Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ , ৫ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২২-২০১১

হাঁসেদের দেশে

মীজান রহমান


হাঁসেদের দেশে
সমস্ত শরীরে আমার দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি, তবু জানি কেন কিছুতেই ঘুম আসছিল না চোখে। অচেনা ঘরের অনভ্যস্ত অন্ধকারে মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসছে। পা টিপে টিপে জানালায় গিয়ে পর্দা খুলে দিতেই মনে হল ঘরের রুদ্ধ অন্ধকার পাখা মেলে উড়ে গেল বাইরে। সামনে, একেবারে চোখের সামনে, প্রায় হাতের নাগালে, ‘ওয়াটারওয়েজ’ হ্রদের নিথর নিস্তরঙ্গ জল। দ্রবীভূত বায়ুর মত কাঁপছে। মৃদু বাতাসের ছন্দদোলাতে যেন নিজেরই বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। দূর থেকে, হ্রদের ওপারে সেই মায়ার জগৎ থেকে, কারখানার বাতিগুলো, হ্রদের পানিতে নেমে পরম আনন্দে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। আমি রাতের তিমিরে জানালার কাঠেতে কনুই পেতে সেই প্রলম্বিত আলোকরশ্মির ছায়াতে গা ডুবিয়ে দিলাম।
 ফ্লোরিডার এ-অঞ্চলটিতে আগে আসা হয়নি কখনো। অর্ল্যাণ্ডোর ডিজনী ওয়ার্ল্ডে গিয়েছিলাম ছেলেরা যখন ছোট ছিল। পশ্চিম উপকূলের টাম্পাতে গিয়েছি একাধিকবার, কিন্তু মায়ামির কাছে, ফোর্ট লডারডেলের গা-ঘেঁষা এ-জায়গাটিতে আসবার সুযোগ হয়নি কোনদিন। এবার হল। ওরা অনেকদিন ধরেই চাইছিল আমি ওদের নতুন বাড়িটা দেখে আসি। লোভ দেখাচ্ছিল আমাকে বিচে নিয়ে যাবে, যেখানে ভেজা বালির ওপর খালিপায়ে হাঁটতে পারব, যেখানে সমুদ্রের ঢেউয়েরা এসে খেলা করবে আমার সাথে, ফেনার রঙ দিয়ে রাঙ্গাবে আমার জামাকাপড়। ওরা জানে, সাগর আর পর্বত, এদুটি জিনিসের প্রতি দারুণ দুর্বলতা আমার। ওরা, মানে সোনিয়া আর তার ছোট্ট সংসার। সে আমাকে ‘দাদু’ বলে ডাকে। দাদু বলে ডাকবার কোনও সহজ যুক্তি নেই, তবুও ডাকে। এমনকি ওদের দুটি ছোট ছোট মেয়ে, শালিকের শাবকের মত অসাধারণ মিষ্টি দুটি মেয়ে, তারাও আমাকে ‘দাদু’ ডাকে। কি অদ্ভুত কাণ্ড বলুন তো। আরো অদ্ভুত, সোনিয়ার স্বামী ইসমত, সে আমাকে সম্বোধন করেঃ ‘মীজানভাই’।এমন জগাখিচুরি সম্পর্ক কেমন করে স্থাপিত হল জিজ্ঞেস করবেন না। সম্পর্কটি রক্তের নয়, প্রাণের, হয়ত সেকারণেই।  
  বলা বাহুল্য যে সোনিয়ার ‘নতুন বাড়ি’ দেখার লোভে আমি ফ্লোরিডায় যাইনি। আমি গিয়েছিলাম ওকে, এবং ওর পরিবারের মানুষগুলোকে, নতুন করে দেখবার জন্যে---ওদের নিজস্ব নিলয়ের দৈনন্দিন আবেষ্টনীর মধ্যে। সত্যি বলতে কি, ক্যানাডা-আমেরিকার মধ্যবিত্ত পাড়াগুলোর একটি বাড়ির সঙ্গে আরেকটির খুব একটা তফাৎ নেই। এদেশে তফাৎ কেবল পাড়ায়-পাড়ায়। বড়লোকের পাড়া, মধ্যবিত্ত পাড়া, গরিবের পাড়া। বড়লোকের পাড়াতে মানুষগুলো বড় হোক বা না হোক বাড়িগুলো বড়, বিশাল। সেগুলোতে চিত্তের প্রাচুর্য প্রকাশ পাক বা না পাক বিত্তের প্রাচুর্য প্রকাশ পায় বেশ প্রাবল্যের সাথেই। এই পাড়াগুলো আমাদের উপমহাদেশীয় বিত্তবানদের খুবই প্রিয়। তারপর আছে মধ্যবিত্ত পাড়া, যেখানে বাড়ি নিয়ে বড়াই করার মত বাড়ি প্রায় কারো নয়। সবশেষে আছে ‘স্বল্পবিত্ত’ এলাকা। এগুলোরও একটা বৈশিষ্ট্য আছে বইকি---যা দেখলেই বোঝা যায়। সে-বৈশিষ্ট্যগুলোকে একেকজন একেকভাবে প্রকাশ করে, তাদের নিজ নিজ মানসিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী।
  সোনিয়ার ‘নতুন বাড়ি’র সামনের দিকটাতে ‘নতুন’ কিছুই চোখে পড়ল না আমার। সুন্দর রং-করা বাড়ি, দুই গাড়ির গ্যারাজ, সবুজ গালিচার মত নিখুঁত ঘাসের লন, বড় বড় তিনটে বিলিতি তালগাছ উঠোনের ওপর---এপাশে ওপাশে সবগুলো বাড়ির প্রায় একই দৃশ্য। এদেশে এগুলো সবই গতানুগতিক----বৈচিত্রহীনতার মাঝেই যতটা বিচিত্রতা সম্ভব। কিন্তু ওদের ‘নতুন বাড়ি’র নতুনত্ব, অন্তত আমার দৃষ্টিতে, বাড়ির পেছনটাতে। প্রকাণ্ড ব্যাকইয়ার্ড---চারদিকে সাদা রঙ দেওয়া কাঠের বেড়া। বেড়ার গেট খুললেই সেই হ্রদটির নীল জল কাছে এসে চুমু খায় পায়ে। এমনটি আমি জীবনে দেখিনি---পুরো হ্রদটাই যেন এলাকাটির পুরবাসীদের দখলিস্বত্বের অন্তর্ভুক্ত। হ্রদের সীমানা ঘিরে সারি সারি বাড়ি, নির্জন নিঝঝুম, প্রশান্ত পরিবেশ। এমন প্রশান্তি কোথাও বিরাজ করে আজকের এই অস্থির অশান্ত পৃথিবীতে, জানা ছিল না। অচিনপুরের মুগ্ধ পর্যটক আমি, বিমোহিত ঘোরের আচ্ছন্নতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি জলের কোমল স্পর্শ সাথে করে, এমন সময় কি হল জানেন? কোথা থেকে চারটে বড় বড় হাঁস, একটি সুখি হাঁস পরিবারই হয়ত, একেবারে পায়ের কাছে এসে ঘাড় তুলে আমার দিকে চেয়ে যেন বলতে চাইলঃ এতদিন কোথায় ছিলে তুমি? তাইতো, এতদিন কোথায় ছিলাম আমি। এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম এই মহাদেশের পথেপ্রান্তরে, একবারও তো হ্রদের হাঁসেদের দিকে মমতা মেশানো দৃষ্টি নিয়ে তাকাবার ভাবনা জাগেনি মনে। তাই বুঝি ওদের সাদর সম্ভাষণের ভাষা বুঝবার ন্যুনতম চেষ্টাটুকুও করা হয়নি।
  সোনিয়ার ডাকে ঘোর কাটল। চলুন ওদিকটায় যাই দাদু, ছোট একটা পার্ক আছে, সেখানে আরো ভালো লাগবে। ওদিকটা মানে দুবাড়ি পরেই---ছোট, খুবই ছোট পার্ক। পার্ক তো নয়, যেন ছোটদের খেলাঘর। চাপ চাপ বালি, বাচ্চাদের চিরপ্রিয় বস্তু। সেই বালির ওপর দোলনা, দোলনার পাশে স্লাইড, মাংকিবার----সোনিয়ার মেয়েদুটি পরম আনন্দে জুতোশুদ্ধ নেমে গেল সেই বালুর জগতে। অদূরে এক ভদ্রলোক কুকুর নিয়ে এসেছেন, সঙ্গে একটি বালক, নিশ্চয়ই তাঁর ছেলে। তিনি বল্ ছুঁড়ছেন, আর কুকুর-ছেলেতে মিলে ছুটছে সেই বল উদ্ধার করার জন্যে। কে কার আগে বল খুঁজে পাবে তারই নির্মল নিষ্পাপ প্রতিযোগিতা। বিকেলের বাদামি সূর্য আবির ছড়াতে শুরু করেছে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে। গাছের পাতায় পাতায় কে যেন আলতা মেখে দিয়েছে। পার্কের এখানে ওখানে ফুলের পাপড়িগুলো অপরাহ্নের শেষ বর্ণচ্ছটাতে রক্তরাঙ্গা হয়ে উঠছে। আমি প্রাচীন বৃদ্ধের মত, বালু থেকে দূরে, ধূলার দৌরাত্ন্য থেকে গা বাঁচিয়ে হ্রদের কাছে প্রকৃতির গুঞ্জন শুনব বলে কান পেতে আছি। ইসমত বলল, রাতের বেলা এখানে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যায়, ঝোপেঝাড়ে হয়তবা জোনাকিদের আচমকা আগমন। জায়গাটি এমনই নির্জন, এমনই সীমাহীন নিঃশব্দতায় ভরা গোটা পরিবেশ যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাওয়া যায়। একটু পর মনে হল যেন বাতাস শিস বাজিয়ে বইতে শুরু করেছে, আর সেই সুরের মাতনে মেতে গেছে বড় বড় তালগাছগুলো----তারাও যেন পুচ্ছ নাড়িয়ে নাচ ধরেছে। আমি দুচোখ ভরে পান করলাম সেই তালপাতার পুচ্ছনাড়ার দৃশ্য।
  এমন সময়, এমন এক বিমোহিত বিস্ময়ের মুহূর্তে, সেই হাঁসগুলো, সেই ধবধবে সাদা রঙের অপরূপ হাঁসগুলো, ধীরলয়ে সাঁতার কেটে আবার এসে দাঁড়ালো আমার সামনে---জল থেকে ডাঙ্গায় উঠে একেবারে আমার চোখের সামনে। যেন বলতে চাইছেঃ আগন্তুক, তোমাকে খুঁজে খুঁজে সারা হচ্ছি। সেই যে দেখা দিলে একবার, ভাবলাম তুমি পানিতে নেমে আমাদের সঙ্গে খেলা করবে; কিন্তু কই, চেয়ে দেখি তুমি নেই। জানি, ছেলেমানুসি ভাবনা। তবু কি জানেন, মাঝে মাঝে মনে হয় ওরাও কথা বলতে পারে। ওরা ভাব ব্যক্ত করতে পারে তাদের নিজস্ব ভাষায় যা বুঝবার ক্ষমতা আমাদের নেই, চেষ্টাটুকুও নেই। ওরা আমার কাছে এসেছে হয়ত বন্ধু ভেবেই, আমার জীর্ণ মুখ দেখে তারা ধরে নিয়েছে যে এই লোকটা কোনও ক্ষতি করবে না তাদের। নিরাপদ। ছোটবেলার কথা মনে হলে লজ্জায় মরে যাই। হাঁসের মাংস এককালে খুব প্রিয় ছিল আমার। গ্রামের বাড়িতে গেলে অন্তত একটি হাঁস তো অবশ্যই জবাই করা হত। এমন কত জীবের যে প্রাণনাশের কারণ ঘটিয়েছি দীর্ঘ জীবন ব্যাপী, ভাবতে গা শিউরে ওঠে। সেই একই আমি, সেই একই হাঁসেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কামনা করছি। তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে এখন আর মাংসের কথা ভাবিনা আমি, ভাবি, আহা যদি ওদের মনের কথা বুঝতে পারতাম। যদি পারতাম ওদের সঙ্গে ভেসে ভেসে চলে যেতে এমন কোনও অলীক জগতে যেখানে কেউ কাউকে বধ করেনা, যেখানে প্রেম আর ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোন শব্দ স্থান পায়না কারো মনে।
  আমার এবারের সফরসূচীর দু’টি প্রধান গন্তব্য---ফ্লোরিডা আর ক্যালিফোর্নিয়া। ফ্লোরিডায় একসপ্তাহ সেই হাঁসগুলোর সঙ্গে ভাব জমিয়ে রওয়ানা হলাম ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে। সেখানে আমার বড় ছেলে বাবুর বাড়ি, প্রখ্যাত সিলিকন ভ্যালির ফ্রিমন্ট শহরে। সেখানেও প্রায় অনুরূপ অভিজ্ঞতা হয়ে গেল আমার---হাঁসসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা। বাবুদের শহরেই এক বিরাট পার্ক--- নাম জিজ্ঞেস করতে মনে ছিল না। কিই বা আসে যায় নামে। পার্কটি বিশাল। কূলকিনারাহীন। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম ছেলের সাথে। সেখানেও একটা হ্রদ---প্রাকৃতিক হ্রদ নয় ফ্লোরিডার ‘ওয়াটারওয়েজ’এর মত---মানুষের তৈরি। চিন্তাশীল নগরপালদের দূরদর্শী পরিকল্পনাতে গড়ে ওঠা গোটা পার্কটি। হ্রদটির আয়তন একেবারে হেসে উড়িয়ে দেবার মত নয়। এর চারধারে যে হাঁটাপথটি তারই দৈর্ঘ পাকা দুই মাইল। নগরবাসীদের অলস বিনোদনের জন্যে যা যা দরকার তার কোনকিছুরই অভাব নেই যেন সেখানে। গাড়ি পার্ক করার বিস্তর জায়গা, পিকনিকের চুল্লিশুদ্ধ যাকিছু প্রয়োজন খাবার তৈরি করার, সবই মজুত সেখানে। বর্জ্যদ্রব্য এদেশে কেউ রাস্তায় ছুড়ে ফেলেনা, এটা এদের কালচারবহির্ভূত এক অচেনা বদভ্যাস---রাস্তায় ময়লা দেখলে সাধারণত মানুষ সেটা নিজে থেকেই তুলে নিয়ে নিকটবর্তী বিনে ফেলে দেয়----তাই প্রতিটি পার্ক, প্রতিটি খোলা জায়গা, প্রতিটি রাস্তায়, এদেশে বিনের ছড়াছড়ি। শুধু একটা সমস্যাই সমাধানের বাইরে চলে যাচ্ছে----হাঁস। হাজার হাজার হাঁসের সমাবেশ ক্যালিফোর্নিয়ার সেই পার্কটিতে। এই হাঁসগুলোর গায়ের রঙ ফ্লোরিডার সেই অসম্ভব ভদ্র, কুলিন  হাঁসগুলোর মত গৌরবর্ণ নয়---কালো, অনেকটা কাকের মত কালো। বড় কথা, এরা ভদ্রতা জানে না---যেখানে সেখানে বিষ্ঠাত্যাগ করে নির্বিকারে বিচরণ করে বেড়ায় সর্বত্র। বেচারি পথচারিরা যে সেই বিষ্ঠার ছাপ পায়ের নিচে মেখে ঘরে ফিরছেন এবং ঘরের দামি সতরঞ্চিগুলোর বারোটা বাজাচ্ছেন সেদিকে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় অধিবাসীদের মতে এই হাঁসগুলো একরকম ‘ইল্লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট’---প্রতি বছর শীতকালে ক্যানাডা থেকে চলে আসে দক্ষিণের উষ্ণতর আবহাওয়াতে। প্রধানত খাদ্যাণ্বেষণ ও বিষ্ঠাত্যাগের অবারিত সুযোগ আছে বলে এদেশে। আমার ভয় কখন না দুই দেশের মধ্যে হাঁসযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়!
 যাকগে, এবার আমার সেই বিস্ময়কর ঘটনাটির কথা বলি। বাপে-ছেলেতে বেশ আরাম করে হাঁটছিলাম সেই হ্রদের ধারে। উপভোগ করছিলাম শেষ অপরাহ্নের নীরব মুগ্ধতা প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কতগুলো উইলো গাছ হ্রদের জলেতে ঠোঁট ভিজিয়ে চুমু খাচ্ছে যেন----দেখছে নিজেদের প্রতিকৃতি। বেশ কিছু বয়োবৃদ্ধ উপমহাদেশীয় যুগল পাশাপাশি হাঁটছেন। তাঁরাও ক্ষণে ক্ষণে পানির দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁরাও হয়ত খুঁজছেন কিছু----অতীতকে, ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে-যাওয়া কোনও রঙ্গিন সময়কে। জীবনের শেষ হ্রদগুলো তো এমনি করেই স্মৃতির বহুবিচিত্র নুড়ি তুলে ধরে আমাদের কাছে।
  তারপর হঠাৎ সেই অপরূপ দৃশ্য। সাতটি হাঁসের দল। যেন কোনও সাত-সদস্যবিশিষ্ট নাট্যগোষ্ঠীর কুশীলবেরা মঞ্চে এসেছে দর্শকদের মনোরঞ্জন করার জন্যে। এগুলো সেই বিষ্ঠাত্যাগী কৃষ্ণবর্ণ হাঁস নয়, এগুলো রাজবংশীয় বিশালদেহী বলাকা---রাজহংস। ‘সোয়ান’ বলে এদেশের ভাষায়। হাঁসেরা বহুবিধ, অনেক জাতিতে বিভক্ত, সেটা মোটামুটি জানা ছিল। জাতিভেদ যেন প্রকৃতিরই এক মজ্জাগত স্বভাব---মানুষই বলুন আর পশুই বলুন সবাই যেন নিজেদের ঐক্যের চাইতে বৈষম্য প্রকাশের প্রতিই বেশি উদগ্রীব।
  প্রাণীজগতের কতগুলো জীবের প্রতি আমি কিঞ্চিৎ ঈর্ষার ভাব পোষণ করি, সেটা অস্বীকার করব না। এক, দক্ষিণ আমেরিকার একপ্রকার চমকলাগানো টিয়া পাখি আছে, যাদের দিকে তাকালে আমি চোখ ফেরাতে পারিনা। বনের পাখি এত সুন্দর হয় কি করে, বা এত সুন্দর সাজে কি করে কিছুতেই আমার মাথায় ঢোকে না। একবার একটা বইতে পড়েছিলাম যে সমুদ্রের রংবেরঙ্গের মাছ আর বনজঙ্গলের রঙ্গিন পাখিদের গায়ের রঙ আর বেশভূষার পেছনে ডারউইন সাহেবের সেই ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ (Natural Selection)দ্বারা আত্নরক্ষা বা বংশরক্ষার একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে। দুই, এই হংসজাতি। ঈর্ষা এদের রূপের জন্যে নয়, এদের ত্রিমাত্রিক স্বাধীনতার জন্যে। এরা আকাশে উড়তে পারে, জলে ভাসতে পারে কোনরকম উদ্যম ছাড়াই, আবার ইচ্ছে হলে মাটিতে উঠে ক্ষুদকুড়ো কুড়োতেও পারে। সত্যিকার সর্বচর জীব তারাই। ঈর্ষা আমার সেকারণে।
  ওই সপ্তহংসীর নৃত্যগোষ্ঠীকে চোখে পড়তেই আমাকে থামতে হল। প্রথমত ওদের আকৃতি। এতবড় হাঁস আমি জীবনে দেখেছি বলে মনে পড়েনি। একেকটির ওজন কম করে আমার সমান হবে। ডানাযুক্ত প্রাণীরা নাকি ডায়নাসোরের বংশধর----এই রাজহাঁসগুলোকে দেখার পর সেটা আরো বিশ্বাসযোগ্য মনে হল। তবে ওদের বিশালতাই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি কেবল, ওদের ভাবভঙ্গিও কেমন ভিন্নরকম মনে হচ্ছিল। যেন একটা বিশেষ ম্যাটিনি শো পরিবেশন করার পরিকল্পনা নিয়েই তারা পানিতে নেমেছিল সেদিন। জীবজন্তুদের দিয়ে সার্কাস হয় জানি, ছোটবেলার সার্কাসের স্মৃতি কি ভোলার উপায় আছে কারো, কিন্তু হাঁসগুলোর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল এরাও সার্কাসজাতীয় কিছু একটা করে, নিজেদেরই বিনোদনের জন্যে। অদ্ভুত, তাই না? আজ পর্যন্ত কোনও বইপুস্তকে এর উল্লেখ দেখিনি। সেদিন ওই হাঁসগুলোর আচার ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছিল ওরা জেনেশুনেই আসর বসিয়েছিল। প্রথমে দেখলাম ওদের সোজা লাইন ধরে দাঁড়াবার নিখুঁত অনুশীলন---যেন আর্মি ট্রেনিং ক্যাম্পের জোয়ানরা লাইন করে দাঁড়িয়েছে। একবার সমান্তরালে, আরেকবার কোনাকুনি। আরো একবার দেখলাম ওরা বর্শার ফলার আকার নিয়ে সাঁতরাচ্ছে---একজন সামনে, বাকি ছ’জন দুধারে সমকোন সরলরেখায় সমানভাবে বিভক্ত। অঙ্কের মাস্টার আমি, মনে মনে একশ’তে একশ দিয়ে দিলাম হাঁসগুলোর চমৎকার জ্যামিতিজ্ঞান দেখে। অসাধারণ দৃশ্য। কিন্তু তখনো তাদের বড় খেলাটা শুরু হয়নি। দেখার পর মনে হল যেন শ্বাস ফেলতে ভুলে গেছি। সাতটি বিশাল হাঁস যুগপৎ, যেন কোনও সূক্ষাণুসূক্ষ্ণ ঘড়ির কাঁটা ধরে পানিতে ডুব দিয়ে লেজ নাড়লো কয়েকবার, তারপর ঠিক একই সময় পানি থেকে মাথা তুলে গোলাকারে দাঁড়িয়ে গেল। যেমনটি আমরা দেখে থাকি অলিম্পিক প্রতিযোগিতার Synchronized Diving পর্বটিতে। মনে মনে ভাবলামঃ সময় এবং তালরক্ষার এই কঠিন খেলাটি কে কার কাছ থেকে শিখেছে? মানুষ শিখেছে হাঁসের কাছ থেকে, না, হাঁস শিখেছে মানুষকে অনুকরণ করে? আমি আর আমার মাঝবয়সে-পৌঁছানো পুত্র মুগ্ধবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম সেই অসাধারণ দৃশ্যটির দিকে। বেশ ক’টা ছবিও তুলে নিল সে তার ডিজিটাল ক্যামেরাতে। হাঁসেদের ‘সমলয়ের জলনৃত্য’ বললে কেউ বিশ্বাস করবে মনে হয়? জানি, এদেশের অনেক প্রমোদাগারে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে মানুষ ডলফিনদের দিয়ে নানারকম নাচের খেলা দেখায়। কিন্তু সে নাচ ডলফিনদের নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত নাচ নয়, নিজেদের আনন্দ প্রকাশের নাচ নয়, তাদের মুনিবদের ফরমায়েসী নাচ সেগুলো। হাঁসেদেরও হয়ত নাচ শিখিয়ে পর্যটকদের পকেট থেকে পয়সা আদায় করা সম্ভব হতে পারে----নিরীহ পশুদের দিয়ে মানুষ তো চিরকালই যাচ্ছেতাই করিয়ে নিচ্ছে , কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত জৈবিক আনন্দের অভিব্যক্তি, সেটা কি কখনও সম্ভব হবে? কখনও কি কেউ পারবে বলেকয়ে হাঁসেদের দিয়ে অমন করে নাচাতে? মনে হয়না। আমি এবার যা দেখলাম ফ্লোরিডায়, বা ক্যালিফোর্নিয়ায়, তা পয়সা দিয়ে কিনবার নয়---সেটা অমূল্য। এতটাই অমূল্য যে অতঃপর আমি কখনোই, কোনও কারণেই, হাঁসের শরীরকে খাদ্য বলে ভাবতে পারব না।

ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া


মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে