Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২০ , ২৬ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১৮-২০২০

বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ

গৌরাঙ্গ মোহান্ত


বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ

রিপাবলিকের তৃতীয় সর্গে প্লেটো দর্শনকে কবিতার প্রতিপক্ষ করে তুলেছিলেন। হোমার ও তাঁর সমর্থকদের সম্পর্কে সন্দিগ্ধ এ দার্শনিক জানিয়েছেন, কবিতা পরিব্যাপক ও প্রায়শ ক্ষতিকারক কেননা কবিতা প্রকৃতি ও অনাদি সম্পর্কে যে ধারণা উপস্থাপন করে তা ভ্রমাত্মক। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্লেটোর এ তত্ত্বে আস্থাশীল ছিলেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে এই মহাপ্রাণ মানুষ অহর্নিশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে রেখেছেন নিবিড় সম্পর্ক। ১৯৪১ সালে ফরিদপুরে আয়োজিত ছাত্রলীগের জেলা সম্মেলনে কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খাঁ সাহেবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। উল্লেখ্য যে, এই সম্মেলনে রাজনীতি বিষয়ক কোনো বক্তব্য উপস্থাপিত হয়নি।

বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তিনি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও তাঁর সহকর্মী জনাব মাজহারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, রুশ লেখক আইজ্যাক অ্যাসিমভ, তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, পাঞ্জাবে অনুষ্ঠিত প্রগতিশীল লেখকদের সম্মেলনে যোগদান করেছেন, লাহোরে কবি আল্লামা ইকবালের বাড়ি ‘জাভেদ মঞ্জিল’-এ অবস্থান করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে করাচি অভিমুখে যাত্রাকালে তিনি সহযাত্রী কয়েকজন কৌঁসুলিকে কাজী নজরুল ইসলামের কিছু কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাংশ আবৃত্তি করে শোনান।

বাংলা ভাষার দিগন্তকে বিস্তৃত করার জন্য বিশ্বকবির অবদানকে বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করতেন। চীনে ভ্রমণকালে তিনি তাঁর উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেন, ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃ : ২২৮)।

বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক পাঠাগার রবীন্দ্র-রচনাবলীসহ নানা বিরল গ্রন্থে পূর্ণ ছিলো। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী শুধু ভাংচুর করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা স্বর্ণসহ মূল্যবান দ্রব্যাদি লুণ্ঠন ও গ্রন্থরাজি নিশ্চিহ্ন করে।

ইতিহাসের মূক সাক্ষীর অস্তিত্বহীনতায় বঙ্গবন্ধুর মানসক্ষেত্রের নির্ভুল রূপায়ন অসম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে আমাদের অবহিত করেন, ‘১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানায় বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন কিন্তু আমার মার অনুরোধে এই বই কয়টা আব্বা কখনও দিতেন না, সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলী, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নাড শ’র কয়েকটা বইতে সেন্সর করার সিল দেওয়া ছিল। ...মা এই কয়টা বই খুব যত্ন করে রাখতেন। আব্বা জেল থেকে ছাড়া পেলেই খোঁজ নিতেন বইগুলি এনেছেন কিনা। যদিও অনেক বই জেলে পাঠানো হতো। মা প্রচুর বই কিনতেন আর জেলে পাঠাতেন। নিউ মার্কেটে মার সঙ্গে আমরাও যেতাম। বই পছন্দ করতাম, নিজেরাও কিনতাম। সব সময়ই বই কেনা ও পড়ার একটা রেওয়াজ আমাদের বাসায় ছিল। প্রচুর বই ছিল। সেই বইগুলি ওরা নষ্ট করে। বইয়ের প্রতি ওদের আক্রোশও কম না। আমার খুবই কষ্ট হয় ঐ বইগুলির জন্য যা ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে সবই হারালাম।’ (পৃ : ৭০, ৭১)।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশেষত কবিতা ও গান বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে নিরন্তর উদ্দীপ্ত রেখেছে। কারাবাসের অধিকাংশ সময় ‘সঞ্চয়িতা’ ছিলো তাঁর আলোকময় সহচর। রবীন্দ্রকাব্যে ভাস্বর মানবিকতা ও স্বদেশপ্রেম বঙ্গবন্ধুকে চিরদিন অনুপ্রাণিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় অভিব্যক্ত অভীস্পা বঙ্গবন্ধুর সংবেদী সত্তায় পল্লবিত হয়ে উঠেছিলো:

পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে

মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে

হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে

চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।

দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান

খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।

পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে

বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।

প্রাণ দিয়ে, দুঃখ স’য়ে, আপনার হাতে

সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।

বঙ্গবন্ধু পরার্থপরতায় উৎসর্গ করেছেন তাঁর সংগ্রামশীল মহাজীবন। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন, ‘ইংরেজ আমাদের নিন্দা করুক, প্রশংসা করুক,যাই করুক—আমাদের প্রতি বিমুখ হোক বা প্রসন্ন হোক—সে দিকে দৃকপাতমাত্র না ক’রে আমাদের উপেক্ষিত দেশ, আমাদের উপেক্ষিত ভাষা, আমাদের অপমানিত লোকদের কাজে জীবন সমর্পণ করতে হবে।’ (ছিন্ন পত্রাবলী পৃ : ১৩২) রবীন্দ্রনাথের এ উপলব্ধি বঙ্গবন্ধুর ভাবনায়, পরিকল্পনায়, কর্মে ও ত্যাগে প্রোজ্জ্বল হয়ে আছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু আন্দোলনে একাত্ম হলেও পাকিস্তানি শাসকের শোষণ, নিপীড়ন, অবিমৃশ্যকারিতা তিনি সহ্য করেননি; দৃঢ়তার সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত মুক্তির সরণি নির্মাণ করেছেন। পাকিস্তানি সরকার এক জেলার খাদ্যশস্য অন্য জেলায় পরিবহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় ‘দাওয়াল’ শ্রেণি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যে সকল গরিব দিনমজুর ধানকাটার মজুরি হিসেবে ধানের একটি অংশ পেতেন তারা কর্ডন প্রথার বাড়াবাড়িতে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু নিঃস্ব মানুষের জন্য প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। ‘জিন্নাহ ফান্ডের’ নামে নিরন্ন মানুষের কাছ থেকে জোরজুলুম করে চাঁদা সংগ্রহ তিনি প্রতিরোধ করেন। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে চালিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আব্বাসউদ্দিন বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে জানান, ‘বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃ : ১১১)। বঙ্গবন্ধু সর্বাংশে এ কথা রক্ষা করেছিলেন। কারাবন্দি অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে তিনি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন ও সংগ্রাম পরিষদ গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

স্বদেশে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি যেমন প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন তেমনি বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলা ভাষার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব উন্মোচনে তিনি ছিলেন অতি উদ্যমী। ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবোধের প্রতি সংবেদনশীল থেকে ১৯৫২ সালে পিকিংয়ে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে তিনি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু ও ভারতের ঔপন্যাসিক মনোজ বসু বাংলায় বক্তব্য উপস্থাপন করায় কৌতূহলী অনেক শ্রোতাকে বঙ্গবন্ধু যেভাবে উত্তর দান করেন তা স্মরণযোগ্য : “বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ায় ‘ট্যাগোর’ নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাঁকে করে। ...পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা।” (আমার দেখা নয়াচীন ৪৪)।

রবীন্দ্রশরণ ও ভাষা আন্দোলন বাঙালির অরুণোদয়কে অমোঘ করে তুলেছিলো। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান শাসনতন্ত্রে উর্দু ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। শাসনতন্ত্রের শেষদিকে ২৪১ সংখ্যক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষার বিষয় বিবৃত হওয়া যেমন অস্বস্তিকর তেমনি আরোপিত শর্তও চাতুর্যপূর্ণ। বর্ণিত অনুচ্ছেদে বিধৃত হয় যে, আগামী ২০ বছর ধরে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ব্যবহৃত হবে এবং এ কাল-পরিসরে প্রাদেশিক সরকার রাষ্ট্রভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। দূরদর্শী বঙ্গবন্ধুর কাছে পাকিস্তানি অভিসন্ধি অস্বচ্ছ থাকেনি। তাঁর অদৃষ্টপূর্ব সাংস্কৃতিক চৈতন্যের প্রভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন বেগবান হয়।

মুহম্মদ সবুর ‘আমার সোনার বাংলা যেভাবে জাতীয় সংগীত হলো’ প্রবন্ধে লিখেছেন যে, “১৯৫৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ থেকে আগত সংসদ সদস্যগণের সম্মানে বঙ্গবন্ধু কার্জন হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বাংলার সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করা ছিলো তাঁর অন্বিষ্ট। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গানসহ লোকসংগীত পরিবেশিত হয়। ডি. এল. রায় রচিত ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানটি বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গান হিসেবে অনুষ্ঠানে গীত হয়। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সনজীদা খাতুনকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইবার জন্য বঙ্গবন্ধু অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানিদের নিকট ‘সোনার বাংলা’-র রূপমাধুর্য ও প্রীতি পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এ গানটি নির্বাচন করেছিলেন। তবে পাঁচ স্তবকে বিন্যস্ত এ গানটি সনজীদা খাতুনের মুখস্ত ছিলো না বিধায় তাৎক্ষণিকভাবে ‘গীতবিতান’ সংগ্রহ করে তাঁকে গানটি পরিবেশন করতে হয়। গানটির সাথে অঙ্গীভূত বাঙালির হৃদয়াবেগ প্রকাশ করবার জন্য বঙ্গবন্ধুর এ উদ্যোগ ছিলো নিশ্চিত ফলদায়ক।” (বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম ২৩.০৩.২০১৫)।

বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদস্বরূপ ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট যে গান বাউল সুরে গীত হয় তা বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায় অনুযায়ী সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে স্বীকৃতি লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শিল্পী জাহিদুর রহিমের কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ শুনতে পছন্দ করতেন। বঙ্গবন্ধুর সস্নেহ আহ্বানে জাহিদুর রহিম বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশ করতেন। বঙ্গবন্ধু ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’, ‘সুপ্রভাত’, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’, ‘দুই বিঘা জমি’ প্রভৃতি কবিতা যেমন আবৃত্তি করতেন, তেমনি গুনগুন করে রবীন্দ্রনাথের গানও গাইতেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার’ বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

গত শতকের পঞ্চম ও ষষ্ঠ দশকে এ দেশে রবীন্দ্রচর্চা অবাধ ছিলো না। তবে পূর্ববঙ্গীয় সংস্কৃতির জন্য দেশবাসী তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছিলেন (খান সারওয়ার মুরশিদ পৃ : ১১৬)। রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গে ১৯৬১ সালে পালিত হয় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী। বাংলার চেতনাদীপ্ত মানুষ রবীন্দ্রনাথকে ‘তাঁর সংস্কৃতির সবচেয়ে পূর্ণোদিত মানুষ’ হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধা করেনি (খান সারওয়ার মুরশিদ পৃ : ১০৯)। খান সারওয়ার মুরশিদের ভাষায়, ‘তিনি (রবীন্দ্রনাথ) আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের দ্বন্দ্ব এবং টানাপোড়েনে জড়িয়ে গেছেন। ...তিনি...এক ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধের জন্ম এবং পুষ্টিতে সাহায্য করেছেন। ...তিনি... একটি অস্থির জাতির বিক্ষুদ্ধ ইতিহাসে আশ্রয়ের একটি উজ্জ্বল স্থিরবিন্দু’ (পৃ : ১২৩)। ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করলে শিল্পী ও প্রগতিবাদী মানুষের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু একাত্ম হন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বক্তৃতা প্রদানকালে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপিয়ার, এরিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সে তুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য। আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখে যিনি বিশ্বকবি হয়েছেন। আমরা এই ব্যবস্থা মানি না—আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এই দেশে গীত হবেই।’ (মুনতাসীর মামুন পৃ : ২৯৬)। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের অমোঘ অবস্থান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসংশয়চিত্ত। ১৯৬৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, “Tagore had reflected the hopes and aspiration of the millions of Bengalies through his works. Without him…the Bengali Language was incomplete” (The Pakistan Times, 17.12.1969). রবীন্দ্রসাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে সমধিক গুরুত্ব আরোপ করে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে রবীন্দ্র-রচনাবলী প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাংলার শিল্পীদের কণ্ঠে গীত রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম রেকর্ড বঙ্গবন্ধুর হাতে অর্পণ করেন কবি সুফিয়া কামাল। বঙ্গবন্ধু জানতেন, একটি জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি দমিত হলে সে জাতি ক্রমান্বয়ে নির্মূল হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়,  ‘একটি জাতিকে পঙ্গু ও পদানত করে রাখার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করা।’ (মুনতাসীর মামুন পৃ : ২৫৬)। ফলত তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমুদয় গান ও সাহিত্য প্রকাশের আবশ্যকতাকে গুরুত্ব প্রদান করেন। তিনি শাহজাদপুরে অবস্থিত রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি সংরক্ষণের দাবিও উত্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে কলিম শরাফী, জাহিদুর রহিম, আফসারী খানম, বিলকিস নাসির উদ্দীন ও রাখী চক্রবর্তী রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁদের সমবেত কণ্ঠে গীত হয় ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দিল্লি হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে বিমানে বসে বঙ্গবন্ধু বাষ্পরুদ্ধস্বরে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গাইতে থাকেন এবং সহযাত্রী ভারতীয় কূটনীতিজ্ঞ শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীকে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে বলেন। এ গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত হবে বলে বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন (মুনতাসীর মামুন পৃ : ২৯৬)।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রুশ কূটনীতিবিদ ফেলিক্স ইউরলভ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্য বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্যকর্ম রুশ ভাষায় অনূদিত হচ্ছে মর্মে তিনি বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির কিছু চরণ পাঠ করে শোনান। এ সময় বঙ্গবন্ধুর অভিব্যক্তি ছিলো অনন্যসাধারণ; তিনি স্বয়ং আবেগস্পন্দিত কণ্ঠে এ গানটি আবৃত্তি করেন (Yurlov 210, 211)|

রবীন্দ্রনাথকে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চাকে গতিময় করবার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে রেসকোর্স ময়দানে যখন ভাষণ দান করেন তখন তাঁর সমগ্র সত্তায় অভূতপূর্ব আলোড়ন তরঙ্গিত হয়। তিনি আনন্দ-বেদনামিশ্রিত যে শব্দমালা উচ্চারণ করেন তা রবীন্দ্রানুগ। বাংলার মানুষ, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়ার সান্নিধ্য তাঁকে বিহ্বল করে তোলে। তিনি ক্রন্দিত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় বড় ভালোবাসি’। রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার শেষে লিখেছেন, ‘সাতকোটি সন্তানের, হে মুগ্ধজননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি’। বিশ্বকবির এ ক্ষোভের কারণ নস্যাৎ করে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ করেন, কবিগুরুর এ কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে। কারণ ‘আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙালি দেখিয়ে দিয়েছে।’ বাস্তুভূমি থেকে বিতাড়িত উপেনের বেদনা বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়; রবীন্দ্রনাথ মাতৃভূমিকে প্রণতি জানাবার জন্য যে অকৃত্রিম শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন তা বঙ্গবন্ধুর আপ্লুত কণ্ঠে ব্যঞ্জিত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু তদ্গতচিত্তে উচ্চারণ করেন, ‘নম, নম, নম সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি,/গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি’। রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার কারণেই বারবার রবীন্দ্রবাণী উচ্চারিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে, তাঁর চেতনার গভীরতম প্রদেশে রবীন্দ্রনাথ অধিষ্ঠিত।

শোষণ, বঞ্চনা ও গণহত্যায় ধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু আত্মনিয়োগ করেন। নিঃস্ব ও অবহেলিত মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম মমত্ব ও কর্তব্যবোধ। তিনি চাইতেন দুঃস্থ ও বঞ্চিত মানুষের প্রকৃত অবস্থা আমাদের সাহিত্যে প্রতিফলিত হোক। রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম, অসহায় মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও তাঁর প্রকৃতিমগ্নতা বঙ্গবন্ধুকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের মানবিক চেতনার প্রতিধ্বনি বঙ্গবন্ধুর চৈতন্যে সঞ্চারিত। রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ মানুষের দৈন্যদশা পরম মমতায় তুলে ধরেন, ‘যখন দেখতে পাই গৃহস্থের মেয়েরা একখানা ভিজে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বাদলায় ঠান্ডা হাওয়ায় বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে হাঁটুর উপর কাপড় তুলে জল ঠেলে ঠেলে সহিষ্ণু জন্তুর মতো ঘর-কন্যার নিত্যকর্ম করছে, তখন সে দৃশ্য কিছুতেই ভালো লাগে না। এত কষ্ট এত অনারাম মানুষের কী করে সয় আমি ভেবে পাই নে—এর উপরে প্রতি ঘরে ঘরে বাতে ধরছে, পা ফুলছে, সর্দি হচ্ছে, জ্বর হচ্ছে, পিলে-ওয়ালা ছেলেগুলো অবিশ্রাম ঘ্যান ঘ্যান করে কাঁদছে, কিছুতেই তাদের বাঁচাতে পারছে না—একটা একটা করে মরে যাচ্ছে। এত অবহেলা অস্বাস্থ্য অসৌন্দর্য দারিদ্র্য বর্বরতা মানুষের আবাসস্থলে কিছুতেই শোভা পায় না’ (ছিন্ন পত্রাবলী পৃ : ২৩২, ২৩৩)।

বঙ্গবন্ধুও সাহিত্যে নগরসর্বস্ব জীবনের প্রতিফলনকে উৎসাহিত করেননি। তিনি সদ্যস্বাধীন দেশের অগণন গ্রামবাসীর অকৃত্রিম জীবনাচরণকে সাহিত্যের উপজীব্য করে তোলার জন্য দেশের সাহিত্যিকগণকে আহ্বান জানান। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে উপস্থিত শ্রোতা ও সাহিত্যসেবীদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন, ‘আমি সাহিত্যিক নই, শিল্পী নই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোদিন কোন মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না। আমি সারাজীবন জনগণকে সাথে নিয়েই সংগ্রাম করেছি, এখনও করছি ভবিষ্যতেও যা কিছু করবো, জনগণকে নিয়েই করবো। সুধী বন্ধুরা, আপনাদের কাছে আমার আবেদন, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ না হয়ে থাকে, বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দনও যেন তাতে প্রতিফলিত হয়। আজকের সাহিত্য সম্মেলনে যদি এসবের সঠিক মূল্যায়ন হয়, তবে আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হব’...(মুনতাসীর মামুন ৪২)।

‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধের পরিশিষ্টে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজেদের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা’ (রবীন্দ্র রচনাবলী তৃতীয় খণ্ড পৃ : ৫৫৬)। ‘পল্লী প্রকৃতি’ প্রবন্ধে তিনি প্রস্তাব করেন, ‘বাংলাদেশের যেখানে হোক একটি গ্রাম আমরা হাতে নিয়ে তাকে আত্মশাসনের শক্তিতে সম্পূর্ণ উদ্বোধিত করে তুলি। সে গ্রামের রাস্তা-ঘাট, তার ঘরবাড়ির পারিপাট্য, তার পাঠশালা, তার সাহিত্যচর্চা ও আমোদ-প্রমোদ, তার রোগী পরিচর্যা ও চিকিৎসা, তার বিবাদনিষ্পত্তি প্রভৃতি সমস্ত কার্যভার সুনির্দিষ্ট নিয়মে গ্রামবাসীদের দ্বারা সাধন করাবার উদ্যোগ আমরা করি’ (রবীন্দ্র রচনাবলী সপ্তবিংশ খণ্ড পৃ : ৫২৩)। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘...দেশের পল্লীগুলি আত্মনির্ভরশীল ও ব্যূহবদ্ধ হয়ে উঠলেই আমরা রক্ষা পাব’ (রবীন্দ্র রচনাবলী সপ্তবিংশ খণ্ড পৃ : ৪৬০)। রবীন্দ্রনাথ সমবায়নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে গ্রাম বা সমাজভিত্তিক উন্নয়নের জন্য চিরদিন স্বপ্ন দেখেছেন। বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথের মতো পল্লি পুনর্গঠনে তৎপর থেকেছেন। উপরন্তু নতুন একটি দেশের স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু নির্বিকল্প দায়িত্ব পালন করেন। বিধ্বস্ত বাংলার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য তাঁকে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে এবং দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ১৯৭৩-৭৮ প্রকাশিত হয়। এর মুখবন্ধে বর্ণিত হয়েছে ‘The Plan emphasises self-reliance’—যা রবীন্দ্রনাথের আত্মশক্তিরই প্রতিধ্বনি। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র—রাষ্ট্রপরিচালনার এ মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতে প্রণীত হয় পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু এ পরিকল্পনা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। তাঁর ভাষায় ‘All of us will, therefore have to dedicate ourselves to the task of nation building with single-minded determination. I am confident that our people will devote themselves to this task with as much courage and vigour as they demonstrated during the war of liberation.’ (Foreward to First Five Year Plan)

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বব্যবস্থিত সমবায়কে পল্লি উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত স্থানীয় সরকারের সহায়তায় সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বর্ধিত উৎপাদন ও আয়ের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির দ্বারা প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে নিম্নস্তরের মানুষের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে বিধায় সমবায়ের মাধ্যমে তাদের সংগঠিত করে, সমষ্টিগতভাবে উদ্ভাবনী উৎপাদন-পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়। প্রান্তিক কৃষকের শ্রম কিংবা শস্যের বিনিময়ে ঋণ পরিশোধ, শ্রমঘন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, ভূমিহীন শ্রমিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে পরিপুষ্টি প্রদান, সমবায়ভিত্তিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক পল্লি পরিবারের কল্যাণ সাধনের জন্য রবীন্দ্রানুসারী বঙ্গবন্ধু গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন (First Five Year Plan 89, 155, 156)। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তাঁর উন্নয়ন-পরিকল্পনা পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের একনিষ্ঠ পক্ষাবলম্বী ফরাসি ঔপন্যাসিক ও রাজনীতিক অঁদ্রে মালরো (Andrè Malraux) ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়ে এলে উপাচার্য অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ নতুন রাষ্ট্র নির্মাণে বঙ্গবন্ধুর সক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর অভিমত প্রত্যাশা করেছিলেন। মালরো সদর্থক উত্তর জ্ঞাপন করে বলেছিলেন, ‘অবশ্যই যদি না আপনারা শিক্ষিতরা, বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে মেরে ফেলেন। …You are a cynical lot. Don’t kill him like one of those tribes which kill their leaders and eat their flesh’ (খান সারওয়ার মুরশিদ পৃ : ২৯)। মালরোর আশঙ্কা অপ্রতিকার্য হয়ে ওঠে; ঘাতকচক্র এই মহামানবকে এবং তাঁর স্বপ্নকে নিষ্পন্দ করে দেয়। ‘অশ্রুভরা বেদনা দিকে দিকে জাগে’, গভীর বিষণ্নতাবোধের ভেতর তাঁর অক্ষয় ত্যাগ ও মুক্তিসাধনা আমাদের প্রতিনিয়ত পথ দেখায়।

এন এইচ, ১৯ মার্চ

প্রবন্ধ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে