Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০ , ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২০-২০২০

আমি বাঙালি আমি মুসলমান : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

তানজিল আমির


আমি বাঙালি আমি মুসলমান : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন উদার চেতনার অধিকারী একজন খাঁটি ইমানদার। পারিবারিকভাবেই ইসলামিক চেতনা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। ইসলামের মহানুভবতা ও উদারতার আদর্শ আজীবন লালন করেছেন বাঙালির এ মহানায়ক।

বঙ্গবন্ধুর গোটা জীবন বড় বিচিত্র, বর্ণাঢ্য আর কীর্তিতে ভরা। তার জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি অনেক রচনা সম্ভারও তৈরি হয়েছে। ইসলামের প্রচার-প্রসারে বঙ্গবন্ধুর গৃহীত বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকরী নানা ব্যবস্থা নিয়েও অনেক লেখা রয়েছে।

উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরীর (রহ.) ছেলে ও দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম মাওলানা রুহুল আমীন বলেন, বঙ্গবন্ধু জীবনভর যে মুক্তির সংগ্রাম করেছেন, সে লড়াইয়ে ইসলামের চেতনাবোধ সব সবময় তাকে আলোড়িত করত। ৭ মার্চের ভাষণে দৃঢ়প্রত্যয়ীভাবে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, সেই ‘ইনশাআল্লাহ’ থেকেই বাঙালি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা পেয়েছিল।

লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু যখন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন, একই মাঠে তার মুখে শোনা গেল বাঙালির জাতিসত্তার পরিচয়। আবেগাপ্লুত বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। একবার মরে, দুইবার মরে না’।

মাওলানা রুহুল আমীন বলেন, স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রথম ভাষণেই বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কারণ আবহমানকাল থেকে বাঙালি ধর্মগতভাবে মুসলিম, আর বাঙালির জাতিগত স্বাধিকার অর্জিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

তাই জাতিগতভাবে বাঙালি হলেও ধর্মীয় পরিচয়ে আমরা মুসলিম। এ দুটির মধ্যে যে কোনো বিভাজন নেই, তা বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন।

ছদর সাহেব হুজুরকে বঙ্গবন্ধু সবসময় ভক্তি করতেন বিষয়টি আমরা তার রচনাতেই জানতে পেরেছি। মাওলানা রুহুল আমীন জানালেন আরেকটি অজানা ইতিহাসের কথা। বঙ্গবন্ধু নিয়মিত পরিধান করার কারণে তার অনুরাগীদের মধ্যেও ‘মুজিব কোট’ নামে যে পোশাকটি জনপ্রিয় হয়েছে, সেটি বঙ্গবন্ধুকে প্রথম হাদিয়া দিয়েছিলেন আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)।

মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, আমি সরাসরি না দেখলেও আমাদের এলাকার এত মানুষ থেকে বিষয়টি জেনেছি যে, তা অনেকটাই প্রসিদ্ধ ঘটনা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন উদার চেতনার অধিকারী একজন খাঁটি ইমানদার মুসলমান। আমরা এ কথা দাবি করছি না যে, তিনি বাংলাদেশে কোরআন-হাদিসের আলোকে ইসলামী হুকুমত কায়েম করেছেন। বরং তার সমসাময়িক মুসলিম নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রকৃত ইসলামের অনুসারী।

বিশেষত ইসলামের দোহাই দিয়ে হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল, সে রাষ্ট্রটির গদিলোভী নেতাদের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে তিনি যে মানবতার বিজয় পতাকা উড়িয়েছেন সেটিই তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে পৃথিবীর মুসলিম নেতাদের ইতিহাসে।

১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় ফরিদপুরে এক জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখেছিলেন কিশোর গোলাম মাওলা। সে সময় বাংলার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য পীরে কামেল গোলাম মাওলা নকশবন্দী বলেন, বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির নায়ক। তার হাত ধরে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তিনি বাঙালির জাতিগত পরিচয় বিবেচনায় রেখে রাজনীতি করতেন।

পাকিস্তানি শাষকদের জুলুমের কারণে বঙ্গবন্ধু সরাসরি ইসলামের নামে রাজনীতি করেননি। কারণ পাকিস্তানিরা ইসলামের নাম ভাঙিয়ে তাদের স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি করত। বঙ্গবন্ধু এ মোনাফেকির বিরোধিতা করতেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে দেয়া তার বেতার ভাষণে ইসলাম সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য, লেবেলসর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হজরত রাসূলে করিম (সা.)-এর ইসলাম। যে ইসলাম জগদ্বাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে।’

গোলাম মাওলা নকশবন্দী বলেন, বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ চাই। সমাজে মানুষ হিসেবে সবার মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। কারও বাড়িতে খাবারের অপচয় হতে থাকবে আবার অনেকে বেঁচে থাকার মতোও খাবার পাবে না, সেটা হতে পারে না।

ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারেও বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব ব্যাখ্যা ছিল। তিনি বলতেন, ইউরোপীয়রা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যা বলতে চায় সেটা আমি মানি না। আমি বুঝি, রাষ্ট্র কোনো ধর্মের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। সবার সমান ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। যে যার মতো নিজের ধর্ম পালন করবে।

একাত্তরে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কাজ করেছেন মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী ও তার ছোট ভাই মাওলানা উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী। বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন এ দুই ভাই। ৬২-৬৩ সালের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদীর হাতে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেডিও-টেলিভিশনে কোরআন তিলাওয়াতও চালু করেছিলেন তিনি।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে মাওলানা আবদুল্লাহ বলেন, ৭২-এর পর স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষা বাঁচিয়ে রাখা খুবই জটিল হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মাদ্রাসা শিক্ষার অনুমোদন, অনুদানের ব্যবস্থা করলাম। আমার হাত ধরেই রেডিও-টিভিতে এলো কোরআন তিলাওয়াত।

ঘটনাটা ঘটেছে এভাবে- বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ জানালাম, বাংলাদেশ সিরাত মজলিশের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য। তিনি তা গ্রহণ করলেন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে আবার বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। বললাম, আপনি পাঞ্জাবির সঙ্গে টুপি পরে অনুষ্ঠানে যাবেন। সেখানে কোরআন তিলাওয়াত হবে। সরাসরি রেডিও-টিভিতে তা প্রচার হবে। হঠাৎ করে কোরআন তিলাওয়াত শুনে দর্শক-শ্রোতা অবাক হয়ে যাবে।

বরং তার আগে একটা কাজ করা যেতে পারে। আজ থেকে রেডিও-টিভিতে কোরআন তিলাওয়াত চালু করে দিন। সবকিছু তখন স্বাভাবিক মনে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তথ্যমন্ত্রীকে ফোন দিয়ে এ আদেশ দিয়ে দিলেন।

একইভাবে আরেকদিন বললাম, আরববিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য দরকার আরবি অনুষ্ঠান। রেডিওতে আরবি অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই থেকে বঙ্গবন্ধুর আদেশে সংযোজন করা হল আরবি অনুষ্ঠান।

বাংলাদেশকে সব ধর্মের সব মানুষের জন্য শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সদা সচেষ্ট। তার স্বল্পকালীন শাসনামলে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণার্থে গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ভৌত অবকাঠামোগত পদক্ষেপ যেমন ছিল, তেমনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধের বিষয়াদি বিবেচনায় রেখে তিনি ইসলামের প্রচার-প্রসারে গ্রহণ করেছিলেন বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকরী নানা ব্যবস্থা।

তিনি যেমন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মহান স্থপতি, তেমনি বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের স্থপতিও তিনিই। এ দুটি অনন্য সাধারণ অনুষঙ্গ বঙ্গবন্ধুর জীবনকে দান করেছে উজ্জ্বল মহিমা।

সে ধারাবাহিকতায় ইসলামের খেদমতে তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও যুগান্তকারী নানা অবদান রেখেছেন।

মাওলানা রুহুল আমিন বলেন, কওমি মাদ্রাসার সনদসহ নানা ইস্যুতে বঙ্গবন্ধুকন্যার কার্যক্রম আমি কাছ থেকে দেখেছি। এসব বিষয়ে তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন এবং কারও কোনো কথার পরোয়া করেন না।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে মহান আল্লাহর দরবারে আমরা তার মাগফিরাত কামনা করছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আল্লাহ তার কন্যাকে সহযোগিতা করুক, পরম করুণাময়ের কাছে এই আমাদের আর্জি।

লেখক : তরুণ আলেম ও গণমাধ্যমকর্মী

আর/০৮:১৪/২০ মার্চ

ইসলাম

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে