Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ , ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (42 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৪-২০১১

কোটি প্রাণের অশ্রুজলে মুছে যাক রাজ্জাক ভাইয়ের কষ্ট-অভিমান

পীর হাবিবুর রহমান


কোটি প্রাণের অশ্রুজলে মুছে যাক রাজ্জাক ভাইয়ের কষ্ট-অভিমান
সারাজীবন তুমি মানুষের জন্য, দেশের জন্য তোমার জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে কী অন্তহীন বেদনা, বুকভরা অভিমান আর ক্রন্দন নিয়ে তুমি একা একাই চলে গেলে! তুমি যাবে, তুমি শেষ পর্যন্ত চলেই যাবে এমন আভাস দেশবাসী পেয়েছিল। কিন্তু তোমার প্রিয় দেশের মাটি ও মানুষ থেকে এত দূরে নিয়তির সঙ্গে লড়াই করে এভাবে চলে যাও কেউ চায়নি। কী গভীর ভালোবাসাই না বেসেছিলে তুমি তোমার দেশ, দেশের মানুষ ও দলের লাখ লাখ কর্মীকে। কথায় ও কাজে, চিন্তা ও বিশ্বাসে অবিচল ছিলে তুমি। আদর্শবান কর্মী গড়ার কারিগরই নয়, বাঙালি জাতির মহান নেতা শেখ মুজিব ও তার আদর্শের প্রতি ছিলে আমৃত্যু বিশ্বস্ত। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির জন্য, দেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য, সুমহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে একজন অসাম্প্রদায়িক চিরসংগ্রামী মানুষ হিসেবে তোমার কর্মই তোমাকে আজ অমরত্ব দেবে। তুমি চলে গিয়ে হয়তো বেঁচেই গেছ। রাজনীতির মুকুটহীন সম্রাট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদরের ধন বলেই বাংলাদেশ তোমাকে চিনেছিল। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের দুই-দুইবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক তুমি ছিলে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রাণ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দলের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করার পক্ষে ছিলেন মাঠকর্মীরা। ষাটের দশকের ছাত্রলীগের রাজনীতির 'রাজ্জাক-তোফায়েল' জুটির রাজ্জাককে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের জন্য তৈরি করেছিলেন। তাই তো তোফায়েলকে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত করলেও রাজ্জাকের ওপর তিনি এই উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ নামের দলটি তার অতি প্রিয় অনন্য সাধারণ সংগঠক আবদুর রাজ্জাকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কাউন্সিলরদের চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু নিজে দলের সভাপতি হননি। কামরুজ্জামানকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করেন। সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেন আবদুর রাজ্জাকের কাঁধে। মিষ্টভাষী কর্মিবান্ধব আবদুর রাজ্জাক কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দলের নেতা-কর্মী ও মানুষের হৃদয় জয় করে উঠেছিলেন। '৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের ওপর বিভীষিকা নেমে আসে। আবদুর রাজ্জাককে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার সময় শেখ মুজিবের মানসপুত্র রাজ্জাককেও খোঁজা হয়েছিল। ঢাকার বাইরের কারাগারে থাকায় সেই অভিশপ্ত রাতে প্রাণে রক্ষা পান রাজ্জাক। কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় নিরলস পরিশ্রম দিয়ে সেনাশাসক জিয়ার কঠোর দমননীতির মুখে দলকে শক্তিশালী করেছিলেন। আদর্শবান রাজনৈতিক কর্মীদের ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত করে আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি হয়ে আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছিলেন। আবদুর রাজ্জাক রাজনীতির মেঠোপথে এই দেশের তারুণ্যকে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো পেছনে নিয়ে ছুটেছিলেন মহান মুজিবের আদর্শের উত্তরাধীকারিত্বের তরীতে উঠিয়ে। পিতাহারা সন্তানদের চোখে সে দিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের যোগ্য উত্তরাধীকারিত্ব নিয়ে মাথা তুলে রক্তাক্ত বাংলাদেশে রাজ্জাক হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যমণি। দলের দুই-দুইবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রাজ্জাক। '৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে সুনামগঞ্জ স্টেডিয়ামে জনসভা মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর অবয়বে দাঁড়ানো রাজ্জাকই ছিলেন উদ্বেলিত জনতার ঐক্যের প্রতীক। তখন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রইছ ও সাধারণ সম্পাদক আবদুজ জহুর। ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি বড়ভাই মতিউর রহমান পীর। স্কুলজীবনের শেষপর্বে হলেও আমরা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ পরিবারের সন্তানরা তখন সংগঠনের ডাকে আসতাম। রেস্ট হাউসে মতিউর রহমান পীরের ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিলে, আবদুর রাজ্জাক যখন গভীর মমতায় পিঠে হাত রেখে বললেন, ভালো আছিস? কি যে ভালো লেগেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের এই অসাধারণ নায়কের স্পর্শ কখনো ভুলতে পারিনি। শুক্রবার তোফায়েল আহমেদসহ সবাই যখন একে একে টেলিফোনে বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলছিলেন, রাজ্জাক ভাই আর নেই। আমার তখন সেই প্রথম ভালোবাসার উষ্ণ স্পর্শে মধুর স্মৃতিখানি মনে পড়েছে। আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগেও আমরা সবাই ছিলাম আবদুর রাজ্জাকের কর্মী। রাজ্জাকের কর্মী বলে সে দিন আমাদের যে গর্ব ছিল আজ অনেক মন্ত্রী-এমপি-নেতার সেই গর্ববোধ আছে কিনা আমি জানি না। রাজ্জাক-তোফায়েলের নামে দলে দুটি সে াতধারা থাকলেও সারা দেশের ১৪ আনা নেতা-কর্মী ছিলেন রাজ্জাকের সঙ্গে। আমাদের চিন্তাচেতনা ও হৃদয়জুড়ে প্রথম তারুণ্যে এই বিশ্বাসবোধ জেগেছিল যে, আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন একদিন হবেই। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় দলে সবাইকে আদর্শবান কর্মী হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন রাজ্জাক। আমরা ছিলাম সেই সংগ্রামের সহযাত্রী। সহজ-সরল মুজিব অন্তঃপ্রাণ আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও রেহানার প্রতি ভীষণ দুর্বল ছিলেন। ভিন্নমতাবলম্বীদের মতামতকে গ্রহণ করে, গণমুখী চরিত্র নিয়ে দল পরিচালনা ছিল আবদুর রাজ্জাকের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাদামাটা জীবনযাপনে ছিল অভ্যস্থ। তার অনুরাগী অসংখ্য শিল্পপতি দেশে থাকলেও আবদুর রাজ্জাক দল, কর্মী আর জীবন-জীবিকার জন্য যতটুকু দরকার তার বেশি কখনো নিতেন না। কর্মীদের লোভ-লালসার ঊধর্ে্ব থাকার শিক্ষাই দিয়েছেন। তার সম্মতি থাকার কারণেই '৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সভানেত্রী করে দেশে আনা হয়েছিল। তখন একটি সুশৃক্সখল আদর্শবান বিপ্লবী চেতনায় তৈরি কর্মীর সংগঠন আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব রাজ্জাকের হাতে। শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী পদে সম্মতি দেওয়ায় সে দিন যারা দলের সভাপতি হতে পারেননি তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে রাজ্জাকের ওপর শোধ নিতে ছাড়েননি। '৮৩ সালে ছাত্রলীগের বিভক্তি ঘিরে আবদুর রাজ্জাককে দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। রাজ্জাক সে দিন বেরিয়ে গেলেও কোনো দিন শেখ হাসিনা দূরে থাক, কোনো নেতার প্রতি নিজে কটূক্তি করা দূরে থাক, কর্মীদেরও করতে দিতেন না। শেখ মুজিবের কাছ থেকে তার আদরের কর্মী রাজ্জাক এই শিক্ষাই পেয়েছিলেন। '৯২ সালে পুরো কর্মী নিয়ে রাজ্জাক আওয়ামী লীগে ফিরে এলেও আর কখনো দলের সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি। বাঘের গর্জন নিয়ে পথ চলা রাজ্জাককে আওয়ামী লীগে রীতিমতো খাঁচায় পুরে রাখা হয়। ছাত্রলীগ বিভক্তির সময় আমাদের বলা হয়েছিল রাজ্জাক অনুসারী ছাত্রলীগকে বঙ্গবন্ধুকন্যা সমর্থন দেবেন। যখন সমর্থন দেননি, আমরা দিনে দিনে হতাশ হই। একদিন রাজ্জাককে ছেড়ে কর্মীদের নিয়ে মূলধারায় ফিরে যাই। পরে একদিন আবদুর রাজ্জাকের মুখোমুখি হলে সেই চিরচেনা মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, ও তুই, আমার কর্মীদের নিয়ে গেছিস? তারপর পেশার তারে জীবন জড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে সারা দেশ ঘুরেছি। সংবাদের জন্য নেতাদের বাড়ি বাড়ি, দলীয় কার্যালয় এক সময় হররোজ চষে বেড়িয়েছি। আবদুর রাজ্জাকের মুখে কখনো কারও বদনাম যেমন শুনিনি, তেমনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি কখনো কোনো দিন ভুল করেও মিডিয়া কাভারেজ চাননি। তার কত অনুসারী সংবাদকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও রাজ্জাক কখনো কাউকে ডাকেননি। রাজ্জাক ভারত থেকে প্রথম দফা লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন করিয়ে এলে একবার টেলিফোনে কথা হলে বলেছিলাম, এই জীবনে বেশি কিছু করার সুযোগ পাবেন না। আত্মজীবনীটা লিখে যান। রাজ্জাক ভাই বলেছিলেন, শুরু করেছি, তুই যদি সাহায্য করতি তাহলে ভালো হতো। অবশ্য তুই ব্যস্ত। আমি আগে দাঁড় করাই তারপর তুই দেখে দিস। তোর হাতের লেখা এত সুন্দর, সবাই যখন প্রশংসা করে খুব ভালো লাগেরে। যেখানেই পেতেন, হাতের মধ্যে টিপ দিয়ে বলতেন, বাসায় আসিস, কথা আছে। আমার কখনো যাওয়া হতো না। রাজ্জাক ভাইয়ের চেয়ে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে যাওয়া-আসা বেশি। নূরে আলম সিদ্দিকী, আমির হোসেন আমু, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আসম রব প্রমুখ ষাটের দশকের ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে তা ছিল না। কেন ছিল না জানি না। তবে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে শয্যা নিলে আমার মন বলে দিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির চিরসংগ্রামী এই দাপুটে নেতা আর কখনো ফিরে আসবেন না। এই শেষ যাত্রার আগে বলেছিলেন, তিনি আমাকে একটি দীর্ঘ এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দেবেন। তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন। অনেক কথাই বলবেন। তার সহকারী মোক্তার হোসেন জানেন। কিন্তু তার আর সেই কথাগুলো বলা হলো না। আমাদেরও জানা হলো না। তার প্রিয়তমা পত্নী ফরিদা রাজ্জাক কী গভীর মমতা নিয়ে স্বামীর শয্যাপাশে রাত-দিন কষ্ট করে লড়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিয়তির কাছে হেরে গেছেন। দেশপ্রেমিক বরেণ্য এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। রাজনীতির আকাশ থেকে অতি উজ্জ্বল একখানি নক্ষত্রের করুণ বিদায় ঘটল। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা জননন্দিত রাজনীতিবিদ আবদুর রাজ্জাকের শয্যাপাশে শেষ সময়ে গভীর মমতায় হাজির হয়েছেন সিরাজুল আলম খান, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, রায় রমেশ চন্দ্রসহ অনেকেই। দু-একদিন ভাবী রাজ্জাক ভাইকে টেলিফোন দিলে ক্লান্ত কণ্ঠে কষ্ট করে বলেছেন, তুই ভালো আছিস? মতিউর কেমন আছে? মতিউর রহমান পীর '৭৫-উত্তর সময়ে ছাত্রলীগ পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই শ্বাসরুদ্ধকর দুঃসময়ে ছেলে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত মা বারান্দায় বসে থাকতেন গভীর রাত পর্যন্ত। সেই রাজনীতি ছিল খেয়ে না খেয়ে ঝুঁকিবহুল পথের আদর্শের মহিমায় ত্যাগের রাজনীতি। দলের ভাঙনে মতিউর রহমান পীর রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে না গেলেও একবার মতি ভাই অসুস্থ খবর শুনে রাজ্জাক ভাই দেখতে গিয়েছিলেন। লন্ডনে যারা রাজ্জাক ভাইয়ের শয্যাপাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের কারও কারও সঙ্গে আলাপচারিতায় আমার তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি নিয়ে জানার চেষ্টা করেছি_ কী বলেছেন রাজ্জাক ভাই? উত্তরে দু-একজন বলেছেন, মাঝে মাঝে তাদের মনে হয়েছে তার বুকজুড়ে অনেক না বলা কথা জমা আছে। আছে অভিমান। আছে বেদনা। অনেক কিছু যেন বলতে চান। বলেও বলেন না। কারও বিরুদ্ধেই যেন তার অভিযোগ নেই। শেষ জীবনে দল তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা কতটুকু দিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইতিহাসের এসব নায়ককে নিয়ে আগামী প্রজন্ম যখন গবেষণা করবে, ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে তাদের অমর কীর্তি তুলে আনবে তখন তাদের গৌরবময় সাহসী বর্ণাঢ্য জীবনের দু-চারটি ভুল-ত্রুটি যেমন আসবে, তেমনি গবেষকরা তার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে তা আনতেও ভুল করবে না। নিয়তির কাছে হার মেনে রাজ্জাক ভাই চলে গেছেন। আমরা জানি চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে যাওয়া আবদুর রাজ্জাক আর কোনো দিন কথা বলবেন না। আর কখনো তার কণ্ঠে উচ্চারিত হবে না দুখিনী বাংলা মায়ের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। এমনকি আর কোনো দিন তিনি দলে সম্মানজনক পদ-পদবি, মন্ত্রিত্বের দাবি নিয়ে কারও সামনেও দাঁড়াবেন না। অন্তহীন বেদনা আর নির্দয় দহন সয়ে সয়ে ক্ষয়ে যাওয়া হৃদয় ও শরীর নিয়ে রাজ্জাক ভাই চলে গেছেন। তার শয্যাপাশে যদি থাকতাম কানে কানে ফিস ফিস করে প্রশ্ন করতাম_ রাজ্জাক ভাই, তোমার বুকজুড়ে যেখানে শেখ মুজিব আর বাংলাদেশের মানচিত্র, তোমার হৃদয়জুড়ে যেখানে আওয়ামী লীগ ও জনগণ সেখানে কতটা অভিমান আর বেদনা সয়ে গেছ তুমি? তোমার অপেক্ষায় ছিল ঈদুল ফিতরের রাত, তোমার অপেক্ষায় ছিল শরতের কাশবন, তোমার অপেক্ষায় উন্মুখ ছিল অশ্রুসজল লাখো লাখো কর্মী, ভক্ত আর শরীয়তপুরের মানুষ। ব্যালটের লড়াইয়ে যারা কোনো দিন তোমাকে পরাজয়ের গ্লানি স্পর্শ করতে দেয়নি সেখানে দলের অন্তহীন অবহেলা, অনাদর, অযত্ন, অসম্মানের গ্লানি, বেদনায় কী সীমাহীন কষ্টই না পাচ্ছ রাজ্জাক ভাই? রাজ্জাক ভাই, তোমার আদর্শের নাম যদি হয় শেখ মুজিব, তোমার স্বপ্নের নাম যদি হয় অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, তোমার আনন্দের নাম যদি হয় মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, তোমার ভালোবাসার নাম যদি হয় আওয়ামী লীগ শুধু একটিবার আমাকে একান্ত গোপনে বলে যাবে তোমার কষ্ট ও বেদনার নাম কী? কত অযোগ্য, মূর্খ আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই পেলেও জাতিকে অবাক বিস্ময়ে দেখতে হয়েছে শেখ মুজিবের রাজ্জাকের সেখানে জায়গা হয়নি। কত বিতর্কিত নাম এসেছে মন্ত্রিসভায়। সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামী আবদুর রাজ্জাক তোমার নাম শোভা পায়নি। এমনকি সবকিছু নষ্টদের হাতে এমনভাবে চলে গেছে একদল স্তাবক, মোসাহেব তোমাদের সংগ্রামের বেনিফিশিয়ারি হয়েছে আজ। কিন্তু কর্মচারীর চাকরিটি হারানোর ভয়ে কত ক্রীতদাস মৃত্যু পথযাত্রী একজন জাতীয় বীর আবদুর রাজ্জাককে দেখতেও যায়নি। রাজ্জাক ভাই, তোমার কফিনে আজ কোটি প্রাণের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দু হয়ে জনগণের ভালোবাসা ঝরবে। তোমার কফিন ঘিরে লাখো মানুষ বুকভরা আর্তনাদ নিয়ে জানাজায় শরিক হবে। জনতার ভালোবাসার অশ্রুজলে মুছে যাক রাজ্জাক ভাই আজ তোমার সব একান্ত গোপন দুঃখ, বেদনা, অভিমান। যারা তোমাকে রাজদণ্ড দিয়েছে তারা জানে তুমি একখানি বাংলাদেশ দিয়ে গেছ। তোমার গ্লানি কেন হবে রাজ্জাক ভাই? যারা তোমাকে অসম্মান দিয়েছে, প্রাপ্য মর্যাদা বুঝিয়ে দেয়নি আজ তাদের আত্মগ্লানি ও অনুশোচনায় ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার দিন। তুমি বাংলাদেশ দিয়ে গেছ। কতদিন তুমি ঘুমাওনি শান্তিতে। এই ছোট্ট জীবনের পুরোটা সময় দেশ ও মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়েছ। তুমি ঘুমাও শান্তিতে আজ। হাশরের ময়দানে তুমি ঠিক দেখে নিও মুমিন সন্তানরা তোমার হয়ে সাক্ষ্য দেবে। তুমি তাদের নেতা ছিলে। তাদের সুখ-দুঃখের সাথী ছিলে। আজ রাষ্ট্র তোমাকে গার্ড অব অনার দিয়ে শেষ বিদায় জানাবে। সরকার চাইলে একদিনের জাতীয় শোক কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে। যদিও তাতে তোমার কিছুই যায় আসে না। তোমার কফিন ভরে উঠবে লাখো জনতার ফুলে ফুলে। কিন্তু দেখ, তোমার অভিমানী আত্মা যেন বলে না ওঠে 'জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে তারে কেন দিতে এলে দান?'

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে