাচ্ছিল। দিল্লির মুসলমানদের জন্য দরদ প্রকাশের আড়ালে এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানো। এই উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য তারা দাবিটা মাত্র তুলতে শুরু করেছিল। যদি দেখত তারা জনমতকে প্রভাবিত করতে পেয়েছে, তাহলে এটাকে ইস্যু করে আন্দোলন শুরু করার চেষ্টা চালাত এবং মোদি ঢাকায় এলে তার প্রতিবাদে মিটিং-মিছিলও করা হতো। কিন্তু তাদের এই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে গেছে করোনাভাইরাস বিপজ্জনকভাবে বিস্তারের দরুন মোদি নিজেই তার ঢাকা সফর বাতিল করে দেওয়ায়।

নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় না এলেও ১৭ মার্চের অনুষ্ঠানে ইন্টারনেটের সাহায্যে তার উপস্থিতি ও ভাষণ দান (আরও কয়েকজন বিদেশি অতিথিসহ) বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। নরেন্দ্র মোদিকে এবং তার সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে আমি পছন্দ করি না। কিন্তু ১৭ মার্চে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার বক্তব্য এবং বঙ্গবন্ধুকে যে ভাষায় তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, তা আমার ভালো লেগেছে।

ভারতের বিজেপি এবং বাংলাদেশের বিএনপি প্রায় একই ধরনের সাম্প্রদায়িক দল হলেও এই দুই দলের মধ্যে একটি বিশাল পার্থক্য লক্ষণীয়। বিজেপি ভারতে সন্ত্রাসের পথে ক্ষমতায় আসতে চায়নি। গণতান্ত্রিক পথে আসতে চায় এবং এসেছে। তারা মহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতা বলে স্বীকার করে এবং সম্মান জানায়। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত বদলানোর চেষ্টা করে না। এবারও গান্ধীজয়ন্তীতে মৌন পদযাত্রা ও চরকায় সুতা কাটাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বিজেপি ও বিজেপি সরকার পালন করেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে সম্মানদানে বিএনপির অসম্মতি জাতীয় সম্প্রীতি, জাতীয় পতাকা বদলানোর অপচেষ্টা, স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াস এই দলটিকে শুধু সাম্প্রদায়িক দল নয়, দেশের স্বার্থবিরোধী এবং স্বাধীনতার শত্রু একটি দল হিসেবে চিহ্নিত করে।

লন্ডন, ২০ মার্চ শুক্রবার, ২০২০।

এম এন  / ২২ মার্চ

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে